সিডনী শনিবার, ৮ই আগস্ট ২০২০, ২৪শে শ্রাবণ ১৪২৭


সফলতার জন্য চাই অধ্যবসায়: একান্ত সাক্ষাতকারে মিসেস ইউনিভার্সাল বাংলাদেশ ২০১৯


প্রকাশিত:
৩ মার্চ ২০২০ ১৩:২৫

আপডেট:
৪ মার্চ ২০২০ ০৩:০৬

 মিসেস ইউনিভার্সাল বাংলাদেশ ২০১৯ ফাইনালে নুরীন চৌধুরী

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকের কাছেই নুরীন চৌধুরী বেশ পরিচিত একটি নাম। মেলবর্নে সপরিবারে বসবাস করা বাঙালি মেয়েটি ইতোমধ্যেই এদেশের মেইনস্ট্রিমের ফ্যাশন ও মডেলিং ইন্ডাস্ট্রিতে সবার নজর কেড়েছে। বাংলাদেশী ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপারস্টারদের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেকে তুলে ধরার এই ব্যতিক্রমী যোগত্যাসম্পন্ন তারকার জীবনযাত্রা, পেশা ও কাজকর্ম সম্পর্কে জানতে প্রভাতফেরী সম্প্রতি মুখোমুখি হয়েছিলো নুরীনের। আমাদের গর্ব এই তারকা খোলামেলা কথা বলেছেন তাঁর পরিবার, চিন্তা ভাবনা, চ্যালেঞ্জ, স্বপ্ন এবং পরিকল্পনা নিয়ে।

সংক্ষিপ্ত এ সাক্ষাতকারটি নিম্নে প্রভাতফেরীর পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

১. আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন-
নুরীনঃ আমার জন্ম হয়েছিলো ঢাকা শহরে। যখন আমার বয়স মাত্র সাত বছর, তখন বাবা-মা এবং দুই ভাই সহ আমরা অস্ট্রেলিয়ায় আসি। আমার মা তাঁর কর্মজীবনে একজন একাউন্টস অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন, তিনি এখন অবসর নিয়েছেন। অন্যদিকে আমার বাবা ছিলেন একজন ম্যানেজার। কাজ থেকে রিটায়ার করার পর তিনি এখন একটি স্টুডেন্ট মাইগ্রেশন ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। একটি ভাই আমার চেয়ে দুই বছরের বড়, সে এখন এপিএস লেভেল ফাইভে কাজ করে। এছাড়া ছোটভাইটি এখানেই একটি নামকরা আইটি প্রতিষ্ঠানে ক্লাউড সার্ভিসের দায়িত্বে আছে।

অস্ট্রেলিয়ার একটি ফ্যাশন শোতে নুরীন চৌধুরী

নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলতে গেলে, আলহামদুলিল্লাহ আমাদের বিবাহিত জীবনের বাইশ বছর পূর্ণ হয়েছে। আমাদের চমৎকার দু’টি মেয়ে আছে। বড়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সে পড়ালেখা শুরু করেছে। অন্যদিকে ছোট মেয়েটি ক্লাস সেভেনে পড়ছে।

আমার বিয়ে হয়েছিলো খুবই অল্প বয়সে। এরপর সংসারে জড়িয়ে যাওয়াতে পড়ালেখায় বিরতি পড়ে যায়। কিন্তু সবসময়েই পড়ালেখার প্রতি আমার একটা ঝোঁক থেকে গিয়েছিলো। প্রায়শ মনে হতো, মানুষ হিসেবে আমারও তো কিছু করার আছে। সুতরাং প্রায় দশ বছর বিরতির পর ২০১৪ সালে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাই। এ সময়টাতে আমি ব্যাচেলর অফ নেটওয়ার্কিং এর নিয়মিত পড়ালেখা করছিলাম, আবার একই সাথে সপ্তাহে বত্রিশ ঘন্টা কাজও করতাম। একই সাথে আমি প্রতিদিন বাসায় সবার জন্য রান্না করতাম, বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক দেখাশোনা করতাম, বাসার অন্যান্য খুঁটিনাটি কাজগুলোও করতাম এবং পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত ছয়দিন জিমে গিয়ে ব্যায়াম করতাম।

দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এতকিছুর পরও আমাকে এসাইনমেন্টগুলো নিয়মিত করতে হতো এবং পরীক্ষার জন্য নিয়মিত পড়ালেখা করতে হতো। এভাবে চলতে চলতেই পরবর্তীতে মাত্র বারো মাসে আমি বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশনে মাস্টার্স শেষ করি। একটানা সাড়ে তিন বছর আমি ছিলাম একই সাথে ফুলটাইম ছাত্রী এবং ফুলটাইম কর্মী। কখনো আমি কাজ করা বন্ধ করিনি। যদিও আমার জীবনে এ সময়টি ছিলো সবচেয়ে বেশি চাপের এবং কষ্টকর। কিন্তু মাস্টার্স শেষ হওয়ার পরই আমি অন্তর দিয়ে বুঝতে পারলাম লম্বা একটি সময় ধরে এই প্রচন্ড কষ্ট করাটা আসলে সার্থকতা পেয়েছে। বর্তমানে আমি একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে ক্লায়েন্ট রিলেশনশীপ ম্যানেজার হিসেবে নিয়মিত কাজ করছি।

পরিবারের সদস্যদের সাথে নুরীন চৌধুরী

২. আপনি বর্তমানে মেন্টাল হেলথ ফাউন্ডেশন অস্ট্রেলিয়ার মাল্টিকালচারাল এম্বাসেডর হিসাবে নিযুক্ত হয়েছেন। এ সম্পর্কে কিছু বলুন-

নুরীনঃ সম্প্রতি মেন্টাল হেলথ ফাউন্ডেশন অস্ট্রেলিয়া সংস্থাটি আমাকে তাদের মালটিকালচারাল এম্বাসেডর হিসেবে মনোনীত করেছে। এটি আমার জন্য এক অভূতপুর্ব সম্মাননা। স্বাভাবিকভাবেই আমি অত্যন্ত খুশী ও আনন্দিত।

কারণ এই কাজটি যেন আমার নিজের অন্তরের খুব কাছাকাছি কোন কাজ। আমি নিজেই জীবনের অনেকগুলো বছরে ডিপ্রেশন ও চাপের ভেতর দিয়ে গিয়েছি, ঐ সময়টা ছিলো আমার নিজের ব্যক্তিগত এক সংগ্রাম। সুতরাং আমি জানি এ ধরণের চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করতে হলে মানুষকে কতটা শক্তিশালী হতে হয়। তাই আমি খুবই আগ্রহের সাথে এদেশের বৈচিত্র্যময় নানা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মানুষজনের সাথে মিলে তাদের ব্যক্তিগত মানসিক সমস্যাগুলো মোকাবেলার কাজে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য করতে চাই।

বিভিন্ন কমিউনিটিতে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক নানা কর্মসূচীর পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং সমন্বয় সাধন করার বিষয়গুলো এ কাজে আমার জন্য দায়িত্ব হিসেবে দেয়া হয়েছে। ভিক্টোরিয়াতে নানা দেশ থেকে আসা অসংখ্যা মানুষ আছে, এছাড়াও রয়েছে আদিবাসী জনগণ। তাদের মাঝে ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্যচর্চা ও সুস্থ থাকার কাজগুলো আমি প্রমোট করছি। এ কাজে অবদান রাখার জন্য আমাদের একটি শক্তিশালী স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্কও রয়েছে। সবমিলে বলা যায়, বোর্ড সদস্য ও কর্মকর্তাদের সাথে কমিউনিটির সদস্যদের যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সংগঠনটির কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য আমি কাজ করে যাচ্ছি।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবর্নে একটি ফ্যাশন শোতে নুরীন চৌধুরী

৩. আপনি অনেকগুলো ফ্যাশন শো এবং মডেলিং ইভেন্টে সাফল্যের সাথে অংশগ্রহণ করেছেন এবং বিভিন্ন পর্ব পেরিয়ে সাফল্যের সাথে ফাইনালিস্টও নির্বাচিত হয়েছেন। এ অভিজ্ঞতাগুলো সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের জন্য কিছু বলুন-

নুরীনঃ প্রথমেই বলবো মিসেস বাংলাদেশ ইউনিভার্সাল ২০১৯ ইভেন্টের কথা। মিসেস ইউনিভার্সাল সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে কেবলমাত্র বিবাহিতাদের সুন্দরী প্রতিযোগিতা বললে হয়তো ইভেন্টটির গুরুত্ব বুঝা যাবে না। আন্তর্জাতিক সংস্থা পিজেন্ট প্ল্যানেট এর তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বের বিবাহিতা নারীদের সুন্দরী প্রতিযোগিতাগুলোর মাঝে ২০১৬-২০১৯ সময়কালের জন্য এই প্রতিযোগিতাটি প্রথম পাঁচটি সুন্দরী প্রতিযোগিতার মাঝে অন্যতম একটি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলো। এছাড়াও এ প্রতিযোগিতাটিকে পৃথিবীর সেরা ছয়টি সুন্দরী প্রতিযোগিতার মাঝে একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে মেলবর্নে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় সারা পৃথিবীতে বসবাসকারী সকল বিবাহিত বাংলাদেশী নারীদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়ে আমি অনেক আনন্দিত। আমার জন্মভূমিকে উপস্থাপন করার এই সুযোগটি ছিলো ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য এক অভূতপুর্ব সম্মানের বিষয়। প্রতিযোগিতার পরবর্তী ধাপে মেক্সিকোতে হতে যাওয়া পাঁচ দিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানে প্রথম নির্বাচিত পনেরো জনের মাঝে আমি থাকছি, এটাও প্রায় অবিশ্বাস্য একটি বিষয়।

সুন্দরী প্রতিযোগিতাটি খুবই শৃঙখলাপূর্ণ এবং সাজানো একটি অনুষ্ঠান ছিলো, প্রত্যেক প্রতিযোগীকেই যথাসময়ে জানানো হয়েছে কি কাপড় পড়তে হবে, কি করতে হবে। মূলত তিন ভাগে অনুষ্ঠানটি বিভক্ত ছিলো; ফিটনেস, আনুষ্ঠানিকতা এবং সাক্ষাতকার। এখন মেক্সিকোতে পরবর্তী ধাপে অংশগ্রহণের আগে প্রত্যেক নির্বাচিত প্রতিযোগীকে একটি বিজ্ঞাপনী তথ্যমালা উম্মুক্ত করতে হবে যেন দর্শকরা সব প্রতিযোগীদের সম্পর্কে বিস্তারিত সব তথ্য আগেই জেনে নিতে পারেন।

এছাড়া আমি মিস ফ্যাশন উইক অস্ট্রেলিয়া ২০১৯ প্রতিযোগিতার চুড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণের জন্যও নির্বাচিত হয়েছিলাম। এই ইভেন্টটি হলো সুন্দরী প্রতিযোগিতার সাথে মডেলিং এর সুসমন্বিত একটি আয়োজন। এমন একটি প্রতিযোগিতার ফাইনালিষ্ট হওয়াতে আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে উভয় ক্ষেত্রেই আমি উৎকর্ষ সাধন করতে পেরেছি। এটি এমন একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতা যেখানে ক্ষীণকায়া কিংবা পৃথুলা, বয়স্কা কিংবা টিনেজার, স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক সব ধরণের প্রতিযোগীরাই অংশগ্রহণ করতে পারে। মানুষের মাঝে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও শারীরিক ইতিবাচকতা বাড়ানোর যে কার্যক্রম এই প্রতিযোগিতার আয়োজকরা সম্পন্ন করেছেন তা সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে। কারণ আমি নিজেও দীর্ঘ একটা সময় নিজের শারীরিক গঠন সম্পর্কে দুশ্চিন্তায় ভুগেছি। এছাড়া আরেকটি বড় বিষয় হলো প্রতিযোগিতাটির সেরা তিন প্রতিযোগীকে নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইকে মডেল হিসেবে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়।

২০১৯ সালের মিস এশিয়া পেটিট এর ফাইনালিস্ট হয়েছিলাম আমি। আসলে এটা আমার জন্য একটা সৌভাগ্যের বিষয়ই ছিলো যে স্বয়ং সুন্দরী প্রতিযোগিতার ডাইরেক্টর আমাকে এতে অংশ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এই সুন্দরী প্রতিযোগিতাটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিলো, টিনেজার, এডাল্ট, এডাল্ট পেটিট এবং গ্র্যান্ডমাদার। প্রতিটি বিভাগে ছিলো কমবেশি বারোজন করে প্রতিযোগি এবং মূলত তিনটি রাউন্ডে আমাদের অংশ নিতে হয়; সুইমস্যুট, জাতীয় পোষাক এবং গাউন।

এখানে বেশিরভাগ প্রতিযোগীরাই ছিলেন ফিলিপিনের, এছাড়া কেবলমাত্র আমি ছিলাম অন্যদেশী এবং ভিয়েতনামের একটি মেয়েও ছিলো অন্যদেশী। সুন্দরী প্রতিযোগিতাটির মঞ্চ এবং পুরো অনুষ্ঠানস্থল ছিলো অনবদ্যভাবে সাজানো। ফিলিপিনের মেয়েরা সাজগোজের ক্ষেত্রে সত্যিই অনুপম। বিশেষ করে তাদের পোষাকগুলো ছিলো দেখার মতো, বেশিরভাগ পোষাকই ছিলো ফিলিপিন থেকে বিশেষ অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনা। এ অনুষ্ঠানে সবার চমৎকার সাজপোষাকগুলো কাছ থেকে দেখাটাও ছিলো আমার জন্য অনন্য এক অভিজ্ঞতা।

তারপর বলা যায় অস্ট্রেলিয়া গ্যালাক্সি সুন্দরী প্রতিযোগিতা ২০১৯ এর কথা। এ ইভেন্টেও জাতীয় পর্যায়ে আমি ফাইনালিস্ট হয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি এটা ছিলো এমন এক অনুষ্ঠান যেটি আমি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি। এতে অংশ নিতে গিয়ে আমরা ওরিয়েন্টেশন এবং ট্রেইনিং করেছি, এবং পরবর্তীতে একটানা চারদিন শুধু মজাই করেছি। এডাল্ট, এডাল্ট মিস, মিসেস, এবং মিস ক্যাটাগরিতে আমরা সবাই সুইমস্যুট, পার্টি পোষাক এবং গাউন এই তিনটি রাউন্ডে অংশ নেই। পুরো প্রতিযোগিতাটি ছিলো অত্যন্ত মনোরম এক স্থান সারফার্স প্যারাডাইসের ম্যারিয়ট হোটেলে আয়োজিত। এ সময় প্রতিটি রুমে প্রত্যেক প্রতিযোগীর সাথে ছিলো তিনজন রুমমেটস। আমার সাথে সেখানে যারা ছিলো তারা এখনো আমার সাথে যোগাযোগ রাখে এবং তারা প্রত্যেকেই আমার চমৎকার বন্ধু, তারা আসলেই চমৎকার একেকজন মানুষ।

সবশেষে উল্লেখ করতে হয় ল্যাকমি অস্ট্রেলিয়া ফ্যাশন শো ২০১৯ অনুষ্ঠানটি। ১৯৫২ সালে ভারতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিখ্যাত ল্যাকমি কসমেটিক ব্র্যান্ড নামটির সাথে দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ মানুষই পরিচিত। ওরা ১৯৯৯ সাল থেকেই ল্যাকমি ফ্যাশন শো এবং ফ্যাশন উইক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে আসছে। যখন অনুষ্ঠানটির আয়োজক রোজ এবং শেরি আমাকে এতে অংশ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, তখন আমি অপ্রত্যাশিতভাবে আনন্দিত হয়েছিলাম এ সম্মাননা পেয়ে। অনুষ্ঠানটিতে আমি ছিলাম কোকো বাই বাওয়া এবং বিখ্যাত বলিউড ডিজাইনার কীর্তি রাঠোরের মডেল। এ ধরণের একটি সুসজ্জিত মঞ্চে এতো সুন্দর পোষাক পড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতাটাও যেন আমার জন্য ছিলো জীবনের সুন্দর একটি স্বপ্ন সত্যি হয়ে উঠার মতো অনবদ্য একটি বিষয়।

৪. একজন বাংলাদেশী অস্ট্রেলিয়ান মানুষ এবং মুসলিম পরিবারের সদস্য হওয়াতে নিঃসন্দেহে আপনাকে অনেক প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেইসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন-

নুরীনঃ ব্যক্তিগতভাবে আমাকে সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে তার কথা তো সবাইরই বুঝার কথা। আপনি যদি কোন সুন্দরী প্রতিযোগিতা কিংবা এ ধরণের কোন অনুষ্ঠানে প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নিতে যান তাহলে আপনার পরিবার থেকে প্রথমেই বলা হবে যেসব প্রতিযোগিতা কিংবা ফ্যাশন শোতে কিছুটা সংক্ষিপ্ত কাপড় পড়তে হয় তাতে অংশ নেয়ার দরকার নেই। তারা হয়তো বলবে, যেসব অনুষ্ঠানে বড় ও ঢিলাঢালা কাপড় অনুমোদন করে কেবলমাত্র সেসব অনুষ্ঠানেই অংশ নেয়ার জন্য।

আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ হলো কমিউনিটির বেশিরভাগ মানুষের মানসিকতা। অনেকে তো আছে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনে এবং কিছু না জেনেই সরাসরি ধারণা করে বসে যে আমার চরিত্র খারাপ কারণ আমি এমন একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করি।

'ফ্যাশন উইক অস্ট্রেলিয়া ২০১৯' এ ফাইনালে নুরীন চৌধুরী

আমি মনে করি পবিত্র কোরআন শরীফের শিক্ষা অনুযায়ী আমাদের উচিত কেবলমাত্র বাহ্যিক আবরণ দেখেই অন্যদেরকে বিচার না করা, বরং আমাদের উচিত অন্য মানুষদের নিয়ত ও চিন্তা বুঝারও চেষ্টা করা। ভালোভাবে ঢেকেঢুকে কাপড় পরার অর্থ এই না যে কেবলমাত্র এতে করেই আপনার নিয়ত খুবই ভালো হয়ে গিয়েছে কিংবা আপনি খুবই সৎ ও পবিত্র হয়ে গিয়েছেন। আমার পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন নিয়মিত নামাজ পড়ে। হালাল খাবারের কোড এবং উপাদান সম্পর্কে আমার মেয়েরা খুব ভালোভাবেই অবগত, তারা এসব বিষয় মেনে চলে। তারা বরঞ্চ আমার চেয়ে বেশি সুরা জানে আলহামদুলিল্লাহ। সুতরাং আমি মনে করি কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালাই পারেন আমাদের বিচার করতে।

৫. যারা মডেল এবং ফ্যশনকে ক্যারিয়ার হিসাবে নিতে চায় তাদের উদ্দেশ্য আপনার উপদেশ কি?

নুরীনঃ যদি কেউ আসলেই মডেলিংকে মনের গভীর থেকে অধ্যবসায়ের সাথে পেশা হিসেবে নিতে চায় তাহলে আমি বলবো প্রথমেই আপনাকে নিজের প্রচুর যত্ন নিতে হবে। যথাযথ ডায়েট, শরীরচর্চা এবং ত্বকের নিয়মিত যত্ন নেয়ার কোন বিকল্প নেই এক্ষেত্রে, বরং এ কাজগুলোকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।

এরপর শুরুতেই আপনাকে স্থানীয় ইন্ডিয়ান এবং ওয়েস্টার্ন বিজ্ঞাপননির্মাতারা কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজকরা যখন মডেলদের খোঁজ করে, অথবা ফটোগ্রাফাররা যখন টিএফপি (টেস্ট ফর প্রিন্ট) শুটিং করেন এসব তথ্য সম্পর্কে আপডেট থাকতে হবে। যত বেশি সম্ভব কমিউনিটি ইভেন্টের আয়োজন ও সোশাল মিডিয়ার পেজগুলো থেকে তথ্যের খোঁজ করতে হবে। কোন সংশয় না রেখেই স্থানীয় সুন্দরী প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতা সবকিছুতেই অংশ নেয়ার জন্য আবেদন করতে হবে।

আপনাকে মনে রাখতে হবে প্রচারেই প্রসার। এই ইন্ডাস্ট্রিতে দেখনদারিটাই আসল বিষয়। সুতরাং যে কোন অনুষ্ঠান যত ছোট হোক কিংবা বড় হোক, আপনি যখন অংশ নেবেন তখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে যেন আপনাকে গ্ল্যামারাস দেখায়। তবে মনে রাখবেন, একজন বিবাহিত নারী যার ছোট শিশুর প্রতিপালনও করতে হয় তার জন্য মডেলিংকে ফুল টাইম কাজ হিসেবে নেয়া প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। কারণ আপনাকে বিভিন্ন প্র্যাকটিস ও অডিশনের জন্য প্রচুর সময় দিতে হবে, পরিবারের জন্য বরাদ্দ সময়কেও স্যাক্রিফাইস করতে হবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি এ বিষয়টাকে সুসমন্বিত রাখতে এবং কেবলমাত্র উইকেন্ডে এ নিয়ে কাজগুলো করতে। মনে রাখবেন জীবনের সবকিছুই আসলে অভিজ্ঞতা এবং ভ্রমণের মতো, এতে কোন কিছুই ফেলনা নয়। সুতরাং আপনি যদি কোন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী না হন তাহলে ভেঙে পড়বেন না, বরং আপনার ব্যক্তিগত অর্জনটুকু নিয়েই আপনাকে আনন্দিত হতে হবে। যদি আপনি শুরুতেই ভালো কোন সুযোগ না পান তাহলে তা পাওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কারণ আমার নিজের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, যদি আপনি ভেতর থেকে আসলেই চাওয়ার মতো করে কিছু চান তাহলে আপনি তা একসময় বা একসময় অর্জন করব্নেই। কিন্তু এর জন্য আপনার নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে, একাগ্রতা ধরে রাখতে হবে।

৬. আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?
নুরীনঃ এ পর্যন্ত আমার কাছে তিনটি মিডিয়াম বাজেট বলিউড মুভি করার প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু সমস্যা হলো পরিচালকরা আমাকে যে কন্ট্রাক্টগুলো দিয়েছেন তার মাঝে একটা শর্ত ছিলো চরিত্রের প্রয়োজনে আমি খোলামেলা হতে রাজি আছি কি না। আমি এসব প্রশ্নের উত্তরে না লিখেছি। কারণ আমার সুনাম ও আমার পরিবার আমার কাছে কোন মুভির চরিত্রে অভিনয় করার জন্য শরীরকে পুঁজি করার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব রাখে।

তবে হ্যাঁ, ইনশাল্লাহ আর কিছুদিন পরেই দুটি বেশ বড় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যাচ্ছি। এর মাঝে একটি তো অনেক বড়সড় এক ইভেন্ট। মার্চ ২০২০ পর্যন্ত অপেক্ষা করুন তারপর আপনারা নিজেরাই সব দেখতে পাবেন।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top