সিডনী রবিবার, ৭ই মার্চ ২০২১, ২৩শে ফাল্গুন ১৪২৭


সুধাকন্ঠে -সুধাগীত: সুচিত্রা মিত্র : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
১৮ জানুয়ারী ২০২১ ১২:৫৭

আপডেট:
১৮ জানুয়ারী ২০২১ ১৩:২৫

ছবিঃ সুচিত্রা মিত্র

 

রবীন্দ্রনাথের গানে একটি যুগের অবসান হয়েছিল তাঁর প্রয়াণে। আজ তিনি আমাদের চোখের সামনে না থাকলেও, তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে তিনি থেকে গেলেন চিরজীবী হয়ে, যা কখনও ম্লান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাঁর গায়নের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে ছুতে পারা তাঁর দর্শনকে বুঝতে শেখা কি সহজসাধ্য! ক'জন শিল্পী তা পেরেছেন! আর এখানেই অনন্যতমা। তাঁর গানে একটা জাদু ছিল। রবীন্দ্রনাথের গান সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ শিল্প--সৃষ্টি। এ বিষয়ে কোন সংশয় নেই, আর সুচিত্রা মিত্রের  গানে পাওয়া যেত  তারই আদর্শ  রূপায়ণ। এর সঙ্গে যুক্ত তাঁর অনন্য ব্যক্তিত্ব। সব মিলিয়ে তৈরি হত এক গানের বৃত্ত। শুদ্ধ ,স্পষ্ট উচ্চ্চারণে দৃপ্ত, বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে গাওয়া সেই সব গানে সুচিত্রা মিত্রের স্বকীয়তা সে কারণে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে।                     

"একলা চলরে" রবীন্দ্রনাথের গানকে গীতবিতানের বাইরে এনে ব্যক্তির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া, এই কাজটা করেছিলেন সুচিত্রা মিত্র সারা জীবন দিয়ে। বাংলা গানের ইতিহাস তাঁর কণ্ঠকে আজও কুর্ণিশ জানায়। তাঁর মধ্যে দিয়ে ধরা থাকল পঞ্চাশ-ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের একটানা গায়নের রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাস। সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ সুধীর চক্রবর্তী যেমন বলেছিলেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথকে সামগ্রিকভাবে জানবার চির উৎকণ্ঠা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের ভিতর দিয়ে উন্মোচিত বিস্ময় পরিকীর্ণ বিশ্বকে বোঝার আবেগ মাঝখানে জীবনের একটা পর্যায়ে যেমন ব্যক্তিগত জীবনের সংকট ও অভিজ্ঞতা তাঁর গানের জগতকে সমৃদ্ধ করেছে তেমনি রাজনৈতিক বিশ্বাসের অনিবার্য গণসংযোগ সুচিত্রা গায়নে এনেছে এক পার্থিব ঋজুতা।’’

আজকের সময়ের হানাহানিতেও তো সেই ‘একলা চল রে’-র সুচিত্রা আমাদের শক্ত রাখেন। সেই ঋজুতা! দীপ্তির মাঝে দৃপ্ততা!তাঁকে তাঁর সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করে দেয়।

১৯৪৬-এর অগস্টে রক্তাক্ত ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় যখন কলুষিত হল কলকাতা, তখন চিন্মোহন সেহানবীশের কথায়, ‘মনে পড়ে দাঙ্গার বিরুদ্ধে লেখক ও শিল্পীদের সেই অপূর্ব অভিযান। রাস্তার মোড়ে মোড়ে যখন সে মিছিল পৌছাচ্ছিল, নিমেষের মধ্যে মিছিলের গাড়িগুলিকে ঘিরে ফেলছিল হাজার হাজার শব্দাতুর মানুষ।তাঁদের মুখের দিকে চেয়ে ট্রাকের উপরে দাঁড়িয়ে সুচিত্রা মিত্র গান ধরলেন,‘সার্থক জনম আমার...।’

দাঙ্গাবিধ্বস্ত মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ। পারতেন সুচিত্রা! দাঙ্গা থামিয়ে দিতে, নিকারাগুয়ার মুক্তিসংগ্রামের জন্য অসুস্থ শরীর নিয়ে গান গেয়ে টাকা তুলে দিতে। কিন্তু নিজের জীবন?

সুচিত্রা মিত্র এমন এক মানুষ যাঁকে পুরুষ ঠিক অধিকারে আনতে পারেনি। তাই বিবাহবিচ্ছেদ। ছেলেকে একা মানুষ করার লড়াইয়ে তিনি বিজয়িনী। তাঁর জীবনের মন্ত্র ছিল একলার। একলা লড়াইয়ের। তিনি নিজেই বলে গেছেন, ‘অপরকে আনন্দ দেবার জন্য গান আমি গাই না। আমি নিজে আনন্দ পেলে নিশ্চিত জানি অপরকে তা আনন্দ দেবে। রবীন্দ্রনাথের দুঃখের গান আমাকে অভিভূত ও আকর্ষণ করে বেশি কারণ সে দুঃখ তো দুঃখ নয় এক আশ্চর্য উত্তরণ।রবীন্দ্রনাথের দুঃখের গান আমাকে জীবন চিনতে শেখায়, মনকে সুদৃঢ় করে তোলে। এ এক আশ্চর্য শিক্ষা।’

তৃপ্তি মিত্র-র স্মরণসভা হল। নিশ্চয়ই মৃত্যুর গান গাইবেন সুচিত্রা। তাঁর এই বহুকালের বন্ধুর জীবনও ছিল লড়াইয়ের নামান্তর। তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা হোক গানে গানে। সুচিত্রা গেয়েছিলেন, ‘ওরে জাগায়ো না, ও যে বিরাম মাগে’, আরেকটি গান আরও চমকে দিয়েছিল, ‘বনে যদি ফুটল কুসুম।’

সব কনভেনশন ভেঙে বেরিয়ে এল শোক।

জীবনের পথ কখনওই সোজা ছিল না। গানের ঐশ্বর্যে যখন ঘিরে আছেন তখন বলছেন তিনি, ‘গানকে এ ভাবে বিক্রি করতে চান না!'

সংসারের দাবি মিটিয়ে। ফরমাসি গান গেয়ে। ছাত্রদের গান শিখিয়ে। স্তাবকদের ইচ্ছে মিটিয়ে তারার আলোর সঙ্গে কথা বলা একলা সুচিত্রা...সেখানে আলো ফেললে দেখা যাবে প্রেম তাঁকে নিঃস্ব করেছে। আগুন তাঁকে দগ্ধ করেছে। মৃত্যু তাঁকে গান এনে দিয়েছে। আর তিনি আজও চলেছেন...রক্তমাখা চরণতলে একলা!

 

 

সে অনেকদিন আগের কথা......

ডেহরি-অন-শোন থেকে কলকাতার দিকে ছুটে আসছে একটা মেল ট্রেন। লাইনের দুপাশে শুধু বিস্তৃত ঘন শাল পিয়াল জঙ্গল। এদিকে একটি কামরায় তখন প্রসব যন্ত্রণায় কাতর এক ভদ্রমহিলাকে কোনোমতে সামলাচ্ছেন তাঁর স্বামী। পরিস্থিতি দেখে চরম  বিভ্রান্ত ভদ্রলোক, কি করা উচিত কিছুতেই ভেবে পাচ্ছেন না। ট্রেনও চলেছে অবিশ্রাম গতিতে,  কোথাও থামার কোনো লক্ষণই নেই!

 

হঠাৎই একটা ভাবনা তাঁর মাথায় এলো। একটি কাগজে কিছু লিখে সেটি ভাঁজ করে ভরে ফেললেন বোতলে। তারপর উদ্বিগ্ন হয়ে বসে রইলেন স্ত্রীর পাশে। ছোট্ট একটা স্টেশন তখন পার হচ্ছে ট্রেনটি,  স্টেশন মাস্টার পতাকা নাড়িয়ে ছুটন্ত ট্রেনটিকে পাশ করাচ্ছেন দিচ্ছেন। এই ফাঁকে চলন্ত ট্রেন থেকে জানলা গলিয়ে বোতলটি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ভদ্রলোক !

 

বেশ খানিকক্ষণ পরে ট্রেনের গতি কিছুটা কমে এলো। দ্রুত পায়ে উঠে জানালার কাঁচ তুলে দেখেন

ছোট্ট নির্জন এক স্টেশানে ঢুকছে ট্রেন। ধীরে ধীরে গতি কমে আসছে তার, স্টেশানের নাম 'গুঝান্ডি'।

একটি স্ট্রেচার নিয়ে কয়েকজন কুলির সাথে স্টেশন মাস্টার ছুটে আসছেন তাদের কামরার দিকেই... আর সর্বাগ্রে ছুটে আসছেন গলায় টেথিস্কোপ ও হাতে মেডিকেল বক্স নিয়ে এক ডাক্তার।

 

বাবা মায়ের সব আশংকার অবসান ঘটিয়ে স্টেশন মাস্টারের কোয়ার্টারে জন্ম হলো একটি ফুটফুটে কন্যার।  ঝাড়খন্ডের অখ্যাত সেই রেলস্টেশন গুঝান্ডিকে স্মরণে  রাখার জন্য বাবা মা কন্যার নাম রাখলেন গজু। অনেকদিন পরে  শান্তিনিকেতনে তাঁকে সবাই চিনলেন গজুদি নামে‌। তিনি বাঙালির অতি প্রিয় সঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্র।

 

নিজের জন্মের ঘটনাটি ছড়ায় লিখে গেছেন...

"শুনেছি, রেলগাড়িতে জন্মেছিলাম

দুই পায়ে তাই চাকা

সারাজীবন ছুটেই গেলাম

হয়নি বসে থাকা।

যাই যদি আজ উত্তরে ভাই

কালকে যাবো দক্ষিণে

পশ্চিমে যাই দিনের বেলা

রাত্তিরে ঘুরি পুবকে চিনে...!"

 

নেহরুজী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সংক্ষিপ্ত সফরে কোলকাতায় গেলেন। বিরোধীরা রাস্তায় নামলেন কালো পতাকা হাতে; বিক্ষোভ জানাতে। সেদিনই আকাশবাণীতে সুচিত্রা মিত্রের প্রোগ্রাম। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাল্মিকী প্রতিভা থেকে গাইলেন.... "কাজের বেলায় উনি কোথা  যে ভাগেন্, ভাগের বেলায় আসেন আগে  আরে দাদা!"

 

কারো বুঝতে বাকি রইলনা, আইপিটিএ-র সক্রিয় সদস্য সুচিত্রা মিত্র ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করেই এ গান গেয়েছেন। পরিণতি যা হবার তা-ই  হয়েছিল। টানা ছয় বছর ’আকাশবাণী’তে নিষিদ্ধ ছিলেন সুচিত্রা মিত্র।

 

২০১১ সালের জানুয়ারির  ৩ তারিখে  অমৃতলোকে চলে যান বাঙালির অতি প্রিয় সঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্র ! প্রয়াণ দিবসে আমার বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। 

 

'তোমার আমার বিরহের অন্তরালে কত আর সেতু বাঁধি সুরে সুরে তালে তালে'

 

 

জানলা দিয়ে আজ সকালে যখন সুনীল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে এক গুরু গম্ভীর কণ্ঠস্বর 'কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি' এই  আবেগের  কণ্ঠস্বর আর কার হতে পারে? এমন দরদী আওয়াজ   উপচে পড়ছে গানের মধ্যে "মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে, কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ "

 

বেশ কিছু বছর আগে তানপুরার  তারটা আজকের দিনে ছিঁড়ে গিয়েছিল। নতুন সালে তেশরা জানুয়ারি রবীন্দ্রসংগীত প্রেমিকদের জন্য এবং বাঙালিদের জন্য এক বিরহের দিন ছিল।আজকের দিনে শ্রীমতী সুচিত্রা মিত্র বলে উজ্জ্বল এই নক্ষত্রটি যিনি রবীন্দ্র সঙ্গীত জগতকে ভরিয়ে রেখেছিলেন মন প্রাণ দিয়ে তিনি  চিরবিদায় নিয়েছিলেন।

 

পৃথিবীতে মাঝে মাঝে এমন সব মানব মানবীদের আবির্ভাব হয় যাদের সঙ্গে আমি মৃত্যুর শব্দটা যোগ করতে পারি না। কিন্তু এটা চরম সত্য যে মৃত্যুকে অস্বীকার করা যায় না। পৃথিবীতে এলেই কোনও না কোনও দিন মৃত্যুর মুখোমুখি হতেই হবে। যুগ যুগ ধরে এমন সব কিংবদন্তি  ব্যক্তিত্বরা মাঝে মাঝে এসে পৃথিবীকে অলোকিত করে দিয়েছে  যাদের সৃষ্টিকর্ম মানুষের হৃদয়ে  চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। সময় চলে যাবে, কিন্তু অতীতের সৃষ্টি কলা এক তিলও মলিন হবে না। এদের অস্তিত্ব মানবসমাজে এক মহিমায় উদ্ভাসিত।

 

আর সেই বিশেষ দিনে আমি স্মরণ করছি    এমনই একটি নাম "সুচিত্রা মিত্র।" আজকের দিনে রবীন্দ্রসংগীত জগতের মায়া ত্যাগ করে উনি চলে গেলেও ধ্রুবতারার মতন এখনও জ্বলছে বাঙালির হৃদয়ে।

 

 আজ এই প্রভাতে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে বসে কত গান যে মনে ভিড় করছে কি বলব। সুদূর  দিগন্ত থেকে কত গান যে মনের মধ্যে মেতে উঠেছে।  ওনার একটার পর একটা গান  দিশাহারা হয়ে পরছি।

 

শান্তিনিকেতনের আশ্রম কন্যা এবং সংগীত ভবনে   গুরুদেবের ছায়ায় বেড়ে ওঠা ওনার   মানসকন্যা সুর এবং কণ্ঠস্বরের দ্বারা  রবীন্দ্রসংগীত জগতে যে বীজ রোপণ করেছিল বহু বছর আগে তা ধীরে ধীরে এক বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছিল। সেই রবীন্দ্রসংগীত বৃক্ষে ওনার গান চারিদিকে  প্রসারিত হয়েছিল। স্মৃতি বড়ই করুণ, তাই ওনার প্রয়াণ দিবসে মনে হচ্ছে আকশ বাতাস ভরপুর হচ্ছে ওনার দরদী  কণ্ঠের মাধ্যম। একটা সময় ছিল ওনার গানের কণ্ঠস্বর বাঙালিকে মোহিত  করে রেখেছিল।

ওত পেতে বসে থাকতাম কখন রেডিও বা গ্রামোফোনে সুচিত্রাদির গান শুনতে পারব। একেকটা গানের মধ্যে সুরের ঝরনা উপচে পরত। সুমধুর কণ্ঠস্বর, ঝরঝরে   উচ্চারণ বাঙালিকে এক স্বপ্নালু দেশে নিয়ে যেত।

গুরুদেবের একেকটা গান বাঙালিকে মুগ্ধ ও স্তম্ভিত করে রেখেছিল পরম পূজিত সুচিত্রা মিত্র।

 

রবীন্দ্রসংগীতের ভাণ্ডারকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন এই  অতুলনীয় গায়িকা। একেকটা গান এক বিস্ময়কর  ইতিহাস।চর্চা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় তবুও বলব যে কয়েকটি গান এখন আমার মনে বেজে উঠছে তার মধ্যে কৃষ্ণকলি এবং ভানুসিংহের পদাবলীর "মরণেরে তুঁহু মম শ্যাম ও সমান'.. লিখতে লিখতে দু টি গানের বীণা যেন কানে বেজে উঠছে।

পরবর্তীকালে এই দুটো গান অনেকের গলায় শুনতে পেরেছি কিন্তু সুচিত্রাদি তার নিজের মতন করে, নিজের ধরনের মধ্যে  দিয়ে নিজস্ব স্টাইলে যেভাবে আমাদের কাছে পেশ করেছে তা সত্যিই অতুলনীয়। এসব অসামান্য গান গেয়ে রবীন্দ্রসংগীত জগতে যেই উচ্চতম স্থানে নিজেকে স্থাপন করে গিয়েছিলেন সেই স্থানটি তা এখনো শূন্য পরে আছে। 'আমার  সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি ' ৭১এর মুক্তি যুদ্ধের বেদমন্ত্র। আছো আমার  হৃদয় জুড়ে অমলিন।

অত সোজা নয় ওনার শূন্যস্থান পূর্ণ করা। আজ  স্মৃতিচারণ  করতে গিয়ে একটু পেছন দিকে তাকিয়ে দেখি ওনার আত্মজীবনী।

 

শান্তিনিকেতনের এই আশ্রম কন্যার সঙ্গীত তের শিক্ষা প্রথম শুরু হয় ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর কাছে। ছাত্রীর মধ্যে যে রত্ন লুকিয়ে আছে সেটা উনি প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলেন এবং সেইভাবেই তৈরি করেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। তাই তৎকালীন যেই সব নামকরা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীরা ছিলেন তাঁদের থেকে সুচিত্রাদির গলার আওয়াজ সম্পূর্ণ অন্যরকম ছিল।  গুরুগম্ভীর এক ভরাট গমগমে আওয়াজের মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তি খুঁজে পেতাম  যেই শক্তি খানিকটা নিজের সংগ্রামী জীবন থেকে প্রভাবিত হয়েছিল।

 

এমন দাপটের সাথে নিজস্ব অকারে, নিজস্ব ধারণের মধ্যে  দিয়ে নিজস্ব স্টাইলে একেকটা গান যেভাবে পেশ করে গিয়েছেন সেই অদ্ভুত শক্তি পরে আর কারও গলায় আজ পর্যন্ত খুঁজে পাই নাই। পাব কী করে এটা তো ঈশ্বরের দান সুচিত্রাদি কণ্ঠে। কিন্তু এটাও বলব একদিকে যেমন দাপটের সাথে গান গেয়েছেন, অন্যদিকে নিজের  নিঃসঙ্গ  জীবনের বেদনা ও প্রকাশ পেয়েছে। বিরহ, দাপট, দরদ, বেদনায় পরিপূর্ণ ভরা সব ভাবনা স্থান পেয়েছে ওনার কণ্ঠে যা এক কথায় বলব  অসামান্য অনন্যা।

সুচিত্রা মিত্র এমনই এক জীবন যা বন্ধনহীন গ্রন্থিতে বাঁধা। আমার মনে  সবসময় একটা আফসোস থেকেই গেছে সুচিত্রাদির মুখোমুখি কোনো দিনও হতে পারি নাই। তবে দূর থেকে ওনাকে দেখেছি অনেক রবীন্দ্রসংগীত অনুষ্ঠানে।

পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্র কেন্দ্রিক যত অনুষ্ঠান হতো ছুটে যেতাম দিদির গান শুনবার জন্য। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির থেকে শুরু করে, বিশ্বভারতী রবীন্দ্রভারতী রবি তীর্থ  রবীন্দ্রসদন, মহাজাতি সদন কলামন্দির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ওনাকে গান গাইতে দেখেছি। কী ব্যক্তিত্বময়  উজ্জ্বলতার ভরা  চেহারা। চশমার ভেতর থেকে একজোড়া গভীর দৃষ্টি অনেক কথাই বলে দিচ্ছে। মন মানতে চাইত না যখনই অনুষ্ঠান শেষ হত ,তখনই মনে মনে বলে উঠতাম "দিদি আরও গাও আরও গাও।'

 

সুচিত্রা মিত্রর গানের কি কোনো শেষ আছে? যখন জীবিত ছিলেন তখনো শেষ নেই আর এখনো চলে গিয়েও আমাদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।  ছাত্রী অবস্থা থেকেই ওনার সঙ্গীত   শুনে বড় হয়েছি যা আজও  আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। উনার ছাত্রছাত্রীদের   থেকে শুনেছি সুচিত্রা মিত্র জন্মলগ্ন থেকেই  অতুলনীয়, রূপে গুণে  রবীন্দ্রসংগীতের ধরনে লালনে বেড়ে ওঠা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

 

কে ভুলতে পারে সেই ভুবন ভোলানো গান 'আমি রূপে তোমায় ভোলাব না ভালোবাসায় ভোলাব ..

আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গান দিয়ে দ্বার খুলব  ..

আজ যেমন করে গাইছে আকাশ তেমন করে গাও।

দিদি আজ তোমার মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই বলব বহুকাল আগে আজকের দিনে তুমি যে রবীন্দ্র সঙ্গীত জগতকে ছেড়ে  চলে গিয়েছিলে  সেইভাবেই চলে আসছে কোনো ব্যতিক্রম হয় না। তোমার স্পর্শ লতায় পাতায় জড়িয়ে আছে  গুরুদেবের গানের জগতে। তোমার গান আমাদের আনন্দে উতলা করে তুলেছিল, আমাদের কাঁদিয়েছে, আমাদের আবেগপ্রবণ করে তুলেছে, মন ভরিয়ে দিয়েছে এখনো চলে আসছে। শুধু আমি আমার কথা বলছি না আমার মতো অগণিত  ভক্তরা আছে যাদের মনে সুচিত্রা মিত্র এক সঙ্গীতের ভাস্কর।

 

তাই তো এত বছর হয়ে গেছে আজও উনার জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকীতে ওনাকে স্মরণ করি ওনার গান গানের মাধ্যমে। যুগ যুগ ধরে ভক্তরা আসবে, রবীন্দ্রসংগীত চর্চা করবে গান গাইবে এবং রবি চেতনা বাঁচিয়ে রাখবে। এই রবীন্দ্রসংগীতের পথচলা কোন দিনও থামবে না ,এই যাত্রার মধ্যে সুচিত্রা মিত্র ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকবে।  এই প্রেক্ষিতে ওনার আরেকটা গান এখন খুব মনে আসছি  উল্লেখ না করে পারছি না ..

'ধূসর জীবনে  গোধূলীতে ক্লান্ত আলোর   ম্লানস্মৃতি, মুছে  আসা সেই ছবিটিতে রং একে দেয় মোর গীতি'।

 

আর একটি নটরাজ শিব কেন্দ্রিক গান উনি গেয়ে  গেছেন যার মধ্যে নটরাজের শক্তি প্রকাশ পেয়েছে   'নৃত্যেরও তালে তালে হে নটরাজ.. ঘুচাও ঘুচাও ঘুচাও সকল বন্ধ হে। মনে আছে বহু বছর আগে নটরাজ  নৃত্যের মাধ্যমে সুচিত্রাদির এই কণ্ঠস্বরের গানটা সমস্ত প্রেক্ষাগৃহকে গমগম করে রেখেছিল।

'যুগে যুগে তালে তালে সুরে সুরে কালে কালে ঢেউ তুলে যাও মাতিয়ে জাগাও অমল কমল গন্ধ হে ..নমো নমো নমো '..

আহা কী কণ্ঠ, কী সঙ্গীত কোনও দিনও তোমার  সংগীত ভুলব না যেই কণ্ঠ তাড়িয়ে তা নিয়ে বেড়াত আমাকে। সত্যি সত্যি এক অগ্রগণ্য রবীন্দ্রসংগীত গায়িকা যিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, কিছু নামের মধ্যে অদ্বিতীয় নাম।    

'আছে দুঃখ আছে মৃত্যু 'শেষ করছি ওনার এই গানটা  দিয়ে যেটা একবার  শুনলে  বারবার শুনতে ইচ্ছা করে। নিজের হাতে তিল তিল করে রবিতীর্থ তৈরি  করে এমন একটা আবহ  করে গিয়েছিলেন যেখানে সুচিত্রা মিত্রর গান আজও ভাসছে এবং চিরকালই প্রতিধ্বনি  হবে।

'যদি দূরে চলে যায় তবু মনে রেখো'

তুমি সব সময় আমাদের কাছে আছ, সুরের মধ্যে  দিয়ে, যুগ যুগ ধরে তুমি আমাদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আমার চোখে এই অসামান্য গায়িকা শুধু মহান সংগীত শিল্পী হয়ে থাকেন নাই তিনি এক তেজস্বিনী দৃষ্টান্ত এবং এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের প্রতীক।  রবীন্দ্রনাথের গান শুধু  কণ্ঠে ধারণের গান নয়। একে গ্রহণ করতে হবে  হৃদয়ে। এ আমাদের জীবনের বিশ্বস্ত সঙ্গী,চলার পথের দিশা, লড়াইয়ের  হাতিয়ার। এ গান আত্মরক্ষার বর্ম, গভীর দুঃখের দিনে সান্ত্বনার  স্নিগ্ধ প্রলেপ। সুরলোকে আনন্দময় হোক তাঁর যাত্রাপথ, চিরশান্তিতে থাকুন। এটাই আমার প্রার্থনা। শতকোটি প্রণাম অর্পণ করলাম তোমার চরণে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলির মাধ্যমে ।

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকার আর্কইভ, দেশ পত্রিকা।

ব্যক্তিগত ঋণ, পরম শ্রদ্ধেয় সুধীর চক্রবর্তী, সুভাষ চৌধুরী,সোমেন্দ্রনাথ  বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌরেন সেন।

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত (গবেষক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প ও ভ্রমণ লেখক)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top