সিডনী বুধবার, ২১শে অক্টোবর ২০২০, ৬ই কার্তিক ১৪২৭


বিসর্জন : আশিস চক্রবর্তী


প্রকাশিত:
১৭ অক্টোবর ২০২০ ১৬:২২

আপডেট:
২১ অক্টোবর ২০২০ ০৮:২৮

 

অবশেষে প্রায়  দশ বছর পর, সুপ্রভা দেবীকে তার একমাত্র ছেলে অবিনাশ গ্রামের বাড়ি থেকে ,একে বারের জন্য, তার নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে এলো। গত বছর সুপ্রভা দেবীর স্বামী মারা গেলে, ছেলেটা দিন পনেরোর জন্য এসে, আবার ফিরে গিয়েছিল। তারপর থেকে একাকীত্ব ভরা জীবনে ছেলের আশা একে বারে ছেড়েই দিয়ে ছিলেন তিনি ।অবিনাশ কলকাতায় বড় কোম্পানির চাকরী করে। তার স্ত্রীও ওখানেই  কর্মরতা ।ওদের প্রেমের বিয়ে। ওর স্ত্রী আজ অব্দি একদিনের জন্যও গ্রামের বাড়িতে পা মাড়াই নি।ওদের ছেলে ও মেয়ে দুটি যমজ সন্তান ।

গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে আসার দিন, পাশের বাড়ির সখী সরলা কে সুপ্রভা শেষ বারের মতো বলেছিল -- আসি রে সরলা। ভালো থাকিস । আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা জানিনা। এখন থেকে পাকাপাকি ভাবে ছেলের কাছেই থাকবো। একা আর ভালো লাগে না রে।

সরলা আঁচলের আগা মুঠো করে ধরে চোখ মুছে বললো -- পেটের কথা বলার একমাত্র তুমিই ছিলে গো দিদি, এখন থেকে গুমরে গুমরে মরতে হবে। তোমার ছেলে টা বড়ো ভালো গো।

অবিনাশ অনেক তফাতে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিল ।

 

বড় শহরে পৌঁছে ফ্ল্যাটে ঢুকতেই নাতি নাতনি দুটি ঠাকুমা বলে দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো। সুপ্রভা দেবীর মুহূর্তের মধ্যেই সমস্ত পথের ক্লান্তি, মানসিক একাকীত্ব ,অভিমান সব দূর হয়ে গিয়ে বুক টা খুশির হওয়ায় ভরে গেল। যেন তিনি অমৃতের স্বাদ পেলেন। দিনরাত ওদেরএটা ওটা হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে তিনি এক বারের জন্যও হাঁপিয়ে ওঠেন না। বাঁচার লোভ টা এই কটা দিনে আবার জেগে উঠলো।একাকী থাকার সময় তিনি নিজের মৃত্যুর জন্য ঠাকুর কে অনেক প্রার্থনাই করেছিলেন। কয়েক মাসেই চেহারা রং সব খুলে যেতে লাগলো তিনি নিজেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে সব লক্ষ্য করলেন। সারাদিন ছেলেবৌমা অফিসে কাজেই ব্যস্ত থাকে। নাতি নাতনি দুটো স্কুলের থেকে ফিরেই  কেবলই ঠাকুমা ঠাকুমা করে । ঈশ্বর যে তার একাকিত্বের কথাটা শোনেননি ,তার জন্য ঈশ্বরকে মনে মনে ধন্যবাদ দেন।

 

সময় গড়িয়ে কয়েক মাস যেন হাতে মুঠো করে ধরে রাখা বালির মতো সর সর করে ঝরে গেল। ঘুরে ফিরে শহর বাসী দের দুর্গা পুজো দেখে সুপ্রভা দেবীর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। দশমীর দিন বিকেল বেলা পূজার থালা সাজিয়ে ছেলে আর বৌমা সুপ্রভা দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে বললো -- মা ! পাড়ার ক্লাবের ঠাকুর নেমে গেছে, একটু মিষ্টি মুখে বিদায় জানিয়ে আসছি, তুমি ওদের দেখো, যেন বাইরে না যায়।

সুপ্রভা দেবী মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলেন। 

ছেলে মেয়ে গুলো যাবার জেদ ধরলে অবিনাশ বললো -- এই তো সোনা বাবারা আমার , এক্ষুনি এসে পড়বো। তারপর সবাই মিলে নদীর ঘাটে ঠাকুর ভাসান দেখতে যাবো, কেমন ! একটু থাকো ঘরে, ঠাকুমা কে স্কুলে দুজনে কি শিখেছো দেখাও । 

তারপর সুপ্রভা দেবীর দিকে তাকিয়ে অবিনাশ 'আসি মা' বলে বেরিয়ে গেলো।

বান্টি আর দিয়া ঠাকুমার মুখের কাছে এসে থুতনি ধরে বললো -- ঠাকুমা ছড়া শুনবে ? 

শোনাও দেখি কেমন ছড়া শিখেছো ? -- বললেন ঠাকুমা। 

এরপর দুজনে ইংরেজি বাংলা মিলিয়ে বেশ কয়েক টা ছড়া শুনিয়ে অনায়াসে ঠাকুমার মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়ে ফেললো। ঠাকুমা দুজন কে কাছে টেনে গালে স্নেহ চিহ্ন এঁকে দিয়ে বললো -- আর কি কি জানো দাদু ভাই দিদি ভাই ?

বান্টি ছুটে গিয়ে তার আঁকার খাতা এনে ঠাকুমার কাছে মেলে ধরলো। রং বেরংয়ের কত ছবি সুপ্রভা দেবী হাত বুলিয়ে দেখে বললে  -- বাঃ চমৎকার হয়েছে। 

বাইরে পুজোর ঢাকের শব্দে দুজনে এরপর এলোমেলো নাচ দেখালো। নাচ শেষ হলে দিয়া এগিয়ে এসে বললো -- ঠাকুমা আমি মা আর ও বাবা সেজে দেখাবো ? 

সুপ্রভা দেবী ওদের এই আবদারে অবাক হয়ে বললো -- এ আবার কার কাছে শিখলে ?

বান্টি বললো -- রাত্রি বেলা আমরা যখন মিছি মিছি শুয়ে থাকি তখন মা বাবার কাছ থেকে শুনেছি, আবার চোখ অল্প খুলে দেখে আবার বন্ধ করে নি। 

-- তোমরা তো ভারী দুস্টু হয়েছে !

বান্টি একটা বই খুলে নিয়ে তার বাবার কায়দায় খাটের একপাশে পা মেলে বসলো। দিয়া টুলের ওপর আয়নার সামনে বসে চিরুনী নিয়ে চুল আচড়াবার কায়দা করলো। এসব দেখে সুপ্রভা দেবী মুখ টিপে হেসেই চলেছেন। তারপর দিয়া বলে উঠলো -- অফিস সামলে আমি আর পারছি না এতো বাড়ির কাজ করতে ।

বান্টি চোখ তুলে বললো -- একটা রান্নার লোক রেখেদি ? 

--হ্যাঁ ওটাই বাকি আছে। এই বাজারে কত নেবে জানো কাজের লোক ?এমনিতেই চলে না, দুজনে কাজ করেও একটা কাজের লোক রাখতে পারিনি। তোমার মা কে এনে ওদের দেখা শোনার মেয়ে টাকেও তো ছাড়ালে। -- বললো দিয়া।

 

--কি করবো, এছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তাছাড়া মা ও একা একা আর কতদিন ?

-- বুড়ি টা গিলে কত ! এই কটা মাসে কেমন ফুলে-ফেঁপে উঠেছে । পা এর ওপর পা তুলে খাচ্ছে। এঁটো বাসন গুলো একটু ধুলেও তো কাজ হয়।কাজের মেয়ে টাই ভালো ছিল এসে কিছুক্ষণ থেকে চলে যেত, এ যেন এক বাড়তি বোঝা।

 

এই পর্যন্ত শুনে সুপ্রভা দেবীর বুকটা চ্যাৎ করে উঠলো। হাত পা বুঝি অসাড়, বুকের ভেতর একটা জল হীন মাছ যেন তড়পাচ্ছে। এরপর আর কতক্ষন ওদের নাটক টা চলে ছিল তিনি টের পাননি। চোখের জলে ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। সম্বিৎ ফিরলো যখন দিয়া এসে হাত ধরে ঝাকুনি দিয়ে বললে -- ঠাকুমা ও ঠাকুমা তুমি কাঁদছো কেন গো ?

সুপ্রভা দেবী কোন উত্তর না দিয়ে চোখের জল মুছে চললেন ।বান্টি জিজ্ঞাসা করলো -- ঠাকুমা বুড়ি টা কে গো?

সুপ্রভা দেবী কম্পমান কন্ঠস্বরে বললেন -- দাদুভাই আমি একটু জল খেয়ে আসি, তোমরা এখানেই থেকো।

 

ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে অবিনাশ সস্ত্রীক ফিরে এসে গোটা ফ্ল্যাট চক্কর দিয়ে ঘুরেও আর মা এর দেখা পেলো না। এ পাশ ও পাশ পাশের ফ্ল্যাট না কোত্থাও না। তীব্র হতাশা আর দুশ্চিন্তায় যখন সে পুরো ভেঙে পড়েছে তখন স্ত্রী বলে উঠলো -- বুড়ি টার আঁককেল দেখলে, এই বাচ্চা দুটোকে ফেলে নিশ্চিত ঠাকুর দেখতে বেড়িয়েছে।

অবিনাশ একটা ধমক দিয়ে বললে -- তুমি একটু থামবে প্লিজ !

তারপর ঢোক গিলে, কপালে হাত দিয়ে বললো --আমার মনে হয় মা আমাদের রাত্রের কথা গুলো কোন ভাবে জেনে ফেলেছে। আর তুমিও মা আসার পর থেকে ওই একই কথা রোজ রোজ ঘ্যানর ঘ্যানর করতে। এখন সামলাও ঠেলা। এই ভিড়ে কোথায় খুঁজি এখন, গ্রামের বাড়ি ফিরে যাবার মতো তো সামর্থ্য নেই। আমার মাথা কোন কাজ করছে না।

-- কিন্তু সকাল থেকে তো মুখ দেখে কিছু বুঝতে পারিনি -- বললো অবিনাশ এর স্ত্রী।

--যায় একটু বাইরে দেখে আসি -- বলে অবিনাশ দ্রুত দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। 

 

বাইরে তখন মা দুর্গার এ বছরের মতো বিদায় পর্ব চলছে। ঢাকের শব্দ , ধুনুচির ধোঁয়া , বাজির শব্দ আর মেয়ে বউ দের সিঁদুর খেলায় আকাশ বাতাস মেতে উঠেছে। ভিড় ঠেলে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে নদীর ধারে একটা গাছের তলায় অবিনাশ মাথায় হাত দিয়ে কতক্ষন বসে পড়ে ছিল জানে না। বিকেল ফুরিয়ে তখন সন্ধ্যে নামছে কেবল। একটা গোলাপি আভা ছেয়ে আছে নদীর রেখা বরাবর। আলোর রোশনাই দু পাড় ভোরে উঠেছে। তার ছবি নদীর বুকে কেঁপে চলেছে। হঠাৎ একটা জলে ভারী কিছু পড়ার ছলাৎ শব্দ শুনে ,অবিনাশ অত্যান্ত খারাপ কিছু একটা ভেবে ,হুস মুসিয়ে উঠে , নদীর পাড়ের কাছে  ছুটে গিয়ে, জলের দিকে ঝুঁকে, দেখে কারা জেনে গৃহের ছোট্ট দুর্গা প্রতিমা টি বিসর্জন দিল। ফুল, বেলপাতা, মালা, ধান ,দূর্বা ,খই সব ভেসে উঠছে।আরও গভীর দৃষ্টি ফেলে অবিনাশ দেখলো ক্রমশ ডুবন্ত দুর্গা প্রতিমার মুখ টা, ঠিক যেন তার মা এর মতো।

 

আশিস চক্রবর্তী
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top