সিডনী রবিবার, ৩১শে মে ২০২০, ১৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭


প্রভাত ফেরীর সাথে যৌথ সাক্ষাতকারে ফারুকী-তিশাঃ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে বিপুল একটা পরিবর্তন দরকার


প্রকাশিত:
২৯ মার্চ ২০২০ ২০:০৯

আপডেট:
৩১ মে ২০২০ ২১:৫৪

অস্ট্রেলিয়ায় ফারুকী ও তিশা

সম্প্রতি সিডনি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশী আলোড়ন সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘শনিবার বিকেল‘ প্রদর্শনী ‍উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন সিনেমাটির পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এই ভ্রমণে তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর স্ত্রী এবং সিনেমাটির অন্যতম অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা।

ফারুকী-তিশা দম্পত্তি বাংলাদেশের সংস্কৃতি জগতের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র। অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণকালে এক শুক্রবার দুপুরে তারা প্রভাত ফেরীর আমন্ত্রণে আমাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সিডনির বিখ্যাত অপেরা হাউজের অদূরে হারবারসাইড একটি রেস্টুরেন্টের বারান্দায় বসে দীর্ঘক্ষণ তারা দু‘জনেই কথা বলেছেন নানা প্রসঙ্গে। প্রভাত ফেরীর পক্ষ থেকে সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছে সম্পাদক শ্রাবন্তী কাজী আশরাফী।

যৌথ সাক্ষাতকারের পুরো সময়টা জুড়েই ফারুকী ছিলেন স্বভাবসুলভভাবে কৌতুকপ্রবণ ও হাস্যরসে উচ্চকিত। ফারুকী যখন কথা বলেন তখন মনের লাগাম খুলে কথা বলেন। তার কথায় অনবরত কৌতুক থেকে নির্যাস খুঁজে নিতে হয়। অন্যদিকে তিশা স্বল্পভাষী এবং মনযোগী শ্রোতা। তিনি উপস্থিত সবার সাথে মৃদু হেসে আন্তরিক আচরণ করেন এবং নিজে বেশি কথা বলার চেয়ে অন্যদের কাছ থেকে শুনতেই আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে যখন কথা বলেন তখন তাঁর সুচিন্তিত কথাগুলোতে পরিস্কারভাবেই একটি সুন্দর ও চিন্তাশীল মনের পরিচয় ফুটে উঠে।

প্রভাত ফেরীর সাথে এ সাক্ষাতকারে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পৃথিবীর নানা দেশ দেখার স্মৃতি, সিডনি ও অস্ট্রেলিয়া এবং এখানকার বাংলাদেশী কমিউনিটি নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতাপ্রসূত মতামত, দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড নিয়ে ভবিষ্যত স্বপ্ন সহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা অকপটে আলাপ করেছেন। প্রভাত ফেরীর পাঠকদের জন্য এক্সক্লুসিভ সাক্ষাতকারটির নির্বাচিত অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।

প্রভাত ফেরী: পাঠকদের পক্ষ থেকে আপনাদের দু‘জনের কাছেই আমাদের কিছু প্রশ্ন আছে। প্রথমে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কাছে আসি। আপনি পরিচিত একজন মানুষ হয়ে উঠার আগের জীবন সম্পর্কে কি কিছু জানাবেন আমাদের?

ফারুকী: পরিচিত একজন মানুষ হওয়ার আগে আমার জীবনটা আর দশজন মানুষের মতোই ছিলো। এটেনশনের বাইরে। ক্যাফেতে গেলে কখনো মনে হতো না যে কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে, রাস্তায় বেরুলে যা ইচ্ছা তাই করতে পারছি বন্ধুবান্ধবদের সাথে। এখন রাস্তায় বের হলে, কোন মানুষ না থাকলেও আমার মনে হয় যে কেউ একজন বোধহয় দেখছে। সুতরাং আমাকে খেয়াল রাখতে হয় আমি কি করছি। ফলে পাবলিক প্লেইসে আমার চলাফেরা, কাজকর্ম এগুলো এখন খানিকটা লিমিটেড। আগে এটা ছিলো কমপ্লিটলি ফ্রি। আমার মনে হয় পাবলিক এটেনশনে আসার আগের জীবন এবং পরের জীবনের মধ্যে এটা সবচেয়ে বড় পার্থক্য। এছাড়া আর কোন পার্থক্য দেখি না। বাকী সব আমি একই রকম।

প্রভাত ফেরী: নাটক লেখা ও পরিচালনার এই যে পর্যায়, এটা কিভাবে শুরু হলো আপনার জীবনে?

ফারুকী: ওয়েল, এটা তো মনে হয় বহুবার বলেছি। আমি জীবনে অনেক কিছু হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। নাখালপাড়ার একটি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আমি এসেছি। আমার বাবা নাখালপাড়ার মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন একজন মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমরা ঠিক, সমাজের এলিট পর্যায়ের কোন মানুষ না। মধ্যবিত্তের কিন্তু একটা তাড়না থাকে নিজেকে প্রমাণ করার। আর আমার ক্ষেত্রে তাড়নাটা একটু বেশি ছিলো কারণ আমি ছোটবেলায় দেখতে সুন্দর ছিলাম না। (একটু মজার হাসির সাথে) এখন তো দেখতে সুন্দর, তাই না তিশা?

তিশা: (হেসে) আগে শুনি। শেষ করো।

ফারুকী: খুবই শুকনা ছিলাম।

তিশা: তুমি কি এখন শুকনা না?

ফারুকী: (হাসির সাথে) এখন তো একধরণের আবেদনময়। যাইহোক, এমনই ছিলাম। আমরা অবস্থাসম্পন্ন ছিলাম, ভালো ছিলাম, কিন্তু আমরা তো গুলশানের কোটিপতি না। ফলে আমি প্রথম তাড়না বোধ করলাম নিজেকে এক্সপ্রেস করার। আমাকে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। এই তাড়নাটা প্রথম বোধ করলাম, যখন আমি প্রেমের প্রস্তাব দিতে শুরু করলাম। প্রেমের প্রস্তাব দিতে গিয়ে দেখলাম যে আমার শেয়ার বাজারের দর খুব খারাপ। ফলে দেখা গেলো আমি পড়তাম বড় স্কুলে, থাকতাম নাখালপাড়ায়, প্রাইভেট টিউটরদের কাছে পড়তে যেতাম গ্রিন রোড, কাঠালবাগান এসব জায়গায়। ওখানে আমি যাদের কাছে প্রস্তাব দিতে চাইতাম তাদের কাছে আমার শেয়ার বাজারের ভ্যালুটা কম ছিলো। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে ওকে, আমাকে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। আমাকে কিছু একটা করতে হবে। এটা আসলে খুবই বেসিক একটা তাড়না। সে তাড়না থেকে আমি নানান কিছু করার চেষ্টা করেছি।

ফাইভ স্টার হোটেলের স্টাফ হওয়ার চেষ্টা করেছি। বড় ক্রিকেটার হওয়ার চেষ্টা করেছি। ফুটবলার হওয়ার চেষ্টা করেছি। সব জায়গায় মোটামুটি ব্যর্থ হয়েছি। এবং তারপর কিভাবে যেন আমি সিনেমা বানানো শুরু করলাম। (তিশার দিকে তাকিয়ে) এবার ওকে জিজ্ঞাসা করেন। সব প্রশ্ন তো আমাকেই করে ফেলছেন।

প্রভাত ফেরী: তিশার কাছে প্রশ্ন নিয়ে যাওয়ার আগে তাহলে একটা কথা বলতেই হয়। প্রেমের প্রস্তাব দিতে দিতে ….

তিশা: শুধু প্রস্তাব না প্রেমও করেছে।

প্রভাত ফেরী: তাহলে বলতে হয়, প্রেম করতে করতে আপনি এতোই দক্ষতা অর্জন করেছেন যে সারাদেশের সবচেয়ে প্রিয়মুখকে একসময় জয় করে ফেললেন।

ফারুকী: ওহ আমি নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। আমি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞও। দেখুন আমরা মানুষ, আমাদের কাজ হলো চেষ্টা করা। বাকি জিনিসগুলো, কেউ বলেন সময়ের চক্রান্ত, কেউ বলেন আল্লাহর রহমত। যে যেটা বিশ্বাস করেন সে সেটাই ভাবতে পারেন। সে জায়গা থেকে মনে করি যে এটা আমার জন্য একটা আশীর্বাদ যে ওর সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। কারণ, পারিবারিক জীবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, একজন মানুষের কাজের জীবনের দিক থেকে। সে কেন আমাকে গ্রহণ করেছে বা আমার কথায় পটে গিয়েছে তা অবশ্য সেই বলতে পারবে। হতে পারে আমি অনেক সিনসিয়ার ছিলাম।

প্রভাত ফেরী: তাহলে এখন আমরা তিশার কাছ থেকে শুনতে চাই আপনার পরিচিত হয়ে উঠার আগের জীবনের কথা, ঐ সময়ের কিছু স্মৃতির কথা।

তিশা: আমার জন্য এটা বলা একটু কঠিন। আমি শিশুশিল্পী হিসেবেই পারফর্ম করতাম। তাই বুদ্ধি হওয়ার সময় থেকেই দেখেছি আমি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ইনভলভড। এর আগের কোন স্মৃতি আমার সাধারণত নেই।

ফারুকী: ও ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। নতুন কুঁড়ির চ্যাম্পিয়ন ছিলো।

তিশা: হ্যাঁ, এমনটাই হয়েছে। তবে তারপরও ওর মতোই বলবো, যদি এমন পরিচিত না হতাম তাহলে হয়তো সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় কোন বাঁধা ছাড়া নিজের মতো করে ঘুরে বেড়াতে পারতাম। এছাড়া অন্য কোন পার্থক্য আমার চোখে পড়ছে না। তবে এটাও খুব বেশি চোখে পড়ে না, বা এর জন্য কখনো যে মন খারাপ হয় তাও না। কারণ এতো এতো মানুষের যে ভালোবাসা আমরা পাচ্ছি, এই ভালোবাসাটুকু পাওয়ার সৌভাগ্য কয়জনের হয়? সবাই তো এই ভালোবাসা পায় না।

ফারুকী: দ্যাটস ট্রু। আমি কিন্তু এখানে যোগ করে দিচ্ছি, এই অংশে আমি ওর সঙ্গে একমত।

প্রভাত ফেরী: শিল্পীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখি তাদের সফলতা, তবে তাদের সফলতার পেছনে দীর্ঘ সাধনা আমরা দেখতে পাই না। এ ধরণের কোন স্মৃতির কথা আমাদের পাঠকদের জন্য বলবেন?

তিশা: অবশ্যই। এ ধরণের কত শত অভিজ্ঞতা আছে। বলতে গেলে সারা দিনেও হয়তো শেষ হবে না। তবে হ্যাঁ, এদিক থেকে আমি বলবো যে আমি খুব ভাগ্যবান ছিলাম। কারণ আমার বেইজটা ছিলো ভালো। আমার বাবা-মা, আমার আত্মীয়স্বজন তারা ছোটবেলাতেই আমার ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়েছেন। এ কারণে আমি পেশাগতভাবে অনেকটুকু এগিয়ে থাকার সুযোগ পেয়েছি। নতুন কুঁড়ির সময়ে আমাকে যে গ্রুমিং করা হয়েছে তার কথা বলতেই হয়। একটা শিশুর ভিত্তি আসলে তার পরিবারের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমার পরিবার সে সময় আমাকে সে সাপোর্ট দিয়েছে, তার কারণেই আমি আজকের একজন শিল্পী হয়ে উঠতে পেরেছি। মনের মতো কাজ করতে পারছি। আমার মা কিন্তু এখনো আমার নানা কাজ দেখে তার মতামত জানান। কেমন করলে আরো ভালো হতো এসব নিয়ে কথা বলেন।

 

প্রভাত ফেরী: আপনি একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী। একই সাথে গায়িকা, আপনার একটি ব্যান্ডও ছিলো। আবার আপনি একজন মডেলও। নিজের কোন পরিচয়টা আপনার নিজের কাছে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার?

তিশা: এটা খুবই ডিফিকাল্ট প্রশ্ন। আসলে কেউ যদি আমাকে বলে যে, আপনি একজন ভালো মানুষ। অথবা, আপনার জন্য দোয়া থাকলো। মানুষ হিসেবে ঐ পরিচয়টাই আসলে আমার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট। আমি চেষ্টা করি, কাজের ক্ষেত্রে সব পরিচয়কেই সমানভাবে প্রাধান্য দিতে। ভালো লাগা ও ভালোবাসার জায়গা তৈরি করতে। সবগুলো কাজেই আমি আনন্দ পাই। তাই কাজের ক্ষেত্রে সবগুলোই আমার কাছে ভালো লাগার। তবে পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিচয়গুলোও আমি উপভোগ করি। পছন্দ করি। কারো ছেলের বউ, কারো বউ, কারো মেয়ে, বা বোন হওয়া এ পরিচয়গুলোকেও আমি পছন্দ করি। পছন্দ করি বলেই কাজের বা ব্যক্তিগত, সব পরিচয়কেই আমি সম্মান করি।

প্রভাত ফেরী: বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের উপর কিছু সিনেমা হয়েছে। চাষী নজরুল ইসলাম কিংবা খান আতাউর রহমান থেকে হুমায়ুন আহমেদ, উনারা মুক্তিযুদ্ধের উপর কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তুলে ধরার জন্য সিনেমা বানিয়েছে। আজকের প্রজন্মের সামনে আপনি একজন পাইওনিয়ার। তাদের সামনে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার কোন চিন্তা কি আপনার রয়েছে?

ফারুকী: আমি মুক্তিযুদ্ধের উপর টেলিভিশনে কাজ করেছি। স্পার্টাকাস সেভেন্টি ওয়ান, এবং এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি। এ দুইটার বাইরে আসলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বলার আর কিছু এ মুহুর্তে আমার মাথায় নেই। আমার যা কিছু বলার তা তো আমি বলে ফেলেছি। হয়তো ভবিষ্যতে আরো কাজ করবো। দেখা যাক।

প্রভাত ফেরী: শিল্প নির্মাতা হিসেবে আপনার মনের ভেতর কি উদ্দেশ্য কাজ করে? নিজের আনন্দের জন্য? না কি সমাজ পরিবর্তনের জন্য?

ফারুকী: এর উত্তর দেয়া একটু কঠিন। সম্ভবত দু‘টির মিশ্রণ হবে। আমি মনে করি, আমার বিশ্বাস, একজন শিল্পী যখন একটা কাজ করে তখন তার কারণ হলো শিল্পী কোন একটা কথা বলতে চায়। এটা সে মনের ভেতরে অনুভব করে। সুতরাং একজন শিল্পীর প্রাথমিক উদ্দেশ্য থাকে নিজের চিত্তকে সন্তুষ্ট করা। আমি এই কথাটা বলতে চাই। এটা বলার মাঝেই সে একটা আনন্দ খুঁজে পায়। অন্যদিকে সবকিছুরই একটা সামাজিক প্রভাব থাকে, সুতরাং এরও একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব হয়তো আছে সমাজে, তাও অস্বীকার করা যায় না। তবে হ্যাঁ, শিল্প কি সমাজ বদলাতে পারে কি না তা নিয়েও বেশ প্রশ্ন আছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, শিল্প কিন্তু কোন মোটিভেশনাল বা সচেতনতা তৈরীর জন্য ফিল্মই না। এটা খুবই বিস্তারিত আলাপ।

প্রভাত ফেরী: বাংলা নাটক ও সিনেমায় আপনার নিজস্ব যে ধারা, বাক্যচয়ন ও কথা বলার স্টাইল, এর প্রভাব সমাজে কিভাবে পড়েছে বলে আপনি মনে করেন?

ফারুকী: প্রথমত এখানে কিছু বেসিক জিনিস বুঝতে হবে। ভাষা বিষয়ক এ বিতর্কটা আসলে ননসেনসিকাল। অনেকেই আবেগ থেকে কথা বলেছে এখানে, যুক্তি থেকে না। আপনি দেশে যান, সবাই তো এ ভাষাতেই কথা বলে। এটা আমি উদ্ভাবন করিনি। আমি এই ভাষার আবিস্কর্তা না। এটা সমাজেরই ভাষা। এবং সিনেমা নির্মাতা হিসেবে আমার কাজটা সিম্পল। মনে করেন আমি যদি একটা সিনেমা বানাই যেখানে একজন অস্ট্রেলিয়ান চরিত্র আছে, সে কখনোই আমেরিকান না শুধু বরং ইয়র্কশায়ারের একসেন্টে কথা বলবে না। সমাজে সততার প্রসার হওয়া উচিত। আমি মনে করি এটা স্বতস্ফুর্ত একটা বিষয়। আপনি ফেইসবুকে যান এবং দেখেন মানুষ কি ভাষায় লিখছে। সুতরাং আমি এ বিষয়টা নিয়ে আসলে খুব চিন্তিত না।

প্রভাত ফেরী: তিশা আপনি তো একসময় গান গাইতেন? এ নিয়ে কাজ করার কোন চিন্তাভাবনা কি আছে?

তিশা: অভিনয় এমন একটা কাজ যেখানে সব কিছু আছে। নাচ গান সবই। এর বাইরে যে আলাদা করে অন্য কিছু করা, এভাবে বেশি কাজে জড়িয়ে পড়তে চাইনি। তাছাড়া আমার বাবা আমাকে গান গাইতে উৎসাহ দিতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর গানটা গাওয়াটা আর ওভাবে ধারাবাহিক হয়নি।

ফারুকী: ও আবার করবে। গান গাওয়া উচিত ওর। যখন মন চাইবে তখন গাইবে।

প্রভাত ফেরী: শনিবার বিকেল বাংলাদেশে প্রদর্শনের ছাড়পত্র না পাওয়া প্রসঙ্গে কি ভাবছেন?

ফারুকী: দ্যাটস এ ট্রাজেডি। কিছুদিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তার সাথেও আমার কথা হয়েছে, ছবিটি সেন্সর বোর্ডে আটকে রাখা প্রসঙ্গে। আমি তাকে জানিয়েছি, সেন্সর বোর্ডে এটি আটকে থাকা নিয়ে আমি কোন প্রতিক্রিয়া দেখাইনি। কারণ আমি আশাবাদী। আমি চাই বিষয়টা নিয়ে আপনারা খোঁজখবর করেন। এই ছবি বাংলাদেশের জন্যই ভালো। দিস ফিল্ম ইজ নট গোয়িং টু জিওপার্ডাইজ বাংলাদেশ, এটাই রিয়েলিটি।

ঘটনাচক্রে যেদিন এই কথাবার্তা হলো সেদিন সকালবেলাতেই আন্তর্জাতিক একজন রিপোর্টার আমাদের ছবিটির একটি রিভিউ প্রকাশ করেছেন। সে রিভিউতে, আল্লাহর কি অশেষ রহমত, ওরা সে পয়েন্টেই কথা বলেছে যা আসলে আমাদের সবার জানা দরকার। ওরা সেখানে লিখেছে বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ড ছবিটা বন্ধ করে রেখেছে দুইটা কারণ দেখিয়ে। এটা না কি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতায় উস্কানি দেবে। এবার সেই ক্রিটিক তার নিজের রায় দিচ্ছেন, তিনি লিখছেন, অথচ ফিল্মটি দেখলে আপনি বুঝবেন যে এই সিনেমা দেখে আপনার কাছে দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কেবল বৃদ্ধিই পাবে। সুতরাং আমি আশাবাদী।

প্রভাত ফেরী: ভবিষ্যত নিয়ে আপনারা কি ভাবছেন?

ফারুকী: পৃথিবী এখন খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো আমাদের ভবিষ্যত, কাজের ক্ষেত্রে নিত্যনতুন প্রযুক্তি আসছে। কিন্তু এতো ব্যস্ততার মাঝে থাকি যে জীবনে, অনেক ইচ্ছাই পূরণ করা হয় না। অনেককে অনেক কিছু শেখাতে ইচ্ছা করে কিন্তু হয়ে উঠছে না। আবার কখনো কখনো মিলে যায়। যেমন, সিঙ্গাপুর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যখন গেলাম, সিঙ্গাপুরে একটা ইউনিভার্সিটি আছে নানিয়াং টেকনলজি ইউনিভার্সিটি তারা অনেকদিন ধরে বলছিলো ওদের ওখানে একটা ওয়ার্কশপ করানোর জন্য, কিন্তু সময় মিলছিলো না। পরে যখন ফেস্টিভ্যালে গেলাম তখন তারা খবর পেলো, এবং ওয়ার্কশপটা চালাতে পারলাম।

বাংলাদেশে একটা ভালো ফিল্ম স্কুল দরকার। ভালো কারিকুলাম, ভালো ল্যাবরেটরি সুবিধা, প্রোডাকশন স্টুডিও সহ সব সুবিধা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খুব ভালো শিক্ষক দরকার। একবার খুব ক্ষেপে উঠলাম একটা ভালো ফিল্ম স্কুল বানাবো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন শান্তিনিকেতন বানিয়েছিলেন, তেমনই বিশাল একটা জায়গা নিয়ে ভালো একটা স্কুল। যেখানে দেশ বিদেশ থেকে ফিল্মমেকাররা আসবে। কিন্তু এটা আসলে অনেক বড় একটা কাজ। কখনো হবে কি না জানি না। কিন্তু স্বপ্ন আছে আমার।

তিশা: আমাদের এটা একটা স্বপ্ন। আমরা এমনকি এই কাজটা করার জন্য একটা জায়গাও দেখেছিলাম। কিন্তু তারপর অন্য ফিল্মে কাজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, সেও তার সিনেমা বানানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো। আমাদের সময়টা এতো বেশি দ্রুত চলে যাচ্ছে তা বলার মতো না।

ফারুকী: বাংলাদেশে যদি একটা ভালো জায়গা থাকতো, আমি আপনাকে বলি হাজারো মেধাবী ছাত্রছাত্রী অপেক্ষা করছে এমন একটু সুযোগ পাওয়ার ও কাজ শেখার। আর্থিক বিষয়টাও একটা বড় ব্যাপার। একটা ফিল্ম স্কুল হবে আমাদের, যেখানে ইয়াং স্টুডেন্টরা দর্শন নিয়ে চিন্তা করবে। আমাদের নিজস্ব ঘরানায় শিল্পচর্চাকে বিকশিত করবে। টেলিভিশনে আমরা সফল হয়েছি, কিন্তু সিনেমাতে আমরা এখনো পারিনাই। যাইহোক, সে অনেক কথা।

প্রভাত ফেরী: আমাদের সাথে সাক্ষাতকারের সময় দেয়ার জন্য আপনাদেরকে প্রতি প্রভাত ফেরীর পাঠকদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ রইলো।

তিশা: প্রভাত ফেরী এবং প্রভাত ফেরীর পাঠকদের জন্যও আমাদের শুভেচ্ছা।

ফারুকী: অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশী কমিউনিটির আতিথেয়তায় আমি অভিভূত হয়েছি। আশা করি এখানে বাংলাদেশী যারা আছেন তারা সমাজে, কর্মক্ষেত্রে এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সবখানে উত্তরোত্তর ভালো করবেন। আপনাদের পত্রিকা দেখেও আমার ভালো লেগেছে। আপনাদের সবার প্রতি ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা থাকলো।

 


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top