সিডনী শনিবার, ২৪শে জুলাই ২০২১, ৯ই শ্রাবণ ১৪২৮


পারিবারিক কলহ শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে : অরুণ বর্মন


প্রকাশিত:
৩০ জুন ২০২১ ১৩:৪৫

আপডেট:
২৪ জুলাই ২০২১ ২২:২০

ছবিঃ অরুণ বর্মন

 

শিশুর জগত গড়ে ওঠে তার বাবা-মাকে কেন্দ্র করেই। বাবা মায়ের আচার আচরণ শিশু রপ্ত করে অনায়াসে। শিশু অনুকরণ করে বাবা মা বা পরিবারের সদস্যদের চালচলন।

শিশুদের মন যেমন সহজ সরল সুন্দর দুধের মতো ধবধবে সাদা তেমনি কাদার মত নরমও। শিশুকে দিয়ে যেমন খুশি তেমন মানুষ তৈরি করা সম্ভব। পটুয়া যেমন নরম কাদামাটি দিয়ে তার ইচ্ছামত মুর্তি তৈরি করে ঠিক তেমনি শিশুকেও ইচ্ছামত অবয়বে গড়ে তোলা যায়। এজন্য চাই শুধু সুন্দর পরিবেশ ও সঠিক দিকনির্দেশনা। 

শিশুমন যেমন সাদাসিধা তেমনি অনুকরণপ্রিয়। শিশু যা দেখে যা শোনে তাইই অনুকরণ করে এবং সেভাবেই সে নিজের আচরণ গড়ে তোলে।

 শিশু সাধারণত তিন ভাবে শিক্ষা গ্রহন করে থাকে। দেখে, শুনে এবং পড়ে। এর মধ্যে প্রথম দুটি উপকরণ শিশুকে বেশি প্রভাবিত করে। 

শিশু শিক্ষাকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়।
১ম স্তর গর্ভকালীন থেকে ০৩ বছর বয়স পর্যন্ত
২য় স্তর ০৪ থেকে ০৭ বছর বয়স পর্যন্ত
৩য় স্তর ০৮ থেকে তারুণ্য আসার আগ পর্যন্ত।

এক্ষেত্রে প্রথম দুটি স্তরে শিশুর দেখে এবং শুনে শেখার প্রবনতা সিংহভাগ। শিশু গর্ভে থাকাকালীন পাঁচ মাস বয়স থেকেই মস্তিষ্কের গঠন শুরু হয়। আর তখন থেকেই তার শিক্ষা গ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়।

শিশু শিক্ষায় পরিবারের ভূমিকাই মূখ্য। প্রথম দুই স্তরে শিশু শিক্ষা পেয়ে থাকে পরিবারের কাছ থেকেই। এসময় পরিবার ও চারপাশের খেলার সাথীরাই শিশুর শিক্ষার মাধ্যম। পরিবারের বাবা-মা বা অন্যদের আচরণ শিশুকে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত করে।

এখন আসুন দেখে নেয়া যাক পারিবারিক কলহ কী এবং কিভাবে শিশুকে প্রভাবিত করে।

 

পারিবারিক কলহ হলো বাবা-মায়ের ভিতর ঝগড়াঝাটি, খারাপ খারাপ ভাষার ব্যবহার, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা, মারধর করা। শিশুর সামনে বাবা-মায়ের বিড়ি সিগারেট মদ গাঁজা ইত্যাদি নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করা। বাবা-মা মিলে দাদা দাদীকে গালিগালাজ করা। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া। কাকা, চাচা, পিসি, ফুফুদের সাথে ঝগড়াঝাটি ইত্যাদি করা। এগুলো সবই শিশু মনে প্রভাব ফেলে। 

তবে এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতিকর হলো বাবা-মায়ের মধ্যে কলহ, ঝগড়াঝাটি, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ, মারধর ইত্যাদি। এটিই শিশুমনে বেশি প্রভাব ফলে।

শিশুর মনে কী ধরণের প্রভাব ফেলে?

বাড়িতে কী ঘটছে সেটা আসলেই দীর্ঘ মেয়াদে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বড় রকমের ভূমিকা রাখে।

শিশুরা যখন দীর্ঘদিন যাবত বাবা মায়ের মধ্যে গালিগালাজ বা নেতিবাচক আচরণ দেখে তখন

শিশু ঐসব গালিগালাজ বা আচরণ ধীরে ধীরে রপ্ত করে ফেলে। যা পরবর্তীতে প্রয়োগ করার চেষ্টা করে।

বাড়িতে যখন তার বাবা মায়ের মধ্যে কোন ধরনের সহিংস সম্পর্ক দেখে তখন তাদের হৃদকম্পন বেড়ে যেতে পারে কিম্বা মানসিক চাপের কারণে হরমোন-জনিত সমস্যারও সৃষ্টি হতে পারে।

শিশু মানসিক বিকারগ্রস্ত হতে পারে।

এর ফলে বাচ্চা বা শিশু ছেলেমেয়েদের মস্তিষ্ক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তায়, বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। এধরনের পরিবেশের মধ্যে খুব বেশিদিন থাকলে শিশুর মেজাজও খিটখিটে হয়ে যায় এবং আচরণগত মারাত্মক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

এর ফলে শিশুর লেখাপড়ায় মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

নেতিবাচক এসব প্রভাবের ফলে শিশুর নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে, বাচ্চাদের মস্তিষ্কের প্রাথমিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, উদ্বেগ দুশ্চিন্তা তৈরি হতে পারে, স্কুলে তার আচার আচরণে সমস্যা হতে পারে। বিষণ্ণতায় ভুগতে পারে। ব্যহত হতে পারে শিক্ষা কার্যক্রম।

কখনও কখনও শিশুদের উপর এই প্রভাব যেরকম হতে পারে বলে মনে করা হয় তার চেয়েও মারাত্মক হয়ে যেতে পারে।

 শিশুর সামনে বিড়ি সিগারেট বা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করলে সেটাও শিশুর মনে ও মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে এবং শিশুও ঐ নেশার প্রতি ধীরে আকৃষ্ট হয়ে যেতে পারে।

করণীয় কী ?

সংসারে বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। সাংসারিক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ঝগড়াঝাটি হতেই পারে। তবে সেটা যেন দীর্ঘমেয়াদি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আর ঝগড়াঝাটি হলেও সেটা শিশুর অগোচরে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

এই ঝগড়াবিবাদ নানা রকমের হয়ে থাকে। কোন কোন বিতর্কের হয়তো প্রভাবই পড়ে না, এমনকি শিশুর ভবিষ্যতের জন্যে সেটা হয়তো ভালোও হতে পারে, কিন্তু পিতা মাতা যখন একে অপরের প্রতি ক্রুদ্ধ আচরণ করেন, চিৎকার চেঁচামেচি করেন, গালিগালাজ করেন। অথবা তারা একে অপরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেন, তখনই সেটা শিশুর মনে দাগ কেটে যায়।  

প্রকাশ্যে ঝগড়াঝাঁটি ও সংঘর্ষের কারণেই যে শুধু ক্ষতি হবে তা কিন্তু নয়। পিতামাতা যদি একে অপরের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, একজন আরেকজনকে উপেক্ষা অবহেলা করতে থাকে তখন কিন্তু শিশুদের উপর বড় রকমের প্রভাব পড়ে। শিশুর মানসিক, আবেগ অনুভূতি, আচরণ এবং সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রেও তখন সমস্যা হতে পারে।

শিশু মাতৃগর্ভে থাকার পাঁচ মাস বয়সের পর থেকেই বাবা মা-কে সতর্ক হয়ে যেতে হয়। শিশুর সামনে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ বা মারধর করা থেকে বাবা-মা কে বিরত থাকতে হয়।

শিশুর চারপাশের বন্ধু বান্ধব কারা। তারাও যেন ভাল হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর দুই বছর বয়স থেকেই, কিম্বা তার আগে থেকে শিশুরা বাড়িতে তাদের পিতামাতার আচরণের উপর নজর রাখতে শুরু করে। অনেক সময় পিতামাতা মনে করেন যে শিশুরা হয়তো সেটা বুঝতে পারছে না। তা কিন্তু নয় শিশুরা সবই বোঝে, সবই অনুধাবন করে কিন্তু প্রকাশ করতে পারেনা।

তাই বাবা-মা কে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে শিশুদের সামনে যাতে ঝগড়াঝাটি না করতে হয়।

তাদের সামনে নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। শিশুর সামনে যাতে মিথ্যা না বলতে হয় সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে।

শিশুর দাদা দাদী অর্থাৎ গৃহকর্তার বাবা মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। নয়তো একসময় ঐ শিশুই বলবে হয়তোবা তোমরা দাদা দাদীর সাথে যেমন ব্যবহার করছো আমি বড় হলে আমার কাছ থেকেও ঐরূপ ব্যবহার আশা করতে পারো।

আজকের শিশু আগামী দিনের সম্পদ। তাই তর জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে দেওয়াই আমাদের সকলের দায়িত্ব।

আসুন আমরা সবাই সহনশীল হই। পরিবারের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলি। আপনার আমার শিশুই হয়ে উঠুক আগামী দিনের আলোকিত মানুষ।।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top