সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৩০শে জুন ২০২২, ১৬ই আষাঢ় ১৪২৯


একশো টাকার নোট : লিপি নাসরিন


প্রকাশিত:
১১ জুন ২০২০ ১১:১৭

আপডেট:
২৯ জুন ২০২০ ১৩:৪১

 

টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, সাথে আছে ঝড়ো হাওয়া। কাল রাতে মোমেনা টিভিতে খবরে দেখেছে ঢাকায় কালবোশেখি  ঝড়ে বেশ কিছু গাছ ভেঙে পড়েছে। যদিও এ খবরে মোমেনার তেমন রা নেই। চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিছু হিন্দি সিনেমার নাচ-গান দেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমাবার আগে নিজের চুরি করে জমিয়ে রাখা টাকাগুলো আর একবার গুণে দেখে- এই টাকা দিয়ে ক'দিন চলবে তাই ভাবে। বাড়ন্ত শরীরে তার কেবল খিদে লাগে। সর্দারনি খালা অন্যদের থেকে তাকে একটু বেশি স্নেহ করেন তা এভাবে চললে খালাই বা আর সবাইকে কতোদিন বসিয়ে খাওয়াবে! এসব ভাবতে ভাবতে টাকাগুলো পরপর সাজিয়ে রাখা দু'খানি করে ইটের উপর যে ভাঙাচোরা সোকেজটা দাঁড় করানো আছে তার পিছনের পায়ার ইটের কাছে দলা করে ফেলে রাখে। ইঁদুরে কাটতে পারে এই ভয়ে সময় অসময়ে বের করে দেখে। সেই কোন দুপুরে ছোট তেলাপিয়া মাছের ঝোল দিয়ে আধথালা ভাত খেয়েছে, খিদেয় মোমেনার পেটটা চোঁ চোঁ করছিল। এক গ্লাস পানি খেতে খেতে ভাবে কাল নিশ্চয়ই কোন খদ্দরের  দেখা পাওয়া যাবে।রাতে খুবই ঝড়বৃষ্টি হলো টিনের চালে অশ্রান্ত কালবোশেখির দামাম নৃত্য চললো বেশ কিছুক্ষণ। রাত একটু গভীর হতেই ঝড়ের উদোম  তাল কেটে গিয়ে প্রকৃতি শান্ত হলো। আরো একটু গভীর রাতে হঠাৎ দরজায় ধাক্কার শব্দে মোমেনার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙা আঠালো চোখে বলে উঠে, কিডারে রে দরজায় ধাক্কা মারে?

আমি, দরজা খোল, তাড়াতাড়ি খোল।

মোমেনা গলাটা চিনতে পারে। উঠে ঘরের লাইটটা জ্বেলে দরজা খুলে দিয়ে সেতারাকে দেখে আবার শুয়ে পড়ে। ঘরের আলোয় ওর চোখে-মুখে জলের ফোঁটা একেবারে চিকচিক করে তৈলবিন্দুর মতো। গা থেকে ভেজা কাপড় সরাতে সরাতে সেতারা বলে ,একদম ভিজে গেছি রে। মোমেনা আধবোজা চোখে দেখতে থাকে সেতারাকে। মোমেনার সামনেই ব্লাউজ খুলে শুধু বডিজ গায়ে একটা গামছা পরে ভেজা কাপড় ও সায়া ঘরের মেঝেতে একপাশে ফেলে রাখে।

কোনে গেছিলে সেতারা বুবু এই ঝড়- জলের রাতে? মোমেনা একটু বিস্ময়ে প্রশ্ন করে।

রাস্তার পাশে দাঁড়ায় আছিলাম, চুল মুছতে মুছতে সেতারা উত্তর দেয়।

এতো ঝড়-বৃষ্টি মধ্যে তুমি রাস্তায় দাঁড়ায় আছিলে?

হুঁ – অস্ফুট উচ্চারণ করে গামছা টা দড়িতে ফেলে রেখে বডিজের মোটা হুকটি পিছনে হাত গলিয়ে খোলার চেষ্টা করে সেতারা।

মোমেনা উঠে পায়ের কাছে রাখা কাঁথাটা টানতে টানতে নিজের কাছ থেকে যেন লুকিয়ে অনুচ্চ স্বরে বলে, টাকা পাইলে ?

সেতারা জড়ানো গামছাটা খুলে আলনায় রাখা মোমেনার একখান শাড়ি শরীরে প্যাঁচিয়ে নিয়ে শুধু হুঁ শব্দের নিগুঢ় ব্যঞ্জনায় মোমেনার বুকের মধ্যে একটা টেউয়ের তরঙ্গ সৃষ্টি করে। সে তরঙ্গে অভিঘাত বারংবার মোমেনার পাড়ে এসে ফিরে যায়।

এরাম রাতেও কেডা আইলো সেতারা বু?

ততক্ষণে মোমেনার ঘুম ছুটে গেছে।

কেডা আমাগো অতো জানোনের কাম কী? উত্তর দিতে দিতে মোমেনার পাশে একটা বালিশ টেনে শুয়ে পড়ে।

আজ রাতে সে মোমেনার ঘরে ঘুমুবে। তার টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে খাটের সাথে লেপটে থাকা পাতলা তোষকটা ভিজে গেছে, এখানে সেখানে জল গড়াগড়ি খাচ্ছে। সেতারা তাই নিজের ঘরে গিয়ে এই অবস্থা দেখে  মোমেনার ঘরে রাত কাটাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দু'একফোঁটা বৃষ্টি বোধহয় তখনো ঝরছিল, পাশের বড় সাদাকাঞ্চন ফুল গাছ থেকে বড় বড় ক'ফোঁটা বৃষ্টি টস  টস শব্দ করে মোমেনার ঘরের চালে এসে পড়ছিল, সেতারা বেশ ভিজেছিল বলে কাঁথার ওমে ঘুমিয়ে পড়ে। মোমেনার চোখে ঘুম নেই। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ তার মনে কাব্যিক দ্যোতনা ছড়ায় না ঠিকই কিন্তু কেমন বিহ্বল করে তোলে, এই মাঝরাতে হাহাকারে ভারি করে দিতে চায় তার চারপাশের শূন্যতা।

তার মা-বাবা কে আরো অনেকের মতো সেও জানেনা। তেমন কোন স্মৃতি ও তাকে আবেশিত করে না কেবল আবছা মনে পড়ে কারো একজনের কোলে চড়ে-মা হয়তো,কোথাও যাওয়া। এই আলয়ের খালাই নাকি তাকে দেখেছিল নদীর পাড়ে পড়ে থাকতে অচেতন অবস্থায়। পরে পুলিশ তার আত্মীয়-স্বজনকে  অনেক খোঁজাখুঁজির পর পেয়েছিল বটে কিন্তু কেউ মেয়েটির দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেনি,পরে খালাই পুলিশের কাছ থেকে মোমেনাকে নিয়ে আসে মুচলেকা  দিয়ে- মেয়েটিকে এ পেশায় নামাবে না বলে। নিজের মেয়ের মতো করে অন্য জায়গায় রেখে মানুষ করবে কিন্তু খালা শেষতক সে কথা রাখতে পারিনি আর কারই বা দায় পড়েছে সেসব তদারকি করার। তা মোমেনাকে সর্দারনি মেয়ের মতো মানুষ করেছিল বটে, একবার ভেবেছিল এতিমখানায় দিয়ে আসবে, কিন্তু মায়ায় জড়িয়ে গেলো আর হয়তো ভেবেছিল পড়ন্ত বয়সে তাকেই বা দেখবে কে।

সন্ধ্যার পর মোমেনা বড় রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে এলোমেলোভাবে সেসব কথা ভাবতে ভাবতে। আজও বৃষ্টি হচ্ছে হালকা ঝিরঝিরে, তুষার কণার মতো ওর চুলে বসে আছে তার চিহ্ন। গা দিয়ে সস্তা পাউডার আর অলি সেন্টের গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে মোমেনা হেঁটে চলে। দোকানপাট সব বন্ধ। করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় সরকার লকডাউন ঘোঘণা করার পর থেকে আজ একমাস সবকিছু বন্ধ। জনসাধারণের চলাচল ও সন্ধ্যে ছ'টার পর নিষিদ্ধ করেছে সরকার। মোমেনার মতো মেয়েরা তাই আছে চরম দূরাবস্থায়। শরীরের ব্যবসায় খদ্দের একমাত্র পুঁজি। সরকারের ত্রাণের খাতায় ও তাদের নাম কেউ লেখে না, মানুষ ঘেন্নাভরে তাকায় আবার ঘরে গিয়েও কেউ ত্রাণ দিয়ে আসেনা।

অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। মোমেনা তীক্ষ্ম চোখে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে হেঁটে চলে। সেতারার দেখানো পথে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছি গতরাতেই। ঝাপটা বাতাসে মোমেনার গায়ের ওড়না সরে পড়ে। একটু পা টেনে এগোয় । সাইকেল চড়ে দু'একজন পাশ কাটিয়ে যায়- আড়চোখে দেখে। এই বৈরী সন্ধ্যায় স্নো-পাউডার মেখে একটা বিশ-বাইশ বছরের নারীকে দেখে তেমন কেউ অবাক হয় না কারণ এ তল্লাটে  এসব নতুন কিছু না তবে; একবার তাকিয়ে দ্বিতীয়বার তাকানোর ইচ্ছা অনেকেই পোষণ করে। একটু একটু করে বাতাসের তোড় বাড়ে, মোমেনা পা চালিয়ে বড় রাস্তার মোড়ে পৌঁছোয়। বৃষ্টি শুরু হয় সাথে বজ্র। বজ্রবিদ্যুত যেন আকাশটাকে ফালি ফালি করে ভাগ করে ফেলছে,একটু যেন ভয় পায় ও- দৌঁড়ে একটা বন্ধ দোকানের খানিক ঝুলে থাকা শেডের নীচে গিয়ে দাঁড়ায়। ওখানে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মাঝ চল্লিশের লোক সিগারেট ফুঁকছিল। মোমেনা দাঁড়াতেই লোকটি আড়চোখে তাকিয়ে বুঝে ফেলে। মোমেনাও লোকটির দিকে তাকিয়ে  হাতের চুড়ির জল মোছে টুংটাং শব্দ করতে করতে আর নিজের আয়ত্তের মধ্যে বাগিয়ে নেওয়া শিকারের সাথে বেড়ালের মতো একটু একটু পা বাড়িয়ে অসাড়তা বুঝতে চেষ্টা করে। লোকটি আরো জোরে জোরে সিগারেটে সুখটান মারে। তাকে দেখে মোমেনার ভদ্রলোকই মনে হয়।লোকটি বেল্টের মধ্য থেকে শার্টটা ছাড়িয়ে নেয়- চারিদিকে তাকায়, অন্ধকার ঘন হয়ে আসে- লোকটা মোমেনার আরো কাছ ঘেষে দাঁড়ায়। কিছুদূরের ল্যাম্পপোস্টের আলো ঠিকরে এসে এ-দিকটায় আলো-আঁধারির একটা মায়াজাল সৃষ্টি করেছে। লোকটা কাছে সরে আসতেই মোমেনা বুকের ওড়না সরিয়ে বক্ষযুগল উন্মুক্ত করে দেয়। লোকটার ঘন হয়ে আসা নিঃশ্বাস টের পায় ও।

রেট কতো?

পছন্দ হইছে? মোমেনা যেন বহু পরিচিত কাউকে প্রশ্ন করে।

লোকটার চোখ খেলে যায় মোমেনার জোড়া বক্ষের উপর, একটু মাথা নুইয়ে ঠোঁটটা বুকের কাছে নিতেই মোমেনা লোকটির গা থেকে ভারি একটা মিষ্টি গন্ধ পায়। শরীর বেঁচে খেলেও মোমেনার রুচির আস্বাদ আলাদা। গা দিয়ে উটকো গন্ধ বেরুনো খদ্দের সে নিজের ঘরে নিতে চায় না। এ নিয়ে সবাই তাকে টিটকারি করে, খালাও মাঝেমধ্যে গালি-গালাজ করে কিন্তু তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। লোকটা পকেট থেকে একশো টাকার একটা চকচকে নোট বের করতেই মোমেনা তাকিয়ে থাকে টাকার দিকে। লোকটার গায়ের মিষ্টি গন্ধ আর চকচকে নোটের খসখস শব্দে মোমেনা ও লোভী হয়ে উঠে লোকটাকে নিজের মধ্যে পেতে। টাকার বিনিময়ে প্রয়োজন তখন আর অচেনা মানুষটারই কেবল থাকে না, মোমেনা ও কামাসিক্ত হয়। বৃষ্টির বেগ বেড়ে রাস্তা দিয়ে জল গড়িয়ে যায়। লোকটা টাকাটা হাতে ধরেই মোমেনাকে ঠেসে ধরে দোকানের শাটারের সাথে। জামার সামনে বসানো চেইনটা একটানে খোলে ফেলে বুকের মধ্যে হাতড়াতে থাকে- একজন দক্ষ কুমোর যেমন করে মাটির চাক ঘুরায় ঠিক তেমন। ঠিক তখন রাস্তার ওপাশে মার্কেটের গলিতে অলস শুয়ে থাকা কুকুরটা লেজ নাড়তে নাড়তে উঠে এসে রাস্তার ওপাশে থেকেই তাকিয়ে থাকে এদিকে।

এইখানে মানুষ দেখবো, পুলিশ ও আইতে পারে যে কোন সময়, মোমেনা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে।

লোকটা হাঁপানির মতো শব্দ করে বলে ,তাহলে তোর ঘরে চল।

এখন বৃষ্টির মধ্যে কেমন যামু, তারচেয়ে ঐ পাশটায় চলেন- নিরিবিলি আছ। অচেনা মানুষটার সাথে মোমেনা দোকানঘরটা ঘুরে পেছনদিকটায় আসে। একটা সরু গলি তার ওপাশে সারি করে দোকান সাজানো - সবগুলোই বন্ধ। লকডাউনে বৃষ্টি এক অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এই বৈরী সন্ধ্যায়। ওরা দু'জন একটা ছোট চায়ের স্টলের পেছনদিকে পেতে রাখা একটা তক্তপোষের উপর গিয়ে আশ্রয় নেয়। কুকুরটাও ভিজতে ভিজতে গলির মোড়ে এসে ঘেউ ঘেউ করে বারকয়েক ডেকে উঠে দাঁড়িয়ে থাকে এদিকে চেয়ে। বৃষ্টির তোড় বাড়ার সাথে সাথে  ওদের দু'জনের বাড়ন্ত নিঃশ্বাসের ধ্বনিও ঘন হয় এবং মিশে যেতে যেতে একসময় থেমে যায়। লোকটা তার জামা প্যান্ট ঠিক করতে করতে জিজ্ঞেস করে, কী নাম রে তোর?

মোমেনা বডিজের হুক লাগিয়ে জামার চেইনটা টেনে উঠিয়ে উত্তর দেয়, মোমেনা।

লোকটা আর একবার ওর স্তনযুগলে হাত চালাতে গেলেই ও 'না' সূচক শব্দ করে।

লোকটি বলে, তুই একটা খাসা মাল।

দ্যান, টাকাটা দ্যান,বলে মোমেনা হাত পাতে। কুকুরটি দীর্ঘস্বরে ডেকে উঠে- ঠিক এমন সময় গলির মুখে একটা মোটরবাইকে দু'জন পুলিশকে আসতে দেখে লোকটা এক দৌঁড়ে বৃষ্টির মধ্যে নেমে দোকানটার এপাশ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

এই আমার টাকাটা দিয়া যান, টাকাটা দিয়া যান বলে মোমেনা চিৎকার করতেই পুলিশের মোটরবাইকটি চায়ের স্টলের সামনে এসে দাঁড়ায়। পেছনে বসা পুলিশটি বাইক থেকে নেমে এসে বলে, এই, এখানে কী হচ্ছে- এই অন্ধকারের মধ্যে? তোদের লাজ-লজ্জা বলতে কিছু নেই, রাস্তাঘাটেও শুরু করেছিস? যা, ঘরে যা, এদিকে যদি আর কখনো দেখি সোজা লকআপে ভরে দেবো।

মোমেনার চোখ দিয়ে জল ঝরতে থাকে; তার চোখ কেবলি দেখে একশ টাকার একখানা চকচকে নোট, নাকে তার গন্ধ এসেও লাগে বৈকি! ওড়নার খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে মোমেনা গলির পথ ধরে, রাস্তার কাদাজল তার পায়ে পায়ে উঠে আসে জামার পিছনের অংশে মাঝ বরাবর। কুকুরটি ও মোমেনার পিছে পিছে আগের জায়গায় গিয়ে লেজ গুটিয়ে শুয়ে পড়ে।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top