"হৃদয়ে নজরুল"- আহবায়কের কথা
প্রকাশিত:
২৪ নভেম্বর ২০২২ ০৫:০০
আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২২ ০৫:০২

"কাজী নজরুল ইসলাম" এক অপার বিস্ময়ের নাম! সেই বিস্ময়কর প্রতিভা যে আমাদের মাতৃভাষায় তাঁর সকল সৃষ্টি দিয়ে গেছেন সেটাই বাঙালি হিসাবে এবং বাংলা ভাষাভাষী হিসাবে আমাদের চিরকালের গৌরব। যে দর্শন তিনি সমাজে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন আজও তা সমকালীন। তাঁর সাহিত্য, সুর-ছন্দ, সংগীত, কবিতা, প্রবন্ধে যে দূরদৃষ্টির প্রখরতা আজ এতদিন পরও একটুও মলিন হয়নি। সাম্যবাদের যে আহবান তিনি করে গিয়েছেন তা মানব ইতিহাসে বিরল। বর্তমানের পৃথিবী প্রতিনিয়ত জানান দেয় তিনিই ছিলেন প্রকৃত দিশারী। তিনিই আলোকবর্তিকা। তিনিই ক্ষণজন্মা যশস্বী যাঁর হাত ধরে মুক্তি মেলে পরাধীনতার। যাঁর সৃষ্টিতে দূর হয় এই হৃদয়ের অন্ধকার। তাঁর সুরে উন্মাতাল হয় হৃদয়-মন-ধমনী। আর চির জাগরুক রাখে দ্রোহের চিত্ত যেকোন অবিনাশী বাণে।
কিন্তু যেটুকু সম্মান আর শ্রদ্ধার ডোরে তাঁকে বাঁধা দরকার তা কি আমরা করে দেখাতে পেরেছি? যে দ্রোহ, ভালোবাসা, প্রেম আর সুর ব্যঞ্জনায় তিনি গেঁথে গেছেন অজস্র মালিকা তা কি আমরা গলায় পরেছি? যে অসাম্প্রাদিয়কতা ও সাম্যবাদের অনুরণন তিনি জগতে দেখতে চেয়েছিলেন তার সামান্যও কি আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি? সাহিত্যের যে কুঠুরিতে তিনি মণি-মুক্তো সঞ্চয় করে গেছেন তা কি আমরা যাপিত জীবনে বিলিয়ে দিতে পারলাম? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমরা চেষ্টা করেছিলাম অভিনব কিছু উপস্থাপনের। তাঁর অসামান্য সৃষ্টির কাছে হাত পেতেছি ঋদ্ধ হতে, নিজেকে সাজিয়ে নিতে, নিজেদের খুঁজে পেতে। চেষ্টা করেছি দূর পরবাস থেকে অভিবাসী তিনটি প্রজন্মের কাছে তথা সারা পৃথিবীর নজরুল পিয়াসীদের পৌঁছে দিতে বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ কাজী নজরুল ইসলামকে।
মানুষ তাঁর স্বপ্নের চেয়েও বড়! কথাটি কোথায় যেন শুনেছি, এই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছি না। কথাটি কতটা যৌক্তিক সে বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু বুকে লালিত স্বপ্ন যখন আলোর মুখ দেখে তখন সে নিজেও কিছুটা বিহ্বল হয়ে পড়ে। আমার দশাও এ মুহূর্তে তাইই। আজ তিনটি দিন গত হয়েছে "হৃদয়ে নজরুল" সিডনির তথা সারা বিশ্বের মানুষের গোচরীভূত হলেও এর স্বপ্ন লালন করা আমি কলম ধরতে পারিনি কাঙ্খিত ব্যস্ততায় ও কিঞ্চিৎ আবেগপ্রবণ অবস্থায় থাকায়।
"হৃদয়ে নজরুল" এর প্রাণ ভোমরা ইরশাদ আহমেদ শাহীন (স্যার) একজন প্রকৃতই কাজী নজরুল ইসলাম প্রেমী ও গুণী গবেষক। তাঁকে চিনি, জানি এবং মানি গত ৪০ বছরেরও অধিককাল। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক। ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে তিনি আমাদের গড়ে তুলেছেন সুনিপুণভাবে। ইরশাদ আহেমদ শাহীন গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে "সম্পূর্ণ নজরুল" নামের একটি অনুষ্ঠান টেলিভিশনে করে আসছেন এবং গণ-মানুষের কাছে খ্যাতি লাভ করেছেন "সম্পূর্ণ নজরুল" হিসাবে। প্রবাসে থেকেও সুযোগ পেলেই সেই অনুষ্ঠানগুলি অনুসরণ করতাম আর কল্পনায় স্বপ্নের ডানা মেলে যেত বহুদূর। নীল আকাশে তাকিয়ে ভাবতাম কোন একদিন অস্ট্রেলিয়ার রুচিশীল-মার্জিত, বাংলা সংস্কৃতি প্রেমী এবং কাজী নজরুল ইসলাম প্রেমীরা আমার/আমাদের স্যারের গ্রন্থনায় কাজী নজরুল ইসলামকে পুনঃআবিষ্কারে মত্ত হবেন। আরো গভীরভাবে অনুধাবন করবেন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞকে। উপভোগ করবেন কাজী নজরুল ইসলামকে। সেই ভাবনা থেকেই রেমিয়ানস অস্ট্রেলিয়ার "হৃদয়ে নজরুল"কে উপস্থাপনের প্রয়াস এবং গত ৫ মাসে অনেকগুলি পর্ব পেরিয়ে অবশেষে ১২ নভেম্বর সিডনির দর্শকদের কাছে উপস্থিত হওয়া।
একদল মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাঁদের সাজানো স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে "হৃদয়ে নজরুল" সংকলন ও পরিবেশনার মাধ্যমে। মনোজ্ঞ সেই পরিবেশনায় ছিল সংগীত, পাঠ, নজরুল প্রসঙ্গ এবং গীতি আলেখ্য। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলা ব্যতীত পৃথিবীর আর কোন স্থানে কাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে এতো বড় কোন আয়োজন হয়েছে কিনা আমরা সে ব্যাপারে অবগত নই। দূর দ্বীপ মহাদেশ অস্ট্রেলিয়ার অপ্সরা নগরী সিডনিতে আজ আমরা এক ইতিহাসের সূচনা করতে সক্ষম হয়েছি আমাদের আলোকবর্তিকার দৃপ্ত মশালকে প্রজ্জ্বলিত করতে পেরে।
কেবল সংগীত ও এর প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলা ছাড়াও এক পর্যায়ে অনুভূত হয় নজরুলেরই কোন নাট্যাংশ উপস্থাপনের। দর্শক-শ্রোতার জন্য বাড়তি আয়োজনকল্পে যখন সামান্য দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ ঠিক তখনই পথ প্রোডাক্শনের আগ্রহ ও সম্মতি এমন শুভ উদ্যোগে অংশগ্রহণের। পথ প্রোডাকশন পরিচালক নাহিদ কামাল রূপসা নিজেই রচনা ও পরিচালনা করেন "হ্যাশট্যাগ নজরুল" বা "#Nazrul" নামের theatrical. চমৎকার সেই গীতিনাট্য নেটিজেনদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। রাশি রাশি অভিন্দন বার্তা এই মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। আরজিন হোসাইন দীপ্রকে আন্তরিক ধন্যবাদ গীতিনাট্যের যথার্থ ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট তৈরী করে "#Nazrul"কে সুনিপুনভাবে উপস্থাপনের। তাসনুভা হিমেল দিতি ও এলিসন গোমেজ চাঁদনীর নৃত্য নির্দেশনায় গীতিনাট্যটি হয়ে উঠে চিত্তাকর্ষক। রেমিয়ানস অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্ন পূরণে পথ প্রোডাকশনের পরিবেশনা "#Nazrul" ছিল "হৃদয়ে নজরুলের" জন্য একরকম মণি-কাঞ্চন যোগ।
হৃদয়ে নজরুলের দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চে আসেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইরশাদ আহমেদ শাহীন। তিনি তাঁর সুললিত কণ্ঠে পরিবেশিত গানসমূহের অমূল্য সব তথ্য ও ব্যাখ্যার পেটরা সাজিয়ে বসেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতন সিডনির দর্শক-শ্রোতা তন্ময় হয়ে শোনেন গুণী শিল্পী প্রিয়াঙ্কা গোপ ও তানভীর আলম সজীবকে। একে একে বিভিন্ন রাগাশ্রিত ১৮টি গান তাঁরা পরিবেশন করেন। তাঁদের সঙ্গত করেন তবলায় জিয়াউল ইসলাম তমাল, কি-বোর্ডে বিনোদ রায় দাস, গিটারে প্রাঞ্জল অধিকারী এবং কাজী নজরুল ইসলামের রচনা থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠ করেন শুভজিৎ ভৌমিক।
এছাড়াও "হৃদয়ে নজরুল" নামে যে সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছে তার প্রতিটি প্রবন্ধ তথ্য সমৃদ্ধ, সুলিখিত ও সুখপাঠ্য। গবেষক, প্রাবন্ধিক, লেখকদের প্রত্যেকেই কাজী নজরুল ইসলামকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন গভীরভাবে। বর্তমান ও আগামীর অগণন মানুষের কাছে বহু মূল্যবান পাথেয় হিসাবে তা পরিগণিত হবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আর এরই মাধ্যমে দুখু মিয়া/বিদ্রোহী রণক্লান্ত/বুলবুল অমর হয়ে জ্বলতে থাকবে সকলের মানসপটে।
রেমিয়ানস অস্ট্রেলিয়া ও পথ প্রোডাকশনের সকল সহযোদ্ধার কাছে কৃতজ্ঞতা এবং সংকলনের সম্পাদকমণ্ডলীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাঁদের নিরবিচ্ছিন্ন সহযোগিতার জন্য। রেমিয়ানস অস্ট্রেলিয়ার চেষ্টায় সিডনির বাংলা ভাষাভাষী ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষদের জন্য তথা সারা বিশ্বের নজরুল প্রেমীদের কাছে ধরা দিলাম "হৃদয়ে নজরুল" নামের সংকলন ও চিরস্মরণীয় এক আয়োজনে।
ধন্যবাদান্তে,
সালেহ আহমেদ জামী
আহ্ববায়ক, "হৃদয়ে নজরুল"।
বিষয়:
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: