সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৩০শে জুন ২০২২, ১৬ই আষাঢ় ১৪২৯


সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মোহাম্মদ (সা.) : মোঃ শামছুল আলম


প্রকাশিত:
২১ জুন ২০২২ ১৬:১৫

আপডেট:
২১ জুন ২০২২ ১৭:৩৩

 

মহানবী মুহাম্মাদ (সা.) সর্বশেষ নবী। দুনিয়ার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব। কুরআন এবং মুসলিম উম্মাহই কেবল তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দেয়নি, দিয়েছেন অমুসলিম মনীষীরাও। ‘মাইকেল হার্ট’ যিনি বিশ্বের সর্বকালের সবচাইতে প্রভাবশালী একশত সেরা মনীষীর জীবনী লিখেছেন, তিনি সেই জীবনী তালিকায় প্রথমেই মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে স্থান দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “মুহাম্মদ (সা.) এর সাফল্যের মধ্যে জাগতিক ও ধর্মীয় উভয় বিধ প্রভাবের এক অতুলনীয় সংমিশ্রণ ঘটেছে। এজন্য সংগতভাবেই তাঁকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।” -(দ্যা হ্যান্ড্রেড) 

ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুইর যথার্থ বলেছেন, “The Prophet his real greatness- a master mind not only his own age but of all ages.” অর্থাৎ, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিরাট ব্যক্তিত্ব ও অপূর্ব মননশীলতা শুধু তৎকালীন যুগের পরই নয়, সর্বযুগের ও সর্বকালের মহামানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক।”

রাসুল (স.) সম্পর্কে "Mahatma Gandhi" এর সুন্দর মুল্যায়ন-
I wanted to know the best of the life of one who holds today an undisputed sway over the hearts of millions of mankind.... I became more than ever convinced that it was not the sword that won a place for Islam in those days in the scheme of life. It was the rigid simplicity, the utter self-effacement of the Prophet the (SM) scrupulous regard for pledges, his intense devotion to his friends and followers, his intrepidity, his fearlessness, his absolute trust in God and in his own mission. These and not the sword carried everything before them and surmounted every obstacle. When I closed the second volume (of the Prophet's biography), I was sorry there was not more for me to read of that great life.( প্রকাশিত হয় Young India,'1924.)

পৃথিবীতে নবী-রাসুলদের আগমনের ধারাক্রম মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে শেষ হয়েছে। তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। ফলে তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছেন। কিয়ামত পর্যন্ত আগত সব মানুষ ও জিন তাঁর আনীত শরিয়ত (জীবনবিধান) মানতে বাধ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সবার প্রতিই আল্লাহর রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। ’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭৫)

জাহেলিয়াপনায় কলুষিত, পাপাচারে নিমজ্জিত, ঘোর অন্ধকার সমাজ/ভূ-পৃষ্ঠে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগস্ট (১২ রবিউল আউয়াল, সোমবার প্রত্যুষে) মা আমিনার গর্ভে যাঁর শুভাগমন ঘটে।
মহানবী (সাঃ) আরব সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সংস্কার সাধন করেন যার মধ্যে সমাজ সংস্কার অন্যতম। তিনি শতধা বিভক্ত, মারামারি-হানাহানিতে লিপ্ত, দস্যুবৃত্তিতে পরিপূর্ণ, অন্ধকারাচ্ছন্ন সেই আরব সমাজকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সভ্য, আদর্শপূর্ণ ও আলোকিত সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তাঁরই হাতে গড়া আদর্শবান, উন্নত চরিত্রের অধিকারী সাহাবাদের সহযোগিতায় ন্যায়নীতি ও সাম্যের ভিত্তিতে আরবকে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ জাতিতে পরিণত করেন। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বব্যাপী তাঁর সংস্কারসমূহ ছড়িয়ে দিয়ে মহাবিপ্লব সাধন করতে সক্ষম হন।

ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবন মহানবী (সাঃ) এর সংস্কারসমূহকে ‘এক অতিস্মরণীয় বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেছেন।
’আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে মানবতার মুক্তির দূত ও সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। xপবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র জগতের প্রতি শুধু রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি। ’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)
আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সা.)-কেই শুধু সম্মানিত করেননি; বরং তাঁর উম্মতকেও সম্মানিত করেছেন। তাদের অন্য উম্মতের জন্য সাক্ষ্য ও আদর্শ বানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘এভাবে আমরা তোমাদের একটি উত্তম জাতিরূপে গড়ে তুলেছি, যাতে তোমরা গোটা মানবজাতির জন্য সত্যের সাক্ষ্যদাতা হতে পারো এবং রাসুল যেন তোমাদের সাক্ষ্য বা নমুনা হন।’(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা ঈমানের অংশ। আর ভালোবাসার প্রকাশ হবে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী! আপনি বলে দিন যে যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তাহলে আমার অনুকরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩১) অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আপনি উত্তম চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।’(সুরা : কালাম, আয়াত : ৪)

মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের মাধ্যমেই মানুষ অন্ধকার থেকে আলোর পথ লাভ করতে পারবে। আল্লাহ বলেন, ‘এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য রবের নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।’(সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ১)

হাশরের কঠিন ময়দানে যখন কেউ কাউকে চিনবে না। আপনজন দেখলে দৌড়ে পালাবে। তখন কোনো নবী-রাসুলও কারো ব্যাপারে সুপারিশ করতে পারবেন না। সেই কঠিন মুহূর্তে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের জন্য সুপারিশ লাভের অধিকার পাবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেয়ামতের দিন সব সৃষ্টির জন্য সুপারিশ করবেন এবং একাজের মাধ্যমে তিনি প্রতিশ্রুত ‘মাকামে মাহমুদ’ (সম্মানিত স্থান) অর্জন করবেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক নবীর জন্য বিশেষ একটি দোয়ার অধিকার আছে, যা কবুল করা হবে। প্রত্যেক নবীই তাঁর দোয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছেন (দুনিয়াতেই তা চেয়েছেন)। আর আমি আমার সে দোয়া কেয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফায়াতের জন্য মুলতবি রেখেছি। আমার উম্মতের যে ব্যক্তি শিরক না করে মারা যাবে, ইনশাআল্লাহ! সে তা লাভ করবে।’ (বুখারি)

সমগ্র মানব ও জিন জাতির মধ্যে মুহাম্মদ (সা.) সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন আমি বেহেশতের দরজায় এসে দরজা খুলতে বলব। তখন বেহেশতের প্রহরী এসে বলবে, আপনি কে? আমি বলব, মুহাম্মদ। তখন বেহেশতের প্রহরী বলবে, আপনার বিষয়ে আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেন আপনার আগে আর কারো জন্য দরজা না খুলি। ’ (মিশকাতুল মাসাবিহ,  হাদিস : ৫১১)

মহানবী (সা.) এর সামাজিক জীবন, ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক জীবন ছিলো একেবারে স্বচ্ছ, ঝকঝকে তকতকে অনাবিল। তাঁর স্ত্রীরা সবাই তাঁর স্বচ্ছতার সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। পরিবারের গোলাম ও সেবকসহ সকলেই তাঁর অনাবিল সুন্দর চরিত্র, মধুর ব্যবহার এবং দয়া ও সহানুভূতির দ্বারা পরম মুগ্ধ ছিলেন। আট বছর বয়স থেকে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস (রা:) তাঁর সেবক হিসেবে ছিলেন। তিনি দশ বছর মহানবী (সা.) এর সেবা করেন। তিনি বলেন, মহানবী (সা.) কখনো আমাকে ধমক দেননি। কখনো বলেননি এমনটি করলে কেন? অমনটি করলে না কেন? তিনি কখনো কাউকে মারেননি। নির্যাতন করেননি। তাড়িয়ে দেননি। অপমান করেননি। অনাদর করেননি। কারো সাথে রুঢ় আচরণ করেননি। অমায়িক ব্যবহারে ঘর এবং বাহিরের সবাই ছিলো তাঁর প্রতি চুম্বকের মতো আকৃষ্ট ও মুগ্ধ।

হযরত আনাস (রা:) আরো বলেন, মহানবী (সা.) কখনো কাউকেও অশ্লীল-অশালীন কথা বলতেন না। অভিশাপ দিতেন না এবং গালাগাল করতেন না। কারো প্রতি অসন্তুষ্ট হলে শুধু এতটুকু বলতেন: তার কি হলো, তার কপাল ধুলোমলিন হোক! -(সহীহ বুখারী)

মহানবী (সা.) নারী, পুরুষ ও শিশুসহ যার সাথেই দেখা হতো, তাকেই তিনি সালাম দিতেন। নিজেই আগে সালাম দেয়ার চেষ্টা করতেন। কেউ তাঁকে আগে সালাম দিয়ে দিলে উত্তমভাবে তার জবাব দিতেন। হযরত আনাস (রা:) বলেন, মহানবী (সা.) ছিলেন সবচেয়ে ভদ্র কোমল ও অমায়িক মানুষ। তিনি সবার সাথে মিলেমিশে থাকতেন। সবার সাংসারিক খোঁজ খবর নিতেন। শিশু কিশোরদের সাথে হাস্যরস করতেন। শিশুদের আদর করে কোলে তুলে বসাতেন। ছোটবড় সকলের দাওয়াত তিনি কবুল করতেন। দূরে হলেও রুগ্ন ব্যক্তির খোঁজ খবর নিতেন। তিনি মানুষের ওযর কবুল করতেন। -(মিশকাত)

আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে মহানবীর (সা.) জীবনাদর্শ অনুসরণ করে চলার তাওফিক দান করুন এবং মুর্খ ও জাহেলদের দ্বীনের জ্ঞান দান করুন , আমিন।

 

মোঃ শামছুল আলম
লেখক ও গবেষক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top