সিডনী সোমবার, ২৬শে অক্টোবর ২০২০, ১১ই কার্তিক ১৪২৭

বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত বসিরহাটের ইছামতী নদী : ডঃ সুবীর মন্ডল


প্রকাশিত:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:১০

আপডেট:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:২৮

                     

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত একটি সুপ্রাচীন মহাকুমা শহর হলো বসিরহাট। বর্তমানে নতুন জেলার স্বীকৃতি লাভ (২০১৯)। এই শহরের গড়ে ওঠার একটা সুমহান বর্ণময় ইতিহাস আছে। শুধু তাই নয় পরতে পরতে বনেদিয়ানার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত শহর। ১৯৮৬ সালের ১ মার্চ উত্তর ২৪ পরগনার জন্ম হয়েছিল, সদর শহর বারাসাত। ৪টি মহকুমা নিয়ে উত্তর ২৪পরগনা জেলা গঠিত হয়, বারাসাত, ব্যারাকপুর, বনগাঁ, বসিরহাট। বর্তমানে ২২টি ব্লক ও ২৮টি পৌরসভা নিয়ে নবগঠিত উত্তর ২৪ পরগনা জেলা। এই জেলার পূর্বে বাংলাদেশ, দক্ষিণে সুন্দরবন, উত্তরে নদীয়া জেলা এবং পশ্চিমে হুগলি নদী। নদীতে বয়ে আসা পলিমাটি দিয়ে গড়ে উঠেছে উত্তর ২৪ পরগনা। এই জেলাকে এক সময় বলা হতো ভাটির  দেশ। নদীর ভাটা বয়ে যেত  দক্ষিণ দিকে।

মুসলিম আমলে ছিল সাতগাঁও সরকারের অধীনে, বৃটিশ আমলেও নানা ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে এই জেলা বারবার নানান চেহারা নেয়। ১৮৬১ সালে বসিরহাট মহকুমার জন্ম হয়েছিল কিন্তু বসিরহাটের ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। নানান পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে তার বর্তমান অবস্হানও মনে রাখার মতো। বসিরহাট মহকুমায় বর্তমানে ৩টি পৌর শহর। ইছামতির নদীর কূলে অবস্থিত ৩টি পৌর শহর যথা --বসিরহাট, বাদুড়িয়া ও টাকি।

১৮৬৯ সালের ১এপ্রিল থেকেই এই গুলো পৌর শহর। বর্তমানে ১০টি ব্লক নিয়ে বসিরহাট মহকুমা। বসিরহাট ১ ও ২, সন্দেশখালি ১ ও ২, মিঁনাখা, হাড়োয়া, হাসনাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জ, বাদুড়িয়া ও স্বরূপনগর। বর্তমানে নতুন জেলার স্বীকৃতি পেয়েছে। ১০০ বছর আগে যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন ছিল নৌকা। একমাত্র সড়ক যোগাযোগ ছিল বারাসাতের সঙ্গে। লর্ডবেন্টিয়ের সময়  প্রথম পথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়,টাকির সেই সময়ের জমিদার কাশীনাথ মুন্সি উদ্যোগ নেন। ১৮৯৬ সালে রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় বারাসাত-বসিরহাট ন্যারো গেজ  রেলওয়ে হয়। লোকে বলত মার্টিন কোম্পানির রেলওয়ে। ১৯০৯ সালে এই রেলপথ হাসনাবাদ পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাসনাবাদ থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ৭৪ কিমি, দীর্ঘ ব্রডগেজ রেলপথ চালু হয়। ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত বসিরহাট বসুরহাট নামে পরিচিত ছিল। খোলাপোতার মোড় থেকে মসলন্দপুরগামী রাস্তাটি গৌড়বঙ্গ রোড নামে পরিচিত ছিল।

মহাকুমা বসিরহাট গঠিত হয় ১৮৬১  সালের জানুয়ারিতে। বসিরহাট নামের উৎস সম্পর্কে বেশ কয়েকটি মত আছে। কেউ কেউ মনে করেন-- জনৈক বসির নামক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত হাট থেকেই বসিরহাট নাম এসেছে। এর কোন ঐতিহাসিক তথ্য আজ ও পাওয়া যায় নি। আর একটি মত আছে,বশির শব্দটি মূলত সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ করকচ লবণ। অনেকের অভিমত, বাঁশের হাট থেকেই বসিরহাট হয়েছে। আবার কেউ মনে করেন বসি (নিচু) জায়গা থেকে বসিরহাট নামকরণ করা হয়েছে। আধুনিক গবেষক দলের অভিমত করকচ লবণের হাট থেকেই হয়েছে, বশিরহাট/ বসিরহাট। এই স্হানে সুপ্রাচীন কাল থেকেই লবণের হাট বসতো, তার ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রমাণ পাওয়া গেছে। বসিরহাট সংলগ্ন বাগুণ্ডি ছিল লবণের বড় হাট। এই হাটে বরানগর থেকে নৌকায় আসতেন দ্বারকানাথ ঠাকুর লবণ ব্যবসার জন্য।বসিরহাটের মতোই ইছামতি নদী খুবই প্রাচীন  এবং একটি সুপ্রাচীন বৈচিত্র্যময় নদী, দু -ধরনের জল , বসিরহাট পর্যন্ত মিষ্টি জল, তারপর বাংলাদেশের দিকে আবার লবণাক্ত জল। দুর্গা পুজোর বিসর্জনের সময় দু' দেশের  লক্ষ লক্ষ মানুষ সববেত হয় নদীর তীরে। এই ভাসমান উৎসব ভারতের আর কোথাও পরিলক্ষিত হয় না । এটাই দু'বাংলার  সম্প্রীতির  উৎসবে পরিনত হয়। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের বেশিরভাগ মানুষ এই সময়কেই বেছে নেয় । মনে করা হয় আদিভাষায়  ইসা- মো  -তি  থেকে ইছামতি, সংস্কৃততে ইছামতী।উৎস স্হল থেকে ইছামতির দৈঘ্য আনুমানিক ১৮০ কিমি। আদিকাল থেকে ইছামতির গতিপথ বারবার পরিবর্তন হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “ইছামতী মানুষ--ঘেঁষা নদী, তার শান্ত জলপ্রবাহের সঙ্গে মানুষের কর্মপ্রবাহের  স্রোত মিশে যাচ্ছে ----এই নদীটির হাস্যময় কলধ্বনির সঙ্গে এক সুরে মিলে যায়”। (১৮৯৫ সালের ৯ই জুলাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি পত্রে লিখেছিলেন)।

নানা কারণে জীবনটা যখন একঘেয়েমিতে ভরে উঠেছে, কর্মজীবনে পুরানো হলেও ১০টা ৫টার ধরাবাঁধা নিয়ম মেনে চলতে চলতে, আমি মানসিক ভাবে ক্লান্ত ও বিরক্ত। মনটা যখন নতুন কিছু পেতে চাইছে – কোথাও ঘুরতে যাওয়া যায় কিনা ভাবছি, তখন আমার কয়েকজন কাছের শিক্ষক বন্ধু আমাকে আনুরোধ করলেন এবং বললেন তিন দিনের ছুটিতে চলুন বসিরহাট -টাকির ইছামতির তীরে অবস্থিত বিভূতিভূষণের বসতভিটে ও মিনি সুন্দরবন ঘুরে আসি।। কোন কিছু না ভেবেই, এই লোভনীয় প্রস্তাবে আমি সানন্দে রাজি হলাম। অবশেষে গত পুজোর সময় সামান্য কিছু হালকা লাগেজ নিয়ে আমরা রাতের খাতরা-কোলকাতা বাসে চেপেন রওনা দিলাম বসিরহাট--টাকির হাসনাবাদের ইছামতির উদ্দেশ্য।

পরেরদিন ভোর ৫ টার সময় শিয়ালদহে পৌঁছে, টিকিট কেটে ৫টা ৩০–এর শিয়ালদহ-হাসনাবাদ লোকাল ট্রেনে উঠে পড়লাম। ক্রমশ ট্রেন বিরাটি, মধ্যমগ্রাম হয়ে বারাসাতে এলো, চা–মিষ্টি-পরোটা খেতে শুরু করলাম আমরা। বন্ধনহীন জীবনের আনন্দে আত্মহারা পাঁচ জন, বয়সে আমিই বড়। রেলপথের দুদিকের অপরূপ সৌন্দর্য বিশেষ করে কয়ড়াকদম্বগাছি, ষ্টেশান পার হবার পর, বেলিয়াঘাটা, হাড়োয়া, মালতিপুরে যেন প্রকৃতির বাড়াবাড়ি বিলাসিতা। চারিদিকে ধানের ও সব্জির খেত, কোথাও মাছের ভেড়ি। এ যেন জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’। চা, পরোটা, মিষ্টি সহযোগে দুই ঘণ্টার যাত্রাপথ কখন যে শেষ হল তা বুঝতে পারলাম না। সকাল ৮টায় টাকি রেল ষ্টেশান থেকে অটো ভাড়া করে শান্তিনিকেতন হোটেলে পৌঁছলাম। দুটি এসি রুম বুক করা হয়েছিল বসিরহাটের এক বন্ধুর মাধ্যমে। ভাড়া দুহাজার। হোটেলটি ইছামতি নদীর ধারে, অসাধারণ মনোরম পরিবেশ।

একটু দূরে অন্যপারে বাংলাদেশ, এপারে ভারত, মাঝখানে ইছামতী নদী বয়ে চলেছে। এ-এক অন্য অনুভূতি। আমরা হোটেলের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হলাম এবং দুপুরের খাওয়ার অর্ডার দিলাম। চারিদিকে সুন্দরি, কেওড়া, বাইন, গরাণ, সোনাঝুরির জঙ্গল, দুই তীরে দুইদেশ, এককথায় বলতে গেলে এক কল্পনার জগতে অবস্থান করছি। দুপুরের মেনু দেখে আমরা তো অবাক - দামি চালের ভাত, আলুপোস্ত, ডাল, ভেটকি মাছের ঝোল, বাগদা চিংড়ির মালাইকারি, সঙ্গে সুন্দরবনের কেওড়ার চাটনি। জন পিছু মূল্য ২০০ টাকা। মেনু দেখে আমরা বিস্মিত হয়ে গেলাম, যেমন মেনু তেমনি তার স্বাদ। পরিতৃপ্তি সহকারে দুপুরের খাওয়ার পর্ব শেষ করলাম।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকালে টোটো ভাড়া করে প্রাচীন শহর টাকির নানা জায়গায় ঘুরলাম। প্রথমে দেখলাম টাকির রাজবাড়ি ও দুর্গামন্দির। তারপর গেলাম শান্তির পরিবেশ রামকৃষ্ণ মিশনে। হৃদয় ও মন ভরে গেল। এরপর আমরা এলাম জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরীর বাড়ি, একে একে ত্রিশক্তি মন্দির, বিসর্জন সিনেমার শুটিং স্পট, সোনারবাংলা রিসর্ট, টাকির ইকোপার্ক, শ্মশান, শিশু উদ্যান, পিকনিক গার্ডেন, তিনশ বছরের জোড়া শিবমন্দির, কার্গিলের শহীদ রাকেশ দাসের শহীদ বেদি, টাকির সরকারি কলেজ ও লাইব্রেরি, বৃদ্ধাবাস এবং বিশ্রাম বাগানবাড়ী ইত্যাদি জায়গাগুলো দেখে আমাদের মন ভরে গেল।

সন্ধ্যাবেলায় হোটেলে ফিরে এলাম, কিছু টিফিন করে ইছামতির নদীর তীরে আমরা চলে এলাম।

মন জুড়ে কালজয়ী গানের অনুরণন 'এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায় একি বন্ধনে জড়ালে গো' রাতের ইছামতির অপূর্ব রূপে মুগ্ধ হলাম। মনে হল আমরা পাঁচজন মানুষ অন্য জগতে বিচরণ করছি। এ-এক অন্য ভুবন, রাতের ইছামতির রূপ এক কথায় অনবদ্য, রাত ১০-টায় হোটেলে ফিরে এলাম। মূগের ডাল, সব্জি, দেশি মুরগির ঝোল দিয়ে রাতের খাওয়া সারলাম। অসাধারণ স্বাদ। একটু আড্ডা দিয়ে আমরা ব্যালকনিতে চলে এলাম, সীমান্তবাহিনীর জওয়ানরা মোটর সাইকেলে করে রাতে পাহারা দিচ্ছে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা, চাঁদের আলো যেন গলে গলে পড়ছে ইছামতির বুকে। রাতের প্রাকৃতিক দৃশ্য অতুলনীয়। রাত ১-টায় যে যার ঘরে ফিরে এলাম। কারণ ভোর বেলায় ইছামতির বুকে সূর্যোদয় দেখতেই হবে, আমাদের বহুদিনের এটা অধরা স্বপ্ন। ঘুম আসতে চাইছে না, মনে বর্ণময় নানা ছবি ভাসতে লাগল,  এই শহরে আমরা দুদিনের অতিথি। আমরা ফিরে যাব যে যার কর্মজীবনে। নদীর  দুই তীরে দুই দেশ, এক ভাষা ও সংস্কৃতি এবং প্রকৃতি। সীমান্ত বিভাজনে একটি নদী ইছামতি। এই সব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম, নতুন তাজা ভোরের স্বপ্ন নিয়ে।

৮ই মার্চ খুব সকালে সবাই উঠে পড়লাম। প্রাতরাশ সেরে নিলাম তাড়াতাড়ি। আজ আমরা বাংলাদেশ সীমান্তের পানিতরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। গন্তব্যস্থল বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত পানিতর। টাকি থেকে দূরত্ব ১০ কিমি। এখানে বসে প্রকৃতিপ্রেমিক বিভূতিভূষণ “ইছামতী” উপন্যাস লিখেছিলেন। টোটো ভাড়া করে সকাল ৭টায় বেরিয়ে পড়লাম। বসিরহাট একটি সুপ্রাচীন সীমান্ত শহর।পরতে পরতে আভিজাত্যের ছোঁয়া।এই শহরের কাছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত স্হল বাণিজ্য বন্দর  ঘোঝাডাঙ্গা-ভোমরা অবস্হিত।একটু দূরে বাংলাদেশের খুলনা ও সাতক্ষীরা শহর। বহু ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। আমার শিক্ষা জীবনের একটা সময় কেটেছে এই শহরে। তাছাড়া এ শহরে আমার বাড়ি ‌।

আমার অনেক স্মৃতি ও ভালোবাসা শহর বসিরহাট। ইছামতির তীরে সাজানো গোছানো সুপ্রাচীন বনেদি শহর। ইতিহাস -ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী। "এখানে আকাশ আঁকে ভোরের সূর্য। এখানে গাঙচিলের ডানায়  রঙ মাখায় দিনান্ত। এখানে বিদ্যূৎলতায় আকাশের কোণে দোল খায় ঝড়ের পাখি। এখানে দু  চোখের পাতায় পাখির পালকের মতো স্বপ্ন, ইচ্ছেমতীর কূল বরাবর" ১৯২৩ সালের ২৩ মার্চ  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যশোর-খুলনার ইতিহাস প্রণেতা  সতীশ চন্দ্র মিত্রকে  লিখেছিলেন,  "ইতিহাস দেশের গৌরব ঘোষণার জন্য নহে, সত্য প্রকাশের জন্য"।এই শহরে জন্মেছিলেন, বিপ্লবী দীনেশ মজুমদার (বিপ্লবী বিনয়-বাদল-দীনেশ), কবি রামবসু,  লেখক অমর মিত্র,বিমল কর, অধ্যাপক -অভিনেতা-নাট্যব্যক্তিত্ব মনোজ মিত্র, স্যার আর, এন, মুখোপাধ্যায়, লেডি রানু মুখার্জি ,অভিনেত্রী মনামী ঘোষ, ফুটবলার মিহিরবসু,দীপেন্দু বিশ্বাস, সঙ্গীত শিল্পী জয়ন্ত দে (জয়ন্ত দে -অনুরাধাপাডোয়াল জুটি, এক সময় টি সিরিজ খ্যাত), একটু দূরে অভিনেতা বিশ্বানাথ বসু, সঙ্গীত শিল্পী ও ডাক্তার পল্লব কীর্তনীয়া, সঙ্গীত শিল্পী শক্তি ঠাকুরের বাড়ি।

ছবিঃ ডঃ সুবীর মন্ডল

একেএকে শহরের দর্শনীয় স্থান গুলো দেখতে শুরু করলাম (১) স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বসতবাড়ি (২) শহীদ দীনেশ মজুমদার স্মৃতি বিজড়িত টাউনহল (৩) বিপ্লবী-শহীদ দীনেশ মজুমদারের বাবার স্মৃতি বিজড়িত গার্লস স্কুল, পূর্ণচন্দ্র মজুমদার, টাউনস্কুল, বসিরহাট হাইস্কুল, কলেজ, দেবযানী, ফাল্গুনী মিলনী সিনেমা হল, (৪) উনহাই স্কুলের একদম পাশে সুপ্রাচীন শাহী মসজিদ। ১৪৬৭ সালে ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে উলুগ মসলিস ঈ আজম  নির্মাণ করেন। বয়সের দিক থেকে শাহী মসজিদ বাংলায় সুপ্রাচীন দ্বিতীয় মসজিদ। বাংলাদেশের  সর্ব শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক ও জাতীয় অধ্যাপক ড, আনিসুজ্জামান সাহেবের বসতবাড়ি, ছিল এই শহরের কাছে (৫) ইছামতির তীরে, সাজানো গোছানো পার্ক ও সেতু, পুরসভা, সার্কিট হাউস, স্টেডিয়াম, বিনোদন কেন্দ্র, মহাশ্মশান, মায়ের বাজার, মহকুমাপাঠাগার, কালীমন্দির, গৌড়ীয়মঠ, মহকুমা হসপিটাল, সুপ্রাচীন দুটি রোড -খানবাহাদুররোড ও মার্টিন সাহেবের রোড। এক সময়ে মার্টিন কোম্পানির রেল চলত এই শহরে। ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত বসিরহাট  বসুরহাট নামে পরিচিত ছিল। শিক্ষা-সংস্কৃতির শহর হিসাবে অতীত গৌরব আজ ও বজায় রয়েছে।

বসিরহাট শহরের হৃদয় ছুঁয়ে ইটিণ্ডাঘাট গিয়ে ইছামতি নদী পার হলাম, তারপর আমরা ২০০ টাকা দিয়ে টোটো ভাড়া করে পানিতর গ্রামে পৌছালাম সকল ৯টায়। পথের দুধারে সবুজের সমুদ্র। সীমানা বরাবর দাঁড়িয়ে আছে ইউক্যালিপটাস, বাবলা, সারি সারি নারিকেল আর কলাগাছের ঝাড়। কাছেই ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের ঘোজাডাঙ্গা চেকপোস্ট।

পানিতর গ্রামে বিভূতিভূষণের বংশধররা আজও বাস করছেন। ছায়াঘেরা শান্ত মনোরম গ্রাম। সরকারি উদ্যোগে তাঁর বাড়ি সংস্কার ও স্মৃতিসৌধ তৈরি হয়েছে। একে একে দেখলাম বিভূতিভূষণের স্মৃতিবিজড়িত ঠাকুরঝি পুকুর, বকুলগাছ, দ্বিতলাবাড়ি, যেখানে বসে তিনি “ইছামতী” উপন্যাস লিখেছিলেন। এছাড়া, ঠাকুরদালান, তিনতলার চিলেকোঠা, বাসরঘর দেখলাম। অনেকদূরের সেই গ্রাম্যনদী (ইছামতি) নিজস্ব খেয়ালে চলতে চলতে বদলেছে তার রূপ।  ভেঙেছে দু' পার, গড়েছেও।

সেই দোতলা বাড়ি, ঠাকুরদালান, তিনতলার চিলেকোঠা -- যেটি ছিল বিভূতিভূষণের বাসরঘর, কতকাল আগে যে মেয়েটি ছিল, আজ সে নেই। তাঁর নিকটজনেরাও আজ কোলকাতা মুখী। ঘরগুলোর দরজায় একে একে তালা পড়েছে। ঠাকুদালানে পায়রার বকবকম। বারান্দার কড়িবরগায় চামচিকের বাসা। কোথাও এক হাহাকার মিশে আছে বাড়িটাকে ঘিরে। তবে বাঁশবনের ফাঁকে ফাঁকে, মেঠো সরুপথে, আম-বকুল-- শিরীষ--কৃষ্ণচূড়ার শ্যামছায়ায় কিশোর অপুকে যেন  আজ ও খুঁজে পাওয়া যায় । পানিতর শুধু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রাম নয়, ছায়াঘেরা শান্ত মনোরম রূপসী বাংলার একটি গ্রাম। এখানে বেশকিছু গাছের গুঁড়ি বয়সের প্রাচীনতায় ভাস্কর্যের রূপ নিয়েছে। সারাদিন গাছের ডালে আশ্রয় নেওয়া নানা অজানা পাখির কলরবে মুখর জায়গাটি। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী-র প্রথম দিকে হরিহর রায়ের পূর্ব পুরুষ ডাকাত বীরু রায়ের যে পরিচয় আছে, সে সময়কালটা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতামহের পানিতরে বাসের সময়। বীরুরায় মে বৃদ্ধ ব্রাক্ষণ ও তার বালক পুত্রকে মেরে ঠাকুরঝি পুকুরের  জলে পুঁতে রেখেছিল,---। সেই ঠাকুরঝি পুকুরের সন্ধান আমরা পেয়েছিলাম। গোরীদেবীর মৃত্যুর পর বিভূতিভূষণ বহুবার পানিতরে গিয়েছিলেন। উর্মিমুখর দিনলিপিতে লিখেছিলেন, 'গত শুক্রবার আবার বসিরহাট গিয়েছিলাম। মাঠে মাঠে শিমুল গাছগুলি রাঙা হয়ে উঠেছে ফুলে ফুলে, বৈঁচী ফুল ফুটেছে বাঁশবনের শুকনো ঝরা লতার মধ্যে, বাতাবি লেবুর গন্ধ ও মাঝে মাঝে পাচ্ছি। বসিরহাটে নামলুম বিকেলবেলায়। প্রাসাদের সঙ্গে বাঁধানো জেটির ঘাটে গিয়ে বসে রাঙা রোদ মাখানো ইছামতির ওপারের দৃশ্যটি দেখলুম। 'গৌরীদেবী’র ছোট বোন অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়। তাঁর স্মৃতিতে ধরা ছিল জামাইবাবুর নানা ঘটনা। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘জামাইবাবু এলে চিলেকোঠার ঘরটিতে থাকতেন, সকালে উঠে ছাদে পায়চারি করতেন। ঘন্টার পর ঘন্টা সেখান থেকে দূরের গাছপালা দেখতেন। বাড়ির সামনে বড় দিঘি, দিঘির পাড়ে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল ফুটে থাকতো। পাশে বকুল গাছ। বকুল ফুল জামাইবাবু খুব ভালোবাসতেন। শানবাঁধানো বকুলতলায় বসে থাকতেন দুপুরের দিকে।'

আমরা কৃষ্ণচূড়া গাছটি দেখতে পাই নি, তবে বকুল গাছটি সেদিনের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে, জীবন্মৃত অবস্থায়। গাবতলার ঘাটে নেমে যেপথ দিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামে আসতেন, বাঁশঝাড়, আমবাগান শালুকফোটা ছোট-বড় ডোবার পাশ দিয়ে সেই আঁকাবাঁকা পথটি চলতে মন আজ ও  উদাস হয়ে যায়। পথের দু-পাশে সবুজ ধানক্ষেত আর দরিদ্র মানুষের বাস। আর পলেস্তরা খসা তিনতলার সেই বাড়িটি ---তাকে ঘিরে বিভূতিভূষণের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে,আজ আর বাসযোগ্য নয় সেটি। বাসিন্দারা কোলকাতামুখী। আমাদের সঙ্গে বিভূতিভূষণের বংশধরদের পরিচয়ের সুযোগ, হয়েছিল। একজন বর্তমানে টোটোচালক। দিঘির বাঁধানো ঘাট সরকার থেকে তৈরি করে দিয়েছে। আজ ও দিঘির সামনে দাঁড়ালে শিশু কন্ঠের সেই ছড়াটা যেন কানে ভেসে আসে' পুণ্যিপুকুর পুষ্পমালা কে পুজে রে দুপুরবেলা? আমি সতী লীলাবতী ভাইয়ের বোন ভাগ্যবতী-' বিভূতিভূষণের বসতভিটে থেকে কয়েক পা এগোলেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। সীমান্তে খাল। খালের ওপারে বাংলাদেশ। শরতের নীল আকাশের নীচে শান্ত গ্রাম পানিতর যেন পল্লি মায়ের আঁচল পেতে রেখেছে। পানিতর সম্পর্কে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন,' চারিধারে চেয়ে এই প্রকৃতির সঙ্গে, পাখির গানের সঙ্গে, মানুষের সুখ-দুঃখের যোগ আছে বলেই এত ভালো লাগে।'

 

বিভূতিভূষণের বাসরঘর জীর্ণ হয়েও সবুজ বনানীর মধ্যে একাকী মাথা তুলে দাড়িয়ে রয়েছে আজও। মনের মণিকোঠায় এক অনাস্বাদিত অমলিন স্মৃতি নিয়ে এরপর আমরা ফিরে আসলাম বেলা ১-টায় টাকিতে। দুপুরের খাওয়া শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম মিনিসুন্দরবন দেখতে। দশ মিনিটের পথ, ভ্যানে করে গেলাম। টাকির একেবারে হৃদয়ের ভিতর, গ্রামের ভিতর দিয়ে আঁকাবাঁকা ছবির মতো পথ, পথের পাশেপাশে বয়ে চলেছে ভালোবাসার নদী ইছামতি। অবশেষে ইছামতির চরে গড়ে ওঠা নতুন গোল পাতার বনে পৌঁছলাম, এ-যেন এক চিলতে সুন্দরবন। এ-এক অন্য ভুবন, যে ভুবন অনাবিল সৌন্দর্যের মোড়কে মোড়া। চারিদিকে কেওড়া, গরাণ, হেতাল, বাইন, সুন্দরি, গোলপাতার অরন্য। শুধু সবুজ আর সবুজ। ভেসে আসে মন উদাস করা জঙ্গলের বন্য গন্ধ। অরণ্যের আলো–আঁধারিতে কয়েকটা হরিণ দেখলাম। শহরের সভ্যতা, নগরের কোলাহল এখনও গ্রাস করতে পারেনি মিনিসুন্দরবনকে। এখানকার আরণ্যক শোভায় পুলকিত ও মুগ্ধ হলাম। গা ছমছম করা এক রোমাঞ্চকর আরণ্যক পরিবেশ অপলক নয়নে উপভোগ করলাম। টাকি পুরসভা এটি তৈরি করেছে প্রায় তিনশ বিঘে জমি নিয়ে, জন প্রতি প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। দু ঘন্টা এখানে কাটানোর পর টোটো করে চললাম ৭ কিমি দূরে মোহনায়, এটি অতীব দর্শনীয় স্থান, এ একা ইছামতি নয়, এ হল ত্রিবেণী সঙ্গম, কালিন্দি, ইছামতি আর বিদ্যাধরীর মিলনস্থল। এমন সুন্দর রূপ, এমন ভয়ঙ্কর সুন্দর নদীরূপ দেখে শিহরিত, পুলকিত হলাম। আমাদের ভাড়া করা নোকাটি (যন্ত্রচালিত) কিছুক্ষণের মধ্যে মাছরাঙা দ্বীপের কাছাকাছি এসে গেল। কে কার আগে পৌছাতে পারে, ছুঁয়ে দেখতে পারে এই নতুন ভুবনকে, তারই এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন। ইছামতির নদীবক্ষে ভ্রমণ বহু দিন মনে থাকবে। আহা কি দেখিলাম জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না!

এবার ফেরার পালা। মাছরাঙা ও মোহনার প্রকৃতি যে কত সুন্দর, কত অনাবিল, অমলিন হতে পারে তা এখানে না এলে আমরা বুঝতে পারতাম না। যেকোনো পূর্ণিমা রাতে মাছরাঙা ও মোহনা হয়ে ওঠে মোহময় এক কল্পনার স্বর্গরাজ্য। নদীবক্ষে ফেরার সময় মনে হল ইছামতীর জলে চাঁদের রূপালি আলো ঠিকরে ঠিকরে পড়ে এক মায়াজাল তৈরি করছে, সেজে উঠেছে সুন্দরী ইছামতি। বাংলাদেশের কেয়াপাতার জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে বিদায়ী সূর্যটা যেন অনিন্দ্যসুন্দরী টিপ। দূরে বাংলাদেশের কেয়াপাতার জঙ্গল আর সাতক্ষিরে জেলার শ্রীপুর। মন না চাইলেও অবশেষে হোটেলে ফিরলাম, ইলিশের ঝোল ভাত দিয়ে রাতের খাওয়া শেষ হল। সবার মন খারাপ, ভোরে বাড়ি ফেরার পালা, তারপর যে যার গতানুগতিক কর্মজীবনে প্রত্যাবর্তন।

যে অমলিন, অপার্থিব স্মৃতি টাকির মিনিসুন্দরবন, মাছরাঙা দ্বীপ ও মোহনা থেকে প্রাপ্তি হল তা মনে হয় কোনোদিন ভোলা যাবে না। মায়ায় আচ্ছন্ন করল আরেকবার আসার আশায়।

কোলকাতা থেকে টাকি মিনিসুন্দরবনের দূরত্ব বাস এবং ট্রেনে মাত্র ৬৯ কিমি। ট্রেনে ভাড়া মাত্র ২০ টাকা। সময়  কম-বেশি ১ ঘন্টা ৫০ মিনিট।থাকার জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহজলভ্য প্রচুর হোটেল রয়েছে। সীমান্তশহর টাকিতে যে বর্ণময় বিসর্জন দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়, তাতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। দেশ বিদেশের মানুষের কাছে টাকির ইছামতি নদী ও মিনিসুন্দরবনের আকর্ষণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

পথনির্দেশ:

(১) শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে টাকি স্টেশন। (২) টাকি স্টেশন থেকে টোটোয় ট্যুরিস্ট স্পট ১৫ মিনিট, ভাড়া ১০/১৫ টাকা জনপ্রতি। নদীর তীরে সাজানো গোছানো সুন্দর বহু লজ, গেস্টহাউস। বড়বাজেটের বিলাসবহুল সোনারবাংলা রিসোর্ট। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও কম খরচে থাকার জন্য টাকি পৌরসভার গেস্টহাউস। খাওয়া ও থাকার সুবিধা আছে। দরদাম করে টোটো ভাড়া করতে হবে।ঠকার কোন সম্ভাবনা নেই। সঙ্গে পরিচয় পত্র রাখা আবশ্যক। অনলাইন বুকিং হয়। এছাড়াও ধর্মতলা থেকে সরকারি ও বেসরকারি বাসে  টাকি যেতে  পারেন। এতে সময় ও খরচ পড়বে বেশি। তবে সবচেয়ে আরামদায়ক ভ্রমণ হবে ট্রেন যাত্রা। এতে সময় ও খরচ পড়বে কম। আমরা ছিলাম শান্তিনিকেতন গেস্টহাউস। ইছামতি নদীর তীরে অবস্থিত।

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত (গবেষক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প ও ভ্রমণ লেখক)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top