সিডনী বুধবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ৮ই আশ্বিন ১৪২৭

চলুন একটু অতীত মেখে আসি : অর্কদেব বন্দ্যোপাধ্যায়   


প্রকাশিত:
৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৭:৫০

আপডেট:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৬:০৭

ছবিঃ পৌষ মেলা

 

বোলপুরের সঙ্গে আমার ছোটবেলার সম্পর্কটা মধুর ছিলনা। দাদুর জল পড়া বা ঠাকুমার মেথির পাঁচনে কাজ না হলে বাবা বোলপুরে নিয়ে আসতেন ডাক্তার দেখাতে। মনে হত বোলপুরটা যেন তেতো ওষুধ আর ভয়ঙ্কর ইনজেকশনে ভর্ত্তি। বোলপুরের প্রতি প্রেম এতটাই বেড়েছিল যে চিত্রা সিনেমাহল, শান্তিনিকেতন, পৌষমেলা সবই আমার কাছে ইনজেকশনের বিরাট বিরাট ছুঁচ বলে মনে হত। 

এই যখন অবস্থা, তখন আমার পাড়াতুতো এক দাদা আমার "ঝেউলু" খেলায় খুশি হয়ে বললো "বুঝলি বাবু তোকে এবারে পৌষ মেলা নিয়ে যাবো"। প্রসঙ্গত বলে রাখি "ঝেউলু" উুঁচু গাছের ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে খেলতে হয়, কী করে খেলতাম জানিনা, তবে এখন ভাবলে পা দুটো শিরশির করে ওঠে। 

পৌষ মেলার নাম শুনে আমার তো চোখের সামনে ভেসে উঠলো বিরাট এক ডাক্তারি ছুঁচের ছবি। সেই দাদা আমার ভয় ভাঙ্গিয়ে বললো, ওরে গাধা, পৌষমেলা ছুঁচ নয় বিরাট একটা মেলা। কত দোকান। কত খেলনা। দেখবি, ছুঁচের ডাক্তাররাও তোর পাশে বসে মোগলাই খাবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

 মেলার সঙ্গে আমার একেবারে পরিচিতি যে ছিলনা এমনটা নয়। বছরে একবার সগন খুরির সঙ্গে বড়ার দোলের মেলা দেখতে যেতাম ।

তখন আমরা আজকালকার ছেলেমেয়েদের মত বাপমায়ের স্থাবর সম্পত্তি ছিলাম না। ছিলাম পাড়ার সম্পত্তি।যে ইচ্ছা যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেত।এর জন্য বাবা মা কে কখনো দেখিনি বিরক্ত হতে।

আবছা মনে পড়ে, হাতে গামছায় বাঁধা মুড়ি নিয়ে অনেক কুলি, কাঁন্দর (ছোট, বড় নালা) পেরিয়ে বড়ার মেলা পৌঁছতাম। বড়ার বকুল তলায় বসে খেতাম ভেজা মুড়ি আর মেলার চপ। মুড়ি ভেজানোর কাজটা কাঁন্দরের গলা জল পেরোনোর সময়ই হয়ে যেত। সত্যি বলছি সেই স্বাদের কাছে আর্সেনাল দশ গোল খেয়ে যাবে। ফেরার সময় পঁচিশ পয়সায় কিনতাম টিনের কটকটি।কয়েকদিন গোটা পাড়া কটকট করতো। তবে পৌষমেলার ব্যাপারটাই আলাদা।

 

পৌষমেলায় যাবো শুনে মা চালের হাঁড়ির ভিতরে গোপনে রাখা গোটা কতক নোট দাদার হাতে দিলেন। আর আমাকে পরিয়ে দিলেন তুতে রঙের সোয়েটার। বাস স্ট্যান্ডের থিকথিকে ভিড়ে অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ  সমবেত জনগন চিৎকার করে উঠলো বাস আসছে বাস আসছে। তাকিয়ে বাস দেখতে পেলাম না। দেখলাম দুলতে দুলতে এক বোঝা লোক আসছে। বাসের মধ্যে চাপা অসম্ভব। বাস থামলে দাদার নির্দেশে শ্রী কৃষ্ণের কালীয় দমনের স্টাইলে বাসের বাম্পার ধরে ঝুলতে থাকা লোকগুলোর মাথায় পা রেখে বাসের ছাদে ল্যান্ড করলাম। এখন বুঝলাম কেন আমার মেলা যাওয়ার নির্বাচন ঝেউলু খেলা দেখে হয়েছিল। যাইহোক আধঘন্টা অবাসিক (মানুষের ক্ষেত্রে অমানুষিক হলে বাসে ক্ষেত্রে যা হয় আর কী) যাত্রার পর বাসের চাকা দুম করে জানান দিল, এবারে চরন বাবুর ট্যাক্সিতে বাকী পথটা চলে যাও।

 

বাস খারাপ হয়েছিল প্রান্তিক ঢোকার ঠিক আগে। বাস থেকে নামার পর আমার সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো নতুন একটা জগত।প্রান্তিক টাউনশিপ তখনো তৈরি হয়নি। লাল মোরামের দিগন্ত বিস্তৃত বিরাট  মাঠ আমাকেও বানিয়ে দিল ছোট্ট লিভিংস্টোন। মেলা যাবো কী, নুরি পাথর কুড়োতে আর রেললাইনের পাশে লাল মোরামের উপর দিয়ে তীরতীর করে  বয়ে চলা জল ধারার দিকে তাকিয়েই সময় চলে যাচ্ছিল। দাদার বকুনি খেয়ে  কাজুবাদাম গাছের পাশ দিয়ে বেশ খানিকটা হেঁটে পৌঁছে গেলাম মেলার মাঠ। 

 

পুকুর দেখে অভ্যস্ত লোক যদি দুম করে সাগর দেখে ফেলে তার যেমন অবস্থা হয়, পৌষমেলা দেখে আমার অবস্থা হল তাই। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা বলুন বা বসন্তোৎসব বলুন চাইলে আপনি একটা দল পেয়ে যাবেন। আমাদেরও একটা দল হয়ে গেল। আমাদের দলে একজন বৃদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রনাম করে মেলার মাঠে ঢুকলেন। এখন মনেহয় আচ্ছা, ঐ বৃদ্ধ লোকটি যদি পরিবেশ- বিদ হতেন তবে পৌষমেলার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে ওনার হাত কি একটুও কাঁপতো না? কে জানে। 

পৌষমেলায় প্রথম কী দেখে ছিলাম মনে নেই। তবে প্রথম খাওয়াটা মনে আছে এগরোল। আর ফেরার সময় বাড়ির জন্যে দাদা কিনে দিয়েছিল কেজি দুয়েক জিলিপি। গগলস, জামা, বেল্ট, জুতো, খেলনার শেষ না হতে চাওয়া দোকান গুলো দেখে আমার মনে হচ্ছিল ঠাকুমার কাছে শোনা "বিরেনা গাঁর" কথা যেখানে"মনিষ্যি" যা চায় তাই পায়। প্রথম পৌষ মেলার আর কিছু মনে নেই। নাগর দোল্লার চক্করে সব তালগোল পাকিয়ে গেছে। তবে প্রথম পৌষমেলার কথা ভাবলে আমার মনে  একটা মেঠো সুর বাজে। খুব সম্ভবত বাউল গানের। গায়ক হলে হয়তো বলতে পারতাম কোন সুর। না হয়ে বরঞ্চ ভালো হয়েছে, সুরটা একেবারে আমার নিজস্ব হয়ে হৃদয়ে জায়গা নিয়েছে। প্রথম পৌষমেলা দেখার স্মৃতির উদাস করা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মত। 

এর পর থেকে আর কোন বছর বাদ দিইনি। বাজি দেখে সারারাত মেলার মাঠে কাটানোর স্মৃতিও খুব বেশিদিনের না। এখন অবশ্য আর যেতে পারিনা। তবে মেলার কটা দিন শরীরটা খাট বন্দী থাকলেও মনটা মেলার মাঠেই পড়ে থাকে। আসলে কবিগুরুর কবিতার মত,  পৌষমেলারও একটা আলাদা আকর্ষন আছে। কবিগুরুর কবিতার মতই এই মেলাও কখনো  পুরানো হয়না বয়স ভেদে নানা রূপে ধরা দেয়।  

শেষ করার আগে একটা কথা না বলে পারছি না। আমার বিয়ের ঘটকালী করেছে পৌষমেলা। আবার এমন ভাববেন না, যে মেলা দেখতে গিয়ে প্রেম করে আমার বিয়ে।বিয়ের পর গিন্নি, বীরভূমেরই কন্যা, আমাকে বলেছিল তোমাকে বিয়ে করেছি কেন জানো? সলজ্জ মুখে নিজেই উত্তর দিয়েছিল, আমি মেলা দেখতে খুব ভালোবাসি, আর তোমার বাড়ি থেকে পৌষ মেলা খুব কাছে তাই। 

 

যারা বাংলা লেখেন বা আমার আমার মতো লেখার চেষ্টা করেন, তাদের কিন্তু পৌষ মেলা আসা মাষ্ট। তবে বন্ধু একটু তাড়াতাড়ি। 

 

অর্কদেব বন্দ্যোপাধ্যায়
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত   



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top