সিডনী মঙ্গলবার, ১৩ই এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র ১৪২৭


তিনজন বাংলাদেশী তরুণ সহ মৃতদের স্মরণে সিডনিতে দোয়া মাহফিল


প্রকাশিত:
২ মার্চ ২০২১ ১২:৫৭

আপডেট:
২ মার্চ ২০২১ ১২:৫৮

 

গত ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১ শুক্রবার বিকেলে সিডনিতে ইসলামিক প্র্যাকটিস এন্ড দাওয়াহ সার্কেল (আইপিডিসি) নিউ সাউথ ওয়েলস শাখার উদ্যোগে সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় মর্মান্তিক কয়েকটি দুর্ঘটনায় নিহত তিনজন বাংলাদেশী তরুণের জন্য একটি দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মাহফিলে সাম্প্রতিক সময়ে মুত্যুবরণ করা অন্যান্য প্রবাসী বাংলাদেশী ও তাদের আত্মীয় স্বজনদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেও দোয়া করা হয়। বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী এবং অন্যান্য মুসলিম কমিউনিটির মানুষদের উপস্থিতিতে শোকাবহ এই দোয়া মাহফিলে অস্ট্রেলিয়ার স্বনামধন্য আলেমগণ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অনেক অস্ট্রেলিয়ান জনপ্রতিনিধিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তাদের সংহতি ও সহানুভূতি প্রদর্শন করেন।

শুক্রবার আসর নামাজের পর সিডনির সর্বপ্রধান মসজিদ হিসেবে সুপরিচিত আলী বিন আবি তালিব মসজিদে এই মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সিডনির প্রধানতম বহুসাংস্কৃতিক এলাকা লাকেম্বার ওয়ানজি রোডে অবস্থিত ও বড় মসজিদ নামে পরিচিত মসজিদটিতে আয়োজিত এই মাহফিলে সাম্প্রতিক সময়ে মর্মান্তিক দু’টি পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত মেহেদী হাসান খান, মোজাফফর আহমেদ ও শাহাদ শামস নোমানীর পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি খোদর সালেহ এবং সেন্ট মেরিজ মসজিদের ইমাম মুহাম্মদ আবু হোরাইরা।

ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এ দোয়া অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে আইপিডিসি এনএসডব্লিউ শাখার সভাপতি কামাল মাহমুদ উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমাদের সন্তানতুল্য এই ছেলেগুলোর মৃত্যু পুরো বাংলাদেশী কমিউনিটিকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

ফেডারেল সংসদ সদস্য ও অস্ট্রেলিয়ান বিরোধী দলীয় ম্যানেজার অফ অপজিন বিজনেস টনি বার্ক এমপি তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, একজন এমপি বা জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয় বরং একজন কমিউনিটি মেম্বার ও একজন পারিবারিক মানুষ হিসেবে তিনি এই আয়োজনে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি দুই বছর আগে তার নিজের বাবার মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, মানুষের জীবন ও মৃত্যুর কিছু স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা থাকে। কিন্তু এমন অল্পবয়সী ও সম্ভাবনাময় তরুণদের আকস্মিক বিদায় আমাদেরকে ভাষাহীন করে দেয়।

লাকেম্বার স্টেট এমপি জিহাদ দীব বলেন, একজন পিতা বা মাতার জন্য এমনভাবে সন্তানের বিদায়ের ঘটনা একটি অকল্পনীয় বিষয়। তথাপি আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা মেনে নেয়া ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই। তাই আমরা মরহুমদের পিতামাতা ও পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য্য দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করি। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া এমন মর্মান্তিক ঘটনাগুলো থেকে আমাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করার এবং সকলের জন্য উপকারী ও ভালো কাজ করার শিক্ষা গ্রহণ করার চেষ্টা করি।

মরহুম মোজাফফর আহমেদের বড়ভাই জাফর আহমেদ তার সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যে বলেন, মোজাফফর ছিলেন ব্যতিক্রমী চরিত্রের মানুষ যিনি কখনোই কারো সাথে কোন ধরণের বিবাদ করতেন না। তার সাথে একই দুর্ঘটনায় নিহত মেহেদিও ছিলেন গড়পড়তার চেয়ে অন্য ধরণের মানুষ। এই ধরণের মানুষদের বিদায়ের শূণ্যতা সবাইকে কাঁদিয়েছে। তিনি মোজাফফরের মৃত্যু পরবর্তী নানা আনুষ্ঠানিকতায় সবার স্বতঃস্ফুর্তভাবে এগিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ জানান ও সবার কাছে দোয়ার অনুরোধ করেন।

মরহুম মেহেদী হাসান খানের বাবা আকরাম হোসাইন যখন তার সন্তানের আবেগপূর্ণ স্মৃতিচারণ করছিলেন তখন উপস্থিত সবার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠে। অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও নামাজী মেহেদী হাসান ছিলেন বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা লাকেম্বায় ব্যবসা করার সুবাদে সকলের পরিচিত মুখ। তার বাবা বলেন, পিতা হিসেবে তাকে যেমন দেখেছি তার চেয়েও বেশি দেখেছি একজন সততার প্রতীক যুবক হিসেবে। তার বেড়ে উঠা ও চরিত্রগঠনে তার মায়ের ত্যাগ ও অবদান সবসময়েই অনেক বেশি ছিলো।

মরহুম শাহাদ সামস নোমানীর বাবা হেলালউদ্দিন নোমানী তার বক্তব্যে বলেন, সিডনি ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি শেষ করে এই সোমবারে তার একটি ল ফার্মে কাজ শুরু করার কথা ছিলো অথচ আল্লাহর ইচ্ছা ছিলো অন্যরকম। তিনি সিডনি ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশী একজন উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় তরুণ হিসেবে শাহাদের নানা অবদানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, সে ছিলো এমন নম্র ও মধুর স্বভাবের সন্তান যার কথা স্মরণ করে এখনো প্রতিবেশী মানুষরা পর্যন্ত কান্না করে।

দোয়া মাহফিলে ইসলামিক প্র্যাকটিস এন্ড দাওয়াহ সার্কেলের সেন্ট্রাল প্রেসিডেন্ট মাওলানা ড. রফিকুল ইসলাম মৃত্যু পরবর্তী জীবন ও আমাদের প্রস্তুতি বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু সারগর্ভ আলোচনা পেশ করেন। তিনি বলেন, এই তিনজন তরুণ যেভাবে এই দুনিয়া থেকে আখেরাতের চিরন্তন জীবনের উদ্দেশ্যে বিদায় নিয়েছেন, রাসুল সা. এর হাদীস অনুযায়ী তা শহীদের মৃত্যু। তারপরও মানবিক অনুভূতি ও চিত্তে একজন পিতা বা মাতার জন্য এই বেদনা অকল্পনীয় ধরণের ভারী একটি ব্যাথা। রাসুল সা. নিজেও তার সন্তানদেরকে এভাবে হারিয়েছিলেন এবং সমস্ত কষ্টের পরও ধৈর্য্য ধারণ করেছিলেন। যে কোন মৃত্যুর ঘটনাই আমাদেরকে পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দেয় যে এই পৃথিবীর জীবনের সময়টুকু হলো আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মূল্যবান একটি উপহার, যা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য চেষ্টা করা আমাদের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত। এই তরুণদের জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিলো, অনেক গল্প ছিলো। একইরকমভাবে আমাদের সবার জীবনেরই নানা গল্প থাকে। কিন্তু এই পার্থিব পথচলা কখন কিভাবে সমাপ্ত হয়ে যাবে তা কেউই জানেনা। তাই মুসলমান হিসেবে আমাদেরকে সদাপ্রস্তুত থাকতে হবে মৃত্যুর জন্য, এবং এই পৃথিবীর জীবনে সৎকর্ম করাই হলো সবচেয়ে উত্তম প্রস্তুতি। তিনি বলেন, এই ধরণের চমৎকার সন্তানদেরকে যারা পরিচর্যা করে বড় করেছিলেন সেইসব পিতামাতারা আসলে ভাগ্যবান। তদূপরি সবচেয়ে বড় সফলতা হলো পরকালীন জীবনে আল্লাহ তায়ালার দীদার অর্জন করা, মুসলমান হিসেবে যার চেষ্টায় সর্বদা আমাদের ব্যস্ত থাকা উচিত।

স্মৃতিচারণ ও আলোচনা অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে গিয়ে মাওলানা ড. রফিকুল ইসলামের পরিচালনায় মরহুম বাংলাদেশী তরুণ সহ অন্যান্য সকল মৃত প্রবাসী, দেশীয় শুভাকাঙখী ও আত্মীয়-স্বজনদের রুহের মাগরেফরাত ও পরকালীন নাজাত কামনায় দীর্ঘ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশী সহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী ও অস্ট্রেলিয়ান মানুষদের অংশগ্রহণে এই ব্যতিক্রমী আয়োজনটি বিপুল সংখ্যক উপস্থিত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে। বিদেশের যান্ত্রিক ও ব্যস্ততাপূর্ণ জীবনের মাঝেও সিডনির দূরদুরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন এই দোয়া মাহফিলে। বিভিন্ন বয়সের ও বিভিন্ন মতের মানুষদের এক সৌহার্দ্যপূর্ণ অংশগ্রহণে সবাই অনুভব করেছেন ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিকতার সম্পর্ক আমাদের সবাইকে মানুষ হিসেবে একই বন্ধনে আবদ্ধ করে পরস্পর পরস্পরের জন্য সহমর্মী ও শ্রদ্ধাশীল করে তুলতে পারে।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top