সিডনী বুধবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ৭ই আশ্বিন ১৪২৭

দেবভূমে, বিপ্লবের তীর্থপথে : শান্তনু কুমার


প্রকাশিত:
১০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৪:৩৮

আপডেট:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৫:২৭

 

"আমি জানতাম মুখার্জিকে সহজে ধরা যাবে না, He is a first class strategist"--- বিস্ময়ে আর হতাশায় যতীনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ইনস্পেক্টর  চার্লস টেগার্ট তখন মাথার চুল ছিঁড়ছেন। তবু গোয়েন্দা পুলিশের জাঁদরেল কর্তা ডেনহ্যাম কাপ্তিপোদা থেকে পালিয়ে আসা পাখিটিকে তালডিহির সাধুবাবার আশ্রমে তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন। হদিশ পেতেই হবে। বিপ্লবী মণীন্দ্র চক্রবর্তীকে অকথ্য নির্যাতন করেও যতীন মুখার্জিদের একটা কথাও তারা বের করতে পারল না।

 

যতীন (বাঘা যতীন) তাঁর সহবিপ্লবীদের নিয়ে বালেশ্বরের কাপ্তিপোদায় যে গোপনে অবস্থান করেছিলেন তারও একটা কারণ ছিল। বিপ্লবীদের খাতায় নাম লিখিয়ে সরকারি চাকরি খুইয়ে যতীন্দ্রনাথ তখন ঠিকাদারি ব্যবসায়। ছোটমামার পাঠানো বার্ণ হার্ডির লেখা 'Coming War' বইটি আদ্যন্ত পড়ে দেশকে স্বাধীন করার একটা নতুন রাস্তা খুঁজে পেলেন। মহারণে জার্মানির সঙ্গে ইংল্যাণ্ডের যুদ্ধ বাধবেই একথা খুব জোরের সঙ্গেই হার্ডি লিখেছিলেন। আর অন্যান্য গোপন সূত্রে যতীন্দ্রনাথ যা খবর পেলেন তাতে নিশ্চিত যে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে জার্মানি অর্থ, অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করবেই। এ সুবর্ণ সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে নারাজ।

 

ভারতীয় বিপ্লবীদের সাহায্যের জন্য জার্মানদের পাঠানো 'ম্যাভারিক' নামে জাহাজটি থেকে অস্ত্রশস্ত্রের একাংশ কাপ্তিপোদায় নামানোর জন্য যতীনরা ঘাঁটি গেড়ে বিনিদ্র প্রতীক্ষায়। বালেশ্বরের 'ইউনিভার্সাল এম্পোরিয়াম' নামে সাইকেলের দোকানটিতে বিপ্লবীদের একটি গোপন আস্তানা ছিল। এখান থেকেই যতীন্দ্রনাথ বিপ্লবের যাবতীয় তথ্য আদানপ্রদান ও যোগাযোগ রক্ষা করতেন। কিন্তু গোয়েন্দা বিভাগের বড়কর্তা ডেনহ্যাম আগে থেকেই যতীনদের পরিকল্পনা জানতে পেরে সশস্ত্র অভিযানে এক বড় দল নিয়ে বিপ্লবীদের পাকড়াও করতে অভিযান শুরু করে দেয়। যতীনদের প্রতীক্ষা বিফলে গেল।

 

কাপ্তিপোদা ত্যাগ করে যতীনরা তালডিহিতে। সেখান থেকে নদী পার হয়ে চষাখন্ড নামে একটি ছোট্ট গ্রামে। ক্রমশঃ চারদিক থেকে ইংরেজ সৈন্যরা ঘিরে ফেলছে। চষাখণ্ডের একটি উঁচু জায়গায়, তিনদিকে পরিখা খুঁড়ে, লড়াকু যতীনরা পাঁচজন আর তাদের চারপাশে ব্রিটিশ বাহিনীর তিনশ উন্মক্ত সেনা। চাঁদিপুরের কাছে বুড়িবালামের তীরে সাবেকি রাইফেলের সীমিত গুলির উত্তাপ বনাম শাসকের অফুরন্ত উন্নত অস্ত্রভাণ্ডারের গোলাগর্জন। অসম লড়াইয়ে প্রাণ হারালেন চিত্তপ্রিয়,হাসপাতালে প্রাণ হারালেন যতীন, ফাঁসি হল মনোরঞ্জন আর নীরেনের--- যাবজ্জীবন কয়েদবাসে ইংরেজদের অমানবিক অত্যাচারে পাগল হয়ে গেলেন জ্যোতিষ।

 

ভোলানন্দ গিরির শিষ্য যতীন বলতেন গীতাই আমার ইনস্পিরেশন। বিপ্লবীদের বলতেন গীতা না পড়লে এখানে আসিস না। তাই বোধহয় কাপ্তিপোদায় স্বর্ণঝরা সূর্যাস্তের আলোয় তিনি তন্ময় হয়ে অশ্রুভেজা দৃষ্টিতে শ্রীকৃষ্ণকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন----সহযোদ্ধা মণীন্দ্রের হাত ধরে বলেছিলেন, 'ওই দেখুন,ওই দেখুন, ওইখানে'। মণীন্দ্র বিপ্লবীর সেই ধ্যানস্থ রূপ দেখে সেদিন এক নতুন যতীনকে আবিষ্কার করেছিলেন।

 

কৃষ্ণদর্শন কি বালেশ্বরের স্থান-মাহাত্ম্য? মাত্র ২৪ বছর বয়সে পুরীর পথে বের হয়ে এই বালেশ্বরেই রেমুনাতে ঘরছাড়া চৈতন্যদেব ক্ষীরচোরা গোপীনাথ বা প্রথমবার দ্বিবাহু কৃষ্ণদর্শনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। সেখানে তিনি ভক্তদের কাছে কৃষ্ণের 'ক্ষীরচোরা' নামকরণের এক অপরূপ কাহিনী শোনান I কৃষ্ণভাবে মশগুল চৈতন্যদেব রেমুনাতে দু-দিন ভক্তদের মাঝে কাটান।

 

কৃষ্ণাদর্শে বিপ্লবের পথে দুই পথিক--- একজন দেশের জন্য সম্মুখ সমরে স্বাধীনতার পথে আর একজন সাম্যবাদী চেতনায় আধ্যাত্মিক মুক্তির পথে। দুজনেরই চরণচিহ্ন পড়েছিল এই পুণ্যভূমি বালেশ্বরে। এই দুই ভারত সন্তানের সমৃদ্ধ কাহিনী ছাড়াও সেই দ্বাদশ শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৩৯টি রাজার পরিচয়ে বালেশ্বর-নীলগিরির অবস্থান। সে রাজত্ব বা মাহাত্ম্য নেই কিন্তু ইতিহাস জড়িয়ে আছে ভ্রমণার্থীদের চলার পথে।

 

কথিত আছে ঊনবিংশ শতাব্দীতে নীলগিরির রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এম হরিচন্দনের রাণী অন্নপূর্ণা দেবীর স্বপ্নে শিব আহুতি উপত্যকার পূর্ব দিকে একটি ঝর্ণার নিচে পাথরে খোদিত তাঁর পাঁচটি লিঙ্গমূর্তি পুজো করার আদেশ দেন। রাণী স্বপ্নের কথা রাজাকে জানালে রাজা বহু প্রচেষ্টায় ওই স্থানটি খুঁজে পেয়ে মূর্তিগুলির পুজো করেন। সেই থেকেই 'পঞ্চলিঙ্গেশ্বর' নামে ওই স্থানটির মাহাত্ম্য প্রচার পায়। বালেশ্বর থেকে এটি প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আবার এই শহরেই, বালগোপালপুরে ইমামি গ্র্র্রুপ নির্মাণ করেছেন কোনার্ক এবং পুরীর মন্দিরের আদলে দ্বিতীয় জগন্নাথদেবের মন্দির। স্থাপত্যের এক অনুপম নিদর্শন। শহর থেকে বেরিয়ে, প্রায় সত্তর কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিখ্যাত জলাশয় দেবকুণ্ড, শত সিঁড়ি পেরিয়ে উপরে দেবী অম্বিকা মাতার মন্দির আর প্রায় পঞ্চাশ ফুট ওপর থেকে অবনত জলধারা--- সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে এ এক নয়নাভিরাম দৃশ্য।

 

নীলগিরির উত্তরে এবং ময়ূরভঞ্জ অরণ্যের পশ্চিমে 'কুলডিহা অভয়ারণ্য'---- শোনা যায় যুদ্ধের সময় নীলগিরির রাজা ও তার বংশধরদের লুকোনোর স্থান ছিল এই জঙ্গল। তার থেকেই হয়ত কুলডিহার অদ্ভুত নামকরণ। অন্যমতে আদিবাসীদের এই বনে কুলডিহা নামে একটি  গ্রামও ছিল। শিশু, শাল, পিয়াশালের গভীর জঙ্গলে বাদুড়, শিয়াল, খেঁকশিয়াল, ভালুক, বড় কাঠবিড়ালি, হাতি, হরিণের বাস। অন্যদিকে বেগুনি, ধূসর রঙের সারস, সবজে পাতিহাঁস, ব্রাহ্মণচিল, পেঁচা, মাছরাঙা, কাঠঠোকরা, পাহাড়ি ময়না,পরিযায়ী সোয়ালো পাখির আস্তানা এই বিশাল জঙ্গল আর তার অন্যতম প্রবেশ পথে রিসিয়া বাঁধবেষ্টিত,পাহাড়ে ঘেরা, বিস্তীর্ণ জলাশয় যেখানে নিয়ত মাছ ধরার উৎপাতেই পরিযায়ী পাখির আনাগোনা বহুলাংশে কমে গেছে।

 

রিসিয়া বাঁধের অপক্ক অপরিসর রাস্তা পার হয়ে পথ চলে গেছে গভীর জঙ্গলের মধ্যে,পথের দুপাশেই বিক্ষিপ্ত শালবনছায়া, বনরাজির নিবিড় আলিঙ্গন ভেদ করে মধ্যে মধ্যে অনির্বচনীয় এক চিলতে আলোক রেখা,যেন কোন মায়ালোক হতে পাড়ি দিয়ে অবশেষে এই শ্যামলভূমিতে উপনীত হয়েছে----যেন এখানেই ছিল বহুযুগের স্বপ্ন সত্যি করার আয়োজন---- আজ তারই আনন্দে বনের আনাচে কানাচে শুরু হয়েছে বন্য কাঠবেড়ালি আর পাহাড়ি ময়নার প্রাণের আলাপন।

 

কলিঙ্গ রাজ্যের এ মহাপুণ্যভূমির সমুদ্র, পাহাড় আর জঙ্গল---প্রকৃতির এই অত্যাশ্চর্য সহাবস্থানের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ভ্রামণিকদের অপার্থিব আনন্দরূপ। 

 

শান্তনু কুমার
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top