সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৩০শে জুন ২০২২, ১৬ই আষাঢ় ১৪২৯


কারচা বিলের পতিতা : আনোয়ারা খাতুন


প্রকাশিত:
২৬ আগস্ট ২০২০ ১০:৩৬

আপডেট:
২৬ আগস্ট ২০২০ ১২:৫০

ছবিঃ আনোয়ারা খাতুন

 

আকাশ ফাটা মেঘের গর্জন ঘুটঘুটে আঁধারের বুক ছিড়ে বিদ্যুৎ এর নিত্য। মাঝরাতে জয়নালরা দুই ভাই দৌঁড়ে এসে কাবেরির ঘরে আশ্রয় নিলো। বললো, পাক বাহিনী দাওয়া করেছে।মা মরা কিশোরী কাবেরি, পাক সেনাদের জুতার শব্দ শুনে জয়নালকে আড়াল করে ঘরের কুপি নিভিয়ে দেয়।রাজাকার কাশেম মোল্লা উঁচু গলায় বললো, এই ঘরেই মুক্তি লুকিয়ে আছে হুজুর ভিতরে খোঁজ করুন। পাকসেনারা ঘরে ঢুকার আগেই পিছনের দরজা দিয়ে জঙ্গলের পথে দেখিয়ে দিয়ে কাবেরি বাইরে বের হয়ে এলো। কাশেম বলে, হুজুর এই হলো জয়নালের ফেয়ারের মানুষ, ভারি সুন্দর তাই না! হায়ানার দল টর্চের আলোতে বন্দুকের নলা দিয়ে কাবেরির মুখটা উঁচু করে ধরে, আর বাজে বাজে কথা বলতে থাকে, থরথর করে কাঁপতে থাকে কাবেরি। মুক্তিদের বের করে দেওয়ার জন্য কাবেরিকে মারধোর করলো। কাবেরি বললো, এখানে কেউ আসেনি, আমি কিছু জানি না। কাশেম রাজাকার কাবেরির গাল টেনে ধরে বলে, সুন্দর মুখে মিথ্যা শুভা পায় না। ইতি মধ্যে কাবেরির বৃদ্ধ বাবাকে ঘর থেকে টেনে বের করে এনে বলে সত্যি কথা বল, না হলে গুলি করে সবার প্রাণ উড়িয়ে দেবো।
পাক সেনাদের রক্ত চক্ষু আর কাশেমের অসভ্যতা কাবেরি মুখ খুলে। যারা প্রতিবাদী, সত্য বলা যাদের অভ্যাস, অন্যায় দেখলে তারা বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে না। কাবেরির রক্ত গরম হয়ে যায়, শক্তি থাকলে এই বর্বরগুলোর মাথা কেটে ডাল রান্না করে খেতো।সে পুষে উঠে বলে, আমি জয়নালকে ভালোবাসি, আমি বেঁচে থাকতে ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না। তার ভাই আমারও ভাই তাকে কি করে তোমাদের হাতে তুলে দিব? তারপর কাশেম বলে, হুজুর, তাহলে কাবেরিকে ক্যাম্পে নিয়ে চলেন বহুত কাজে আসবে। কাবেরি কাশেমের পায়ে ধরে কাঁদতে লাগলো, বললো আপনার মেয়ে আমার সই, একসাথে মক্তবে পড়ি, আপনাকে আমি বাবার চোখেই দেখি আমার এত বড় সর্বনাশ করবেন না। সই জানতে পারলে আপনাকে বাবা বলতে ঘৃনা করবে। কাবেরির অনুরুধ আর দস্তাদস্তি কোন কাজ হলো না। দুই মুক্তিসেনাকে বাঁচাতে গিয়ে কাবেরি নিজেকে সপে দিলো পাকসেনার হাতে।
সুন্দরী এই কিশোরীকে দিনের পর দিন নির্যাতন করেছে পাক হায়ানার দল। এমনকি তাদের বাসন মাজা কাপড় কাচা রান্না বান্না নানান রকম কাজ করাতে থাকে। এককথা তাদের যখন যা চাহিদা হতো কাবেরিকে তাই পূরণ করতে হতো।
কাবেরি সর্বদা কান পেতে থাকতো মিলিটারিদের আলোচনা শুনার জন্য। দেশের অবস্থা কেমন, কোন মুক্তি শিবিরে কখন আক্রমণ চালানো হবে সে সব কথা।জয়নালরা কোথায় আছে জানার জন্য। নিজের অজান্তেই প্রতিশোধের বীজ বপন করতে থাকে মনে মনে।
একদিন সকালবেলা কাশেম মোল্লা কি যেনো খবর নিয়ে এলো সেনা ক্যাম্পে। সে পান চিবাতে চিবাতে কথার ফাঁকে বললো, হুজুর মেয়েটা বেঁচে আছে না মরেছে? কাবেরি সামনে এসে বললো, আমি বেঁচে আছি চাচা। আমার জয়নালের খবর কি জানেন? কাশেম বললো, এই দেখো এত দামি দামি ভদ্রলোকের আদর সোহাগ পেয়েও তুই জয়নালকে ভুলতে পারিসনি, সেতো ভালো কথা না। তবে শোন ঐ জয়নাল শয়তানটা পালিয়েছে কিন্তু তোর বাবাকে খতম করে দিয়েছি। একথা শুনে কাশেমের গলা চেপে ধরে কাবেরি। কাশেম চেঁচিয়ে বলতে থাকে, হুজুর এত বড় বড় মানুষ আপনারা কিন্তু এতটুকু মেয়ের তেজ কমাতে পারেননি আজো? এই অপরাধে পাক সেনারা সেদিন মারতে মারতে কাবেরিকে আধমরা করে ছাড়লো ।

কাবেরি মনে মনে সুযোগের অপেক্ষা করে। বয়সে ছোট হলেও সে অসীম সাহস। সে বুঝেছিলো প্রতিশোধ নিতে হলে কৌশল অবলম্বন করতে হবে। কাবেরি ভাবলো আমার যা যাওয়ার অনেক আগেই চলে গেছে, নিজের সতিত্ব, অস্তিত্ব যখন বিসর্জন দিতেই হল, তবে এমনে এমনে তাদের ছাড়বো না। ওদের একজনকেও যদি মেরে মরতে পারি তাহলেও  সার্থক। দিনের পর দিন ফন্দি আটতে থাকে। পাকসেনাদের মারতে কতো দিন কতো বুদ্ধি বিফলে গেছে কাবেরির। আসলে “যে কোন কাজের সফলতা আনতে গেলে কারো না কারো সহযোগিতা লাগে। শুন্য হাতে বাঘের গুহা আক্রমণ করা বোকামির সামিল।”

একদিন দুপুরে ক্যাম্পটাকে নিরব মনে হলো, সেনা বাহিনীর কিছু লোক দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে আর কিছু লোক নানা অভিযানে বাহিরে আছে। সব ঘরেই কাবেরির যাতায়াত ছিল, এক রুমে  পাঁচ সাতজন অফিসার বসে তাস খেলছে, কাবেরি উঁকি দিতেই তারা ভেতরে ডেকে বললো গা হাত পা টিপে দিতে। এই আদেশকে আর্শিবাদ ভেবে তাদের মনের ভাসনা পূরণ করলো কাবেরি। বেরিয়ে যাবার সময় কৌশলে বাহিরে তালা দিয়ে রান্না ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় সে। এই আগুনের স্পর্শে যখন সারা ক্যাম্প ফুস করের জ্বলে উঠলো,  তখন অত্যান্ত সাহসিকতার সাথে নদী সাঁতরে পাশের গ্রামে আশ্রয় নিলো সে। খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মুক্তি শিবিরে সম্মানের সাথে নিয়ে গেলো। জানা যায় সেই দিন মোট ১৩ জন পাকসেনা মারা গিয়েছিলো এবং বিপুল পরিমান গোলা বারুদ নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।

এরপর থেকে সে মুক্তি সেনাদের কাজে সাহায্য করতে থাকে । বয়সে ছোট হলেও দেখতে বেশ বড়-সর, বুদ্ধিতেও পটু। কমান্ডার বলেছিলেন আগামী কালকের অপারেশন শেষ করে কাবেরিকে জয়নালের কাছে পৌঁছে দেবে। কিন্তু সকাল হতেই পূর্ব নির্ধারিত কাজে বের হলো কাবেরি । নদীর ওপারে মুক্তি শিবিরে চিঠি আর একটা নকশা পৌঁছে দুপুরের আগেই বর্তমান শিবিরে ফিরে আসতে হবে। আজ সন্ধায় শিমুলকান্দি ক্যাম্পে পাকসেনাদের আক্রমণ করা হবে। সব ঠিকই ছিলো কিন্তু কাবেরি ফিরার পথে কাশেম রাজাকারের হাতে ধরা পরে। কাবেরিকে হাত পা বেঁধে নৌকার পাঠাতনে ফেলে রাখলো কাশেমের দলবল। এইদিকে মুক্তিযোদ্ধারা অস্রসহ প্রস্তুত হয়ে বসে আছে কাবেরি আসলেই অভিযান শুরু করবে। কিন্তু কেউ জানলো না কাবেরি কোথায়?
রাজাকাররা কাবেরিকে আটক করে কারচা বিলের মাঝে ছনক্ষেতে নিয়ে যায়। সেখানে হাত পা বেঁধে দিনের পর দিন অত্যাচার করে। এই রাজাকাররাই আবার  গ্রামের মুরব্বিদের বলে বেড়াচ্ছে যে, যার যার ছেলেদেরকে সামলে রাখতে। যেনো ভুল ক্রমেও কেউ কারচা বিলে না যায়।
কারণ সেখানে কাবেরি নামের এক পতিতা বাস করা শুরু করেছে যেখানে পাকসেনারা নিয়মিত  আসা যাওয়া করে। পাকবাহিনীর কথা শুনে গ্রামের মানুষ মুখে খিল দেয়, আহা বলার সাহসটুকুও দেখায় না কেউ।
 ক্ষুধায় আর পিপাসার যন্ত্রণা রাজাকারদের হাতে পায়ে ধরে কত দিন বাঁচার আর্তনাদ করেছে কাবেরি। কখনো কাঁচা লতাপাতা খেয়ে, কখনো মাটি খেয়ে প্রাণটা বাঁচিয়েছে সে। কতদিন গেছে চোখের পানি ছেটে গলা ভিজানোর চেষ্টা করেছে। এক সময় চোখের পানি ও শুকালো, তবু মায়া হলো না নিজের দেশের মানুষ রাজাকার নামদারি জানোয়ার গুলোর মনে। বোবা মন প্রতি মুর্হুত প্রার্থনা করে আল্লাহ আজরাইল পাঠিয়ে আমাকে মুক্ত করো আর সইতে পারছি না। আমায় নিবে নাও তবু মুক্ত করো বাংলার ভুখন্ড।

অবশেষে দেশ স্বাধীন হলো। রাজাকাররা কাবেরির হাত পা মুখের বাঁধন খুলে দিয়ে বলে, বাড়ি ফিরে যায় দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা সবাই মুক্তিবাহিনীর দলে মিশে যাবো। কিন্তু আমরা জানি স্বাধীন দেশের মানুষ তোকে কারচা বিলের পতিতা বলে ডাকলেও তুই হলে আসল মুক্তিযোদ্ধা।
 
কাবেরি আধ-মরা দেহটা নিয়ে চলতে বড় কষ্ট হচ্ছে। ঝাপসা চোখে প্রখর রৌদ্রে পায়ে হেঁটে দিন শেষে বাড়ি পৌঁছালো। কিন্তু লোক নিন্দার ভয়ে তাকে কেউ বাড়িতে জায়গা দিলো না। উপায় না দেখে বুক ভরা আশা নিয়ে কাবেরি জয়নালদের বাড়ি গেলো। সেখান থেকেও দুর দুর করে তাড়িয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু কাবেরি জয়নালের অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে ,সে বললো তোমরা আমাকে যতই তাড়িয়ে দাও, জয়নাল আমাকে ঠিকই গ্রহণ করবে। একজন মুক্তিযোদ্ধা কখনো আরেকজন মুক্তিযোদ্ধাকে ঘৃণা করতে পারে না।
জয়নাল ফিরে এলো,দেখা হলো কাবেরির সাথে।কিš‘ সাফ সাফ জানিয়ে দিলো আমি তোমাকে গ্রহণ করতে পারবো না।তোমাকে বিয়ে করলে সমাজে মুখ দেখাতে পারবো না যে। কাবেরি বললো, তুমি আমাকে ভালোবাসতে জয়নাল। উত্তরে জয়নাল বলেছিলো, আমি কাবেরিকে ভালোবাসতাম, কারচা বিলের পতিতাকে নয়। আর যাই হোক আমি কোন পতিতাকে নিয়ে জীবন কাটাতে পারবো না।

যা বুঝার কাবেরি বুঝে নিলো, বেশি কথা বলার শক্তি বা র্ধৈয কোনটাই নাই তার। সে বললো, সাবাস জয়নাল এইতো প্রকৃত প্রেমিক পুরুষের মত কথা। হুযোগে যুদ্ধে গিয়ে বীর সেনানি হয়েছো বটে, মানবিক হওয়ার প্রশিক্ষণ তুমি পাওনি। রক্ত দিয়ে ভুখন্ড স্বাধীন করার আগে মানবিকতা দিয়ে মনুষত্ব জয় করা উত্তম। এতদিন রাজাকার, পাকবাহিনীর পাষবিক নির্যাতন সইলেও এত কষ্ট হয়নি যে কষ্ট তোমার কথাতে পেয়েছি। অত্যাচার সইলেও মনে হয়েছে আমার ভালোবাসার মানুষটিকে তো বাঁচাতে পেরেছি। জয়নাল মানুষকে যে ভালোবাসে না, সে কখনো দেশকে ভালোবাসতে পারে না। সেদিন তোমরা দুই ভাইকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনটা পাকবাহিনীর হাতে বিকিয়ে দিয়েছিলাম। তার প্রতিদান আমি পেয়ে গেছি জয়নাল। উপরে আল্লাহ আছেন, প্রতিদান তুমিও একদিন পাবে।
তারপর জয়নালের হাতের পতাকাটা কেড়ে নিয়ে কাবেরি বললো, এইটা তোমার হাতে মানায় না। এই পতাকা পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সেনা ছাউনি গুলোতে হাজারো কাবেরি নরক যন্ত্রণা সয়েছে দিনের পর দিন। সেই সব কাবেরিরা শত নির্যাতনের পরও স্বপ্ন দেখতো একটা স্বধীন দেশে স্বাধীন পতাকা উড়বে। আর সেই স্বাধীন দেশে স্বাধীন সংসার গড়ে সুখে জীবন কাটাবে। যদি কাবেরিরা জানতো, যাদের জন্য তারা কারচা বিলের পতিতা হয়েছে, তারাই একদিন বিশ্বাসঘাতকতা করবে তাহলে, পাকসেনাদের মারার আগে জয়নালদের মেরে দেশকে কলঙ্ক মুক্ত করতো। মনে রেখো, এমন একদিন আসবে যেদিন কারচা বিলের পতিতার চেয়ে বিশ্বাস ঘাতক জয়নালদের মানুষ বেশি ঘৃণা করবে। আমি কারচা বিলের পতিতা অভিশাপ দিয়ে গেলাম।

তারপর কাবেরি পতাকার মাঝে মুখ গুজে বললো, তোমায় পাবার আশায় আমি পতিতা হলাম, তোমার রঙ ছিটিয়ে মুছে দিতে পারবে না আমার কলঙ্কের দাগগুলো! সবাই বিশ্বাস ঘাতকতা করলেও স্বাধীনতা এসেছে, তুমি মুক্ত হলে হে লাল সবুজের পতাকা। এইতো আমার পরম পাওয়া।

বহুদিন পর দূরের এক রেলস্টেশনে কাবেরিকে দেখা যায়। আবার মাঝে মধ্যেই উদাউ হয়ে যায়। গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে এসে ইস্ট্রিনের ঘরে ঘুমায় কাবেরি। আজ আর পাকসেনার ভয় নেই, মান যাওয়ার আতঙ্ক নেই, নিদ্রিষ্ট কোন ঘরের ও প্রয়োজন নেই। গ্রামে গঞ্জে যেখানেই কাবেরিকে দেখতো, লোকে কানাকানি করতো, এই দেখো কারচা বিলের পতিতা যায়। বাচ্চারা পাগল ভেবে ঢিল ছুঁড়তো,পতিতা কথার অর্থ না বুঝেই কারচা বিলের পতিতা, কারচা বিলের পতিতা বলে ক্ষেপাতো। কাবেরি সকল পিড়ায় মুখ বুঝে সয়েছে মৃত্যুর পূর্ব মুর্হূত পর্যন্ত।
দিনের পর দিন রোগে শোকে  জর্জরিত হয়ে ভাদ্রের এক কালিমাখা রাতে পৃথিবি থেকে বিদায় নেয় কাবেরি।
মৃত্যুর পর নিজ গ্রামে তার লাশ দাফনের জন্য দেয়নি এলাকার মাতাব্বররা। মোল্লারা বলেছে, পতিতার লাশ দাফন করলে, গ্রামের সব কবরবাসির কবর আযাব হবে। 
বহুদিন কারচা বিলের বাতাস কাবেরির লাশের গন্ধে ভারি হয়ে ছিলো।স্বাধীন বাংলার কাক শকুনেরা ইচ্ছে মত ভক্ষণ করেছে কাবেরির ভাসমান মৃত দেহ।    



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top