সিডনী বুধবার, ২১শে অক্টোবর ২০২০, ৬ই কার্তিক ১৪২৭


প্রবাসীঃ এক সুখ দুঃখের কাহিনীকার : পারভীন আকতার


প্রকাশিত:
১০ অক্টোবর ২০২০ ১৫:৫৬

আপডেট:
২১ অক্টোবর ২০২০ ০৭:৩৭


প্রবাসী! নিজের পরিবার, সমাজ আর দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও সৌখিনকতায় গড়ে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছে প্রবাসী নামক ছাতক পাখি। হন্যে হয়ে ঘুরছে কারো ঘর, অফিস, বহুতল ভবনের ছাদে রঙের ডিব্বা নিয়ে। কঠিন লোহার ইমারত গড়ছে প্রিয় মা বাবা, স্ত্রী সন্তানদের সুখ শান্তি, পড়াশোনা নিশ্চিত করতে। সারাদিন কর্মব্যস্ততা। কঠোর পরিশ্রম আবার বছরে বছরে আকামা, ভিসা লাগানোতো আছেই। খেয়ে না খেয়ে, দশ -বারোজন গাদাগাদি করে একটা রুমে উপর নীচ সিঁড়ি লোহার বিছানায় শুধুই রাত্রিযাপন। হয়তো অনেক সময় তাও কপালে জুটে না। একটা ওয়াসরুম -কেনা ড্রামভর্তি পানি, সিলিন্ডার গ্যাস। শেষ হলেই দশজনে ভাগাভাগি করে আনে। কী চরম মানবিক বিপর্যয় ভাবা যায়!আর এভাবেই প্রবাসীরা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছে। তাঁরা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। অন্তর থেকে তাঁদের জন্য এমনিই দোয়া আসে।

আবার কিছু প্রবাসী আছে, যারা খারাপ কাজে লিপ্ত। তাদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। বিদেশে ডান্স ক্লাব খুলে দেশের অসহায় ছেলে মেয়েদের নিয়ে বাধ্য করছে যৌনতায় লিপ্ত হতে। এসব কি কেউ দেখার নেই? এসবের সমাধান কী? মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু চক্রের জন্য আজ দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। চাকরী দেয়ার লোভ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব করছে সব "ম্যানেজ প্যাকেজ" প্রথা চালু করে। টাকা দিয়ে আইনের চোখ বন্ধ করা যায় কিন্তু স্রষ্টার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ানো যায় না। বিচার প্রকৃতিই একদিন করবে।

হাজার হাজার প্রবাসী ভাই বোনরা কী যে অমানবিক জীবন যাপন বিদেশের বুকে করছে তা প্রত্যক্ষদর্শীরাই কেবল জানেন, বুঝেন। তবুও তাঁদের জন্য কারো মায়া হয় না। ফোনে দেখে বাবার মৃত্যুর ক্ষণ। বোনের বিয়ে দেখে ভিডিও তে বা কলে। সন্তান জন্ম নেয়ার মুহূর্ত কাটে উৎকন্ঠায় তখনও কাজের মাঝে লোহা পেটানো চলছে। বুকে আশা সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবে। বাবা হবে আজ বাবা। বুকে হাহাকার, সন্তানকে কোলে না নিতে পারার আর্তনাদ! বুক ব্যথায় টনটন করে। মোবাইলে শিশুর পবিত্র মুখ দেখে সব দুঃখ উবে যায়। তাকে মানুষের মতো মানুষ করার দৃঢ় প্রত্যয়ে ফের শাবল, মাথায় কেম্পানির হ্যালমেট আর পরনে ইউনিফর্ম পড়ে উত্তপ্ত মরুভূমিতে খেঁজুর গাছে উঠা বা দালানের বিনির্মাণে নিজেকে উৎসর্গ করা।

বছরের পর বছর স্বদেশের মুখ দেখে না অনেক প্রবাসী। এমন কি সন্তানকেও জন্মের পর দেখেনি হাজার জন। আট দশ বছর হলে তবেই স্বদেশ দেখছে। কতই না কষ্ট তাদের! তবুও ধৈর্য ধরে সবার সুখের তরে নিজের সুখ মরুভূমির তপ্ত বালুতে বা শীতের কনকন কাঁপনীর মাঝে কবর দিয়ে মুখে হাসি ধরে রাখছে তারা। অথচ তাঁদের আমরা কতই না অবহেলা করি! মূর্খ বলি, গালাগাল করি। এক মাস টাকা পাঠাতে না পারলে চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করি! তারা কী ঠিকমতো চলতে, ফিরতে বা খেতে পারছে কি না কারো যেন মাথা ব্যথা নেই। শুধু দাও, দাও। আর কোন শব্দ শান্তির বাণী তাদের কানে পৌঁছে না। এজন্যই প্রবাসে এখন স্ট্রোকের মাত্রা বেড়ে গেছে।টেনশন হরহামেশাই পরিবার থেকে বিছিন্ন করে দিচ্ছে তাদের। অশান্তি লাগাতার চলতে থাকলে একসময় আত্মহত্যা করছে এমনও ছবি স্যোসাল মিডিয়ার পর্দায় ভেসে উঠে। কী অমানবিক আমরা!লজ্জা হয় বৈকি।


এখন চাকরী হারাচ্ছে হাজারো প্রবাসী।উছিলা করোনা। এটা সম্পূর্ণ অবিচার। বাঙালির কথায় ধরা যাক। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো প্রচুর সম্পদের মালিক। তেলের খনিতে বসবাস। তারা মরুভূমিতে চাষ করতে কখনো পেরেছে? বাঙালি তাদের চাষাবাদ শিখিয়েছে। যত কষ্টকর কাজ ওরা করে তাদের সুখ শান্তি নিশ্চিত করেছে। অথচ আজ যখন বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থা চলছে তারা চোখ উল্টাতে এক পলক সময় নেয়নি। এজন্যই অসহায় হয়ে পড়ছে, বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে সামাজিক, পারিবারিক অবকাঠামো। কী করবে মানুষ? প্রবাসী হওয়া কি তাদের অপরাধ? তারা কি সরকারকে মাহা লেবা বা ট্যাক্স দিয়ে আসেনি? কখনো কি তারা মাফ পেয়েছে? বেতনের অর্ধেক টাকায় চলে যায় সরকারের পূজন করে। তবে কেন আজ বের করে দেয়া হবে বিনা অপরাধে? মহামারিতো বিশ্ব সংকট। কারো হাত তো নেই এতে। যদিও আমরা সবাই চীনকে করোনার জন্য দোষী করছি। হতেও পারে। উপরে একজনতো আছেন, তিনিই বিচার করবেন।

আশা করি প্রবাসীরা সামনের পৃথিবীতে এমন নিয়মের আওতায় আসবেন, সবাই যে যার পরিবার নিয়ে থাকার স্থায়ী সুযোগ সরকারই করে দেবে। পরিবার অনেক বড় প্রশান্তির আশ্রয়স্থল। মায়া মমতার ভিতর দিনযাপন করতে পারলে অপরাধপ্রবণতার হার অনেক কমে যাবে। দীর্ঘজীবন একা প্রবাসে কাটাতে হবে না। হয়তো এমন একদিন আসবে মানুষই পাসপোর্ট, ভিসা হবে। কাগজের কোন কিছুই দরকার হবে না বিশ্ব ঘুরতে, চলতে আর থাকতে। আর দরকারই বা হবে কেন, পুরো পৃথিবীটাতো মানুষের। আশা করি মনুষ্য সৃষ্ট সব জটিলতা কাটিয়ে প্রবাসীরা ভালো, সুখের সুন্দর  মানবিক জীবনযাপন করবে এই কামনা সতত।

 

পারভীন আকতার
কবি, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top