সিডনী রবিবার, ৭ই মার্চ ২০২১, ২৩শে ফাল্গুন ১৪২৭


সঙ্গীত জগতে বাংলা গানের একজন দূত

কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমত উল্লাহ্ : অশ্রু বড়ুয়া


প্রকাশিত:
২১ জানুয়ারী ২০২১ ১২:৩৩

আপডেট:
২১ জানুয়ারী ২০২১ ১২:৫০

ছবিঃ শাহনাজ রহমত উল্লাহ্

 

গত ২ জানুয়ারি ছিল কিংবদন্তী শিল্পী'র ৬৮তম জন্মদিন ।

নাম তাঁর শাহীন। নামেই রয়েছে যেনো অন্যরকম এক জাদু। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে গানের সর্বস্তরে সর্বরাজ্যে অবাধে সাফল্যের সঙ্গে বিচরণ করেছেন যিনি। দীর্ঘ সময়ের ক্যারিয়ারে মধুঝরা কণ্ঠে কালজয়ী হয়ে আছে যাঁর অসংখ্য গান। দেশাত্ববোধক এবং চলচ্চিত্রের গানে যাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। যাঁর গাওয়া কালজয়ী দেশাত্মবোধক ওইসব গান এখনো সর্বস্তরের বাঙালির প্রাণ স্পন্দিত করে। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি যাঁর ছিল অদ্ভুত মুগ্ধতা। হৃদয় খুঁড়ে খুঁড়ে গাইতেন সব গান। তাইতো- খুব সহজেই ছুঁয়ে গেছেন বাংলা গানের লক্ষ-কোটি শ্রোতার হৃদয়-মন। যিনি হয়ে উঠলেন প্রাণের শিল্পী। পরিচ্ছন্ন ও মায়াময় কণ্ঠস্বর দিয়েই বাংলা ভাষার শিল্পীদের মধ্যে যিনি তৈরি করেছিলেন নিজের স্বাতন্ত্রিক পরিচয়। তাইতো-যাঁর আবেগপূর্ণ এবং মেজাজি গায়নশৈলী শোনামাত্রই শ্রোতার অন্তরকে সংক্রমিত করে আবেগে-বিষ্ময়ে।

নিয়মিত চর্চা, অধ্যাবসায় এবং সাধনার প্রতিদান-স্বরূপ কণ্ঠ মাধুর্য গুণেই যিনি হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের সঙ্গীতের এক কিংবদন্তী।

পারিবারিক ডাক নাম তাঁর-শাহীন। সঙ্গীত জীবনের প্রথম দিকে যিনি শাহনাজ বেগম নামেই ছিলেন পরিচিত। হ্যাঁ, যাঁর কথা বলছিলাম-তিনি বাংলা গানের বিরল এক কণ্ঠস্বর, শিল্পী-শাহনাজ রহমত উল্লাহ্।

শাহনাজ রহমত উল্লাহ্-বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে অন্যতম এক কিংবদন্তী। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী এক কণ্ঠশিল্পী। বাংলা গানের জগতে উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী-শাহনাজ রহমত উল্লাহ্-র আজ ৬৮তম জন্মবার্ষিকী। আজকের এদিনে বরেণ্য এই কণ্ঠ সঙ্গীত শিল্পীর প্রতি জানাই এক হৃদয়ের অসীম শ্রদ্ধা ও অতলান্ত ভালোবাসা।

ইংরেজি ১৯৫২ সাল ২ জানুয়ারি। ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন শাহনাজ রহমত উল্লাহ। তাঁর পিতার নাম এম ফজলুল হক ও মাতা-আসিয়া হক। পরিবারের সবার কাছে তিনি ছিলেন আদরের শাহীন। শাহনাজ'র এক ভাই দেশবরেণ্য সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ এবং আরেক ভাই জাফর ইকবাল ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের চিরসবুজ অভিনেতা ও জনপ্রিয় গায়ক। বাবার অনুপ্রেরণা আর মায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একেবারে ছোটবেলায় শাহনাজ'র গানে হাতেখড়ি।

বয়েস তখন কতো আর পাঁচ কী ছয়। ওই বয়সেই গুণগুণ করে গান গাইতেন-শাহনাজ। বিষয়টি বাবা এম ফজলুল হকের নজরে এসেছিল। ওইসময় নয় বছর বয়সে বড় বোনকে গানের তালিম দিতে বাসায় আসতেন ওস্তাদ মুনীর হোসেন। ভিকারুন্নিসা স্কুলের শিক্ষার্থী তাঁর ওই বড় বোনটি ছিলেন তুখোড় মেধাবী সঙ্গীত শিল্পী। বোন তালিম নেওয়ার সময় পাশে বসে থাকতেন-শাহনাজ। অবশ্য ওই বোনটি পরে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবা ছিলেন পেশায় একজন আইনজীবী। বাবা মনে করেছিলেন, গান গাইলে শাহনাজ বেশ ভালো করতে পারবে। তাইতো বাবা এম ফজলুল হকের উৎসাহ এবং মা আসিয়া হক'র অনুপ্রেরনায় শাহনাজকে ওস্তাদ রেখে গান শেখানো শুরু করেন।

বরেণ্য এ শিল্পী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নেন-ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ এর কাছে। তিনি ওস্তাদ মনির হোসেন, শহীদ আলতাফ মাহমুদের কাছেও গানে তালিম নেন। গজল শিখেছেন উপমহাদেশের কিংবদন্তী গজল সম্রাট মেহেদী হাসান'র কাছে। পণ্ডিত বারীণ মজুমদারের মাধ্যমে তিনি উপমহাদেশের কিংবদন্তী এই গজল সম্রাটের সাহচর্য পান। খেলাঘরেও গান শিখেছেন তিনি। ওই সময়টায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন দেশের আরেক কিংবদন্তী শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। তাঁরা নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। ছোট্ট বয়সে পরিণত কণ্ঠের কারণে ওস্তাদের পাশাপাশি অন্য অনেকের প্রিয় শিক্ষার্থী হয়ে ওঠেন শাহনাজ রহমত উল্লাহ।

শাহনাজ রহমত উল্লাহ সেই ছোট্ট বয়সে বেতারেও গাইতেন। ছোটবেলা থেকেই শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।

ইংরেজি ১৯৬৩ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে ‘নতুন সুর’ সিনেমার গানে নেপথ্যে কণ্ঠ দেন। এরপর বহু চলচ্চিত্রের গানে নেপথ্যে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। মূল নাম শাহনাজ বেগম হলেও পরবর্তীতে শাহনাজ রহমত উল্লাহ্ হিসেবেই সঙ্গীতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের গানের জগতে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম-শাহনাজ রহমত উল্লাহ। বিশেষ করে দেশাত্মবোধক গানের জন্য সর্বসাধারণের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি।

ইংরেজি ১৯৬৪ সাল থেকে টেলিভিশনে গাইতে শুরু করেন। ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশন এর ঢাকা কেন্দ্রের শুরুর দিকেই প্রযোজক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মোস্তফা কামাল সৈয়দ। মূলত তাঁরই অনুষ্ঠানে গাওয়া শাহনাজ রহমত উল্লাহ অনেকগুলো গান কালজয়ী হয়ে অগণিত মানুষের মন জয় করেছেন।

পাকিস্তানে থাকার সুবাদে করাচী টিভিসহ উর্দু ছবিতেও গান করেছেন শাহনাজ রহমত উল্লাহ। সত্তরের দশকে অনেক উর্দু গান ও গজল গেয়ে সঙ্গীতপিপাসুদের মাতিয়েছেন শাহনাজ। সেসব গানে এখনও মানুষ মুগ্ধতায় ভাসেন।

ইরেজি ১৯৭৩ সাল। ব্যক্তিগত জীবনে সেনা কর্মকর্তা আবুল বাশার রহমত উল্লাহ'র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শাহনাজ রহমত উল্লাহ। এই দম্পতির এক কন্যা ও এক পুত্র রয়েছে। স্বামী অবসরপ্রাপ্ত মেজর আবুল বাশার রহমত উল্লাহ একজন ব্যবসায়ী। মেয়ে নাহিদ রহমত উল্লাহ থাকেন লন্ডনে। আর ছেলে এ কে এম সায়েফ রহমত উল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করে এখন কানাডায় থাকেন।

ষাটের দশকে সঙ্গীতাঙ্গণে এসে পাঁচ দশক ধরে গান গেয়ে গেছেন শাহনাজ রহমত উল্লাহ্। একের পর এক দেশাত্মবোধক, চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক ও আধুনিক গানে মাতিয়েছেন শ্রোতাদের মন। তাঁর গাওয়া দেশাত্মবোধক গানের তালিকায় উল্লেখযোগ্য-

  • প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ
  • আমার দেশের মাটির গন্ধে
  • আমায় যদি প্রশ্ন করে
  • একবার যেতে দে না আমার
  • এক নদী রক্ত পেরিয়ে
  • একতারা তুই দেশের কথা বল রে আমায় বল

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে প্লে-ব্যাকে অপরিহার্য ছিলেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। 'অধিকার’ ছবিতে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক'র কথায় এবং আলী হোসেন'র সুরে তিনি গেয়েছিলেন-

  • কোন লজ্জায় ফুল সুন্দর হলো

ইংরেজি ১৯৯০ সাল। ‘ছুটির ফাঁদে’ ছবির তাঁরই গাওয়া-

  • সাগরের সৈকতে কে যেন দুর হতে

-গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ সঙ্গীত শিল্পী'র সম্মান ওঠে তাঁর হাতে। দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমত উল্লাহ'র জনপ্রিয় গানের তালিকাও বেশ দীর্ঘ। বলা যেতে পারে- তাঁর কোনো গানই শ্রোতার মন না ছুঁয়ে যায়নি। যত দিন মানুষ বাংলা গান শুনবে ততদিন বেঁচে থাকবে শাহনাজ রহমত উল্লাহর গান-একথা বলতে পারি নিঃসন্দেহে।

শাহনাজ রহমত উল্লাহ'র গাওয়া কালজয়ী গানের তালিকায় রয়েছে-

  • যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়
  • ফুলের কানে ভ্রমর এসে’ (পিচ ঢালা পথ)
  • ওই ঝিনুক ফোঁটা সাগর বেলায়
  • পারি না ভুলে যেতে (সাক্ষী)
  • যেভাবে বাঁচি বেঁচে তো আছি
  • আমি সাত সাগরের ওপার হতে (কত যে মিনতি)
  • শুনেন শুনেন জাঁহাপনা (সাত ভাই চম্পা)
  • কে যেন সোনার কাঠি ছোঁয়ায় প্রাণে
  • আমি যে কেবল বলে তুমি (আগন্তুক)
  • একটু সময় দিলে না হয় (সূর্য উঠার আগে)
  • স্বপ্নের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই
  • আবার কখন কবে দেখা হবে
  • যদি চোখের দৃষ্টি দিয়ে চোখ বাঁধা যায়
  • তোমার আগুনে পোড়ানো এ দুটি চোখে
  • তুমি কি সেই তুমি
  • ও যার চোখ নাই (তাসের ঘর)
  • ঘুম ঘুম ঘুম চোখে (ঘুড্ডি)
  • আমি তো আমার গল্প বলেছি
  • বন্ধুরে তোর মন পাইলাম না
  • খোলা জানালায় চেয়ে দেখি তুমি আসছো
  • একটি কুসুম তুলে নিয়েছি
  • আমায় তুমি ডাক দিলে কে
  • ওই আকাশ ঘিরে সন্ধ্যা নামে
  • আমার ছোট্ট ভাইটি মায়ায় ভরা মুখটি
  • আষাঢ় শ্রাবণ এলে নেই তো সংশয়
  • বারোটি বছর পরে
  • আরও কিছু দাও না দুঃখ আমায়
  • আমি ওই মনে মন দিয়েছি যখন
  • আমার সাজানো বাগানের আঙিনায়
  • দিগন্ত জোড়া মাঠ
  • তোমার আলোর বৃন্তে
  • এই জীবনের মঞ্চে মোরা
  • মানিক সে তো মানিক নয়

সুরের ঝংকার তোলা কালজয়ী এ কণ্ঠশিল্পীর মধুঝরা কণ্ঠে গায়কীমদির বিহ্বলতায় ওইসব গান এখনও কানে বাজে।

গান গেয়ে মানুষকে কাঁদানোর অসম্ভব রকম ক্ষমতা ছিলো শাহনাজ রহমতউল্লাহ্'র। যাঁর রক্তে ছিলো গান। এ রকম ক্ষমতা খুব কম শিল্পীরই থাকে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গানে গানে সুবাস ছড়িয়েছেন তিনি। গান পিপাসুদের আত্মার খোরাক যুগিয়েছেন প্রতিনিয়ত। এ প্রজন্মের শ্রোতারাও কিংবদন্তী এই কণ্ঠ- শিল্পীর গান-সুরে অবগাহন করেন। দেশাত্মবোধক গান, গজল, প্রেমের গান, বিরহের গান, উর্দু-সব ধরনের গানে শাহনাজ রহমত উল্লাহ্ ছিলেন অনন্য। তাইতো দেশের সঙ্গীতের কিংবদন্তী এই গায়িকা কিশোরী বয়সেই জানান দিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গীত প্রতিভার।

কণ্ঠের স্বকীয়তায় বাংলাদেশি শিল্পীদের মধ্যে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন শাহনাজ রহমত উল্লাহ। সঙ্গীত জীবনে শাহনাজ রহমত উল্লাহ'র চারটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। প্রথমটি ছিল প্রনব ঘোষের সুরে ‘বারটি বছর পরে’। এরপর প্রকাশিত হয় আলাউদ্দীন আলীর সুরে ‘শুধু কি আমার ভুল’।

সর্বশেষ 'বাদল দিনের পাখি' শিরোনামে একটি মিশ্র অ্যালবামে ৩টি গানে কণ্ঠ দেন তিনি।

ইংরেজি ২০০৬ সাল। বিবিসি পুরো মার্চ মাস জুড়ে বাংলা গানের উপর জরিপ চালিয়েছিলো। বিবিসি'র সেই জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমত উল্লাহ'র গাওয়া চারটি গান স্থান করে নেয়। যা আমাদের সঙ্গীতকে করেছে অনন্য উজ্জ্বল ও শোভামণ্ডিত।

বিবিসি'র সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের তালিকার ৯ নম্বর গান হিসেবে রয়েছে-

  • এক নদী রক্ত পেরিয়ে : শিল্পী শাহনাজ রহমত উল্লাহ্

গীতিকার ও সুরকার : খান আতাউর রহমান

-বিবিসি'র বাংলা গানের তালিকায় ১৩ নম্বর স্থানে রয়েছে-

  • জয় বাংলা বাংলার জয় : শাহনাজ রহমত উল্লাহ্

কথা : মাজহারুল আনোয়ার সুর: আনোয়ার পারভেজ

-এই গানটি স্বাধীন বাংলা বেতারের সূচনা সঙ্গীত হিসেবে তৈরি করা হয়। দেশাত্মবোধক এই গানটি ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে লেখেন-বাংলা গানের প্রবাদপ্রতিম গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বঞ্চনা-দুর্দশা আর স্বপ্ন- আকাঙ্ক্ষাকে ছন্দময় করে গানটি তৈরি করে বাঙালির হৃদয়ে জাগরণ তুলেছিলেন তিনি।

বিবিসি'র সর্বকালের সেরা বাংলা গানের ওই তালিকার ১৫ নম্বর গানটি হচ্ছে-

  • একবার যেতে দে না আমার: শাহনাজ রহমত উল্লাহ্

কথা: মাজহারুল আনোয়ার, সুর:আনোয়ার পারভেজ।

-সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের বিবিসি'র তালিকার ১৯ নম্বর স্থানে রয়েছে যে গানটি-

  • একতারা তুই দেশের কথা : শাহনাজ রহমত উল্লাহ্

কথা: মাজহারুল আনোয়ার, সুর:আনোয়ার পারভেজ।

পঞ্চাশ বছরের অধিক সময় ধরে গানের জগতে দাপুটে বিচরণ করা এই শিল্পী হঠাৎ করেই গানের জীবন থেকে নিজেকে আড়াল করে নেন। ক্যারিয়ারের পঞ্চাশ বছর পূর্তির পর গান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবেই বিদায় নেন শাহনাজ রহমত উল্লাহ্। ইংরেজি ২০০৮ সালের পর থেকে একেবারেই নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি।

ধর্মপরায়ণ জীবন বেছে নেওয়া-ই ছিল গান থেকে বিদায় নেওয়ার অন্যতম কারণ।

অসংখ্য-অগণন শ্রোতা-ভক্তদের অমোঘ ভালোবাসা ছাড়াও তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কার-সম্মাননার তালিকাটাও সন্তোষজনক।

সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিসরূপ ১৯৯২ সালে রাষ্ট্র তাঁকে সম্মানিত করেছেন একুশে পদকে ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯০ সালে ছুটির ফাঁদে চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান শাহনাজ রহমত উল্লাহ্।

২০১৬ সালে ‘চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’-এর আয়োজনে আজীবন সম্মাননা জানানো হয় গুণী এই শিল্পীকে। এছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার- সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন কিংবদন্তি এই সঙ্গীতশিল্পী

সঙ্গীত জগতে বাংলা গানের দূত ছিলেন শাহনাজ রহমত উল্লাহ্। দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে পাঁচ দশকের রাজত্ব শেষে কিংবদন্তী শিল্পীর প্রস্থানটা ছিল একেবারে নীরবেই। ষাটের দশকে সঙ্গীতাঙ্গণে এসে পাঁচ দশক গেয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী গান। দেশের গান এবং চলচ্চিত্রের গানে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি ছিলেন বাংলা গানের প্রথম সারির প্রতিনিধি। শুধু শ্রোতা নয়, পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের মাঝেও তাঁর গাওয়া গানগুলো আজও হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সত্যিকার অর্থে আমরা ভাগ্যবান- এই জন্য যে, আমাদের দেশে একজন 'শাহনাজ রহমত উল্লাহ' ছিলেন। যিনি একান্তই ছিলেন-আমাদের।

সুরের জাদুকর আলাউদ্দিন আলী এবং শাহনাজ রহমত উল্লাহ'র ছিল অনবদ্য সৃষ্টির এক যৌথ অধ্যায়। যা কিনা সত্যিই ভীষণরকম মৌলিক। এছাড়াও দেশের কিংবদন্তী সব সুরকারের সুরে এবং সঙ্গীত পরিচালনায় গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। যে গানগুলো বাংলা গানের ভান্ডারকে কেবল সমৃদ্ধ-ই করেনি বাংলা গানকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়।

'যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়
যে ছিল হৃদয়ের আঙ্গিনায়
সে হারালো কোথায়
কোন দূর অজানায়
সেই চেনা মুখ কতদিন দেখিনি
তার চোখে চেয়ে স্বপ্ন আঁকিনি'

বাংলা গানে কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী শাহনাজ রহমত উল্লাহ্ নিজের গাওয়া এই গানের মতোই চিরদিনের জন্য সকলের দৃষ্টিসীমার অন্তরালে হারিয়ে গেলেন দুর-অজানায়।

ইংরেজি ২০১৯ সাল ২৩ মার্চ। বাংলা গানের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমত উল্লাহ্ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৬৫ বছর বয়সে ঢাকার বারিধারায় নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন।

সঙ্গীত শিল্পী শাহনাজ রহমত উল্লাহ দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে গেলেও আজো জনপ্রিয় তাঁর কণ্ঠের বহু গান। বাংলা গানের এই কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী আজীবন বেঁচে থাকবেন তাঁর অনবদ্য সব গান-সুরের মাঝে।

 

অশ্রু বড়ুয়া
গীতিকবি, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক
বাংলাদেশ টেলিভিশন

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top