সিডনী শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭

মন কেমনের ঠিকানা রাজারাপ্পা : ডাঃ রিনি পণ্ডা


প্রকাশিত:
৭ অক্টোবর ২০২০ ১৭:০৭

আপডেট:
৩১ অক্টোবর ২০২০ ০৪:১৮

 

স্বপ্নগুলো আকাশ ছোঁয়া / চাহিদাগুলোও বড়ো,
ইচ্ছেগুলো বলছে আমায় / স্বপ্নগুলো গড়ো।
মন চাইছে স্বপ্নপূরণ / মন যে বড়োই দামি,
বাস্তবে তাকিয়ে দেখি / ঘরেই বসে আমি।

২০২০ মার্চে লকডাউন শুরুর  ঠিক আগে আগেই ঘুরে এসেছিলাম দিদির মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে ডায়মন্ডহারবার ও গঙ্গাসাগর। তারপর থেকে পুরোপুরি ঘরবন্দি আজ পর্যন্ত। এই দুঃখের সমব্যথী অনেকেই। তাই এই দুঃখের মাঝে কিছু আনন্দ ভাগ করে নিতেই চলে এসেছি পুরুলিয়া থেকে ৩৩নং জাতীয় সড়ক পথে ১০৩.২ কিমি অথবা হাজারিবাগ থেকে ৪৮ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ডের রামগড়ে রাজারাপ্পা থেকে আমার সঙ্গে আপনাদেরকেও মানস ভ্রমণ করিয়ে আনার জন্য। পুরুলিয়া ভ্রমণ সকলেই প্রায় করেন তাই সে গল্পে পরে একদিন আসবো। মূলত তিনটি বিষয়ের হাতছানি রাজারাপ্পার স্থান করে দিয়েছিলো আমার পুরুলিয়া ভ্রমণের চ্যাপ্টারে।

প্রথমত- ভৌগলিক কারণ বশত রাজারাপ্পা কিছুটা মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরের মার্বেল রকের প্রতিচ্ছবি। তাই হাতের কাছেই জব্বলপুরের মার্বেল রকের স্বাদ। 

দ্বিতীয়ত- সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা কাহিনী 'ছিন্নমস্তার অভিশাপ' এর ক্লাইম্যাক্স গিয়ে ঠেকেছিলো ঝাড়খণ্ডের রামগড় জেলার এই মন্দিরটিতে। সন্দেহ হয়, মানিকবাবু তাঁর রহস্য কাহিনির পটভূমিকায় ছিন্নমস্তাকে রেখেছিলেন একটা জবরদস্ত ব্যাকড্রপ হিসেবে। দেবীর ভয়াবহ রূপটিকে পিছনে রেখেই জটিল হয়েছিল রহস্য আর তদন্ত। 

তৃতীয়ত- রাজরাপ্পার ছিন্নমস্তা মন্দির অতি প্রাচীন। এই দেবস্থানকে ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম একটি পীঠ বলে মনে করেন তন্ত্রবিশ্বাসীরা। বলেই ফেলি ৫১পীঠ দর্শন আমার কাছে এক অদ্ভুত ভালোলাগার বিষয়। যেকোন জায়গায় বেড়াতে গেলে প্রথমেই জেনে নি কাছে পিঠে কোন সতীপীঠ আছে কিনা। সত্যি বলতে নেই নেই করে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫১টি পীঠের ৩০টিপীঠ দর্শন করে ফেলেছি।

ছবিঃ রাজরাপ্পার ছিন্নমস্তা মন্দির

অরণ্যসুন্দরী ঝাড়খণ্ডের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে আছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্যের পাশাপাশি দেবতাদেরও প্রিয় স্থান এই আদিবাসী অধ্যুষিত রাজ্যটি। দিকে দিকে নানা মন্দির ও তাকে ঘিরে থাকা নানান লোককাহিনীর  সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটিয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। তাই তো পর্যটন শিল্পের বিকাশে দুয়োরানি হলেও কত শত প্রকৃতি-পুজারির চিত্তহরণ করে চলেছে এই রাজ্যটি। রাজারাপ্পা নামটির সঙ্গে একটি সুন্দর কাহিনি জুড়ে রয়েছে। প্রাচীনকালে এখানকার এক জনপ্রিয় রাজা ছিলেন ‘রাজা’, তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল ‘রুম্পা’। পরবর্তীকালে রাজা ও রুম্পার নামে জায়গার নাম হয় রাজরাপ্পা।  রামগড় ক্যান্টনমেন্ট থেকে ২৮ কিমি দূরত্বে এক টিলার উপরে মা ছিন্নমস্তার মন্দির। কাছেই বিখ্যাত রাজরাপ্পা ফলস, দামোদর আর ভৈরবী নদীর মোহনা। পুরুষ দামোদরের বুকে জলপ্রপাত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া নারী ভৈরবীর দৃশ্য শুধু প্রাকৃতিক বৈভবের কথা বলে না, এই জলতরঙ্গে মিশে থাকে কাহিনি-কিংবদন্তি-মিথ।  ভারতবর্ষে মাত্র যে কয়েকটি ছিন্নমস্তা দেবীর মন্দির আছে তার মধ্যে রাজরাপ্পা প্রধান সিদ্ধপীঠ হিসেবে খ্যাত। দশমহাবিদ্যার অন্যতম রূপ ছিন্নমস্তা বা ছিন্নমস্তিকা। একদা দক্ষের যজ্ঞ উপলক্ষ্যে সতীর পিতৃগৃহে যাওয়ায় বাধা দিলে শিবের ওপর প্রচণ্ড রেগে দেবী দশটি রুদ্ররূপ ধারণ করে মহাদেবকে ভয় দেখান। মায়ের সেই দশটি রূপের অর্থাৎ দশ মহাবিদ্যার তৃতীয় রূপ হলেন মা ছিন্নমস্তা। দেখতে ভয়ংকরী হলেও মায়ের সব চেয়ে দয়াময়ী রূপ হল ছিন্নমস্তা।

ছবিঃ মায়ের ভৈরবী রূপী শিবলিঙ্গটি বেশ উঁচু বটে

একদা ডাকিনী ও যোগিনী-সহ এক সরোবরে স্নানরত ছিলেন দেবী। সেই সময় ডাকিনী ও যোগিনীর বড্ড খিদে পায়। খিদের যন্ত্রণায় তারা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। এই অবস্থায় কোথাও খাবার না পেয়ে মাতৃহৃদয় বড়োই ব্যথিত হয়। তখন উপায় না দেখে মা নিজেরই নখ দিয়ে গলা চিরে নিজের মুণ্ডু বাম হস্তে ধারণ করেন। গলা দিয়ে তিনটি রক্তধারার একটি ডাকিনী, একটি যোগিনী এবং আর একটি মায়ের নিজ মুখমণ্ডলে প্রবেশ করে। এই ত্রিধারাকে ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্নার প্রতীক বলে ধরা হয়। কামকে দলন করে কুলকুণ্ডলীনির জাগরণকেই ব্যক্ত করে এই মূর্তি। মায়ের গলায় নরমুণ্ড শোভিত। কাম ও রতির ওপর দণ্ডায়মানা এই রূপে ভয়ের পরিবর্তে সন্তানবৎসল মাতৃরূপটিই প্রকাশিত হয়। মা এখানে দয়াময়ী। কামলালসাকে সংযম করেন দেবী। হিন্দুধর্ম ছাড়াও তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মে দেবী ছিন্নমস্তা পূজিতা। মূলত উত্তর ভারত ও নেপালে ছিন্নমস্তার কয়েকটি মন্দির থাকলেও মায়ের মূল সিদ্ধপীঠ রাঁচি জেলার রাজরাপ্পায় অবস্থিত। যে কোনো শাক্তপীঠ বা সিদ্ধপীঠের মতো এখানেও বলিপ্রথা প্রচলিত। মানসপূরণে ভক্তরা ছাগবলি দিয়ে থাকেন। মায়ের পূজার প্রধান অর্ঘ্য নারকেল, প্যাঁড়া, চিঁড়ে, নকুলদানা জবার মালা ইত্যাদি। মূল মন্দির ছাড়াও মহাদেবের মন্দির, দক্ষিণাকালী মন্দির ও কিছু দূরে অষ্টমাতৃকা মন্দির। মায়ের ভৈরবরূপী শিবলিঙ্গটি বেশ উঁচু। পূজা দেওয়ার জন্য মন্দিরচত্বরের সামনে পেছনে রয়েছে পূজাসামগ্রীর অসংখ্য  দোকান। পছন্দমতো পূজার অর্ঘ্য নিয়ে মায়ের চরণে পূজা নিবেদন করে চলে আসুন দামোদরের কাছে। এই অঞ্চলটি ভৌগোলিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি অনুচ্চ পাহাড় থেকে পুরো ভৈরবী নদী দামোদর নদের বুকে আছড়ে পড়ছে।

ছবিঃ নৌবিহারের লেখক ও ছেলে

ভেরা অর্থাৎ ভৈরবী নদীকে নারী আর দামোদর নদকে পুরুষ মনে করলে নদ ও নদী অথবা নারী-পুরুষের সেই চির সঙ্গম হচ্ছে এই স্থানটিতে। টিলায় ঘেরা দামোদরের রূপ নয়নাভিরাম।

 ছবিঃ নৌবিহারে পাহাড়ের ফাঁকে ঐ দেখা যায় মন্দির

 

সেই রূপ একবার যে দেখেছে জন্ম জন্মান্তরেও তা সে ভুলবে না। দামোদরের পাড়ে অনেক নৌকা অপেক্ষা করে আছে আপনাদেরকে নিয়ে ভেসে পড়ার জন্য। তার মধ্যে যে কোনো একটিতে কুড়ি-তিরিশ টাকার বিনিময়ে ভেসেই পড়ুন দামোদরের বুকে। মার্বেল রকের মতো দু’পাশে পাথরের পাহাড়, তার মাঝখান দিয়ে ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যান জলপ্রপাতের কাছে। কয়েক মিনিট ঠান্ডা আবহে আর ঝরনার গর্জন শুনতে শুনতে হারিয়ে যান মন-কেমনের রাজ্যে। চাইলে নৌকো করে আরও কিছুটা ঘুরেফিরে মনের রসদ ভরে নিন। ফেরার পথে নিস্তব্ধ জঙ্গলে প্রকৃতিকে সঙ্গী করে দর্শন করে নিন অষ্টমাতৃকা মন্দির।

ছবিঃ পুরাতত্ত্বের জীবন্ত দলিল রামগড়ের পুরোনো শিবমন্দির

এখানে অরণ্যের শীতল ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রামও করে নিতে পারেন। আহারের জন্য অনেক দোকান আছে মন্দির চত্বরের বাইরে। সেখান থেকে আহারপর্ব সেরে ফেলুন। চাইলে রাজরাপ্পায় রাতও কাটাতে পারেন।  ফেরার পথেও রামগড়ে পুরোনো শিবমন্দিরের সামনে নেমে পড়ুন। ইটের মন্দিরটির অবস্থা আজ জরাজীর্ণ। বহু ইতিহাসের পথ পেরোনো মন্দিরটি বেশ বড়ো এবং দেখলেই বোঝা যায় এক সময় মন্দিরটির গায়ে অনেক কারুকার্য ছিল। এখন সে সব ক্ষয়প্রাপ্ত। বেশ ক’টা বড়ো বড়ো সিঁড়ি ভেঙে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে হয়। পুরাতত্ত্বের জীবন্ত দলিল দর্শন সেরে স্মারক হিসেবে রাজরাপ্পা থেকে বড়ো বড়ো প্যাঁড়াসন্দেশ নিয়েও আসতে পারেন। রাজারাপ্পা ছাড়ার আগে মন বলে আরও একবার চলো ফিরে যাই, নদীর ওই বুকেতে দাঁড়াই, মার্বেল রকের মতো দু’পাশে পাথরের পাহাড় আর আকাশের হাতছানিতে সাড়া দিই কি হবে না ভেবে। যাই হোক ফেরার তাড়া ছিলো কারণ বিকেলে পুরুলিয়া থেকে আমাদের ফেরার রিজার্ভেশন ছিলো। তাই হারিয়ে যাওয়া মন কেমনের রাজ্যকে মনের মণিকোঠায় সযত্নে তুলে রেখে বেড়িয়ে পড়তে হয়েছিলো।

কী ভাবে যাবেন

পুরুলিয়া ভ্রমণের শেষে ও এটা ঘুরে নিতে পারেন অথবা যে কোনো জায়গা থেকে ট্রেনে বরকাকানা বা রাঁচি আসুন। ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in। বরকাকানা জংশন স্টেশন থেকে ম্যাজিক ভ্যান বা অটোয় চেপে চলে আসুন মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরের রামগড় শহরে। রামগড় থেকে ৩২ কিলোমিটার রাজরাপ্পা, দিনভর বাস, ট্রেকার চলে। রাঁচি থেকে রামগড় ৩৭ কিলোমিটার, হাজারিবাগ থেকে রামগড় ৪৮ কিলোমিটার। দু’ জায়গা থেকেই বাস পাওয়া যায়। তা না হলে রাঁচি বা হাজারিবাগ থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে আসতে পারেন। কলকাতার এসপ্ল্যানেড থেকে রাতের বাস ধরে ভোরে নেমে পড়তে পারেন রাঁচিতে। 

কোথায় থাকবেন

সাধারণত রাঁচি বা হাজারিবাগ বেড়াতে এসে ঘুরে যাওয়া যায় রাজরাপ্পা। তবু রাজরাপ্পায় থাকার ইচ্ছে হলে থাকতে পারেন ঝাড়খণ্ড ট্যুরিজমের ‘দেবলোক’-এ। ফোন ৮২৪০৩০৯৩২৮, অনলাইন বুকিং http://jharkhandtourism.gov.in

 

ডাঃ রিনি পণ্ডা
কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top