সিডনী শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭

বসনিয়ায় অটোম্যান ঐতিহ্যের সন্ধানে : নূরুল হুদা হাবীব


প্রকাশিত:
১৫ অক্টোবর ২০২০ ১৫:১৮

আপডেট:
৩১ অক্টোবর ২০২০ ০৪:৪০

ছবিঃ অটোমান ব্রীজ

 

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ বসনিয়ায় এসেছি এক বছর পেরিয়ে গেছে। গত এক বছরে ১৩টি কোর্সের অমানবিক চাপ এবং করোনার কারণে রাজধানী সারায়েভোর বাইরে কোথাও যাওয়া হয়নি। আসার পর থেকেই ইচ্ছে ছিল বসনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহর সহ প্রতিবেশী আলবেনিয়া, কসোভো, ক্রোয়েশিয়া সহ বলকানের অন্যান্য দেশগুলো ঘুরে নানা ঐতিহাসিক বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ বলকানের বাস্তব অভিজ্ঞতা নেবো। মাঝখানে করোনা গোটা দুনিয়াকেই ঘরবন্দী করে ফেলল।

পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হওয়ায় ফিলিস্তিনি ক্লাসমেট সাবেরের সাথে পরিকল্পনা করে ফেললাম Mostar যাবো। রাজধানীর বাইরে Mostar বসনিয়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর। সারায়েভো থেকে বাসে ঘন্টা তিনেকের দূরত্ব। দুজন দায়িত্ব ভাগ করে নিলাম। স্থির হলো সাবের বাস কাউন্টারে খোঁজ নেবে আর আমি Mostar এর আবহাওয়া এবং আনুষাঙ্গিক বিষয়াদির খবর নেবো। ও খোঁজ নিয়ে জানালো সকাল ন'টায় বাস যায়, বেলা তিনটা এবং সন্ধ্যা ছয়টায় ফেরত আসে। স্টুডেন্ট হওয়ায় বাসে একটা বড়সড় ডিসকাউন্টও পাওয়া যায়। আমিও খবর নিয়ে জানলাম বেশ রোদ্দুর-ঝলমলে আবহাওয়া।

তবে আর দেরি কেন। চার তারিখ রবিবার সকালবেলায় রেডি হয়ে ব্যাগটা কাঁধে ফেলে বেরিয়ে পড়লাম। প্ল্যান হলো ট্রামে করে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাস ধরবো। ওমা! বাসার পাশের ট্রাম স্টেশনে গিয়ে টিকেটের জন্য হাত বাড়াতেই ভদ্রমহিলা একগাল হেসে বললেন- লাইনে কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে বিধায় আগামী একমাস ট্রাম চলাচল বন্ধ। সকাল-সকাল মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। আধাঘন্টা হাটতে হবে। ভাগ্যিস হাতে সময় নিয়ে বেরিয়েছিলাম। মাঝপথে সাবেরের সাথে মিলিত হলাম। স্টুডেন্ট কার্ড (ইনডেক্স) দেখিয়ে কুড়ি মার্ক অর্থাৎ প্রায় এক হাজার টাকায় টিকেট নিয়ে বাসে উঠে বসলাম। অন্য সবার জন্য পয়ঁত্রিশ মার্ক।

বামে তাকিয়ে দেখি অন্যপাশে বোরকা এবং হিজাবে আবৃত দুজন তরুণী বসা। বেশভূষা দেখে মনে হলো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। সাবের বসেছে মেয়ে দু'জনের পেছনের সিটে। বসে মনে-মনে দোয়া-দরুদ পড়তে লাগলাম। কি ভাবছেন, নারীর ফিতনা থেকে হেফাযত থাকার জন্য? আরে না, ফিতনার আশংকা নাই। এসি/আবদ্ধ বাস-কারে উঠলেই বমন করার একটা প্রবণতা আছে আমার। বমনকার্য থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য দোয়া-দরুদ পড়ছি। ঠিক ন'টায় বাস ছাড়ল। খেয়াল করলাম বাসের ড্রাইভার আর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একসাথে দাড় করালে দু'জনকে আলাদা সনাক্ত করার জন্য মেলানিয়াকে ডাকতে হবে। বেশভূষা এবং দৈহিক আকৃতিতে একেবারে 'খাপে খাপ মমতাজের বাপ'।

দু'দিকে নানারকম গাছপালা আর নাম না জানা হরেক রকম ফুলের গাছসমৃদ্ধ উঁচুনিচু পাহাড়। আঁকাবাঁকা সরু পাহাড়ী পথ ধরে বাস চলছে। ঘন্টাখানেক বেশ ভালভাবেই গেল। আস্তে-আস্তে কপাল ঘামতে শুরু করেছে আমার। খানিক পরে মনে হলো এই বুঝি বেরিয়ে যাবে, বমি। ভাবছি বসনীয় তরুণীদের সামনে বাসে উঠে বমি করলে আমার জাতির বড় লস হয়ে যাবে। নিজের ইজ্জতের চেয়ে তখন আমার কাছে জাতির মান রক্ষাই মূখ্য।

পাঠকগণ হয়তো বলবেন- জাতির মান রক্ষা কিভাবে? ধরুন, ভবিষ্যতে ঐ তরুণীদের কারো সাথে কোনো বাংলাদেশি তরুণের বিয়ের সম্বন্ধ এলো। তখন মেয়েগুলো কি ভাববে বলুনতো! যেহেতু এই দেশে আমি বাংলাদেশের তাবৎ তরুণ সমাজের প্রতিনিধিত্ব করি, সাত-পাঁচ ভেবে অনেক কষ্টে চেপে রইলাম। নামার পর হালকা অনুভব করলাম। হাটতে হাটতে চলে গেলাম যে ব্রিজ দেখার জন্য এত কষ্ট করে যাওয়া, সেই Mostar Old Bridge'-এ। কফি পান করে একটু ফ্রেশ হয়ে তারপর গেলাম ব্রিজের একদম কাছে।

এবার ব্রিজের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস শুনুন। প্রখ্যাত অটোম্যান শাসক, সুলতান সুলেমান তখন সিংহাসনে। বসনিয়া যেহেতু অটোম্যানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ, সেহেতু এ অঞ্চলের উন্নয়নে তার তীক্ষ্ণ নযর। ১৫২২ সালে মস্টার শহরটি হার্জেগোভিনা অঞ্চলের হেডকোয়ার্টারে পরিণত হয়। এখান থেকেই অটোম্যানরা আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেনা অভিযান পরিচালনা করতো। নেরেটভা নামক ছোট্ট নদীটি (Neretva) মস্টার শহরকে দুটো ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে এবং ইতোমধ্যে নদীর উপর কাঠের একটি ব্রিজও নির্মিত হয়েছে।

অটোম্যানদের প্রবাদপ্রতিম স্থপতি মিমার সিনানের শিষ্য মিমার হাজরুদ্দিন সুলতানের কাছে অনুমতি চাইলেন ব্রিজটিকে মযবুত করে নতুনভাবে তৈরির জন্য। সুলতানের অনুমতিক্রমে হাজরুদ্দিন ১৫৫৭-১৫৬৬ সাল পর্যন্ত পাথর দিয়ে ব্রিজটিকে নতুন করে নির্মাণ করেন। এ কাজে তিনি সময় নেন দীর্ঘ নয় বছর। ছোট এই ব্রিজ তৈরি করতে নয় বছর সময় নেয়া থেকেই বুঝা যায় কত নিপুণ কারুকাজ ব্যবহার করা হয়েছে ব্রিজের নির্মাণশৈলীতে। নির্মাণকালে পুরো সময়ে এটির দেখভাল করেন সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিশেন্ট এর শ্যালক কারাগোজ মেহমেত বে।

দুঃখজনকভাবে বসনিয়ার যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৯৯৩ সালের ৯ নভেম্বর ক্রোয়াট মিলিটারীর শক্তিশালী শেলের আঘাতে ব্রিজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৪ সালে এটিকে UNESCO'র সহায়তা সংস্কার করা হয় এবং ২০০৫ সালে UNESCO ব্রিজটিকে World Heritage এর তালিকাভূক্ত করে। ইউরোপ এবং ইউরোপের বাইরে থেকে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক ব্রিজটি পরিদর্শনে আসে। ব্রিজটি ছাড়াও এ শহরের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন বিষয় হলো অটোম্যান আমলে তৈরি পুরনো বাড়ী-ঘর ও দালান-কোঠা। গোটা শহরের অলিগলিতে উসমানী খিলাফাতের পদচিহ্ন। যদিও বসনিয়া সহ পুরো বলকানেই অটোম্যানদের পদচিহ্ন এখনো আঁকা রয়েছে।

ব্রিজের চারিপাশে দেখা শেষ করে নামায পড়লাম অটোম্যানদের সময়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে তৈরি একটি পুরনো মসজিদে। রোদে গা জ্বলে যায় কিন্তু পানি ট্যাপের অসম্ভব ঠান্ডা। অজু করে খানিকটা পানি বোতলেও ভরে নিলাম৷ শহরের চারপাশে ঘোরাঘুরি আর খাওয়া-দাওয়া করে এবার ফেরার পালা। যেহেতু ফিরতি টিকেট আগেই কাটা ছিল। এসে বাসে উঠলাম। এবারের বাসটি আগেরটির তুলনায় অধিক উন্নত। তবুও কিছুক্ষণ পর থেকেই আমার ভেতরটা গুলিয়ে আসতে আরম্ভ করলো। তার উপরে বোনাস হিসেবে যোগ হলো বাসের পেছনের দিকে বসা একদল আন্টির অট্টহাসির কর্কশ শব্দ। হাসি যে সবসময় মুগ্ধকর হয়না, সেটা আমার পরিস্থিতিতে না পড়লে কেউ বুঝবেনা। এবারও বেশ কষ্ট করে বমি আটকালাম।

না, তিন ঘন্টা পর বাস থেকে নেমে আর পারলমনা। খানিকটা দূরে গিয়ে হড়হড় করে..............। সফরসঙ্গী সাবের বলল- 'আর ইউ ওকে'? মুখে বলার এনার্জি ছিলনা, ঘাড় কাত করে বললাম হ্যাঁ ওকে, চল এখন।

এভাবেই শেষ হলো আমার অটোম্যান ঐতিহ্য দর্শনের ভাললাগা-মন্দলাগার মিশেলে বৈচিত্র্যময় ভ্রমণ।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে

 

নূরুল হুদা হাবীব
এম এ শিক্ষানবীশ, ইউনিভার্সিটি অব সারাজেভো, বসনিয়া এবং হারজেগোভিনিয়া



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top