সিডনী শুক্রবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭


বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকদের প্রত্যাবর্তন ও অনিশ্চয়তার দোলাচল : অনজন কুমার রায়


প্রকাশিত:
৯ নভেম্বর ২০২০ ১৪:৫১

আপডেট:
৯ নভেম্বর ২০২০ ১৫:২২

 

সমৃদ্ধ ধারার অর্থনীতি বজায় রাখতে আমাদের দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ অত্যাবশ্যকীয়। রেমিট্যান্স প্রবাহের এ ধারা অব্যাহত রাখতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু; মহামারীতে কাজ হারিয়ে অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে এসেছে। তারা না পারছে নিজ দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে না পারছে পুনরায় বিদেশে পাড়ি জমাতে। তাই যারা নিজ বাসভূমে ফিরে এসেছে তারা সম্পূর্ণ দোদুল্যমান অবস্থায় দিন যাপন করছে।

অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং উন্নত জীবনমানে প্রত্যাশী হয়ে অনেকেই বিদেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং কষ্ট সহ্য করেও প্রবাসীরা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার প্রত্যাশায় ভবিষ্যতের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। বলতে হয়, প্রচুর পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্থ ঊপার্জন করে। ঊপার্জিত পরিশ্রমের অর্থ কাছের মানুষকে দিতে পারলে সুখের অনুভূতিটুকু আনন্দে উদ্বেলিত করে।

বর্তমান বছরের প্রারম্ভেই মহামারী প্রাদুর্ভাবের দরুণ যে সকল দেশে সংক্রমণের মাত্রা ছড়িয়ে পড়ে সে সকল দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। ফলে, প্রবাসীদের কঠিন সময়ের আবর্তনে সম্মুখীন হতে হয়। তাই তারা অনেকটা বাধ্য হয়ে নিজ দেশে ফিরে আসে। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে বিভিন্ন দেশে মার্চ মাসে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলেও এপ্রিল মাস থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় নিজ দেশে ফেরত আসতে শুরু করে। বিশেষ করে ইতালী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, কাতার, মালয়েশিয়া থেকেই উল্লেখযোগ্য হারে দেশে ফিরে এসেছে। তবে, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রবাসী ফেরত এসেছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যমতে, করোনাকালীন সময়ে এ দেশে প্রায় ১ লক্ষ ৮১ হাজার ৪৩০ জন কর্মী ফেরত এসেছেন। এর মধ্যে মহামারী প্রকোপের জন্য কাজ বন্ধ থাকায় ৯০ হাজার ৫০৮ জন কর্মী ফেরত এসেছে। কারো কারো ইকামার(কাজের বৈধ অনুমতিপত্র) মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায়, কেউবা কাজ হারিয়ে বাধ্য হয়ে দেশে ফেরত এসেছে। ইতোমধ্যে কারো কারো ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। এসকল প্রবাসীরা পুনরায় বিদেশে যেতে পারবে কিনা সংশয় রয়েছে। কিংবা যেতে পারলেও কতদিন অপেক্ষমান থাকতে হবে সেই সংশয়াবর্তের দোলাচলে সময় পার করছে। আবার অল্প কয়েকদিনের মাঝে দেশে কাজ জুটাবে নাকি বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নেবে, দোদুল্যমান এই পরিস্থিতি তাদের নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।

অনেকেই অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত থেকে শেষ সম্বলটুকু হিসেবে জায়গা-জমি বিক্রি করে কিংবা টাকা ধার করে বিদেশ গমণের প্রস্তুতি নেয়। তাই এ  সকল শ্রমিকদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে ঋণ পরিশোধ করা। এমনও অনেকেই অছে যারা সদ্য বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। তাদের মাঝেও অনেকেই প্রত্যাগত শ্রমিক হিসেবে দেশে অবস্থান করছে। তাই তাদের জন্য এ প্রত্যাগমণ অতি কষ্টেরই বটে। যারা চলে এসেছে তাদের জন্য নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা কষ্ট সাপেক্ষ। অন্যদিকে বেকার সমস্যার এ সময়ে বাজারে শ্রমশক্তি উদ্ধৃত। তার উপর করোনা কালীন সময়ে ব্যবসা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবের দরুণ বেকারত্ব আরও বেড়ে যায়। ফলে, দেশে কাজ পাওয়ার চেষ্টা করলেও কোন কাজ জোটানো কষ্ট সাপেক্ষ। যদিও জোটে তবে দর কষাকষির তেমন সুযোগ থাকছে না। অপেক্ষাকৃত কম মজুরীতেও অনেক সময় কাজ পাচ্ছে না। ফলে তারা কর্মহীন থেকে যাচ্ছে এবং নানা সঙ্কটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই তারা পুনরায় বিদেশ যাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। তাতে মানব পাচারের ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, শ্রমশক্তির জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে প্রতিবছর প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ গমণ করে। এ বছর জানুয়ারী থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত যেতে পেরেছে মাত্র ১ লক্ষ ৮০ হাজার জন। ফলে, তুলনামুলকভাবে কম সংখ্যক শ্রমিক বিদেশে গমণ তার উপর প্রবাসীদের দেশে প্রত্যাবর্তন। সবকিছু মিলিয়ে প্রত্যাগত শ্রমিকদের খারাপ সময় অতিবাহিত করতে হচ্ছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি)- এক তথ্যানুসারে, বাংলাদেশ থেকে যতসংখ্যক লোক বিদেশে গমণ করে তাদের মাঝে চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা পেশাদার লোকের সংখ্যা মাত্র দুই শতাংশ। তাদের বেতন পরিশোধের ধরণ শ্রমিকদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাস শেষে তাদের বেতন পরিশোধ করা হয়। শ্রমিকদের মাঝে বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিক, পরিচ্ছন্ন কর্মী, কোন প্রতিষ্ঠানে চুক্তি ভিত্তিক কর্মী, রেস্টুরেন্ট কর্মী, ড্রাইভার এ সকল মুল ধারার কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত শ্রমিকদের দিন ভিত্তিতে কাজের বিনিময়ে টাকা প্রদান করা হয়। ফলে, তাদের চাকরি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনিশ্চিয়তার মাঝে আটকে আছে। তাই দেশ ফেরত এ সকল প্রবাসীরা বিদেশে যেতে না পারলে আমাদের দেশের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দরিদ্রতা হ্রাসে ভূমিকা রাখে এবং জিডিপির স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। বিশ্বব্যাংকের এক তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অভিবাসী প্রেরণকারী জেলাগুলোতে দরিদ্রতার হার হ্রাস পেয়েছে। কোন একটি জেলার ০.১% লোক আন্তর্জাতিকভাবে অভিবাসনের জন্য গমণ করলে সেই জেলার দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১.৭% হ্রাস পায়।

আবার প্রবাসীরা এ সঙ্কটকালীন মুহূর্তে দেশে ফিরে আসায় এক ধরণের বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এ বিপুল সংখ্যক লোকদের কাজের পরিবেশ তৈরি করে দেয়া অসম্ভবই বটে। তবে, ফেরত আসা অভিবাসীরা যদি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতাভুক্ত না হয় এবং বিদেশে এসব অভিবাসীদের পুনরায় পাঠানো না যায় তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর অতি নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নেও অভিবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। অভিবাসীদের উপর নির্ভর করে যাদের পরিবার স্বচ্ছলতার মুখ দেখে করোনা পরিস্থতির জন্য অনেকটা ম্লান হয়ে আসছে। দেশে আসার ফলে তাদের জীবনযাত্রার নিম্নমানের ধারা, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য কিংবা মানসিক চাপ সহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া তাদের মাঝে বিরাজ করছে। পাশাপাশি আর্থিক সঙ্কট তাদেরকে তাড়া করছে। তাই বর্তমান সময়ে অর্থ ঊপার্জনসহ জীবিকা নির্বাহ করা তাদের জন্য হুমকির সম্মুখীন বলা যেতে পারে। এ পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যারা দেশে ফিরেছে তাদের আর্থিক এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা। সমস্যাগুলি সমাধানকল্পে সমন্বিত দক্ষিণ এশিয়ার প্লাটফরম হিসেবে কলম্বো প্রক্রিয়া (এশিয়ান শ্রমিক প্রেরণকারী দেশগুলির একটি ভিত্তি) এবং আবুধাবি ডায়ালগ (শ্রমিক গ্রহণকারী দেশগুলির ভিত্তি) সমগ্র দক্ষিণ থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের বিরূপ প্রভাবের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামগ্রীক ব্যবস্থা প্রস্তাবের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো এবং করোনাকালীন সময়ে তাদের অসুবিধা কাটিয়ে উঠার জন্য শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

আশার কথা হলো, এসকল শ্রমিকদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার ৭০০ কোটি টাকার তহবিল তৈরি করেছে। ইতোমধ্য ২০০ কোটি টাকা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে বরাদ্দ দেয়া হয়। এ তহবিলে আরো ৫০০ কোটি টাকা যুক্ত হবে। প্রত্যাগত এসকল শ্রমিকরা বা তাদের পরিবারের সদস্যরা এক লক্ষ টাকা থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ৪ শতাংশ হারে সরল সুদে ঋণ নিতে পারবে।

প্রত্যাগত শ্রমিকরা যেসকল দেশ থেকে ফেরত এসেছে সেসকল দেশের পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে পারলে প্রবাসীদের অবস্থানটুকু আরও সুদৃঢ় হবে। যদিও নতুন শ্রমবাজার তৈরি করা অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ। যেহেতু করোনার কারণে কর্মক্ষেত্রে কাজের ধরণও পাল্টে যাচ্ছে, তাই সেভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বর্তমান সময়ে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। কারণ, নতুন শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিকের কোন বিকল্প নেই।

 

অনজন কুমার রায়
ব্যাংক কর্মকর্তা ও লেখক, বাংলাদেশ

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top