সিডনী শনিবার, ২৪শে জুলাই ২০২১, ৯ই শ্রাবণ ১৪২৮


চা সমাচার : কাজী খাদিজা আক্তার 


প্রকাশিত:
১১ জুলাই ২০২১ ২৩:০৪

আপডেট:
২৪ জুলাই ২০২১ ২৩:১১

 

"এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই" সুমন চট্টোপাধ্যায় এর সেই বিখ্যাত গান আর তাঁর থেকে ধার করে আমি বলি-" রাত ভোর হলে আমি তোমাকে (চা) চাই।" সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ গরম চা না হলে যেন আড়ষ্টতা  কাটানো মুশকিল, শীতের সকালেতো আরও বেশি অনিবার্য হয়ে পরে। আজকাল চা পান করে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। সেজন্য প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন এদেশের মানুষ সকালে উঠে করে দুটি কাজ, এক চা পান, আর এক সংবাদপত্র পাঠ। তারঁ লিখা থেকেই জানতে পারি "একজন বিলাতি কবি চায়ের সম্পর্কে বলেছেন যে, The cup that cheers but not inebriates. অর্থাৎ চা পান করলে নেশা হয় না অথচ ফূর্তি হয়। চা পান করলে নেশা না হোক, চা পানের নেশা হয়।তাই বলি, চা পান কারো কারো কাছে নেশা আবার চা বিক্রি করা কারোর কারোর কাছে পেশা।

ইংরেজিতে চা এর প্রতিশব্দ হলো টি।গ্রীক দেবী থিয়ার নাম অনুসারে এর নাম হয় টি। চীনে টি এর উচ্চারণ ছিল চি, পরে হয়ে যায় চা। চা এর বৈঞ্জানিক নাম ক্যামেলিয়া সিনেনসিস।চা পাতা হলো চা গাছের পাতা, পর্ব ও মুকুলের একটি কৃষিজাত পণ্য। চায়ের যেমন রয়েছে বিভিন্ন রকম তেমনি রয়েছে নানান স্বাদ। প্রস্তুত প্রণালী অনুযায়ী চাকে ভাগ করা যায় পাঁচ ভাগে। কালো চা, সবুজ চা, ইষ্টক চা, উলং চা এবং প্যারাগুয়ে চা। আমরা বাঙ্গালি, সকল চায়ের স্বাদ আমাদের নেয়া হয়নি। আমাদের দেশে কালো চা-ই বেশি গ্রহণযোগ্য। এই চা সাধারণত আমরা লিকার করে অথবা দুধ চিনি  মিশিয়ে পান করে থাকি। কালো চা স্ট্রোক এর ঝুঁকি কমায়। উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে।লিকার চা ওজন কমায়।

ইদানীং সবুজ চায়ে রুচী হয়েছে অনেকের।এই চায়ে উচ্চহারে ক্যাফেইন থাকে যা আপনার স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি করে। সবুজ চায়ের আ্যন্টি অক্সিডেন্ট ত্বক ও খাদ্যনালীর ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক, কোলেস্টেরল এর মাত্রাও কমিয়ে আনে।

চায়ের প্রস্তুত প্রণালী বিভিন্ন। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে দেখেছিলাম কাঁচা মরিচের চা। দু একবার বানানোর চেষ্টাও করেছি। খেয়েছি, গলা জ্বলে যায়! তবে এই চায়ের চাহিদাও কিন্তু আছে। লেবু চা পছন্দ অনেকের। আদা, লবঙ্গের চা ঠাণ্ডায় বেশ কাজ দেয়। কতো রকম চা! তাইতো বলা হয় বারো রকম মানুষের তেরো রকম চা!

চায় এর এত চাহিদা। তাই চা এর ইতিহাসটা একটু জেনে নেই। খ্রিষ্টপূর্ব  ২৭৩৭ সালে চীনা শেন নাং তাঁর ভৃত্য পরিবেষ্টিত হয়ে জঙ্গলে গেছেন আনন্দ ভ্রমণে। ভৃত্যরা সম্রাটের জন্য খাদ্য প্রস্তুতে ব্যস্ত। হঠাৎ সবার অলক্ষ্যে এক নাম না জানা পাতা এসে পরলো ফুটন্ত পানিতে। সম্রাটকে যখন সেই পানীয় পরিবেশন করা হলো, সম্রাট তার স্বাদ পেয়ে খুবই তৃপ্ত। আদেশ করলেন অধিকতর তদন্ত করে এই পাতার নাম এবং রহস্য বের করার জন্য। জন্ম হলো এক নতুন পানীয়র। শাং শাসনামলে চা পাতার রস ঔষধি পানীয় হিসেবে সেবন করা হতো। ১৬১০ সালে ইউরোপে চায়ের প্রবেশ ঘটে পর্তুগীজদের হাত ধরে। ১৭০০ সালের দিকে ব্রিটেনে চা জনপ্রিয় হয়। ইংরেজদের হাত ধরে চা ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে। তারা ভারতের আসাম রাজ্যে চায়ের চাষ শুরু করে। প্রথমে এংলো ইণ্ডিয়ানরাই চা ব্যবসা শুরু করে পরে ভারত স্বাধীন হলে চা শিল্প দেশীয়দের হাতে বিকশিত হয়।

চায়ের ইতিহাস দীর্ঘ। চায়ের জনপ্রিয়তা অপরিসীম। চা নিয়ে তাই রচিত হয়েছে কতো গল্প, গান, কবিতা, নাটক। চা নিয়ে আয়ুব বাচ্চু গেয়েছেন-

উস্কখুস্ক ঘন ভেজা কুয়াশা
কবিতার বই খুলে, এক কাপ চা

বন্ধুদের সাথে আড্ডা, সকালে মায়ের হাতের চা, প্রিয় জনের সাথে গল্প, অতিথি আপ্যায়ন, রাত জেগে পড়া, শীতের জমে যাওয়া সকাল এসবের সাথে এক কাপ চা না হলে নতুন সময় যেন চাঙ্গা হয়ে উঠে না, চনমনে মন থেমে যায়, চুপসে যায় জীবন। সবশেষে কবির কবিতা-

"শ্রমিকের নাকের ঘাম,
প্রেমিকের ঠোঁটের কাম-
লেগে আছে এই চায়ের কাপে।
শ্রমিকের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ,
প্রেমিকের ওষ্ঠীভূত লোভ-
গলে আছে এই চায়ের তাপে।" 

-কোনো এক চা খোর কবি।

 

কাজী খাদিজা আক্তার 
প্রভাষক (ইংরেজি) 
সরাইল সরকারি কলেজ

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top