সিডনী বুধবার, ১৫ই জুলাই ২০২০, ১লা শ্রাবণ ১৪২৭


বিকল্প ব্যবসা : এম  আতিকুল ইসলাম   


প্রকাশিত:
২৬ মে ২০২০ ১৬:৫৭

আপডেট:
১৫ জুলাই ২০২০ ১৭:২৪

 

আমার জানাশোনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঠান্ডু মিয়া ওরফে ঠান্ডু ব্যাপারী একটু ব্যাতিক্রম। পড়ালেখা কম, মাত্র ফাইভ পাস। কিন্তু ব্যবসায়িক কূটকৌশলে একেবারে এক শ'তে একশ। আড়তদারী ব্যবসা করে মালে মালে লাল হয়েছেন। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে দু' একটা কেশে পাকও ধরেছে। তো এই ঠান্ডু মিয়ার সাথে আমার অনেক দিন দেখা নেই। শুনেছি এখন এই শহরেই থাকেন। বাচ্চাদের জন্য নাকি কেজি স্কুল দিয়েছেন। সেদিন দুম করে ঠান্ডু মিয়া বাসায় হাজির। এ কথায় ও কথায় এক সময় তার সামনের পরিকল্পনাগুলো নিয়ে মুখ খুললেন।

' চিন্তা করতাছি, এবার  একখান পেরাভেট বারসিটি খুলুম।'

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, শুনলেও এতটা অবাক হতাম না, যতটা হয়েছি ঠান্ডু ব্যাপারীর কথা শুনে। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ' কি বলছেন চাচা!  সবাই যদি এভাবে ভার্সিটি খুলে তাহলে আমাদের বাসার কুলসুমের মাও একদিন গ্রাজুয়েশেন সাটিফিকেট পাবে। দেশের অবস্থা তো বারোটা বাজবে। '

' কি যে কও ভাতিজা, আরে দেশের অবস্থা তো বারোটা বাইজাই রইছে। নতুন কইরা বাজবো কি?'

' তা আপনার ভার্সিটির লোকেশান কোথায়?  '

' এখনও খুঁজতাছি, মন মতন পাইতাছি না। তয় একখান পাইছিলাম মালিবাগ মোড়ে। উপর তলায় গার্মেন্টস,  নিচ তলায়  মার্কেট আর মাঝের তলায় হইতো বারসিটি। কিন্তু জায়গা লইয়া ঝামেলা বাধছে। সরকার  নাকি কইছে বড় জায়গা না হইলে বারসিটি খুলন যাইবোনা। তয় কোনো সমস্যা নাই, আমার দোস্ত চান্দু বেপারী ঠাটারি বাজারে একখান জায়গা দেখাইছে। আগে এইডা আলু-পটলের আড়ত আছিলো। হেইডারে একটু সাইজ কইরা বারসিটি বানামু।'

আমি প্রায় লাফ দিয়ে বলে উঠলাম, ' শেষ পর্যন্ত আলু-পটলের গোডাউন হবে একটা বিশ্ববিদ্যালয়!  কি সাংঘাতিক কথা! '

'সাংবাদিকের কথা!  এই হানে তুমি সাংবাদিক পাইলা কই? '

' চাচা আমি সাংবাদিকের কথা বলছি না; বলছি সাংঘাতিক  মানে মারাত্মক কথা। সে যাক, এখন তো দেশে অনেক ভার্সিটি। প্রচার পেতে মানে সুনাম কুড়াতে তো অনেক সময় লাগবে।'

আমার কথা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ' মোটেও সময় লাগবো না। পরথম কয়েক মাস দৈনিকগুলানে বিজ্ঞাপনের বন্যা বয়া দিমু। ফাষ্ট পেজ, লাস্ট পেজ, মাঝ পেজ, দুই রঙা, চার রঙা; কোনো কিছুই বাদ থাকবোনা। এডবেটাইজ টিভি চ্যানেলে ও চালামু। প্রচারের লাইগ্যাই তো একজন লোক রাখমু। এইডারে জানি কি কয়, ও মনে পড়ছে, যৌন সংযোগ কর্মকর্তা।' 

' ইয়ে চাচা, যৌনসংযোগ নয়, জনসংযোগ কর্মকর্তা।'

' ও ছড়ি। '

' চাচা আপনার ওখানে কোন্ কোন্ বিষয় পড়ানো হবে?' 

' বিষয় হইলো তোমার তিনডা, কম্পুটার সাইন্স, বিবিএ আর ইংলিশ। যারা ব্যবসাপাতি আর চাকরি বাকরি করে হেগো লাইগা সন্ধ্যার সময় এমবিএ আর দু' একটা ইংলিশ কোর্স রাখুম। এগুলার এখন বাজার ভালা।'

' কিন্তু চাচা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বাজারের কথা আসছে কেন? এটাতো হবে জ্ঞান শিক্ষার কেন্দ্র অর্থাৎ লার্নিং। '

'রাখো তোমার লার্নিং। সবাইতো চিন্তা করে আর্নিং। পরিচিত কোনো ছাত্র পাইলে আমার এহানে পাঠাইয়া দিবা। ছাত্রপ্রতি ভালো কমিশন পাইবা। কোয়ালিটির দরকার নাই, দরকার কোয়ান্টিটি মাইনে সংখ্যা।'

' শুনলাম আপনি নাকি একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল চালাচ্ছেন। ছাত্রছাত্রী কেমন?'

' এক্কেরে ফাটাফাটি অবস্থা।  ইংলিশ মিডিয়াম কথাটার মইধ্যে জাদু আছে। কবুতরের খোপের লাহান তিনটা রুম দিয়া যে বানের পানির লাহান পয়সা আইব তা আগে বুঝি নাই। থাক সেসব কথা। তোমার কাছে আইছি অন্য কামে। আমার প্রকল্পগুলার নাম  দিছি ' ঠান্ডু মিয়া গ্রুপ অব এডুকেশনাল ইনস্টিটিউট'। এইডার লাইগ্যা একখান যুতসই মনোগ্রাম দাও।' 

আমি এক মুহূর্ত ভাবতে লাগলাম। ঠাটারি বাজারে হবে ঠান্ডু মিয়ার ভার্সিটি!  মাথায় ঠাডা পরার অবস্থা।

' চাচা পেয়েছি। মনোগ্রাম হবে বাঁশ।'

' বাঁশ! ' আঁতকে উঠলেন ঠান্ডু মিয়া।

' জ্বি, বাঁশ। আই মিন ব্যাম্বু। যেভাবে শিক্ষাকে ফাঁস দিচ্ছেন, তাতেতো বাঁশই হওয়া উচিত আপনার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতীক।'

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top