একা এবং একা (পর্ব- তিন) : আহসান হাবীব
প্রকাশিত:
২৯ জুন ২০২০ ২৩:০৪
আপডেট:
৪ আগস্ট ২০২০ ২২:০৮

- মারুফ কাজটা কি ঠিক করলে? মেয়র কাউন্সিলর মেম্বার এরা একটা সিন্ডিকেট ।
- স্যার ভয় পাবেন না এখন সিন্ডিকেট সব জায়গায়। ধরে নেন এই স্কুলে আমি আপনিও একটা সিন্ডিকেট এখন থেকে। আমার উপর ভরসা রাখুন। আর স্যার বিড়াল মারতে হয় প্রথম রাতেই ।
- কিন্তু অনুদানের ব্যাপারটা তুমি জানলে কি ভাবে?
- কেন আপনি যে সমস্ত কাগজ আমাকে দেখতে বললেন ওর মধ্যেইতো ছিল।
- ওহ তাই? আমি ভাবলাম ওটা হারিয়ে ফেলেছি। আর ওরা কি মনে কর এই টাকা দিবে?
- দেখি না স্যার চেষ্টা করে। টাকা যদি ফেরৎ না গিয়ে থাকে তাহলে ঐ টাকা আপনি পাবেন।
- কিন্তু মারুফ তুমি কি ভুল যুদ্ধ শুরু করলে? একা সামলাতে পারবে?
- স্যার ভুল যুদ্ধেইতো জিততে সুবিধা'
- কিন্তু... তুমি একা...
- একা কেন? আপনি আছেন না?
- এ্যাঁ... সত্যিইতো আমি আছি, সরযুবালাও আছে আমাদের সঙ্গে। জান সরযুর অনেক সাহস ছিল। ও একবার একটা সাপের গলা চেপে ধরেছিল নিজের হাতে; সাপটা ওর হাতটা প্যাঁচায়া ধরল। সরযু চিৎকার করে বলল ‘জলদি একটা ছুরি দাও সাপটার মাথাটা কেটে ফেলি... এটা শঙ্খচূড় সাপ, ভয়ঙ্কর বিষ...
- তারপর আপনি চাকু আনলেন?
- আরে না। ঐ দৃশ্য দেখে আমিতো তখন অজ্ঞান! হেড স্যারের চোখ দিয়ে পানি গড়াতে থাকে। তিনি বিরবির করে বলেন-
‘তাইতো আমার হারানোর কি আছে ? এখন থেকে আমরাও একটা সিন্ডিকেট’
হেড স্যারের রুমে মারুফ যখন মিটিং করছিল, তখন নবী নগরের আরো দু জায়গা মিটিং চলছিল।
মেয়রের অফিসে মেয়র ছাড়াও ছিল আরো পাঁচ জন। ওর মধ্যে দুজন গতকাল সরযুবালা স্কুলে গিয়েছিল।
- ঐ স্কুলে আমি ঘুঘু চড়ামু। হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন মেয়র মোতালেব।
- স্যার ঘুঘু কি দ্যাশে আছে? বৈশাখ মাস যায় ঘুঘুর ডাকতো হুনি না। এক মেম্বার বলে।
- ঐ শালা মালাউনের বাচ্চা আমারে অপমান করছে ! ঐ স্কুলের নতুন মাস্টরটা বেয়াদপ, আমারে কয় সিগ্রেট ফালান। কত বড় সাহস !
- স্যার মাথা ঠান্ডা করেন। এহন কন কি করতে হইব?
- বোঝ না কি করতে হইব? আমার কইতে হইব?
- ফালায়া দিমু?
- ফালানোর আগে টাকা উদ্ধার কর। ঐ তিনটারে ডাক।
দুজন লোক এসে দাড়াল মাথা নিচু করে। এই দুজন স্কুলের ক্লাশ রুমে ভাগ বাটোয়ারা করছিল।
- মতিন কই?
- হেতো হাসপাতালে। হের হাত ভাইঙা গেছে।
- আচার্য কান্ড ! একটা লোকে তিনটার সাইজ কইরা দিল? আর তোমরা খাড়ায়া খাড়ায়া ... ফালাইলা? হাতিয়ারটা কই?
- ঐটা হুড়াহড়ির মধ্যে কইযে পড়ল। আৎকা লাথি দিছে বুঝি নাই। তারপর নাকে মারল। লোকটার নাকে তখনও একটা বেশ বড় সর পট্টি লাগানো।
- কুত্তার বাচ্চারা ঐ সব বুঝি না। আমার টেকা উদ্ধার কর তারপর কি করবা তোমরা জান। ওস্তাদরে আমি কি জবাব দিমু? তারে এহনতরি হিসাব দিতে পারি নাই। এই তোরা যা। এই পর্যায়ে মেয়র সাহেব গলা নামিয়ে ফেললেন।
ফিস ফিস করে কাউন্সিলর আর মেম্বারদের কিছু বললেন। তারা সবাই এক সাথে মাথা নাড়ল। অর্থাৎ পরামর্শ তাদের পছন্দ হয়েছে।
তৃতীয় মিটিংটা হচ্ছিল শহরের শেষ প্রান্তে। নদীর পারে একটা দোতলা ঘরে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এই পুরোনো বিল্ডিংটা কেমন, ভিতরে খুবই চমকপ্রদ অবস্থা। দামি সোফায় বসে আছে একজন, তার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। কারণ ঘরে আলো খুবই কম। সবাই বলে ওস্তাদ রাত কানা। আলো চোখে সহ্য হয়না তাই সানগ্লাস পরে থাকেন সবসময়। ওস্তাদের সামনের টেবিলে বোতল আর গ্লাস। সামনে দুজন লোক দাড়িয়ে, তাদের চেহারাও অন্ধকারে ভাল চেনা যাচ্ছে না।
- ওস্তাদ ভ্যাজাল বাজছে একটা
- কি ভ্যাজাল?
- মেয়র সাবে দুই সপ্তাহের হিসাব দেয় নাই
- ক্যান?
- শুনলাম ভাগবাটোয়ারার সময় টাকা মাইরা দিছে আরেকজন
- সেই আরেকজনটা কে?
- বোঝা যাইতেছে না। তবে সন্দেহ হয় এক স্কুল মাস্টরের উপর।
- স্কুল মাস্টর?
- জি সরযুবালা স্কুলে নতুন আইছে
ওস্তাদ সানগ্লাস খুলে তাকালেন, তারপর একটুক্ষন পর বললেন ‘মেয়ররে দেখা করতে বল’
-জি আইচ্ছা।
ওস্তাদ সানগ্লাস চোখে দিয়ে মাছি তাড়ানোর মত করে হাত নাড়ালেন। যার অর্থ তোমরা বিদায় হও। এর আরেকটা অর্থও আছে, সেটা ওরা বোঝে।
তারা চলে গেল। একটু বাদে একটা মেয়েকে ঠেলে ঠুলে ঘরের ভিতরে নিয়ে এল। মেয়েটাকে জোড় করে ওস্তাদের পাশে বসিয়ে দিল তারা। ওস্তাদ মেয়েটির উরুতে হাত রাখলেন। থর থর করে কাঁপছে মেয়েটি। মেয়েটির নাম জরিনা । তাকে গত পরশু উঠিয়ে আনা হয়েছে, অন্য জায়গা থেকে থেকে। মেয়েটি নবী নগরের নয়।
দিনে একবার মায়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে মারুফ। ব্যাস্ততার কারণে সেই রুটিনে বাধা পড়ছে ইদানিং
- হ্যালো মা?
- ফোন ধরিস না কেন?
- ব্যস্ত ছিলাম
- সব ঠিক আছেতো?
- তা আছে
- দেখিস বাবা নতুন কোন বিপদ ডেকে আনিস না। তুই তো তোর বাবার মত সবসময় ঝামেলায় জড়িয়ে যাস।
- না মা জড়াব না। মনে মনে ভাবল ‘মা ঝামেলায় কিন্তু জড়িয়ে গেছি। বেশ ভাল ঝামেলা। কিন্তু এটা সত্যি, বিপদ আমার পছন্দ। বিপদ থেকে বের হবার কৌশল খুঁজে বের করতে আমার ভাল লাগে। কৌশল না থাকলেই বরং বিপদ সত্যি বিপদ হয়ে উঠে!’
-স্যার?
মারুফ ঘুরে দেখে মনিকা ম্য্যাডাম দাড়িয়ে।
- আপনার সাথে একটু কথা ছিল। কম বয়স্ক এই ম্যাডামকে মারুফ কখনও হাসতে দেখেনি। আজকেও যথেষ্ট গম্ভীর
- হ্যাঁ বলুন
- আপনি স্কুলের পিছনে এত টাকা খরচ করছেন কারণটা জানতে পারি?
- মানে? টাকাতো হেড স্যারের ভাইঝি...
- এই গল্প আমাকে শুনাবেন না। ঐ টাকা যে আসেনি আমার চেয়ে ভাল আর কেউ জানে না
- আচ্ছা...
- আপনি আসলে কে?
- আমি মারুফ রহমান, এই স্কুলের ড্রিল টিচার। মারুফ হাসে।
- প্লিজ হাসবেন না , সত্যি কথা বলুন। ড্রিল টিচার হয়েছেন এখন পর্যন্ত ড্রিল ক্লাশ একটা নিয়েছেন?
- তা নেই নি । নিব সমস্যা কি?
- অবশ্যই সমস্যা আছে। আপনাকে এই স্কুলের উন্নয়নের দায়িত্ব কে দিয়েছে? এত টাকাই বা পাচ্ছেন কোথায়?
- দেখুন মিস মনিকা, আপনার সমস্যা কি?
- আমার সমস্যা আপনি... আপনি এই পুরো স্কুলের জন্য ভয়ানক সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছেন। আপনি যত দ্রুত সম্ভব এই স্কুল থেকে বিদেয় হবেন নইলে...
- নইলে?
মিস মনিকা মুখ ঘুরিয়ে দ্রুত চলে গেল ক্লাশে। ক্লাশের ঘন্টা পড়েছে। মারুফের ভ্রু কুচকে গেল। হঠাৎ মহিলার এত তেজ কোথা থেকে এল?
(চলবে)
একা এবং একা - পর্ব এক
একা এবং একা - পর্ব দুই
একা এবং একা - পর্ব তিন
একা এবং একা - পর্ব চার
একা এবং একা - পর্ব পাঁচ
একা এবং একা - পর্ব ছয়
একা এবং একা - পর্ব সাত
একা এবং একা - পর্ব আট
বিষয়: আহসান হাবীব
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: