বিরুলিয়ার চাপা দীর্ঘশ্বাস

আনোয়ারুল হক সোমবার, ২০ মে, ২০১৯ ০৯:৪৯ পিএম | আপডেট: সোমবার, ২০ মে, ২০১৯ ০৯:৫৪ পিএম

বিরুলিয়ার চাপা দীর্ঘশ্বাস

(বাড়ির কাছে আরশি নগর)

আনোয়ারুল হক: বিরুলিয়া গ্রাম লালমাটিয়া থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরত্বে। গাড়িতে করে পৌঁছাতে লাগে ৪৫ মিনিটের মতো। মাজার রোড দিয়ে মিরপুরের বেড়িবাঁধ ধরে ১০ মিনিট চলে বিরুলিয়া ব্রীজে ঢোকার আগে বাঁয়ের রাস্তা ধরে এগুলে তুরাগনদী। খেয়া নৌকায় দু’মিনিটে নদী পার হলেই বিরুলিয়া গ্রাম। চৈত্র মাসের নদীতো এমনিতেই ছোট। তারপরও চারপাশটা এতো সবুজ যে পুরো এলাকাটাকে লাগে ছবির মতো। নৌকায় উঠেই দীর্ঘশ্বাস ফেলি। নদীর পানি কুচকুচে কালো। পানি থেকে আসা পঁচা ঝাঝালো গন্ধ নাকে লাগে। গাজীপুর আর আশেপাশের যত ডাইং কারখানা আছে তার সবকটার বর্জ্য মনে হয় পড়ে এই নদীতে। নিজেদের পরিবেশের তেরোটা বাজিয়ে অল্প দামে গার্মেন্টস প্রোডাক্ট আমরা উপহার দিচ্ছি প্রথম বিশ্বকে। এবার অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে একটা বড় শপিং মার্টে দেখি বাংলাদেশি প্রোডাক্টে ভরা। দাম অবিশ্বাস্য রকম কম।৮/১০ ডলারে যে টি-শার্ট বিক্রি করছে ঢাকার মার্কেটেও এর দাম বেশি। ব্যবসাতো সবার ভালোই হচ্ছে। চারিদিকে শুধুই লাভ আর লাভ। ঢাকা শহরের ঠাঁট বাট বাড়ছে। পিজার নতুন চেইনশপ ওপেন হচ্ছে। শুনছি সেখানে নাকি প্রথম দিনেই বিক্রির বিশ্ব রেকর্ড হয়েছে। এইসব লাভের গল্পের মাঝেই আমাদের জল-জলা সবশেষ।

 

ছবির মতো গ্রাম বিরুলিয়া। একটু ঘুরলেই বোঝা যায় গ্রামটি আসলে একটি ছোট্ট দ্বীপ। এখন শুকনো মৌসুম। গ্রামের একদিকে নদী আর অন্য সব দিকে অবারিত সবুজ ধানক্ষেত। বর্ষাকালে থাকে সবদিকে থাকে পানি। গ্রামের মাঝখান দিয়ে সরু ইটের একটা রাস্তা চলে গেছে। সেই রাস্তা ঘিরেই বসতি। আমাদের মতো শহুরে মানুষদের মূল আকর্ষণ এই গ্রামের পুরোনো সব দালান। ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় এগুলোর সবই হিন্দু বণিকদের বাড়ি। প্রাচ্যের স্থাপত্যরীতির ধরন অনুযায়ী তৈরি এই বাড়িগুলো এক-দেড়শো বছর আগে এ এলাকার যে প্রাণ-চাঞ্চল্য আর ঐশ্বর্য ছিল তার কথা মনে করিয়ে দেয়। বিরুলিয়া ছিল হিন্দু বণিকদের স্বচ্ছলগ্রাম। এখানকার নামকরা ব্যবসায়ী ছিলেন তারক চন্দ্রসাহা, গোপিবাবু, নিতাই বাবু আর রজনীঘোষ। কোলকাতার আদিঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের কর্ণধার নিতাইচন্দ্রের বাড়িও ছিল এইগ্রামে। তাদের বংশধরেরা নাকি চৈত্রসংক্রান্তির সময় এখনো এলাকায় আসেন মাটির টানে। রজনীকান্ত নামের এক জমিদারের বাড়িও নাকি ছিল বিরুলিয়ায়।

 

তবে আমার ধারণা বিরুলিয়া ছিল পূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্র। আজ থেকে শতাধিক বছর আগে এইগ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা তুরাগ নদী যুক্ত ছিল বংশীনদী, ধলেশ্বরী আর বুড়ি গঙ্গার সঙ্গে। ভাওয়াল রাজার জমিদারী এস্টেটের পোর্ট বা বন্দর ছিল বিরুলিয়া। ভাওয়াল রাজা নাকি অস্থায়ী মোকাম বসিয়ে এখান থেকেই শাসন করতেন সাভার, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, বরমী আর আশেপাশের এলাকা। রাজার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে বণিকেরা পণ্য আনতেন। রাজারপাইক, বরকন্দাজ আর মুন্সীরা বাছাই করতো পণ্য। এ উপলক্ষ্যে বসতো বড় মেলা। এভাবেই আশেপাশের এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল আশুলিয়া।

গ্রামে ঢোকার মুখেই পুরোনা এক বটগাছ যেন কালের বিবর্তনের স্বাক্ষী। সঙ্গেই পুরোনো এক মন্দির। এরপর একটু এগুতেই পুরোনো দালান চোখে পড়ে। কোনো কোনো দালান পুনর্নিমাণ করে মানুষ বসবাস করছে। আর তা করতে গিয়ে পুরোনো আভিজাত্য আর নতুন চাহিদার বিশ্রী মিশ্রণ দৃষ্টিগোচর হয়। এক দালানের পেছনের দিকে পুলিশফাঁড়ি স্থাপিত হয়েছে। রাস্তা ধরে আরো সামনে গিয়ে ৫/৬টি ভবন দেখা গেলো। পরিচর্যার অভাবে সবগুলো ভবনের অবস্থাই করুণ। এর মধ্যেও টিকে আছে দেয়ালের কারুকার্য আর দালানের অপূর্বনকশা। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ভবন গুলোর ছবি তুলছিলাম। সেই ছবি তোলার ফাঁকেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কান পাতলেই যেন শুনছি মানুষের দীর্ঘশ্বাস। শুনছি পরিবারগুলোর চাপাকান্না। দালান গুলোর প্রতিটা ইট যেন বলছে তার কষ্টের কথা। দেশভাগের সময় কত কস্ট নিয়েই না পরিবারগুলো নিজের গ্রাম, ব্যবসা আর বাড়িঘর ছেড়ে অন্যখানে চলে গেছেন। চলে গেছেন দূরে, বহুদূরে হয়তো জীবনের মায়ায়। দূরের বসতিতে হয়তো তারা ভালো ছিলেন, হয়তো ভালো ছিলেন না। বিরুলিয়ার জীবন তারা হয়তো কোনো দিনই ভুলতে পারেন নি। বিরুলিয়ার স্মৃতি হয়তো তাদের সারাজীবন তাড়িয়ে বেরিয়েছে। আমার মন ভারি হয়ে আসে। সভ্যতার সব ইতিহাসই বর্বরতার ইতিহাস।

দালানগুলোয় আমি আর স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখতে পাইনা। শুধু চাপাকান্না আর দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাই। সে কান্না নারীর, সে কান্না শিশুর আর পুরুষের। ভারি মন নিয়ে আমি অবারিত সবুজ ধানক্ষেতের দিকে তাকাই আর নিজের কান্না লুকাই।

 

 

 

ই-পেপার

আর্কাইভস সংবাদ

গৃহবধূকে হত্যায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ
গৃহবধূকে হত্যায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ
ক্রিকেটারদের খেলা বন্ধের সিদ্ধান্ত ষড়যন্ত্রমূলক: বিসিবি সভাপতি
ক্রিকেটারদের খেলা বন্ধের সিদ্ধান্ত ষড়যন্ত্রমূলক: বিসিবি সভাপতি
পদ্মাসেতুতে বসলো ১৫তম স্প্যান, দৃশ্যমান হলো ২.৫ কি.মি
পদ্মাসেতুতে বসলো ১৫তম স্প্যান, দৃশ্যমান হলো ২.৫ কি.মি
ঢাকায় এক মঞ্চে দুই বাংলার তারকারা
ঢাকায় এক মঞ্চে দুই বাংলার তারকারা
সড়কে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে: ইলিয়াস কাঞ্চন
সড়কে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে: ইলিয়াস কাঞ্চন
আন্দোলন সম্পর্কে জানতাম না, তবে ১১ দফা দাবির সঙ্গেই আছি: মাশরাফি
আন্দোলন সম্পর্কে জানতাম না, তবে ১১ দফা দাবির সঙ্গেই আছি: মাশরাফি
কানাডায় আবারো ক্ষমতায় বসছে জাস্টিন ট্রুডোর লিবারেল পার্টি
কানাডায় আবারো ক্ষমতায় বসছে জাস্টিন ট্রুডোর লিবারেল পার্টি
এবার ভোলায় এসপির ফেসবুক আইডি হ্যাক
এবার ভোলায় এসপির ফেসবুক আইডি হ্যাক
সিডনির মিউজিক ফেস্ট সন্ধ্যায় দর্শক মাতালেন অর্ণব-মাইলস্
সিডনির মিউজিক ফেস্ট সন্ধ্যায় দর্শক মাতালেন অর্ণব-মাইলস্
ডিইউ ফ্যামিলি ভিক্টোরিয়ার দ্বিতীয় পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত
ডিইউ ফ্যামিলি ভিক্টোরিয়ার দ্বিতীয় পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত
বিএনপির এমপি হারুনের ৫ বছরের কারাদণ্ড
বিএনপির এমপি হারুনের ৫ বছরের কারাদণ্ড
সব ধরনের ক্রিকেট বর্জনের ঘোষণা ক্রিকেটারদের
সব ধরনের ক্রিকেট বর্জনের ঘোষণা ক্রিকেটারদের
​​​​​​​তাল দিয়ে ৫ রকমের ভিন্ন স্বাদের খাবার
​​​​​​​তাল দিয়ে ৫ রকমের ভিন্ন স্বাদের খাবার
‘দ্য হান্ড্রেডে’ টুর্নামেন্টে সাকিব-তামিমসহ ডাক পাননি বাংলাদেশের কেউই
‘দ্য হান্ড্রেডে’ টুর্নামেন্টে সাকিব-তামিমসহ ডাক পাননি বাংলাদেশের কেউই
আইনজীবীর সহকারী মোবারক হত্যায় ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ
আইনজীবীর সহকারী মোবারক হত্যায় ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ
অস্ট্রেলিয়ায় ইমিগ্রেশনের সম্ভাবনা: নতুন পেশার তালিকা
অস্ট্রেলিয়ায় ইমিগ্রেশনের সম্ভাবনা: নতুন পেশার তালিকা
২২ ডিসেম্বর বিজয় দিবস কনসার্টে  সিডনি মাতাবেন সোলস, ওয়ারফেজ ও ঐশী
২২ ডিসেম্বর বিজয় দিবস কনসার্টে সিডনি মাতাবেন সোলস, ওয়ারফেজ ও ঐশী
সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ
সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ
আমেরিকার ভিসার জন্য নতুন নিয়ম চালু
আমেরিকার ভিসার জন্য নতুন নিয়ম চালু
ব্যবসায়ীদের জন্য নিউজিল্যান্ডে অভিবাসনের সুবর্ণ সুযোগ ‘অন্ট্রেপ্রনার ওয়ার্ক ভিসা’
ব্যবসায়ীদের জন্য নিউজিল্যান্ডে অভিবাসনের সুবর্ণ সুযোগ ‘অন্ট্রেপ্রনার ওয়ার্ক ভিসা’
অস্ট্রেলিয়ার স্কিলড মাইগ্রেশন ভিসার পয়েন্ট পদ্ধতিতে আসছে পরিবর্তন
অস্ট্রেলিয়ার স্কিলড মাইগ্রেশন ভিসার পয়েন্ট পদ্ধতিতে আসছে পরিবর্তন
যে সব কারণে বাতিল হতে পারে আপনার অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকত্ব
যে সব কারণে বাতিল হতে পারে আপনার অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকত্ব
নুসরাতের জানাজায় ও সেলফির হিড়িক !
নুসরাতের জানাজায় ও সেলফির হিড়িক !
অবসরে গেলে দলের প্রধান কে হবেন, জানালেন প্রধানমন্ত্রী
অবসরে গেলে দলের প্রধান কে হবেন, জানালেন প্রধানমন্ত্রী
সামর্থ্যবান ব্যাবসায়ীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ
সামর্থ্যবান ব্যাবসায়ীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ
রোগীদের সাথে যৌন অপরাধের দায়ে সিডনিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চিকিৎসক অভিযুক্ত 
রোগীদের সাথে যৌন অপরাধের দায়ে সিডনিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চিকিৎসক অভিযুক্ত 
ব্রিসবেনে সড়ক দূর্ঘটনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইটি প্রফেশনাল  নিহত
ব্রিসবেনে সড়ক দূর্ঘটনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইটি প্রফেশনাল নিহত
শেখ হাসিনার সফর উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগের মত বিনিময়
শেখ হাসিনার সফর উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগের মত বিনিময়
ভিসা সংক্রান্ত প্রচলিত কিছু জালিয়াতি
ভিসা সংক্রান্ত প্রচলিত কিছু জালিয়াতি
অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনঃ  বর্তমান সময়ের সমস্যা ও সম্ভাবনা
অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনঃ বর্তমান সময়ের সমস্যা ও সম্ভাবনা