সিডনী রবিবার, ৩রা মার্চ ২০২৪, ২০শে ফাল্গুন ১৪৩০


বিশ্বকাপ ক্রিকেট এবং রুচির দুর্ভিক্ষ


প্রকাশিত:
২৬ নভেম্বর ২০২৩ ১৬:১১

আপডেট:
৩ মার্চ ২০২৪ ১৬:২৮

 

একজন শিশু জন্ম গ্রহনের পর মানসিক ভাবে গড়ে উঠে নিজ গৃহে,পাড়ায়, সমাজে এবং বন্ধুদের সাথে মেলামেশার মধ্য দিয়ে। এইভাবে হিংসা বিদ্বেষ প্রেম ভালবাসা মানবতা পরোপকারিতা বিভিন্ন ভালমন্দ গুন তাঁদের মনের মধ্যে গেথে যায়। ভালো-মন্দ বিভিন্ন গুনাগুন অর্জন করে। এই অর্জনের মধ্য দিয়ে কেউ কেউ কেউ হিংস্র জানোয়ারের মতো সাম্প্রদায়িক মানসিকতা নিয়ে বিকাশ লাভ করে। কেউ কেউ মানবীয় হয়ে় অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্প্রতি বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফাইনাল নিয়ে বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবাংলার দর্শকদের মধ্যে যে বিরূপ অশালীন মন্তব্য এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে উচ্ছাস তা একেবারেই নিম্নমানের, লজ্জাজনক। শুধু্ সোশ্যাল মিডিয়াই নয় , কিছু টিভি চ্যানেলে এগুলো প্রচার করে তারা আত্মতৃপ্তি লাভ করছে । এইসব হইহুল্লোড়ের মধ্য দিয়ে যা জানা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া জিতার জন্য তাদের আনন্দ যে নয় - ভারত হেরেছে এই জন্যেই তাদের ফুর্তি। হ্যাঁ খেলাতে অনেকেই বিভিন্ন দেশের সমর্থক হতে পারে ।আমি দেখেছি আমাদের পাড়ায় কয়েকজন ছেলে আছে তারা সব সময় অস্ট্রেলিয়া টিমকে সমর্থন করে। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে অস্ট্রেলিয়ার খেলা হলে তারা পুরা দমে বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে বেশ কিছু প্রজাতির লোক আছে যারা বাংলাদেশ পাকিস্তান খেলা হলেও তারা এতটাই পাক প্রেমিক যে বাংলাদেশের একটা উইকেট পতন হলে বা পাকিস্তানের প্লেয়ার একটা ছক্কা মারলে যেন তারা পাকিস্থানি ফ্ল্যাগ নিয়ে উন্মাদের মত নাচতে থাকে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফাইনাল খেলায় অস্ট্রেলিয়া জেতার জন্য অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিম ও প্লেয়ারদের যারা পছন্দ করে তারা আনন্দ উচ্ছ্বাস করতেই পারে ।এটা তাদের পছন্দের টিম জিতেছে সেই কারণে ।কিন্তু এক টিভি চ্যানেলে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু ছবি ও মন্তব্যে দেখলাম অস্ট্রেলিয়া জিতেছে তার জন্য তারা আনন্দ করছে না , আনন্দ করছে ইন্ডিয়া হেরেছে বলে ।যেন পাগলের গোবদেই আনন্দ। আবার কিছু ভারতীয় বাঙালি আছে তারাও তাদের মন্তব্যে বাংলাদেশকে বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বাজে বাজে মন্তব্য করে যেন আমরা একেবারে নিকৃষ্ট টিম । তাদের মনে রাখা উচিত এই অধম দলের কাছেই তাদের উত্তম দল একদিন ধরাশায়ী হয়েছিল। মনে রাখতে হবে সাকিবুল হাসান বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার । ভালো পারফরম্যান্সের জন্য আমাদের দেশের কয়েকজন প্লেয়ার কে আইপিএলে আমন্ত্রণ জানানো হয় ।বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতের একটা প্রদেশের সমতুল্য। বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবাংলার একাদশ গঠন করে একবার খেলার ব্যবস্থা করলে দেখা যেত কে কেমন খেলে। ক্রিকেট হচ্ছে সম্পূর্ণ একটা অনিশ্চিত খেলা। যে ম্যাক্সওয়েল আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে হিরো হয়েছিল সেই ম্যাক্সওয়াল সেমিফাইনালে জিরো হয়েছে। অতএব ক্রিকেট নিয়ে অত মাতামাতি করা বাঞ্ছনীয় নয়। যা হোক প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কেন এই ভারত বিরোধিতা। অনেকেরই অভিমত জেনেছি । ভারত দাদাগিরি দেখায়, আধিপত্য বিস্তার করে ,তিস্তার জল বন্টন সমস্যা ইত্যাদি বিভিন্ন দিক চিহ্নিত করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক পরিবেশে গড়ে উঠে বড় হয়েছে এই বিষয়টা সবচেয়ে প্রধান মনে করি। লিটন দাস এর ক্ষেত্রেও দেখেছি ভালো রান করলে এমনকি শত রান করলেও যত না আনন্দ উচ্ছ্বাস । তার চেয়ে অনেক অনেক গুন বিরূপ অশালীন সাম্প্রদায়িক মন্তব্য হয় যদি শুধু এক দুই রান করে আউট হয়ে যায় কিংবা ক্যাচ মিস করলে। ভারতের বিরূপ মন্তব্যের পেছনে যতটুকু জেনেছি তারা অনেকেই বাংলাদেশকে আন্ডার এস্টিমেট করে ।কারণ একাত্তরের ভারতের সহযোগিতার কথা নাকি বাংলাদেশ মনে রাখেনা ।অনেক বাংলাদেশী ৪৭ এর দেশভাগের পর থেকে এখনো পর্যন্ত কেউ কেউ নিগ্রহ হয়ে কেউ কেউ নিরাপত্তার কারণে বা অজুহাতে ইন্ডিয়ায় চলে গেছে ।এই কারণে তাদের বাংলাদেশের প্রতি বা জন্মভূমির প্রতি দেশপ্রেম কমে গেছে । যাই হোক উভয় দেশের কিছু কিছু লোকজনের মধ্যে সম্প্রীতি সদ্ভাব কমে গেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । এরমধ্যে বাংলাদেশের সংখ্যায় বেশি এই জন্যই যে একাত্তরে পরাজিত শক্তির বংশধর এখন জনসংখ্যায় অনেক বেড়ে গেছে। ভারত বিরোধী শক্তির রাজনীতিও এই বিরোধিতার একটা উপাদান। এই পরিবেশে থেকে অন্যান্য পরিবারের সন্তানেরাও বেড়ে উঠেছে ভারত বিরোধী মানসিকতা নিয়ে। আগেই বলেছি অস্ট্রেলিয়া জিতেছে বলে বাংলাদেশে এতো হই হুল্লার তা নয়।শুধু ভারত হেরেছে বলে এই কারণে । এই ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া না হয়ে অন্য কোন দেশ হলেও এমন ঘটনা ঘটতো। ভারত বিরোধী উচ্ছাসে একই হতো। প্রতিবেশী দুই দেশের পরস্পর বিরূপ অশালীন প্রতিক্রিয়াপূর্ণ লেখালেখি এবং উচ্ছ্বাস কোনক্রমে কাম্য নয় । উভয় দেশের ক্রীড়ামোদী, সংস্কৃতি কর্মী ,অসাম্প্রদায়িক সুশীল সমাজ এবং মিডিয়ার দায়িত্ব আছে এগুলোর খুত ধরে ধরে বিশ্লেষণ করে এই প্রজন্মের কাছে একটা আস্তা ও বিশ্বাসের জায়গা সৃষ্টি করা। যেমনই করে কাজী নজরুল ইসলামের "কারার ঐ লৌহ কপাট "গানের সুর এ আর রহমান বিকৃত করায় উভয় দেশের শিল্পী সাংস্কৃতিক কর্মী কলাকুশলী প্রতিবাদে সামিল হয়েছে সেই ভাবে এগিয়ে আসতে হবে এই প্রজন্মের সন্তানদের মনের মধ্যে জমে থাকা রুচির দুর্ভিক্ষকে অবদমিত করার জন্য।


প্রসাদ ফণী (রতন)
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, নওগাঁ , বাংলাদেশ
বর্তমানে সিডনি প্রবাসী


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top