সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২১, ১লা আশ্বিন ১৪২৮


ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুত্ব : মোঃ শামছুল আলম


প্রকাশিত:
৪ আগস্ট ২০২১ ১৪:১৬

আপডেট:
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৬:০৩

ছবিঃ : মোঃ শামছুল আলম

 

মানুষের পক্ষে সমাজে একা বসবাস করা সম্ভব নয়। নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য, বিপদে সহযোগিতা পাওয়ার জন্য এবং সামগ্রিকভবে সাহচর্য লাভের জন্য একজন ভাল বন্ধুর একান্ত প্রয়োজন। কারণ, একজন প্রকৃত ও ভাল বন্ধু জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার অংশীদার হয়।

সমাজে বিচিত্র শ্রেণীর লোক বাস করে। একেক জনের পেশা একেক রকম। তাই সমাজে একজনকে আরেকজনের প্রয়োজন হয়। সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মানুষের কর্ম, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয় বন্ধুত্বের কল্যাণে। এই বন্ধুত্বের ব্যাপারে ইসলামের রয়েছে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। কাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে এবং কাদের বর্জন করতে হবে এ ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা আমাদের পথ দেখিয়েছেন।

বন্ধুত্ব আল্লাহর এক অশেষ নিয়ামত। সঠিকভাবে যথার্থ বন্ধু নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে মানুষ তার সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনকে সুষ্ঠু ও নিরাপদ করে তোলে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহপাক বলেছেন-

আর ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠিত করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন-যাপন করে। তাদের ওপর আল্লাহতায়ালা অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী সুকৌশলী। [-সূরা আত তওবা: ৭১]

এই প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসলো, তো আল্লাহর জন্যই ভালোবাসলো, কাউকে ঘৃণা করলো, তো আল্লাহর জন্যই ঘৃণা করলো, কাউকে কিছু দিলো, তো আল্লাহর জন্যই দিল এবং কাউকে দেয়া বন্ধ করলো, তো আল্লাহর জন্যই দেয়া বন্ধ করলো, তবে সে তার ঈমানকে পূর্ণ করলো। [ মিশকাত শরিফ ]

বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কবি আল্লামা শেখ সাদি (রহ.) বিখ্যাত উক্তি দিয়েছেন-
“সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।” একজন ভালো বন্ধু যেমন মানুষের জীবনের গতি পাল্টে দিতে পারে, তেমনি একজন অসৎ বন্ধুর কারণে জীবন হয়ে যেতে পারে অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাই বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম প্রদর্শিত নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে। এতে একদিকে যেমন নানাবিধ সমস্যা ও ভোগান্তি থেকে বেঁচে থাকা যাবে, অন্যদিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর পথ অনুসরণ করায় সওয়াব হাছিল হবে।
একজন ভাল বন্ধু হচ্ছে আল্লাহর দেয়া একটি সুন্দর উপহার, যা পৃথিবীর অনেক কিছু থেকেও শ্রেষ্ঠ। সুখে-দুঃখে সমান ভাবে ভাগিদার হবে যে মানুষটি সেই হচ্ছে বন্ধু।
একজন ভালো বন্ধুর কি কি গুণ থাকা দরকার এ সম্পর্কে ইমাম গাজ্জালি (র.) বলেন, যার মধ্যে তিনটি গুণ আছে তাকে বন্ধু বানাতে হবে।গুণগুলো হলো-
১. বন্ধুকে হতে হবে জ্ঞানী ও বিচক্ষণ; ২. বন্ধুর চরিত্র হতে হবে সুন্দর ও মাধুর্যময়; ৩. বন্ধুকে হতে হবে নেককার ও পূন্যবান। এই তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে তাকেই বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করা যাবে।

আবার কাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না এ সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (রা.) বলেন, পাঁচ ব্যক্তিকে বন্ধু বানানো যাবে না। তারা হলো- ১. মিথ্যাবাদী; ২. নির্বোধ; ৩. কৃপণ; ৪. কাপুরুষ; ৫. ফাসেক। সুতরাং আমাদের বন্ধুত্ব করতে হবে এমন লোকদের সাথে যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্বরণ হয়, পরকালের কথা স্বরণ হয় এবং জান্নাতের পথ সুগম হয়।

বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার Nusrath Aaliyah বলেন-“When I see them they remind me of Allah. When I sit with them my iman increases . When I speak to them my knowledge about Islam increases. They are the ones pushing me towards Jannah. They are my companions in this world and hereafter. Worth more than anything and everything this world can possibly offer.”
বন্ধুত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো সততা রক্ষা করা। ইমাম হাসানে মুজতবা (রা.) এর একজন ভক্ত একদিন ইমামের কাছে এসে তাঁর বন্ধু ও সহচর হতে চাইলো। ইমাম ঐ লোকের চেহারার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন এবং ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বললেনঃ “আমি তোমাকে আমার বন্ধুর মর্যাদায় অভিষিক্ত করবো তবে কয়েকটি শর্ত আছে যেগুলো আমার সাথে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে অবশ্যই রক্ষা করে চলতে হবে।” লোকটি ইমামের শর্ত মানার প্রতিশ্রুতি দিল। ইমাম তখন বললেনঃ “আমার বন্ধু হতে চাইলে আমার গুণকীর্তন গাইতে পারবে না, কারণ আমি নিজের ব্যাপারে ভালোভাবেই সচেতন, কখনো আমাকে মিথ্যা বলবে না কেননা মিথ্যার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই; একইভাবে আমার কাছে কারো ব্যাপারে গীবত করতে পারবে না।” লোকটি এবার চুপ মেরে গেল, যেহেতু তার মাঝে এ সব গুণ ছিল না তাই সে ইমামকে বললোঃ

‘হে রাসূলে খোদার সন্তান! আমাকে ফিরে যাবার অনুমতি দিন।’ ইমামের মুখে হাসির রেখা লেগেই ছিল, সেই সহাস্য মুখেই তিনি বললেনঃ ‘তোমার যেমন ইচ্ছে, সমস্যা নেই।’

বন্ধুকে সম্মান করা বন্ধুত্বের নীতিমালার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কারণটা হলো বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে যে বন্ধন তৈরি হয়, তার ফলে একজনের প্রতি আরেকজনের একটা অধিকার সৃষ্টি হয়, আর সেই অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা অবশ্য কর্তব্য। সর্বোপরি একজন মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব হলো অপরের সম্মান রক্ষা করা। চাই তা নীতিকৌশল পরিবর্তনের ব্যাপারেই হোক কিংবা ব্যক্তির আচার আচরণে সংস্কার আনার ব্যাপারেই হোক, অবশ্যই সাহায্য করতে হবে।

ইমাম আলী (রা.) একদিন কুফায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে এক ইহুদির সাথে দেখা। ঐ ইহুদি লোকটিও কুফার দিকেই যাচ্ছিল। ইহুদি লোকটি হযরত আলী (রা.) কে চিনতো না এবং জানতোও না যে তিনিই মুসলমানদের খলিফা। কিন্তু একই গন্তব্যের যাত্রী যেহেতু সেজন্যে আলী (রা.) সাথেই যাচ্ছিলো। যেতে যেতে এক সময় দুজনের মাঝে কিছু কথাবার্তা হলো। কথা বলতে বলতে একটি তেমোহনীতে এসে পৌঁছলো। সেখান থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে কুফার দিকে অপরটি তার আশপাশের কোনো এক এলাকার দিকে।
ইমাম আলী (রা.) ঐ তেমোহনীতে এসে কুফার পথে পাড়ি না জমিয়ে অপর পথে অগ্রসর হয়ে ইহুদি লোকটিকে সঙ্গ দিলেন। ইহুদি লোকটি জানতো যে তার সঙ্গী অর্থাৎ আলী (রা.) কুফায় যাবে, এখন ভিন্নপথে যাচ্ছেন দেখে জিজ্ঞেস করলোঃ ‘তুমি না বলছিলে কুফায় যাবে?’ ইমাম বললেনঃ হ্যাঁ, বলেছি। ইহুদি লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ ‘তুমি তো কুফার পথ চেনোই, তাহলে আমার সাথে আসছো কেন’?

ইমাম জবাবে বললেনঃ ‘আমরা চলার পথে বন্ধু হয়েছি, বন্ধুত্বপূর্ণ সফরের শুভ পরিসমাপ্তির জন্যেই তোমার সাথে যাচ্ছি, কেননা আমাদের নবী রাসূলে খোদা (সা.) বলেছেন পথিক বন্ধুর প্রতি সম্মান দেখানোর স্বার্থে বিচ্ছিন্ন হবার সময় কিছুটা পথ বন্ধুকে সঙ্গ দেওয়া উচিত অর্থাৎ তাকে কিছুটা এগিয়ে দেওয়া উচিত।’ ইহুদি লোকটি জিজ্ঞেস করলোঃ সত্যিই তোমাদের নবী এরকম বলেছেন?’ ইমাম বললেনঃ হ্যাঁ।ইহুদি লোকটি ইমাম আলী (রাঃ) এর চিত্ত্বাকর্ষক এই আচরণ আর নৈতিকতায় মুগ্ধ হয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মুসলমান হয়ে যান।

বন্ধুত্বের নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার হচ্ছে অসুখ-বিসুখ, বিপদ-আপদেও বন্ধুত্ব অটুট রাখা। লোকমান হাকিম বলেছেনঃ ‘প্রয়োজনের মুহূর্ত ছাড়া বন্ধুকে চেনা যায় না।’ কেউ যখন অসুস্থতায় ভোগে তখন তার প্রতি সেবাযত্নের প্রয়োজন হয়, সে সময় অসুস্থ ব্যক্তি আশা করে বন্ধুরা তার সেবায় এগিয়ে আসবে। নবীজীর আহলে বাইয়াতের মহান ইমাম হযরত আলী (রা.) যখন শুনতে পেলেন তাঁর বন্ধু হারেস হামেদানী অসুস্থ এবং একেবারে মরণাপন্ন অবস্থা, তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর সেবায় যাবেন এবং যথারীতি চলে যান। ঘরে ঢুকে হারেসের শিয়রে বসলেন। হারেস তার চোখ মেলে আমিরুল মোমেনিন (আ.) কে দেখতে পেলেন তার পাশে। ইমাম তার খোঁজখবর নিলেন এবং তার মনস্তুষ্টির জন্যে তিনবার বললেনঃ ‘হে হারেস! পরকালেও এই দুনিয়ার বন্ধুকে বন্ধু হিসেবে পাবে এবং তার সাহচর্য ধন্য হবে’। হারেস যেহেতু ইমামকে ভীষণ ভালবাসতেন, ইমামের এ কথায় ভীষণ খুশি হয়ে গেলেন এবং কিছুক্ষণের জন্যে একটু ভালো অনুভব করে উঠে বসে বললেন। ‘এখন আর কোনো ভয় কিংবা শঙ্কা নেই যে আমি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবো নাকি মৃত্যু আমার দিকে এগিয়ে আসবে।’ এর কিছুক্ষণ পরই হারেস মৃত্যুবরণ করেন।

বন্ধুত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার হলো ব্যক্তিগত অহমিকা বা গর্ব পরিহার করা। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যখন গভীর হয় তখন এক বন্ধু আরেক বন্ধুর কাছ থেকে কেবল যে সম্মানই পায় তা-ই নয় বরং নিজেকে কেউ বড়ো করে দেখারও চেষ্টা করে না, অহংকারও করে বেড়ায় না। পবিত্র কোরআনের সূরা যুমারের ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘অহংকারীদের স্থান হচ্ছে দোযখ।’ সূরা শুয়ারার ২১৫ নম্বর আয়াতেও বলা হয়েছেঃ ‘আপনাকে যারা অনুসরণ করছে সেইসব মুমিনের জন্যে আপনার পাখা বিস্তৃত করুন অর্থাৎ তাদের প্রতি সদয় হোন।

ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুদের সাথে আচরণ হতে হবে সদয়, আন্তরিক এবং বিনয়ী। তবে গঠনমূলক সমালোচনাও বন্ধুত্বের মাঝে বিদ্যমান অনিবার্য একটি শিষ্টাচার। হাদিসে এসেছে, রাসূলে খোদা (সা.) বলেছেনঃ ‘এক মুমিন আরেক মুমিনের জন্যে আয়নার মতো।’ তাই বন্ধুর দোষত্রুটিগুলো শোধরানোর ব্যাপারে সহযোগিতা করা শিষ্টাচারভুক্ত। কেননা এতে মঙ্গল ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তবে কখনো ভুল করলে ক্ষমা চাওয়াটাও একটা শিষ্টাচার। কেননা ভুল স্বীকারের মধ্যেই রয়েছে সংশোধনের বীজ। ইমাম আলী (রা.) এর ভাষ্য অনুযায়ী ‘সবচেয়ে মন্দ লোক হলো সে-ই যে ভুল স্বীকার করতে রাজি নয়।’

বন্ধুর বিপদে-আপদে খোঁজ-খবর রাখলে আল্লাহর ভালবাসা অর্জন সম্ভব। আবূ হুরাইরা (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেনঃ ‘‘এক ব্যক্তি নিজ গ্রামের বাইরে অন্য গ্রামে তার ভাইর সাথে সাক্ষাৎ করে, ফলে তার রাস্তায় আল্লাহ তায়ালা এক ফেরেশতাকে পাহারাদার হিসাবে নির্ধারণ করেন, অতঃপর যখন সে তার নিকটে পৌঁছে, তখন ফেরেশতাগণ বলেন- কোথায় যাচ্ছ? সে উত্তরে বলেঃ এই গ্রামে এক ভায়ের কাছে যাচ্ছি। ফেরেশতা বলেন- ওর প্রতি তোমার কোন অনুগ্রহ আছে কি, যা তুমি সম্পাদন করতে যাচ্ছ? সে বলেঃ না, কিন্তু আমি তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসি। ফেরেশতা বলেন- আমি তোমার নিকট আল্লাহর দূত, আল্লাহ তোমাকে ভাল বেসেছেন, যেমন তুমি তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভাল বেসেছো।” [মুসলিম-২৫৬৭]

কোন এক মনিষী বলেছেন-“A Good Friend not only cares about your relationship with them but also your relationship with Allah.”

পরিশেষে, মহান আল্লাহর নিকট দু’আ করি তিনি যেন আমাদের সৎ হওয়ার এবং সৎ লোকদের সংস্পর্শে থাকার এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই বন্ধুত্ব করার তাওফীক দেন। আমীন।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top