সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২০শে জানুয়ারী ২০২২, ৭ই মাঘ ১৪২৮


অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটের উৎসব : মোঃ ইয়াকুব আলী


প্রকাশিত:
৬ ডিসেম্বর ২০২১ ১৬:০৭

আপডেট:
২০ জানুয়ারী ২০২২ ১৪:২৯

 

গত ৪ঠা ডিসেম্বর শনিবার সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচন। সারা রাজ্য ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় এই ভোট। বিদেশিদের ভাষা এবং শব্দ চয়ন আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করে। সেই বিষয়ে বিস্তারিত পরের কোন এক লেখায় লিখবো। যেমনঃ আমরা স্কুল কলেজে অনুষ্ঠিত ক্রীড়া বিষয়ক অনুষ্ঠানকে বলি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানকে বলি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। কিন্তু বিদেশিরা সেগুলোকে বলেনঃ ক্রীড়া উৎসব, সাংস্কৃতিক উৎসব। আমি তাই নির্বাচনের এই ভোট দেওয়াকে নাম দিয়েছি ভোটের উৎসব। আর বাস্তবিকই সেটা ভোটের উৎসব।
ভোটের দিনের আগে আমরা একটু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিই। বড় বড় দলগুলো নিজেদের প্রার্থী ঠিক করেন দলের মধ্যে এক ধরণের নির্বাচনের মাধ্যমে। বড় দলগুলোর বাইরেও অনেকেই কয়েকজন প্রার্থী নিয়ে গ্রূপ করে নির্বাচন করেন। এছাড়াও থাকেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। আর এখানে বাংলাদেশের মতো প্রচার প্রচারণার বালাই নেয় বললেই চলে। সামান্য যে প্রচারাভিযান চলে সেটা খুবই সাদামাটা। প্রার্থীরা নিজেদের লিফলেটগুলো বাড়ি বাড়ি যেয়ে লেটার বক্সে ফেলে আসেন। আর দলীয়ভাবে হয়তোবা একটা দুইটা সভা। এর বাইরে বর্তমানকালে যোগ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার। সেখানে দল এবং প্রার্থীরা নিজেদের মেনিফেস্টো প্রকাশ করে তাদেরকে ভোট দিতে আহবান করেন।


এভাবে একসময় ভোটের দিন ঘনিয়ে আসে। ভোটের দিন ছাড়াও এখানে আগেই ভোট প্রদান করা যায়। সেটাকে বলা হয় প্রিভোটিং। এছাড়াও আছে পোস্টাল ভোট এবং আই ভোট। আপনি যদি ভোটকেন্দ্রে যেতে অসমর্থ হন তাহলে ইলেকটোরাল কমিশন বরাবর আবেদন করে ডাকের মাধ্যমে আপনার ভোট প্রদান করতে পারেন। আর আই ভোটিংয়ে আপনি অনলাইনে বা ফোনে ভোট দিতে পারেন। আর পাশাপাশি নির্বাচনের দু সপ্তাহ আগে থেকে প্রিভোটিংও চালু রাখা হয়। যাতেকরে যাদের ভোটের দিন কাজ আছে তারা আগে থেকেই ভোট প্রদান করতে পারেন।
এভাবে চলতে চলতে এসে পড়ে ভোটের দিন। ভোটের দিন নির্দিষ্ট ভোট কেন্দ্রে যেয়ে সরাসরি ভোট প্রদান করা যায়। এখানে একটু মাঠ পর্যায়ের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দিকে নজর দেয়া যাক। চাইলে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক এবং স্থায়ী বাসিন্দাদের যে কেউই নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ইলেকটোরাল কমিশনের ওয়েবসাইটে যেয়ে এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট সাবমিট করার পর কর্তৃপক্ষ কল দিয়ে কনফার্ম হয়ে অফার লেটার পাঠিয়ে দেন। অনালাইনে একটা প্রশিক্ষণ থাকে কিভাবে ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিভাবে ব্যালট পেপার বাছাই করতে হবে। এরপর নির্বাচনের দিন সরাসরি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা।


নির্বাচন চলে সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। কিন্তু যারা দায়িত্ব পালন করবেন তাদেরকে যেতে হয় ঘন্টাখানেক আগেই। যেয়ে কেন্দ্রের ভেতরটা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী গুছিয়ে নিতে হয়। পোলিং প্লেস ম্যানেজার সকলের দায়িত্ব বন্টন করে দেন। এরপর আটটার সময় গেট খুলে দেওয়া হয়। তখন ভোটাররা আসেন ভোট দিতে। কোভিডের জন্য এইবার প্রত্যেকটা কেন্দ্রের বাইরে বারকোড দেয়া ছিলো যাতে ভোটাররা সেটা স্ক্যান করে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন। যারা সেটা করতে অসমর্থ তাদের জন্য খাতা কলম রাখা হয়েছিলো। সেখানে তথ্য লিখেও প্রবেশ করা যাবে। আর ঢোকার মুখেই ভোটার কোভিডের দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন কিনা সেটা যাচাই করে নেয়া হচ্ছিলো।
ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করার পর নির্দিষ্ট কর্মকর্তা শুরুতে তার শেষ নাম জানতে চান। এরপর জন্ম তারিখ এবং ঠিকানা। আর একটা প্রশ্নও জিজ্ঞেস করতে হয়। সেটা হলো - আপনি কি আজকে এর আগে ভোট দিয়েছেন কি না? এই প্রশ্নে কেউকেউ ক্ষুব্ধ হন। যেমন আমি যে কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলাম সেখানে একজন ভোটারকে এই প্রশ্ন করার পর উনি উত্তর দিয়েছিলেন - সে আমি আপনাকে কেন বলবো। যাইহোক এগুলো যাচাইয়ের পর একটা ব্যালট পেপার দেওয়া হয়। আর যদি অতি সম্প্রতি ঠিকানা বদলে থাকেন তাহলে ডিক্লারেশন ভোটের কাউন্টারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তখন সেখানে ব্যালট পেপারের সাথে বাড়তি একটা খাম দেয়া হয়। ব্যালট পেপারে ভোট দিয়ে খামের উপর আগের ঠিকানা এবং বর্তমান ঠিকানা লিখে ব্যালট পেপারটা খামে ভরে আলাদা ব্যালট বাক্সে ফেলা হয়।


ব্যালট পেপার হাতে পাবার পর শক্ত কাগজের পাটাতনের ছোট ছোট বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হয়। কোভিডের কারণে এইবার সবাইকে একটা করে কলমও সাথে দিয়ে দেয়া হচ্ছিলো। স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন ভোট দেয়া একটু গোলমেলে ব্যাপার। ব্যালট পেপারে দুইভাবে ভোট দেয়া যায়। দাগের উপর এবং দাগের নিচে। দাগের উপরে প্রত্যেকটা গ্রূপের জন্য আলাদা করে চারকোনা ঘর থাকে সেখানে নম্বর দিয়ে ভোট দেয়া যায়। অথবা দাগের নিচে প্রার্থীদের নামের বা পাশের ঘরেও নম্বর দিয়ে ভোট দেয়া যায়। কিন্তু অনেক ভোটারই ভোট দেয়ার নিয়ম সঠিকভাবে জানেন না। আমাদের সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে দেখলাম প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ ভোটার ভুল ভাবে ভোট দিয়েছেন। ভোট দেয়া হয়ে গেলে ব্যালট বাক্সে ফেলে দিলেই ভোটারের কাজ শেষ। এরপর শুরু হয় কর্মকর্তাদের দায়িত্ব।


ভোট প্রদান শেষ হয়ে গেলে ব্যালট বাক্স খোলা হয়। শুরুতেই পোলিং প্লেস ম্যানেজার বিতরণ করার ব্যালট পেপারের সাথে প্রাপ্ত ব্যালট পেপারের সংখ্যাটা মিলিয়ে নেন। এরপর ব্যালট পেপারের ভাঁজ খুলে সেগুলোকে বিভিন্ন গ্রূপে আলাদা করা হয়। আর যেগুলোতে দাগের নিচে ভোট পড়েছে সেগুলোকে আলাদা একটা গ্রূপে রাখা হয়। আর যেগুলোতে ভোটের নিয়ম না মেনে ভোট দেয়া হয়েছে সেগুলোকে 'ইনফরমাল' হিসেবে আলাদা করা হয়। প্রত্যেকটা গ্রূপের ব্যালট পেপার আলাদা আলাদাভাবে কয়েকজন যাচাই করেন এবং গণনা করে নিশ্চিত করেন প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা। এরপর লাইনের নিচে দেয়া ভোটের ব্যালট পেপারকে আবারও বিভিন্ন গ্রূপে আলাদা করা হয়। এরপর আলাদা আলাদাভাবে আটি বেঁধে সেগুলোকে একটা বাক্সে রেখে সিল করে দেয়া হয়। এরপর পোলিং প্লেস ম্যানেজার নির্বাচনের উর্ধতন অফিসে ফোন দিয়ে ফলাফল জানিয়ে দেন। এরপর উর্ধতন কর্তৃপক্ষ আরো কিছু বিষয় বিবেচনায় ফলাফল ঘোষণা করেন।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই পুরো প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হয় অত্যন্ত উৎসব মুখর পরিবেশে। অনেকেই ভোট কেন্দ্রে পুরো পরিবার নিয়ে এসে পড়েন কারণ বাড়িতে বাচ্চাদেরকে আবার কার কাছে রেখে আসবেন। স্বামী এসেছেন ভোট দিতে স্ত্রীও হয়তোবা সাথে এসেছেন। দাদা দাদি এসেছেন ভোট দিতে নাতি নাতনীরাও সাথে এসেছেন উনাদের সাহায্য করতে। আর ভোট কেন্দ্রের মধ্যে পরিবেশ খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ। কেউ হয়তোবা তার বাচ্চাকে সাথে নিয়ে এসেছেন। তাদের সাথেও নির্বাচনী কর্মকর্তারা হাসি ঠাট্টা করছেন। কেউ কোন বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তরিকভাবে সেই বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এভাবেই নির্বাচনী প্রতিযোগিতা রূপ নেয় নির্বাচনী উৎসবে। কোন প্রকার মারামারি, হানাহানি নেয়। কাকতালীয়ভাবে বাংলাদেশেও এই সময়ে চলছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় দেখি হানাহানিতে কেউ না কেউ মারা গেছেন।

 

মো: ইয়াকুব আলী

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top