সিডনী শনিবার, ৬ই মার্চ ২০২১, ২২শে ফাল্গুন ১৪২৭


মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান : মোঃ শামছুল আলম


প্রকাশিত:
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:১০

আপডেট:
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:৪০

 

১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদেরকে নিয়ে পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যদিও ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক দিয়ে ছিল ভিন্নতা। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী তাদের স্বীয় মাতৃভাষাকে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র চালায়। তাদের এ চক্রান্তকে নস্যাৎ করতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলার দামাল ছাত্রগোষ্ঠী মাতৃভাষার টানে রাজপথে নেমে এসেছিল। পুলিশের বুলেটের সামনেও তাদের মাতৃভাষাকে পদানত করতে দেয়নি।
সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার প্রমুখ এ মাসেই ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনে বাঙ্গালী এমন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে যেমনটা বিশ্বের কোথাও খুজে পাওয়া যাবে না! সহিংস এবং রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি মাতৃভাষা বাংলা।
মাতৃভাষার এ অকৃত্রিম ভালোবাসাকে স্মৃতিময় করতে ২০০০ সালে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারি এবং বাংলাভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তাই বাংলাদেশি হিসেবে আমরা গর্বিত যে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে বিশ্বের বুকে জায়গা দখল করে নিয়েছে। প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ তার লেখা কবিতায় এ বিষয়টিকে পরিষ্কার করে তুলে ধরেছেন-
‘ও আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান বিশ্ব ভাষার সবই তোমার রূপ যে অনির্বাণ।’

মাতৃভাষার প্রতি অম্লান ভালোবাসার পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি পবিত্র ইসলাম আমাদেরকে দিয়েছে।
আল্লাহ তায়ালার নিয়ামতের অফুরন্ত ভাণ্ডার ঘিরে রেখেছে সৃষ্টিকুলকে। তার কোনো নিয়ামতই গুরুত্বের দিক থেকে কম নয়। তবে কিছু কিছু নিয়ামত প্রয়োজন ও অপরিহার্যতার বিচারে একটু বেশিই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্য স্রষ্টা তাদের যে ভাষার নিয়ামত দান করেছেন সেটাও এর অন্তর্ভূক্ত। মনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ আকুতিকে প্রকাশ করার জন্য আমরা মুখের মাধ্যমে অর্থপূর্ণ যে শব্দ বের করি সেটাই ভাষা। ভাষাকে আল্লাহ তাআলা তার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভাষা ছাড়া মানবসভ্যতা অচল! বাকহীন নিথর কোনো ভূখণ্ডে বেঁচে থাকা কতটা যে দুর্বিষহ তা বোঝানো মুশকিল। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মানবসভ্যতাকে ছন্দময় করে তোলার জন্যই আল্লাহ তা‘আলা আশরাফুল মাখলুকাত তথা মানুষকে দান করেছেন ভাষার নিয়ামত।

সব প্রাণীরই স্ব স্ব ভাষা আছে, নিজেদের মধ্যে ভাব-বিনিময়ের মাধ্যম জানা আছে। কিন্তু মানুষের ভাষার মতো এত স্বাচ্ছন্দ্য, সহজাত ও সমৃদ্ধ ভাষা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এবং সেরা জীব হওয়ার মহাত্ম্য।

প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করার পর সর্বপ্রথম আল্লাহ তায়ালা তাকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। পবিত্র কোরানে ইরশাদ হয়েছে-
‘মানব জাতিকে তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং বর্ণনা করার জ্ঞান দিয়েছেন।' (সূরা আর রহমান: ৪)
এই পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজারের অধিক ভাষার অস্তিত্ব আছে! বিচিত্র ভাষায় বিভিন্ন মানুষ কথা বলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
‘আর তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি, ভাষা ও বর্ণের মধ্যে পার্থক্য। নিশ্চয়ই এর মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে’- (সুরা আর-রুম : ২২)।
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী রাসুল দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর নাজিলকৃত আসমানি কিতাব তারা স্বজাতির মাতৃভাষায় প্রচার করতেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
‘আমি সব পয়গম্বরকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে তারা পরিস্কার করে বোঝাতে পারে’- (সুরা ইব্রাহিম : ৪)।

হজরত মুসা (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ভাষা ছিল ইবরানি, তাই তাওরাত নাজিল হয়েছে সে ভাষায়, হজরত দাউদ (আঃ)-এর কওমের ভাষা ছিল ইউনানি, তাই জাবুর কিতাব নাজিল হয়েছে ইউনানি ভাষায়। হজরত ঈসা (আঃ)-এর গোত্রের ভাষা ছিল সুরিয়ানি, তাই এ ভাষায় ইনজিল কিতাব নাজিল হয়। প্রিয় নবী (সাঃ)-এর উম্মতের ভাষা ছিল আরবি, তাই আরবি ভাষায় কোরআন নাজিল হয়।
বিশ্বনবী (সাঃ) মাতৃভাষাতেই কোরআনের বাণী প্রচার করে জগতকে আলোকিত করে তুলেছেন।
প্রিয় নবী (সাঃ) ছিলেন আরবের সবচেয়ে সুন্দর ও শুদ্ধভাষী। তিনি কোনো দিন একটি অশুদ্ধ শব্দ ও বাক্যও উচ্চারণ করেননি।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। তাই মহানবী (সাঃ)-এর আদর্শ অনুসারে আমাদেরও উচিত বিশুদ্ধ মাতৃভাষা ব্যবহার করা।
প্রত্যেক ভাষাভাষীর দায়িত্ব হলো, নিজ নিজ মাতৃভাষাকে সম্মানের সাথে চর্চার মাধ্যমে সমুজ্জ্বল করে তোলা। আমাদেরও উচিত হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রিয় ভাষা বাংলাকে বিশ্বের দরবারে মহীয়ান করে তোলার জন্য আকুল প্রয়াস চালানো। তবেই মাতৃভাষার প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ পালিত হবে এবং স্রষ্টার নিয়ামতের যথার্থ কদর করায় আমরা বিশেষভাবে মূল্যায়িত হব।
পৃথিবীতে বাংলা ভাষা আজ ২৮ কোটি বা তারও বেশি মানুষের ভাষা। জনসংখ্যার বিচারে এই ভাষা সপ্তম অবস্থানে আর মাতৃভাষার দিক থেকে পঞ্চম।
এথনোলগের বিশ্বভাষাবিষয়ক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর ১০টি দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশিই হবে। বাংলা ভাষা শুধু বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মাতৃভাষাই নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, আসাম, বিহারসহ আরও কয়েকটি প্রদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বাংলা ভাষার চর্চা করে থাকেন।
কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য, যে লক্ষ্য, চেতনা ও আবেগ নিয়ে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল আন্দোলনের এতো বছর পরও এই সময়ের সে চেতনার প্রতিফলন তথা মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি!
যে প্রেরণা নিয়ে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল মাতৃভাষা বাংলার প্রতি নবপ্রজন্মের সেই ভালোবাসা নেই বলে মনে হচ্ছে! হিন্দি সিনেমা ও সিরিয়াল দেখে দেখে শিশুরা হিন্দি কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে! উচ্চবিত্তরা তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তরুণ সমাজ পশ্চিমা অশ্লীল সংস্কৃতিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। এটিকে অনেকে এক ধরণের আভিজাত্য বলে মনে করে থাকেন!
রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে ভাষার ব্যবহার করার কথা থাকলেও আজও বেশিরভাগ জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছে ইংরেজি ভাষা! সরকারি বিভিন্ন পদ ও বিচারিক কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার না করে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে!
আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি এ রকম উদাসীনতা মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা ও ভাষা শহীদের আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করার শামিল। তাইতো দুঃখের সহিত কবি ফয়েজ উল্লাহ রবি বলেছিলেন-
“দুঃখ মনের কোণে, যদি কোন শহীদ থাকতো বেঁচে,
আজ সত্যিই ভাষার এমন হাল দেখে, যেতো যে মরে।
হারিয়েছি দিক বীর সেনানীর দেখানো সোনালী সে পথ,
উন্নতির যতোই উপরে উঠিনা কেন, থেমে গেছে রথ।”

দেশপ্রেম যেমন ঈমানের অংশ, ঠিক মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থাকাও ঈমানের অপরিহার্য বিষয়। তাই দেশের সব নাগরিকের উচিত, ব্যক্তি, জাতি ও দেশ মাতৃকার জন্য, ভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়োজনে সবাইকে এক ও অভিন্ন থাকা। আল্লাহ তাআলা বাংলা ভাষাভাষী সবাইকে মাতৃভাষার প্রশ্নে এক কাতারে শামিল থাকার তাওফিক দান করুন।

 

মোঃ শামছুল আলম
লেখক ও গবেষক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top