সিডনী শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮


ভ্রাম্যমান প্রেম : রাজীব কুমার দাশ


প্রকাশিত:
১২ জুলাই ২০২১ ১৫:১৯

আপডেট:
২২ অক্টোবর ২০২১ ০৫:৩৩

ছবিঃ রাজীব কুমার দাশ

 

উর্বশী কেঁদে কেঁদে হোষ্টেলে যেদিন মাখনের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ এনেছে, আমরা হোষ্টেলের কেউ তেমন কিছু মনে করিনি। সবাই ধরে নিয়েছিঃ ওদের ভালোবাসার রসায়ন বেশ পুরোনো জাম্পেস। এ ছাড়া টুক-টাক মান-অভিমান ঝগড়া লেগেই আছে। রাজনীতির আদর্শিক ভাবধারায় ওরা দু মেরুর হলে ও বেশ মানিয়ে চলে। উর্বশী'র বাম রাজনীতির আড়ালে মাখন মিশ্র অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে প্রাইভেট পড়ানো ছাত্রী, সিনিয়র-জুনিয়র পড়ুয়া এমন কী বেশ সুনামের করপোরেট অফিসের স্মার্ট সুন্দরীর মনের বাগানে ফোটা কাঠ গোলাপ, গন্ধরাজ, জুঁই, চামেলি, কামিনী, শিউলি, কাঁঠাল চাঁপা অনেকবার চুরি করেছে। যে মাত্র ধরা খেয়েছেঃ সবাই আমার কাছে নালিশ দিয়ে সালিশে হাজির হয়ে একই কথা বলেছেঃ

"ও চোর মন চোর, চুরি করেছে আমার মন।"

"ও চোর, ঘুম চোর,চুরি করেছে আমার ঘুম।"

"ও চোর, সুখ চোর, চুরি করেছে সব সুখ।"

ভাগ্যিস! হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গেলো। কেউ শিল্পী প্রীতমের গানে --ফুলে ফুলে মধু পান করে অবশেষে মন ভাঙ্গার নালিশ করেন নি।

 

ওর আসল নাম নির্ঝর। মাখনে পেটুক বলে- আদরে সবাই মাখন বলে। হোষ্টেলে প্রথম দিন নির্ঝরের মামা আমার হাতে দেখ ভালের দায়িত্ব দিয়ে বলেন,"মাখনের বাবা নেই; আমাদের বাড়িতে বড় হয়েছে। ডাক্তার হয়ে দেশসেবা করবে, আপনি ছাত্রনেতা প্লিজ! একটু দেখবেন।" অনুরোধ রাখতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। সবার কথা-আবাল ভোদাই জুনিয়র যেখানে লাইন ধরে ফরমায়েশ খাটবে; সেখানে কী করে- মাখন, ফাখন আমাদের রুমমেট হয়ে নাক ডেকে ঘুমোবে।

রতনের হাক্কা হুয়ার সাথে সাথে স্বপন, সৌরভ, কায়েস, ইমরুল কেয়া হুয়া! কেয়া হুয়া! প্রতিবাদে আমার মনটা ভেঙ্গে জবুথবু। মাখন আমার মনের অবস্হা বুঝে যে মাত্র চলে যাবে; কায়েসের মাখনকে প্রশ্ন: তুমি মনে কষ্ট পেলে? উত্তর-না। দ্যাখো তুমি মোষ্ট জুনিয়র।সবেমাত্র মেডিকেল কলেজে এসেছো! রুমে মানিয়ে চলতে পারবে তো?

উত্তর: দেখুন আমি মামাবাড়ির গরু রেখে,কাপড় ধুয়ে এমন কী! সাপের কামড়ে যখন মরিনি, ঠিকই পারবো। মুহুর্ত্যে সবার চোখের কোনায় কুয়াশা বিন্দু জল।কারোর মুখে কথা নেই, যাই হউক-মাখনের একটা গতি হলো। অল্পদিনে মাখন সবার প্রিয়জন হয়ে মশারি,মেসের খাবার, মাঝে মাঝে রান্নাকরা, এককথায়-ও আমাদের আপনজন। আমার ছোট ভাই নেই, কখন ছোট ভাইয়ের স্নেহের আসনে বসে আছে বুঝতে পারিনি।

 

আমি ছাড়া ও মাখন সবার স্নেহের আসন কখন নীরবে কেড়ে নিয়েছে;কেউ বুঝতে পারেনি।আমি না হয়, ওর জন্যে না খেয়ে বসে থাকি! সৌরভ,কামরুল,কায়েস?মাখন বেশ মেধাবি, টিউশনি বাজারে ওর বেশ চাহিদা। প্রতিদিন টিউশনি করে ফিরতে রাতের প্রায় এগারোটা ছুঁই ছুঁই।আমরা সবাই ইন্টার্নশিপ করছি।কেউ কেউ প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরির অফার পাচ্ছি।মাখন আমাদের আদর, আস্কারা পেয়ে কখন, কী ভাবে "লাভবার্ড"হয়ে সরিষা,সূর্যমুখী, যব,ধান,ভুট্টা হজম করে চলেছে;আমরা কেউ জানি না।যতো দিন যাচ্ছে-- আমাদের "লাভবার্ড মাখন"জন আব্রাহাম,দেব,জিৎ হয়ে ধানমন্ডি,বসুন্ধরা,গুলশান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জিমে সিক্স প্যাক শরীর!আব্রাহাম স্টাইল হেয়ার কাট,ব্র্যান্ড আইটেম সুগন্ধি,চনমনে দেহ মন;আমাদের আরো আদরে শীত মকমল কম্বলে পোষা "বাবু তুমি খাইছ"টাইপ ভালোবাসায় তুলতুলে ব্রাউন বেড়ালের মতো আদরে মিঁউ মিঁউ করে ডাকে।আমরা সবাই হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিই।

 

মাখনের ঘুমের ঘোরে তীব্র চিৎকার-প্রিয়া, লাবণি, সারিকা বিপাশা, রুহি, সাফিনা, নিহা, বর্ষা, পৌষি, আরোহি, জুলি, সাফা, বিজলি, চুমকি, প্রিয়াঙ্কা, মল্লিকা, জুঁই ডাকে হোষ্টেলে সবাই আঁতকে জেগে উঠি। আদরের লাভবার্ডের সেবা করে কাঁথা কম্বল টেনে দিই।

এদিকে নির্ঝর লাভবার্ডের শালিসের শুনানি চলছে। আমরা কী দন্ডে দন্ডিত করবো? শালিসের একটু দূরে ব্রেক কষে হাজির তিন তরুণী। হাঁফিয়ে-দাপিয়ে  যে-- মাত্র ছুঁই ছুঁই  ভাব; সোফিয়া, নাদিয়া, কিরণ, পিয়া বিপাশার সমস্মর চিৎকার। "খবরদার  ময়লা হাতে আমার বাবুকে ছুঁতে পারবা না কিন্তু।"শালিস পন্ড, দন্ডের তো প্রশ্নই নেই।" তেড়ে আসা তরুণী শিলা, বৃষ্টি, মেঘ বেশ কারাতে জানে। শিল্পপতি পরিবারের মেয়ে ওরা। নাদিয়া, কিরণ, পিয়া, বিপাশা, সোফিয়া আস্তে-আস্তে সরে পড়েছে।আমাদের লাভ বার্ড ভোদাইটারে সিক্স প্যাক করে ফ্যাশন সচেতনে এ কারাতে শিলা, বৃষ্টি, মেঘই দায়ী। কী করবো ভেবে পাচ্ছি না! এ পর্যন্ত প্রেম দূরে থাক--"Anatomy,Netter's Atlas of human embryology, junqueiara's Basic Histology, clinical anatomy, Happer's illustrated biochemistry,medical physiology, এনেস্থেসিওলজি, কমিউনিটি মেডিসিন পড়ে প্রেমের ধৈর্য্য, সহ্য, আবেগ, অনুরাগ কোনোটাই নেই।" প্রথম প্রথম হাতে তেমন টাকা পাইনি। বাড়ি হতে হাত খরচ যা পেতাম, তাতে মেসের ঝোলভাত, ডাল পর্যন্ত। অভাবের তাড়না নিয়ে পুরাতন ঢাকায় এক ছাত্রী পড়িয়েছি।

বনেদি পরিবার; ইডেন কলেজের ছাত্রী। নোট, হোম পরীক্ষা খাতা মূল্যায়ন করতে হোষ্টেলে নিয়ে আসতাম; খুলেই অবাক বিস্ময়ে ছাত্রীর প্রেমপত্রে-"প্রেম পবিত্র শুধু, প্রেম করিলে পাবে মধু, প্রেম করে যে জন, ভালো থাকে তার মন।" অনেক প্রেমপত্র পড়ে ও প্রেমপাত্র হতে পারিনি। বিয়ের অফার, বাড়ি, গাড়ির টোপ। এ রকমের অনেক ছাত্রী-যুবতীর প্রেম যুদ্ধে আমি বার বার হেরে  লক্ষণ সেনের মতো পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে প্রেম ইতিহাসের ভীরু-কাপুরুষ হয়ে আমাজন গহীনের দিগম্বর আদিবাসী গোত্রের বিষাক্ত তীর হতে নিজেকে রক্ষা করেছি। এর মাঝে তরুণীদের বেশ আনাগোনা হোষ্টেল গেটে বেড়ে গেছে। দারোয়ান দাদু'কে সোজা বলে দিয়েছি; কোনো তরুণী-যুবতী, গৃহিণী মাখনের কাছে আসবে না-না। আমার শেষ কথা।

আমাদের লাভবার্ড কে সবাই চোখে চোখে পাহারা দিচ্ছি। কাঁধে ক্যামেরা, হাতে স্পিকার নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া, জুম লেন্স ক্যামেরা হাতে আমাদের হোষ্টেল রুমের জানালা, দরজা, বাথরুম, হল রুম, ক্যাফেটেরিয়া, এমন কী মল ত্যাগের দৃশ্য ধারনে পাক-ভারত ক্রিকেট ম্যাচ উত্তেজনা নিয়ে তাক করে আছে। জুম লেন্স ক্যামেরা ইনসুইং, আউটসুইং দিয়ে ক্লিক ক্লিক লাইন-লেংন্থ নিনাশায় সাংবাদিক ভাইয়েরা বল করে যাচ্ছে। হোষ্টেল, রাস্তার দোকানি, গেইট পাহারার দাদু, বাবুর্চি এমন কী মশলা বাটা মরিয়ম, সিথি পর্যন্ত আমাদের ছোট ভাইকে "সর্বদা রাখিব নিরাপদ, দেখাবো পালানোর পথ।" দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে নিরাপদে রেখেছি। এ দিকে মায়ের দোয়া টিভি চ্যানেল লাইভ করছে।নারী সাংবাদিক, পুলিশ, বিমান বালা, নায়িকা, মডেল, স্কুল-কলেজ ছাত্রী, ভার্সিটি, সুমতি জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছাত্রীদের "we want love justice" প্ল্যাকার্ড হাতে খন্ড-খন্ড মিছিলে আমাদের হোষ্টেল চত্বর কানায় কানায় ভরে গেছে। চারিদিকে পরিপূর্ণ মানুষ আর মানুষ। কোনদিকে একটু ও ফাঁকা নেই। আমাদের নিরাপদে রাখতে কয়েকপ্লাটুন দাঙ্গা দমন পুলিশ ঘিরে রেখেছে।"লাভ চ্যানেল" সাংবাদিক লীলা চৌধুরী কেঁদে কেঁদে লাইভ করে চলেছেন। দেশ বিদেশের সব ডাক্তার আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেনঃ আমরা কী বলি--কী করি? ডাক্তার সমাজের 'দ্য প্রেস্টিজ' বলে কথা!

 

ছাত্রী,নায়িকা, মডেল, নারীবাদী  আমাদের মাখনের আমুদে নামে বেশ ডাকছে। "ও কারোর কাছে-বাবু খাইছো; নায়িকার বশীরাজ, মডেলের আরবাজ, বিমানবালার প্রেমরাজ, বিধবার স্বপ্নবাজ, নারীবাদের যৌনদস্যু।" ওয়ান ওয়ে রাস্তা! প্রচন্ড জ্যামে পড়ে শিশু, নারী, অসহ্য গরমে কাঁদছে। মিডিয়া গুলো লাইভ করছে। সবার একটি প্রশ্নের জবাব আজ লাভবার্ড মাখনকে দিতেই হবে। "কেনো সবার মন ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছে?" এতোদিন সবার মনে মনে প্রতিমূহুর্তে লাভ মোবাইল কোর্ট বসিয়ে কী কারনে ভালোবাসা জরিমানা করে মনের অলি-গলি ঘুরেছে! লাভ জরিমানা রশিদ কাউকে দেয়নি কেনো? লাভ মিনিস্টার (love Minister) সেফুদা এসে পুলিশ কমিশনার মিঃ চৌধুরী'কে সাথে নিয়ে লাভবার্ড কে বকুল ফুলের মালা পড়িয়ে দেন, অসংখ্য লাইভ সম্প্রচার চলছে। 

সবদিকে লাইভে হাজারো প্রেম পিয়াসি যুবতীর হৃদয় ভাঙ্গার গান শুনতে সারাজীবন প্রেম বিরহ কাতর-প্রেম ভিক্ষুক-সুকুমার বাউল বৃদ্ধ বয়সের শেষ আহাজারি সঞ্চয়- "বলবোনা গো, আর কোনদিন ভালোবাসো শুধু মোরে" গানটি লাইভে গাইতে রওনা করেছেন। সুকুমার দাদু লাভবার্ড নির্ঝর ওরফে মাখনের কাছে শিখবেন; কী করলে-- হাজারো নারী প্রেম পিয়াসী হয়! পুরুষদের বিশ্বাস করে, হাসে--কাঁদে। লাভ মিনিস্টার সেফুদা "প্রেম সম্রাট" দাবিতে অনড় না থেকে নির্ঝরের  লাভ কোর্টে সেরেন্ডার করেছে। শব্দবোমা না মারার শর্তে উনাকে "লাভ মিনিস্টার" হিশেবে পরীক্ষাসাপেক্ষ দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে।

 

এবার সে কাংখিত লাভবার্ড নির্ঝর ওরফে মাখনের বক্তৃতার পালা-

প্রিয়জন আমার,

আমি সবাইকে ভালোবাসি। আমি দেশের প্রতিদিন সংবাদে ভালোবাসা প্রতারণা- ধর্ষণের তিনশত পঁয়ষট্টি দিনের একটি হিসেব করে দেখেছি- বছরে এ স্বাধীন দেশে হাজারের উপরে নারী ধর্ষিত হয়। (অন্য নির্যাতন বাদে) শ্রীলংকা, সিরিয়া, ইরাক যুদ্ধে ও এতো নারী নির্যাতিত হয়নি। আজ আমার (Mobile love) ভ্রাম্যমান প্রেমে কোনো যুবতী, নারী অসতী হয়নি। কেউ স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেয়নি! কেউ প্রতারিত হয়নি। আমার মতো এ দেশে হাজারো মাখন আছে; কিন্তু তাদের সৎ মন, সাহস, চিন্তা কোনোটা নেই। এ দেশের প্রায় পুরুষ আমৃত্যু নারীর  স্তন, যোনি, মাংসল নিতম্ব, পুরু ঠোঁট, চিন্তাতে জীবনের বেশ দীর্ঘপথ পাড়ি দেন।আমি যেখানে যাইঃ যা করি, বলি কথার কথা নিয়ে বলিনা। নারীদের শ্রদ্ধা করি, শ্রদ্ধার আসনে যাপিত জীবনে আমার লাভ কোর্টে চলার পথে ফেসবুক, ইউটিউব ও ভার্চুয়াল সততা নিয়ে সমাজের অবহেলিত নারীদের সাহস ও বুদ্ধি দিয়ে পাশে থেকেছি, ভালোবেসেছি। ভালোবাসা অনুভবে, প্রকাশে নয়। যার যতো বেশি ভালোবাসা; তার প্রকাশ ততো কম। সবার জীবনে মোবাইল লাভ (ভ্রাম্যমান প্রেম) সফলতা বনে আনুক।

সূর্য আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে। পাখিরা বাসায় ফিরে যাচ্ছে। আগামী সকালের প্রাণময়, মনোময় আশা নিয়ে উর্বশীর হাতে হাত রেখে নির্ঝর সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।  

 

রাজীব কুমার দাশ
ইন্সপেক্টর অব পুলিশ বাংলাদেশ, প্রাবন্ধিক ও কবি



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top