সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২৬শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭


যুদ্ধবন্দীদরে সাথে রাসুল সা. কেমন আচরন করতনে : মুন্সি আব্দুল কাদরি


প্রকাশিত:
২৬ অক্টোবর ২০২০ ১৬:৫১

আপডেট:
২৬ নভেম্বর ২০২০ ২৩:৪৮

 


মানুষ স্বভাবত শত্রুর উপর প্রতিশোধ নিতে চায়। শত্রু কে চিরতরে বিনাশ করতে চায়। শত্রুর শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলতে চায়। কোন শত্রু অবশিষ্ট থাকুক এটা কেউ চায় না। সকল মানুষ শত্রু মুক্ত থাকতে চায়। আর সে যদি শত্রুর উপর শক্তিশালী হয় তাহলে আর কথাই নেই। আমরা বিজ্ঞানের এক চরম উৎকর্ষতার যুগে বসবাস করছি। বর্তমান পৃথিবীর মানুষ নিজেকে সবচেয়ে সভ্য মনে করে। আর পশ্চিমাদের কথা আলাদা তারা মানবতার ঠিকাদার। পৃথিবীতে যে কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলবে তবে তার ঠোটে কুলুপ এটে দেওয়ার সব আয়োজন করতে তারা একাট্টা হয়ে যায়। এমন কি তাদের শেষ করে দেওয়ার জন্য তারা কম চেষ্টা করে না। তাদেরকে মেরে ফেলে। বন্দি হলে চরম থেকে চরম নির্যাতন চালায়।  

ইসলাম শান্তির পরিবেশে কী যুদ্ধের ময়দানে সব খানে মানবতাবাদী। পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম নেই যে ইসলামের চেয়ে সুন্দর মানবতা উপহার দিতে পেরেছে বা পারবে। দেখুন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের দিকে। নবুয়ত প্রাপ্তির আগে যিনি ছিলেন মক্কার সকলের বিশ^স্ত ও প্রিয়ভাজন। যেই তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হলেন। শুরু হলো শত্রুতা থেকে চরম শত্রুতা। শিয়াবে আবু তালেবে অবর্ণনীয় দুঃখ যাতনা। সাহাবাদের উপর চরম নির্যাতন। সাহাবাগন চরম কষ্টের কারনে সব কিছু ছেড়ে প্রথম বার আবিসিনিয়া তার পর মদিনায় হিজরত করলেন। মক্কার লোকসকল জীবন শত্রুতে পরিনত হল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সব ছেড়ে মদিনায় হিজরত করলেন। কত অমানবিক যাতনা। এই রাসুল যখন বদর যুদ্ধে বিজয় লাভ করলেন। মক্কার ৭০ জন কাফের নিহত হল আরো ৭০ জন বন্দি হল। আর  কারা বন্দী কারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আব্বাস, খালেদ বিন ওয়ালিদের ভাই ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, সোহায়েল ইবনে আমরের মত আবরের বিখ্যাত বক্তা। আবু সুফিয়ানের ছেলে আমর ইবনে আবু সুফিয়ান। এরকম উঁচু দরের ৭০ জন কয়েদী। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজয়ী সাহাবাদের তাদের সাথে ভাল আচরণ করার নির্দেশ দিলেন। সম্মাুখ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ৭০ জন কাফেরকে হত্যা করার পর বিজয় লাভ। ৭০ জন বন্দী। এমন অবস্থায় তাবত দুনিয়ার মানবতাবাদীরা কি করতেন বা কি করছেন। আর রাহমাতুল্লিল আলামিন ঘোষনা দিলেন, ভাল ব্যবহার করো। এবার দেখি বন্দিদের মুখে সেই সময়কার ঘটনা। আবু আজিজ ইবনে উমায়ের রাঃ বলেন, বদরের দিন এক আনসারী ব্যক্তি আমাকে কয়েক করার জন্য বাঁধছিল। এই সময় আমার ভাই মুসআব এদিক অতিক্রম করছিল। তিনি আমার পক্ষপাতিত্ত্ব করার পরিবর্তে আনসারীকে বলেন, তাকে ভাল করে বেঁধে নাও। তার মা একজন ধনাঢ্য মহিলা। তোমরা ভাল মুক্তিপন পাবে। আমরা যখন মদিনায় পৌঁছি তখন আমাকে এক আনসারীর জিম্মায় দেওয়া হয়। সকাল সন্ধায় যখন আনসারীর পরিবার খাবার খেত তখন আমাকে ওরা রুটি দিতেন আর নিজেরা খেজুর খেতেন। তখন মদিনায় খেজুরের চেয়ে রুটির দাম বেশি ছিল। এই কারনে আমার খুব লজ্ঝা লাগত এবং রুটি নিতে আমি অস্বীকৃতি জানাতাম। কিন্তু তাদের পিড়াপিড়ির কারনে আমি রুটি খেতে বাধ্য হতাম। ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা বলেন, আমাকে বন্দি হিসাবে যার জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল তিনি এতো উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন যে আমাকে বাহনে আরোহন করাতেন আর নিজে পায়ে হেটে চলতেন। বর্তমান কালের কোন চক্ষুসমান ব্যক্তি কি এরূপ উন্নত আচরণ কল্পনা করতে পারে? সাহাবাগন নিজেরা কষ্ট করে খেজুর খাচ্ছেন আর বন্দিদের দামী খাবার রুটি খাওয়াচ্ছেন। নিজেরা পায়ে হেটে চলছেন আর বন্দিদের বাহনে আরোহন করাচ্ছেন?

মুসআব বিন ওমায়েরের ভাই আবু ওযাইর বিন ওমায়ের রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বদরের যুদ্ধে বন্দীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাগনকে নির্দেশ দিলেন তারা যেন বন্দীদের সাথে ভাল আচরণ করে। আমি আনসারদের একটি দলের জিম্মায় ছিলাম। যখন তারা তাদের সকাল সন্ধ্যার খাবার নিয়ে আসত তখন তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মোতাবেক তাদের সাথে খেজুর নিয়ে আসত যা তারা নিজেরা খেত এবং আমাকেও খাওয়াত।

ওমর রাঃ সোহাইল ইবনে আমরের সামনের দুটি দাঁত ভেঙ্গে দিতে চাইলেন। সোহাইল ছিল ভাল বক্তা। যে সে আর বক্তৃতা দিয়ে জনগনকে ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারবে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওমরের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। বললেন কিয়ামতের কঠিন দিনে আমি নবী হলেও আমাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। কত কঠিন কথা। চিন্তাশীল ব্যক্তিরা বলুন ইসলাম মানবতা শিখিয়েছে না অন্য কেউ?

জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধের দিন বন্দিদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হাজির করা হল, তাদের মধ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আব্বাস ও ছিলেন। তাদের শরীরে কাপড় ছিল না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জন্য কাপড় সংগ্রহ করলেন। আব্দুল্ল্হা ইবনে ওবাই এর জামাটি আব্বাস রাঃ শরীে র মানানসই হল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই জামাটি আব্বাস রাঃ কে পরিয়ে দিলেন।এ জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর  মৃত্যুর পর নিজের জামা খুলে আব্দুল্লাই ইবনে ওবাইয়ের ছেলেকে দিয়ে দিলেন। যেন তা দিয়ে আব্দুল্লাহ  ইবনে ওবাইকে দাফন করা হয়। বোখারী।

আবু আইয়ুব রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, যে ব্যক্তি বন্দী মাকে তার সন্তানের নিকট থেকে দূরে রাখে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার এবং তার প্রিয় লোকদের মাঝে দূরত্ব তৈরী করে দেবেন। তিরমিজি।

যে মক্কায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করল। রাতের আঁধারে সাথী আবু বাকার রাঃ নিয়ে মদিনায় পাড়ি জমালেন। তের বৎসর তাঁর সাথী গন কত নির্যাতন সহ্য করলেন। মদিনার ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটিকে শেষ করে দেওয়ার জন্য কত যুদ্ধ চাপিয়ে দিল। কত রক্ত সাগর পেরিয়ে আজ মক্কায় বিজয়ী বেশে হাজির হলেন। এসে কাবার দরজায় দাড়িয়ে কি বললেন একটু কান পেতে শুনুন। তিনি বললেন হে কোরাইশরা আজ আমি তোমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করব বলে তোমরা মনে কর। তারা বলল আমরা তোমার কাছে ভাল ব্যবহার কামনা করি, কারণ তুমি আমাদের ভাল ভাই এবং ভাল ভাইয়ের ছেলে। তিনি জবাবে বললেন, তোমরা যাও আজ তোমরা মুক্ত। এর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে বসলেন তাঁর নিকট আলী রাঃ ছিলেন এবং কাবা ঘরের চাবি আলী রাঃ এর হাতে ছিল। আলী রাঃ আবেদন করলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা আপনার উপর রহম করুন। কাবার ঘরের গিলাফ লাগানো এবং হাজীগনের পানি পান  করানো আমাদের দায়িত্বে দিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন উসমান ইবনে তালহা কোথায়? উসমান ইবনে তালহাকে ডাকা হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন , হে উসমান এই নাও কাবা ঘরের চাবি। আজতো কল্যাণ ও ওয়াদা পূরণ করার দিন। আবু হুরায়রা রাঃ অন্য হাদিসে বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করে ঘোষনা দিলেন, যে ব্যক্তি তার ঘরের ভিতর অবস্থান করবে যে নিরাপত্তা পাবে, যে ব্যক্তি তার অস্ত্র ফেলে দিবে সে নিরাপত্তা পাবে। আবু বাকরা রাঃ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন জিম্মিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাত হারাম করে দেবেন।

এই হল ইসলামের নবীর অনুপম আদর্শ। যা অক্ষরে অক্ষরে সাহাবাগন পালন করেছেন। পৃথিবীবাসীর সামনে আজো উজ্জল নক্ষত্রের মত আলোক ছড়িয়ে যাচ্ছে। কারো প্রতি কোন জুলুম নয়, নির্যাতন নয় শুধু ভালবাসা ছড়িয়ে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তারও হিদায়েত কল্যাণ কামনা করেছেন। শত্রুকে ভালবাসা দিয়েছেন, নিরাপত্তা দিয়েছেন। সত্যিকার অর্থে রাসুল প্রেমিক হবে সবচেয়ে বড় মানবতাবাদী। তার দ্বারা কখনও কোন বিশৃংখলা, ফিতনা, সন্ত্রাস ইত্যাদি কিছুই হতে পারে না, পারবে না। আসুন আমরা নিজেরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ লালন করি। দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হই।

 

মুন্সি আব্দুল কাদির
সিনিয়র অফিসার ও জেনারেল ব্যাংকিং ইনর্চাজ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড
লালদীঘির পাড় শাখা
সিলেট

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top