সিডনী শুক্রবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

প্রবাল প্রিয়ার আঁচলে বেঁধেছি প্রাণ : সিরাজুল ইসলাম জীবন


প্রকাশিত:
১৯ নভেম্বর ২০২০ ১৫:৫৭

আপডেট:
২৭ নভেম্বর ২০২০ ০৩:০৭

ছবিঃ নাফ নদী (ইন্টারনেট থেকে)

 

সকালে ঘুম থেকে ওঠে নাস্তা খাওয়ার সময় ছিল না। কক্সবাজার টু টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে সিএনজি ভাড়া করে ছুটলাম। একপাশে চির সবুজ, পাহাড়, বন-বনানী। আরেক পাশে উত্তাল সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তটের বারান্দায়। যদিও নিম্নচাপ ততক্ষণে কেটে গেছে। আশি কিঃমিঃ পথ, একেবারে কম নয়। হিমছড়ি, ইনানী পেরিয়ে গেছি, মেরিন ভ্রাইভে এই প্রথম অভিজ্ঞতা আমার। চোখ একবার ডানে একবার বামে ক্লান্তিহীন ফ্রেমে সব দৃশ্যপট বাঁধিয়ে চলেছে। একসময়ে টেকনাফ পৌঁছে গেলাম। ঘাটে গিয়ে দেখি শেষ ট্রলার সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই। এরপর আজ আর কোনো ট্রলার, স্পিডবোট কিছুই নাই। দ্রুত টিকেট কেটে ট্রলারে ওঠে পড়লাম। নাস্তা আর খাওয়া হলো না, তখন দশটা বেজে গেছে, এক গ্লাস পানিও খেতে পারিনি। মানুষ এবং মালামালে ভর্তি ট্রলারে পা ফেলার জায়গা নেই। কোনোরকমে ব্যাগ রেখে এককোণে বসে গেলাম। প্রচণ্ড সূর্যের তাপ। তারপরও এক অতিন্দ্রীয় অনুভূতি চোখে-মুখে। এ-ধরনের ট্রলারে জীবনে প্রথম ওঠলাম।

নাফ নদীর কোল ঘেঁষে ট্রলার চলছে, বাংলদেশ অংশে সবুজ ম্যানগ্রোভ, ও-পারে রাখাইন রাজ্যের পাহাড়ী ভাঁজ! এই নদী জানে কত রক্ত আর দীর্ঘশ্বাসের ইতিবৃত্ত। মায়ানমারের পুরনো নাম বার্মা। একসময় বার্মার রাজধানী ছিল রেংগুন>ইয়াংগুন। বর্তমান মায়ানমারের রাজধানী হচ্ছে নেপিডো। চট্রগ্রামের সঙ্গে একসময় বার্মার দারুণ যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জড়িয়ে ছিল। শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের কণ্ঠে ছোটবেলায় শুনেছিলাম---বানুরে, ও বানু,

                       জ্বী জ্বী জ্বী,

আঁইতো যাইয়ুম রেংগুন শহর তোঁয়াল্লাই আইননুম কী?

যাক সে-কথা, নাফ নদী অতিক্রম করছি। বাংলদেশ অংশে শাহ্ পরীর দ্বীপ দেখা যাচ্ছে। মন চাচ্ছিল এই দ্বীপে নেমে পড়ি। সারি সারি নারকেল গাছ আর বাড়ীঘরও দেখা যাচ্ছে। জানা হলো না এই দ্বীপের রহস্য, জীবনধারণ প্রণালী কেমন! ওদিকে রাখাইনের পাহাড়ী ভাঁজ যেন কোনো অষ্টাদশী আকাশী রঙের আঁচল পেতেছে থরে থরে। দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে সেই আঁচল ছোঁয়ার বড় সাধ জাগলো। কিন্তু মানব রচিত আইনে ওদিকে লোভ করা বারণ! কী আর করা, প্রখর সূর্যের তাপে মগজ বের হবার উপক্রম। তবু সেদিকে খেয়াল নেই। একসময় নাফ নদী পেরিয়ে ট্রলার সাগরের নীল জলরাশি ভাঙতে লাগলো। নদী-সাগর মিলিয়ে মোট বিয়াল্লিশ কিঃমিঃ জলপথ। এরপর দেখা মিলবে স্বপ্নের প্রবাল পাথরের দেশের।  

সাগরের নীল জলরাশি কখনো পুকুরের মতো শান্ত আবার কখনো ক্ল্যাসিক নৃত্যরত কোনো অষ্টাদশী যেন! ট্রলারও তখন নৃত্যের তালে তালে উপর-নিচু করতে থাকে। সাগরের এমন রুদ্ররূপ দেখে নজরুলের 'সিন্ধু হিন্দোল' কাব্যের কবিতা মনে পড়ে গেল,

দুরন্ত গো, মহা বাহু
ওগো রাহু,
তিনভাগ গ্রাসিয়াছ-একভাগ বাকী!
সুরা নাই পাত্র হাতে কাঁপিতেছে সাকী!

ভয়-ডর কিচ্ছু লাগছে না আমার। এই নীল জলে সলিল সমাধি কপালে থাকলেও আমার আফসোস নেই। ক্ষুধার যন্ত্রণাও ভুলে গেলাম। সাড়ে বারোটা বেজে গেছে তখন। ঐ তো অনেক দূরে স্বপ্নের দ্বীপ দেখা যাচ্ছে! ট্রলার এগিয়ে চলেছে। আরো প্রায় বিশ মিনিট চললো। দ্বীপের প্রায় কাছাকাছি। এমন সময় হঠাৎ  ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। আধা ঘণ্টা চেষ্টা করেও ওটা চালু করা যায়নি। অন্য ট্রলার এসে রশি লাগিয়ে কূলে ভিড়ায়। তার আগে ঘটে গেল এক দুর্ঘটনা! ভাগ্যিস ইঞ্জিন বন্ধ ছিল, না হয় আমার ঠাঁই হতো হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। ইঞ্জিনের ধোঁয়া বেরুবার যে লোহার পাইপ সেটা ধরা যে নিষেধ তা আমি জানতাম না। দ্বীপ দেখা যাচ্ছে, ট্রলার দাঁড়ানো, চলছে না, আমার আর দেরী সহ্য হচ্ছে না। তাই একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। এরপর অবচেতনে ঐ লোহার পাইপে বাম হাত দিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করতেই আমাকে স্পার্ক করে ওঠলো। মুহূর্তের মধ্যেই হাত ছাড়িয়ে নিলাম কিন্তু হাত যেন অঙ্গার হয়ে গেছে। তীব্র ব্যথায়, তীব্র যন্ত্র‌ণায় মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। বাম হাত দিয়ে কিচ্ছু করার ক্ষমতা নাই। একসময়ে দ্বীপে প্রবেশ করলাম। হাত ব্যথা করছে, সেদিকেও আর খেয়াল করছি না। আমি যে সাগর কন্যার আঁচলে এখন। 

জেটি থেকে হাঁটা শুরু করলাম, রাস্তার পাশে বিশাল সাইজের ডাবের দোকান । বসে পড়লাম। এই দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ সস্তায় ডাব খাওয়া। কিন্তু সস্তা না একদম, ষাট টাকা রাখলো। তবে এত পরিমাণ পানি আমি আজাকের আগ পর্যন্ত দেখিনি। হঠাৎ দ্বীপে ডাবের দাম বাড়ার অন্য কারণ আছে। সে প্রসঙ্গে পরে বলবো। আমাদের রিসোর্ট আগেই ঠিক করা ছিল। বহুকাল আগের পরিচিত জন সৈকত। এখন ডাঃ সৈকত হিসেবে সেন্টমার্টিনে অতি পরিচিত। সেন্টমার্টিনের একমাত্র সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক তিনি। তার তৈরি হ্যারিটেজ রিসোর্টে যাব। একদম অপরিচিত জায়গা। সেটা সমস্যা না। কিন্তু হাতের ব্যথায় আমি খেই হারিয়ে ফেলি। কাঠের তৈরি একটি অটোরিক্সায় ওঠলাম। এক কিঃমিঃ পর নামলাম। কত দেব? বললো দুইশত টাকা! যেন আকাশ থেকে পড়লাম। কী আর করা দুইশত টাকাই দিতে হলো। ডাঃ সৈকত তখনো হাসপাতালে। রিসোর্টের কর্মচারী রুমের চাবি বুঝিয়ে দিল। গোসল সেরে নিলাম। কিছুক্ষণ পর ডাঃ সৈকত এল। সারা দিনের উপোস বলা যায়।মাঝখানে ডাবের পানিটুকু ছাড়া। ডাক্তার সাহেব আমাদেরকে একটা হোটেলে নিয়ে গেলেন। রূপচান্দা মাছ দিয়ে খাওয়ালেন। স্বাদে-গন্ধে অপূর্ব রূপচান্দা। এরপর ধীরে ধীরে রুমে ফিরে আসি। আমাদের বারান্দা থেকে সাগরের ঢেউ গোনা যায়। শরীর ক্লান্ত। ভাবছিলাম কাপড় ধোব। কিন্তু হাতের যা অবস্থা সম্ভব নয়। শুয়ে পড়লাম। এক বিচিত্র জগতের বাসিন্দা হয়ে উঠলাম। 

‌রাতের দিকে বেরুলাম। সমুদ্রের তটরেখায় হাঁটলাম। হুমায়ূন আহমদের বাড়িটি আমাদের রিসোর্ট থেকে হাঁটলে দুই মিনিটের দূরত্ব। বাড়িটির সামনে গেলাম। 'সমুদ্র বিলাস' তাঁর বাড়ির নাম। একদম সমুদ্রের কোল ঘেঁষে পশ্চিম বরাবর। কাঠের কারুকার্যপূর্ণ বাড়ি। বেশ নান্দনিক। গেইটের ভেতর দিক দিয়ে সারাক্ষণ তালা মারা থাকে, তাই ভেতরে প্রবেশ করতে পারিনি। এই দ্বীপের পরিচিতির পেছনে হুমায়ূন আহমদের অবদান অপরিসীম। তিনি এর নতুন নাম দিয়েছেন দ্বারুচিনি দ্বীপ। চার দিন ছিলাম এখানে। এই চারদিনে হুমায়ূন আহমদের এই বাড়ি করার পরিপ্রেক্ষিত উদঘাটন করেছি। অন্তত বিশ বছর আগে এই দ্বীপে আসেন তিনি। এসেই স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে জমি কেনার প্রস্তাব দেন। জমি এখানে তখন একদম সস্তা। মানুষগুলোও গরীব। দূরদর্শী হুমায়ূন আহমদ বুঝতে পেরেছিলেন এই দ্বীপ একদিন ইতিহাস সৃষ্টি করবে। মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকায়  এক কানি অর্থাৎ চল্লিশ শতক জমিন টেকনাফ গিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। কিন্তু টাকা দেয়ার সময় মালিককে ত্রিশ হাজার টাকা দেন তিনি। এই টাকা পেয়ে মালিক খুশিতে আত্মহারা। এবং এই টাকার কারণে টোটাল সেন্টমার্টিনে তিনি সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। এরপর ধীরে ধীরে বাইরের লোকের সমাগম বাড়তে থাকে এখানে। এখন এই দ্বীপে শতাধিক রিসোর্ট হয়েছে। জমির কানি বর্তমানে কোটির উপরে। সব হয়েছে বা হচ্ছে ব্যক্তি উদ্যোগে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কোনো চোখ আছে বলে  মনে হয় না। সেন্টমার্টিন হলো টেকনাফের একটা ইউনিয়ন মাত্র। অথচ আমার কাছে বাংলাদেশের কোনো কোনো জেলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। সরকারের পরিকল্পনা  থাকলে এতদিনে এই দ্বীপ ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপকে ছাড়িয়ে যেতো।

রাতে আরো ঘণ্টাখানেক হেঁটেছি। আবারও ডাব খেলাম। প্রায় দশটার দিকে আমাদের রিসোর্টের কাছাকাছি অবকাশ হোটেলে ভাত খেলাম। সাগরের কাইক্যা মাছ দিয়ে। এই মাছ জীবনে প্রথম খেলাম। বেশিরভগ সময় এই হোটেলেই খেয়েছি।

মানিক বন্দ্যেপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে 'ময়না দ্বীপ' নামে একটি দ্বীপ আছে। জানি না মানিক বাবু এই দ্বীপে এসেছিলেন কি না। তবে সেই ময়না দ্বীপের প্রায় কার্বন কপি বলা যায় সেন্টমার্টিনকে। সেন্টমার্টিন লম্বায় সাত কিঃমিঃ, আর প্রস্থে (উত্তর দিকে) হবে এক থেকে দেড় কিঃমিঃ, আর মাঝ বরারর বা আরো দক্ষিণে ওটা আধা কিঃমিঃ চেয়েও কম। কিছুটা ডিম্বাকৃতির। দ্বীপের মাঝখানটায় ধান ক্ষেত রয়েছে। এখানে নাকি ভালো তরমুজ হয়। বড় বড় আমগাছও দেখলাম। কলার বাগানও চোখে পড়েছে। বিভিন্ন শাক-সব্জিও আছে। পিয়াজ-রসুন, মরিচ এগুলোর চাষও আছে।  গরু-ছাগল প্রচুর দেখেছি, এমনকি মহিষও চোখে পড়েছে। আর দেশিয় মুরগী প্রত্যেক বাড়িতেই আছে। এই দ্বীপের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর মিঠা পানি। চারদিকে নোনাজল অথচ মিঠা পানিতে দ্বীপ ভাসছে। না হয় মানুষ বাস করতে পারতো না। এ এক আশ্চর্য ঘটনা। সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কাড়বে দ্বীপের নারকেল গাছ। স্রষ্টার অপার দান এই ডাব এখানে মুড়ির মতো বিক্রি হয়। আমাদের পঞ্চাশ-ষাট টাকায় কিনতে হয়েছে, একমাস আগেও বিশ-ত্রিশ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দাম বাড়ার কারণ হলো ঢাকার এক ব্যবসায়ী দশ-বারো দিন আগে গড়ে দশ টাকা দরে জাহাজ ভর্তি করে ডাব নিয়ে গেছে রাজধানীতে। শুনে কিছুটা আশ্চর্যই হলাম। কর্পোরেটোক্রেসি সাগরের মাঝখানেও হানা দিয়েছে! 

পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে অবকাশ হোটেলে খিচুড়ি দিয়ে নাস্তা সারলাম। এরপর ছেড়াদিয়া বা ছেড়াদ্বীপ যাওয়ার পরিকল্পনা। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ এই ছেড়াদ্বীপ। ওখানে হেঁটে যাওয়া যায় অথবা বাইক বা বাইসাইকেল ভাড়া করেও যাওয়া যায়। প্রচণ্ড সূর্যের তাপ! তবু হেঁটেই যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। হাঁটা আমার শৈশবের অভ্যাস। অন্তত সাত কিঃমিঃ হাঁটতে হবে, তারপর দেখা মিলবে ছেড়াদিয়ার। দ্বীপের পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে তটরেখায় হাঁটা শুরু করলাম, মাঝে মাঝে ছবি তোলারও বিরাম নেই। যতই হাঁটছি লোকজন খুব কমই চোখে পড়ছে। দ্বীপের ও-দিকটায় বসতি যেমন কম তাই লোকজনও কম। সারি সারি নারকেল গাছ আর কেয়া বা কেওড়ার জঙ্গল মনকাড়া রূপবতী যেন। স্থানীয় বাড়িঘরগুলো বাঁশ-বেত, শন বা টিন বা কাঠ-পাতা-লতা দিয়ে তৈরী। স্থানীয়দের বড় একটা অংশ এখনো গরীব বলে মনে হলো। গরীব হলেও ওদের আভিজাত্য আছে। ওখানকার প্রত্যেকটি বাড়ি লতা-পাতা দিয়ে হলেও ঘিরে রাখা হয়েছে। সুতরাং ভেতরটা আপনি প্রবেশ না করে বুঝবেন না। হাঁটতে হাঁটতে মসজিদ পড়লো একটা। মসজিদের ঈমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বললাম। দ্বীপে মসজিদের সংখ্যা চৌদ্দটি বললো। কওমী মাদ্রাসা আছে কয়েকটি। মক্তবের কোনো অভাবই নেই। সরকারি প্রাইমারি সহ স্কুল আছে তিনটি বা চারটি, হাইস্কুল আছে একটি। দ্বীপের লোকসংখ্যা কম-বেশি আট হাজার। এর মধ্যে মাত্র দুই ঘর হিন্দু আছে, বাকী সব মুসলমান। সভ্য দুনিয়ার পুঁজিপতিদের নজর এখন এই দ্বীপে। জায়গা কিনে রিসোর্ট বানাচ্ছে, বালাখানা বানাচ্ছে। অবকাশ জীবন যাপনের জন্য বেছে নিচ্ছে এই দ্বীপকে। এখানে জিনিসপত্রের দাম মূল ভূখণ্ডের চেয়ে দ্বিগুণ। পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে মাছ আর ডাব ছাড়া সবই টেকনাফ থেকে আনতে হয়। তাই সাগরের মর্জির উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। সতর্ক সংকেত জারি হলে নৌ  চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুহাজার একরের এই ভূখণ্ড কার্যত তখন এক বিচ্ছিন্ন স্বপ্নপুরী ছাড়া আর কিছু নয়। 

ছবিঃ লেখক

একটানা হেঁটে চলেছি। মাঝখানে একবার ডাব খেলাম। তটরেখা ছেড়ে এবার গ্রামের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছি। চমৎকার গ্রামীণ পরিবেশ। সরু সরু গ্রামের রাস্তার দুপাশে ঘাসের গালিচা, ধানক্ষেত, খাল, ডোবা সব ছবির মতো সাজানো। কোনোরকম দূষণের লেশমাত্র এই দ্বীপে নেই। অস্বস্তিকর বলতে একটা বিষয় অবশ্য আছে। সেটা হলো বেওয়ারিশ কুকুর। জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এখানকার কুকুরের প্রজনন ক্ষমতা ধারণার বাইরে। এভাবে চললে দশ বছর পর মানুষের চেয়ে কুকুরের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। এই একটি বিষয় নিয়ে দ্বীপবাসীরা চিন্তিত। পর্যটকদেরও সমস্যা হয়। কিন্তু পরিবেশবাদীদের কারণে নাকি কুকুর নিধন হচ্ছে না। কুকুরের প্রসঙ্গ থাক এখন। হাঁটায় আমার তখনো ক্লান্তি নেই। দুপাশ দেখি আর হাঁটি। গ্রামের রাস্তা ছেড়ে আবার সৈকতে নেমে হাঁটছি। 

কখনো বালি কখনো পাথর মাড়িয়ে হেঁটে চলেছি। আড়াই ঘণ্টা হাঁটার পর দেখা যাচ্ছে ঐ তো ছেড়াদিয়ার কেওড়ার ম্যানগ্রোভ। হেঁটে আসা আর কাউকে খুঁজে পেলাম না। সবাই বিভিন্ন বাহনে করে আসা-যাওয়া করছে। কেবল আমরা দুজনই হেঁটে চলেছি। আমার কলিগ আজিজ স্যার একমাত্র সঙ্গী আমার। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সব পরখ করে নেয়া। ছেড়াদ্বীপের দুটি আলাদা ভূখণ্ড রয়েছে। দুটোই কেয়ার কাঁটায় ঘেরা। সেন্টমার্টিন থেকে অনেকটা দূরে, অনেকটা আলাদা। জোয়ারের সময় একদম বিচ্ছিন্ন। ভাটির সময় আবার জোড়া লাগে। ছেড়াদ্বীপ যেতে যেতে প্রায় একটা বেজে গেছে। ছেড়াদিয়ার চারদিকে প্রবাল পাথরের উম্মুক্ত প্রদর্শনী। পুরো দ্বীপকে ঘিরে আছে হাজার হাজার বছরের পুরনো সব বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন আঙ্গিকের পাথার-প্রবাল পাথর। আর পাথরের উপর আছড়ে পড়ছে একটার পর একটা নীল ঢেউ। হাঁটতে হাঁটতে একদম দ্বীপের শেষ প্রান্ত, বাংলাদেশেরও শেষ ভূখণ্ড পর্যন্ত ঘুরেছি। মায়ানমার ওখান থেকে দেখা যায়, পাশেই রায়েছে থাইল্যান্ড। প্রবাল পাথর, শামুক-ঝিনুক কুড়িয়েছি ঘণ্টাখানেক। মাথার ঘাম পায়ে পড়ছে টপ টপ করে। পুরো ছেড়াদ্বীপে মাত্র একটি পরিবার বাস করে। হোসেন আলীর পরিবার। হোসেন আলীর বাড়িতে গেছি। বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি দোকান। হোসেন আলীর নাতি দোকানদারি করছে। পানি ও বিস্কুট কিনে খেয়েছি। হোসেন আলী জীবিত নেই। বংশধররা আছে। এই বিচ্ছিন্ন জলরাশির মাঝখানে একটিমাত্র পরিবার কেমন করে থাকে ভাবলে গা শিউরে ওঠে। বহুকাল আগে হোসেন এইখানে বৌ নিয়ে সংসার পাতে। তার আসল বাড়ি রাখাইন রাজ্যে। সে বলা যায় হিজরত করে নিজেকে হাইড করেছে এই উলঙ্গ প্রকৃতির আশ্রয়ে। সে এক রহস্যময় অধ্যায়। ছেড়াদ্বীপের মতোই রহস্যময়। কোনো ক্ল্যাসিক সাহিত্য লেখার সুযোগ যদি স্রষ্টা দেয় তাহলে সেইখানে হোসেন আলী অবশ্যই মধ্যমণি হয়ে ওঠবে ইনশাআল্লাহ। 

ছেড়াদ্বীপকে সেন্টমার্টিনের এক্সটেনশন বলা যায়। এই দ্বীপে রয়েছে সব মুসলমান জেলে সম্প্রদায়। টোটাল সেন্টমার্টিনের জীবনালেখ্য নির্মাণে দরকার একজন শক্তিমান লেখকের হৃদয় ছোঁয়া দরদ ও কোমল হাতের পরশ। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে যখন ছেড়াদ্বীপ থেকে বিদায় নিই তখন জোয়ার শুরু হয়ে গেছে। মুহূর্তেই হাঁটু পানি, এরপর কোমর পানি। অনেক কষ্টে ছেড়াদিয়াকে ছেড়ে আসি। সারাদিনের একটানা হাঁটায় কিছুটা ক্লান্তি ভর করেছে। রাতে অবকাশ হোটেলে খেয়ে রুমে চলে আসি। ওহ ডাব খাওয়া ভুলিনি। তাই রাতেও খেলাম। 

পরদিন আবার গ্রামে বেরিয়েছি। পুরো সেন্টমার্টিনের পোস্টমর্টেম করতে পারিনি, তাই ওখানে আবারো যাবার ইচ্ছে জেগে রইলো। সেন্টমার্টিনে মোট নয়টি গ্রামের সন্ধান পেয়েছি। গ্রামগুলো হলো---
কোণাপাড়া, গলাচিপাপাড়া, দক্ষিণপাড়া, পশ্চিমপাড়া, উত্তরপাড়া, মাঝেরপাড়া, পূর্বপাড়া, নজরুলপাড়া, ডেইলপাড়া।  

ওখানকার স্থানীয় এক দোকানদারের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ হলো। অনেক তথ্য জানার চেষ্টা করেছি। যার জন্ম এই দ্বীপেই। অনেক কিছুই কিংবদন্তী। দ্বীপের অনেক কিছুই রহস্যময়। সাগর কোন কালে কোন খেয়ালে এই প্রবাল কন্যাকে জন্ম দিয়েছে তার ইতিহাস হয়তো প্রাগৈতিহাসিক। যার নামে এই দ্বীপ এখন পরিচিত তিনি ছিলেন বৃটিশ আমলে চট্টগ্রামের ডিসি। তিনিই এই দ্বীপকে বৃটিশ শাসনাধীন করেন, না হয়  দ্বীপটি বার্মাই দখলে নিত। কোনো এককালে আরব বনিকরা এই দ্বীপ আবিষ্কার করেন। তারাই এর প্রথম নামকরণ করেন 'জাজিরা'। পরবর্তীতে শব্দটি আরবী থেকে জিঞ্জিরায় রূপান্তরিত হয়। তারও পরে এই দ্বীপের নারকেল গাছের অাধিক্যের কারণে সম্ভবত নামকরণ হয় নারিকেল জিঞ্জিরা। এরপর ১৯০০ সালের দিকে হয় সেন্টমার্টিন। কথিত আছে মিঃ মার্টিন সাহেব চট্টগ্রাম ছেড়ে যাবার প্রাক্কালে মাত্র তেরজন জেলের নিকট দ্বীপটি হস্তান্তর করেন। এই তেরজনের মধ্যে রাখাইন রাজ্যের জেলেও ছিল। এই তের পরিবার থেকে হয়েছে বর্তমানে ছয় শতাধিক পরিবার। মাছধরাই এখানকার মানুষের মূল পেশা। কিন্তু এখন হয়েছে বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের এক অদ্ভুত লীলাভূমি। শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ ক্ষেত্র। প্রবাল পাথরে বেষ্টন করে আছে দ্বীপের চারপাশ। কত শত হাজার বছরের বালুকণা জমে জমে এই দ্বীপ তৈরি হয়েছে এবং প্রবাল পাথরের আস্তরণ কীভাবে সাগরের ভাঙন থেকে রক্ষাকবচ হয়ে ওঠেছে তা নিঃসন্দেহে গবেষণার বিষয়। 

আমাদের তিনদিন কেটে গেছে। চতুর্থদিন সকালে নাস্তা সেরে দ্বীপের উত্তর পাশ দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে পূর্ব পাশে গেলাম।  সাগরের তীর ঘেঁষেই হাঁটছি। হাঁটায় কোনো আলস্য নেই। হাঁটায় অনভ্যস্ত এবং আরামপ্রিয় মানুষদের জন্য এই দ্বীপে আসার কোনো মানে নেই। জীবন এবং জগৎকে দেখতে হলে গায়ের ঘাম ঝরিয়েই দেখতে হয়। এসি রুমে বসে, এসি গাড়িতে চড়ে জীবনের নান্দনিক রূপ দেখা যায় না। পুব পাশে সাগরের বাংলাদেশ সীমানায় রয়েছে নৌ বাহিনীর জাহাজ, একাধিক জাহাজ দূরে দূরে নোঙর করা। উদ্দেশ্য মায়ানমারের আগ্রাসন রুখে দেয়া। আছে কোস্টগার্ড, বিজিব, পুলিশ তো আছেই। এক বিজিবি সদস্যের সঙ্গে আলাপ হলো। ওনার বাড়ি বরিশাল। খুব সুন্দর ব্যবহার করেছেন। খুব আন্তরিক মনে হয়েছে। পুব পাশে রয়েছে নৌ বাহিনীর অফিসার্স কোয়াটার। বাইরে থেকে চমৎকার সাজানো গোছানো মনে হলো। একসময় সৈকত ছেড়ে কেওড়া বনের ফাঁক গলিয়ে গ্রামের রাস্তায় উঠে আসি। হাঁটছি তো হাঁটছি। কয় ঘণ্টা হাঁটলাম হিসেব করিনি। ধানক্ষেতের পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বললাম সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া তোফায়েল ইসলাম ইকবাল নামের কালো ছেলেটির সঙ্গে। তার থেকে অনেক তথ্য জানার চেষ্টা করেছি। এরপর একটি দোকানে বসলাম। চললো ডাব খাওয়ার পর্ব।  ডাব না খেলে মনে হয় সব অপূর্ণ রয়ে গেল। এই দ্বীপে অবশ্যই মানিক বাবুর চরিত্ররা আছে। কিন্তু সব উদঘাটনের সময় পাইনি। কুবের, কপিলা, মালা, গণেশ, ধনঞ্জয় এসব চরিত্রের দেখা পেতে অনুসন্ধানী চোখ দিয়ে ধৈর্য নিয়ে পরশপাথরের নেশায় খুঁজতে হবে। দেখা মিলবে অদ্বৈত মল্ল বর্মণের কিশোর, অনন্ত, বাসন্তীদেরও। দ্বীপ তো নয় যেন সোনার খনি। একটা বেজে গেছে। আমার মন চাচ্ছিল আরো ভেতরের দিকে প্রবেশ করি। খুব ইচ্ছে ছিল দ্বীপের জীবন্ত কিংবদন্তী শিল্পী আব্দুর রশীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার। যিনি "মধু হই হই তুমি আঁরে বিষ খাওয়াইলা"---সারাদেশে ভাইরাল হওয়া এই গানটির মূল রচয়িতা। কিন্তু না এবার আর দেখা হলো না, আফসোস রয়েই গেল।  রিসোর্টের দিকেই হাঁটা শুরু করলাম। দুপুরের খাবারের সময়ও হয়ে গেছে। 

পড়ন্ত বিকেলে সূর্য ডোবার মুহূর্তটি দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। যথাসময়ে সৈকতে নেমে পড়ি। রাঙা সাঁঝের মায়ায় টলমল করছে সাগরের নীল জলতরঙ্গ! দুচোখ জুড়িয়ে গেল। এমন নয়ন মনোহর দৃশ্য জীবনে আর কী হতে পারে! একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আর একরাত পরেই তো ছেড়ে যাবো আমার এই প্রবাল প্রিয়াকে! আর কী হে হবে দেখা কোনো কালে, কোনো শুভক্ষণে? অন্তর বলে ওঠলো---

এই খেদ আমার মনে
ভালবেসে মিটিল না আশ---কুলাল না এ জীবনে।
হায়! জীবন এত ছোট কেনে!
এ ভুবনে?

 

সিরাজুল ইসলাম জীবন
প্রভাষক(বাংলা),  
নজরুল গবেষক, সাহিত্য সমালোচক, কবি

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top