সিডনী রবিবার, ৯ই আগস্ট ২০২০, ২৫শে শ্রাবণ ১৪২৭


করোনা ভাইরাস এবং মুখ ও দাঁতের যত্ন : অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী


প্রকাশিত:
২০ জুলাই ২০২০ ১৮:২০

আপডেট:
২১ জুলাই ২০২০ ১৭:৪৮

ছবিঃ ডঃ অরূপ রতন চৌধুরী

 

করোনা ভাইরাস রোগে আক্রান্ত হওয়ার থেকে বাঁচতে হলে আমাদের মুখমন্ডলের যত্ন নেয়া আবশ্যক মুখমন্ডলের যত্ন বলতে আমরা মুখের বাহির ও ভিতরের যত্নই বুঝি। মুখের বাহিরের যত্ন নিতে আমাদের প্রথমেই চোখ, নাক, মুখ ইত্যাদির যত্ন বুঝায়। এর জন্য প্রয়োজন একটি বিজ্ঞানসম্মত মাস্ক ব্যবহার, বাজারে যে ধরনের বৈজ্ঞানিক মাস্ক রয়েছে সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। অথবা ঘরে বসেই তিন পরতের কাপড় দিয়ে তৈরী করা যাবে। যাতে করে বাহির থেকে কেউ হাঁচি, কাশি দিলে অথবা বাতাসের ধূলা বা জীবাণু নাকে, মুখে বা চোখে এসে ঢুকতে না পারে। এই মাস্ক ব্যবহার করার সময় প্রথমে রাবার ব্যান্ড অথবা ফিতাটি ধরে মুখের উপর দিয়ে কানের দুইপাশে লাগাতে হবে। কোনোভাবেই মাস্কের উপর হাত দেয়া যাবে না। এবং খোলার সময়ও ঠিক একইভাবে খুলতে হবে। মাস্কটি ওয়ানটাইম হলে একবার ব্যবহারের পর খুলে ফেলে দিতে হবে। এবং যেগুলো ওয়াশঅ্যাবল সেগুলো ধুয়ে আবার ব্যবহার করা যাবে। তবে কোনো সময়ই হাতের আঙ্গুল দিয়ে মুখ স্পর্শ করা যাবে না। যদি রোগীকে দেখার জন্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরীক্ষা বা চিকিৎসা করতে হয়, তবে অবশ্যই পিপিই পরে নিতে হবে।
মুখমন্ডলের ভিতরের ও বাহিরের স্বাস্থ্য রক্ষায় করনীয়:
১. প্রতিদিন দুই বেলা দাঁত ব্রাশ অর্থাৎ সকালে নাস্তার পর ও রাতে আহারের পর।
২. প্রতিদিন অন্ততঃ দুইবার ১ গ্লাস অল্প গরম লবন পানিতে গড়গড়া করা, অথবা কোনো অ্যান্টিসেপটিক মাউথওয়াশ দিয়ে(যেমন ক্লোরহেক্সিডিন/পভডিোন-আয়োডনি১% মাউথওয়াশর্গাগলে) দিয়ে মুখ কুলকুচি করা(অন্ততঃ দুইবেলা) তাহলে মুখের ভিতরের জীবাণুমুক্ত রাখা সম্ভব হবে।
৩. প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে জীবছুলা অথবা টাঙ্গ ক্লিনার এর মাধ্যমে জীহ্বার উপরিভাগে জমে থাকা খাদ্যকণা সমূহ পরিষ্কার করা, তাহলে মুখের ভিতরের প্রদাহ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। কারন জীহ্বার উপরেই বেশিরভাগ খাদ্যকনা লোমকুপের ভিতরে লুকিয়ে থাকে, যা খালি চোখে দেখা যায় না।
৪. দাঁত ব্রাশের পূর্বে ডেন্টাল ফ্লস (একজাতীয় পিচ্ছিল সূতা) এর সাহায্যে দুই দাঁতের মধ্যবর্তী স্থান থেকে খাদ্যকণা পরিষ্কার করা ভালো, তাহলে মুখের ভিতরের মাড়ির প্রদাহ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। কারন দুই দাঁতের মধ্যবর্তী স্থান এ বেশিরভাগ খাদ্যকনা জমে থাকে।
৫. মুখের রোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্য বর্তমানে প্রতিদিন গ্রহণ করা জরুরী , যেমন-
দাঁত ও মাড়ির বিভিন্ন রোগ প্রেিরাধে প্রতিদিন কিছু ভিটামিন সি ও এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফলমূল খাওয়া প্রয়োজন, কারন করোনা ভাইরাস এর আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য দেহের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানো প্রয়োজন, তাই যে সমস্ত ফলমূল ও শাকসবজিতে পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে সেগুলো হচ্ছে : - এন্টিঅক্সিডেন্ট জাতীয় ভিটামিন যেমন, বিটা ক্যারোটিন: রঙিন ফলমূল ও শাকসবজিতে এই উপাদান প্রচুর পরিমাণে আছে। তাছাড়া, গাজর, পালংশাক, লালশাক, ব্রকলি, টমেটো, পেঁপে, আম, ডাল ইত্যাদি। ভিটামিন সি: আমলকী, লেবু, কমলা সবুজ মরিচ, করলা ইত্যাদি। ভিটামিন এ: গাজর, পালংশাক, মিষ্টি আলু, মিষ্টিকুমড়া, জাম্বুরা, ডিম, কলিজা, দুধ জাতীয় খাবার।
ভিটামিন ই: কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, পেস্তাবাদাম, শিমের বিচি বা বিচি জাতীয় খাবার, ভেজিটেবল অয়েল, জলপাইয়ের আচার, সবুজ শাকসবজি ইত্যাদি। আরো কিছু খাবার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ: অ্যান্টি অক্সিডেন্টের সবচেয়ে ভালো উৎস উদ্ভিজ্জ খাবার, যেমন -বেগুনি, কমলা হলুদ রঙের শাকসবজি এবং ফল। শরীরের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে বিভিন্ন শাকসবজি :- যেমন, সবজি: করলা, লাল পাতা কপি, বিট, ব্রকলি, গাজর, টমেটো, মিষ্ট আলু, ক্যাপসিক্যম, ফুলকপি। এবং যে কোনো ধরনের ও রঙের শাক। ফল এর মধ্যে : কমলালেবু, পেঁপে, আঙ্গুর,আম, কিউই,আনার, তরমুজ , জলপাই, আনারস ইত্যাদি। এ সময়ে টক দই খাওয়া ভালো যা শ্বাসযন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্র সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধ করে। তাছাড়াও প্রতিদিন গ্রিণ টি উপকারী , কারন লাল চায়ে এল-থেনিন এবং ইজিসিজি নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা আমাদের শরীরে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনেক শক্তি তৈরী করে এবং শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। ভিটামিন বি ও জিংকু জাতীয় খাবার এর মধ্যে আছে বিচিজাতীয়, বাদাম, সামুদ্রিক খাবার, দুধ ইত্যাদি, এগুলো শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরীর কোষ বৃদ্ধি করে। তাই এই সময়ে এ ধরনের খাবার বেশি খাওয়া প্রয়োজন। সেইসাথে ডিম, মুরগির মাংস ইত্যাদি আমিষ জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে হবে । অতিরিক্ত তাপে বা দীর্ঘ সময় রান্না করলে খাবারের এই উপাদানটি অনেকখানি কমে যাবে , অতএব, খাবারে অ্যান্ট অক্সিডেন্ট বেশি পরিমাণ পেতে হলে আমাদের কোনো খাবারই অতিরিক্ত জ¦াল দেয়া যাবে না। এছাড়া সালাদ করে খাওয়াই ভালো যেমন শসা, গাজর, টমেটো,বিট, ব্রকলি ইত্যাদি।
৬ ) সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, সাদাপাতা, ইত্যাদি তামাক জাতীয় খাবার :
ধূমপান করোনা ভাইরাস ঝুঁকি মারাত্মক বাড়ায়- বিশেষেজ্ঞরা হুঁশিয়ার দিচ্ছিন ধূমপায়ীদের মারাত্মক সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেক। তাদের ফুসফুসের দূর্বল ক্রিয়াকলাপ এক্ষেত্রে দায়ী। বিশেষজ্ঞরা ধূমপায়ীদের কোভিড-১৯ এর ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য অবিলম্বে এ অভ্যাসটি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।ধূমপানের সংস্পর্শ করোনা ভাইরাস এর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট অন্যান্য ক্ষতির পরিমানও বাড়তে পারে। যারা করোনা ভাইরাসের এই সময়ে পান, সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, সাদাপাতা, ইত্যাদি তামাক জাতীয় খাবার গ্রহন করবেন বা ধূমপান করবেন তাদের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যেমন বেশি তেমনি রোগের জটিলটা ও ভোগান্তি অন্যান্য অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেক বেশি , তাই ধূমপান বন্ধ করা যেমন জরুরী তেমনি জর্দা, গুল, সাদাপাতা ইত্যাদি খাওয়া চলবে না।
৭)সেইসাথে বাদ দিতে হবে ফাস্টফুড কোল্ড ড্রিংকস জাতীয় খাবারও। এবং রাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমাতে হবে।
৮)চিকিৎসা :-
আমেরিকান ডেন্টাল এসাসিয়েশন (এডিএ), ব্রিটিশ ডেন্টাল এসাসিয়েশন (বিডিএ) ও সিডিসি(সেন্টার ফোর ডিজিজ কন্ট্রোল ও প্রিভেনশন) করোনা ভাইরাস এর সংক্রমন প্রতিরোধে ডেন্টাল সার্জারির কয়েকটি কাজ বর্তমানে বন্ধ রাখতে বলেছে যেমন ডেন্টাল স্কেলি, ডেন্টাল ফিলিং, রুট ক্যানেল চিকিৎসা, গ্রাইন্ডিং, পলিশিং ইত্যাদি। কারন এই সমস্ত কাজের সময় এয়ার স্প্রে থেকে মুখের জীবাণু বাহিরে এসে ব্যক্তি অথবা যে কোনো যন্ত্র বা বস্তুতে লেগে থাকতে পারে এবং সেটা পরবর্তীতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রমিত করতে পারে। অতএব এই সমস্ত কাজ করানা ভাইরাস এর ব্যাপ্তিকাল পর্যন্ত বন্ধ রাখাই ভালো। তবে, ইমারজেন্সি বা তীব্র কোনো দাঁতের ব্যথা বা ফোলা থাকলে জরুরী ব্যবস্থাপত্র দিয়ে আপাততঃ প্রদাহ ও ব্যথা উপশম রাখা প্রয়োজন। এই জন্য যে কোনো ব্যক্তি তার সমস্যার কথা টেলিফোনে ,ম্যাসেঞ্জারে / হোয়াটসঅ্যাপ , ইমেইলে অথবা ভাইভারে জানালে অথবা ক্লিনিকে/ হাসপাতালে এসে দেখালে সেই অনুপাতে ব্যবস্থাপত্র দেয়া আবশ্যক। যাতে করে ব্যথা বা প্রদাহ সাময়িকভাবে উপশম হয়। এবং পরবর্তী সময়ে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় ফলোআপ চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top