সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২৬শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

মায়ামাটির টানে, নাকটি'র পথে  : শান্তনু কুমার


প্রকাশিত:
১২ নভেম্বর ২০২০ ১৬:২৭

আপডেট:
২৬ নভেম্বর ২০২০ ২৩:৩৩

 

ইন্দ্র মাঝেমধ্যেই একটা কথা বলত যে, কখনও কখনও গন্তব্যস্থানের চেয়ে পথ চলাটাই অনেক বেশি আকর্ষণীয় লাগে। তরুণ ভ্রমণসখা ইন্দ্রর আপাত সহজ সরল এই মন্তব্যটিকে আমি খুব যে তলিয়ে দেখেছি বলতে পারিনা । কিন্তু আজ যে রাস্তায় ওই আমাদের সারথি-----ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলার চক্রধরপুর-চাইবাসার যে বন্ধন-পথ দিয়ে আমি আশৈশব যাতায়াত করেছি, কখনও জন্মভূমি চাইবাসার লালমাটির নিবিড় টানে, আবার কখনও বা মন ভারি করে ফিরতি পথে বোম্বাই এক্সপ্রেসে কলকাতায় ঘরে ফেরার তাগিদে----দীর্ঘ এই ২৬ কিলোমিটার সুনির্মিত পথ যে এত বৈচিত্র্যময়, এত প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর, তা আমার দৃষ্টিদৌর্বল্যে বা অনুভবদীনতায় এতকাল যে সেভাবে অবলোকিত হয়নি তা বলাই বাহুল্য। পথের দু'পাশে বয়সী শাল, সেগুন, আবার কখনও প্রাচীন এক জোড়া অর্জুন বৃক্ষের দুর্লভ অন্তরঙ্গতা---মধ্যে মধ্যে কচি ধান, সর্ষে, জনাইয়ের বাহারি ফরাসে ঢাকা প্রসারিত প্রান্তর, দুধারে দূরবর্তী অতন্দ্রপ্রহরী পর্বতশ্রেণী যেন নিশ্চিন্তির আড়াল দিয়ে এই 'সবুজ সমারোহকে' রক্ষা করার সংকল্পে ব্রতী। আবার এরই ফাঁকে পড়ন্ত বেলায় বাঁশপাতি, নীলকণ্ঠ, ক্লান্ত কালো ডানার চিলপাখিরা যখন বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা দড়িতে ক্ষণবিশ্রামরত, সহসা এক ঝাঁক টিয়ার কলতানে যখন এ বনপ্রান্তর মুখরিত, গ্রামের আদিবাসী বউরা কাঁকাল জিম্মায় আপন শিশুটিকে রেখে, কাঠ-কুটো ইন্ধন-যোগাড়  নিয়ে ক্লান্ত পায়ে মাঠ পার করে ঘরমুখো, পাঠ শেষে বিদ্যালয় ফেরত ছেলেমেয়েরা যখন সানন্দে পথমধ্যে----- আর এসব নিরন্তর সংঘটনের মধ্যে আমি তখন গাড়ি থেকে নেমে পথের ধারে,পৃথিবীর এক অচিন অনুল্লেখ জমিতে দাঁড়িয়ে জগৎসংসারের অপরূপ মহিমা প্রত্যক্ষ করে চলেছি--- যা ছিল ইন্দ্রর কথায় 'গন্তব্যের চেয়েও আকর্ষণীয়', আর আমার উপলব্ধিতে, মন-ক্যামেরায় এ যাবৎকাল অধরা।

আমাদের গন্তব্যস্থল নাকটি জলাধার। চাইবাসা-চক্রধরপুর হয়ে করাইকেলা-রাঁচির রাস্তায় আরও প্রায় ১৮ কিলোমিটার। কিছুদিন আগেই পাহাড় থেকে নেমে আসার সময় ইন্দ্র আঁচ করেছিল জায়গাটার। আর আজ সকালে গুগল-শাস্ত্রে তার একটা সঠিক ঠিকুজি-কুষ্ঠি বের হল। একরূপ অজানা অচেনার সন্ধানে ইন্দ্র যখন গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছিল তখনই বেলা গড়াতে শুরু করেছিল। নাকটির আর এক সফরসঙ্গী শুভর হাতে দূরবীন থাকলেও খালি চোখে সে যেভাবে একের পর এক পাখিদের নাম-গোত্র আওড়াচ্ছিল তাতে তাকে পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক না বলে অনায়াসে পক্ষীবিশারদ বলা যায়। আমি অবশ্য এ সাবজেক্টের 'সহজ পাঠ' এখনো উদ্ধার করতে পারিনি। শুধু শালিখ, ঘুঘু, বুলবুলি আর ছাতারে মিলে আমার বাড়ির বাগানের পরিচিত 'স্বরগম '---তাদেরই কারো কারো কোন্দল-আপোশেও যে শুদ্ধ-বিকৃত স্বরের হারমনি গড়ে ওঠে, অনুকূল-প্রতিকূল প্রকৃতির মধ্যে থেকে পারস্পরিক সহাবস্থানে তারাও যে আকুল---এটুকু বুঝতে পারি তা প্রাণিকুলশ্রেষ্ঠ বিভেদবিদীর্ণ মনুষ্যসমাজের কাছে বাস্তবিক একটি শিক্ষণীয় সিলেবাস।

 

আজ এ যাত্রাপথে শুভর সন্ধানীদৃষ্টিতে হদিশ পাওয়া কত পাখিরই না সঠিক কুলপরিচয় পেলাম, তার আদ্যন্ত আমার স্মৃতিতে স্থায়িত্ব না পেলেও, পথিমধ্যে যে বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়েছিল তার কৃৎকৌশল, সৌন্দর্য আমাকে বিস্ময়াভিভূত করেছিল। করাইকেলা থেকে সোজা যে রাস্তা পাহাড়ি 'ঘাটি' পেরিয়ে রাঁচির দিকে উঠে গেছে, তারই ডানদিকে এই প্রত্যন্ত 'নাকটি'-গ্রাম-উপত্যকার রাস্তা শুরু, আর সেখানেই একটি খেজুর বৃক্ষের প্রায় প্রতিটি উচ্চপল্লবে দোদুল্যমান খাসা বাসাগুলি ---উল্লেখিত ঘরামি পাখিদের ঠাসবুননে---দেখে মনে হয় নাকটি-রাজের সন্ধ্যাপথ জোনাক-প্রদীপে আলোকিত করার জন্য প্রকৃতিবান্ধব এই পাখিরা পরম নৈপুণ্যে এই ঝাড়বাতিটি নির্মাণ করেছে।

গ্রামের অভ্যন্তরে গাড়ির সম্মুখে তখন ঘরমুখো একদল গৃহপালিত চতুষ্পদী, ত্রস্ত পায়ে পথবিচ্যুত তারা, আর তাদের সিধে করতে নাজেহাল রাখাল-যুবকেরা----উপলাকীর্ণ এই পথে তরুণ ইন্দ্রও পাকা চালকের মতো টালমাটাল গাড়িটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টায়---- কৌতূহলী নিষ্পাপ শিশুদের তৃপ্তচাহনি যেন এই অর্বাচীন তিনটি প্রাণীর তাদের চৌহদ্দিতে সহসা পদার্পণে নীরব সম্মতি জানিয়ে রাখল।

 

কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁছলাম নাকটি জলাধারের নিচে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৮০ মিটার উচ্চতা বরাবর, পূর্বদিকে 'টেবো' পাহাড়ের পাদদেশে, বান্দগাঁও ব্লকে ড্যামটির অবস্থান, বৃষ্টি বা পাহাড়ি নদীনালাবাহিত এই সুগভীর স্থির বারিসম্পদ, এ অঞ্চলের সেচের জলের চাহিদাপূরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে রত---আর তার সম্মুখে, পশ্চিমের পর্বতপাদদেশে, বিশাল হরিৎ আবাদক্ষেত্র----নাকটি জনপদের সুখদুঃখের জমিন-আসমান-----যেন দিনান্তের মায়াময় স্বর্ণালোকে, কুহেলিকার আলিম্পনে আর কোজাগরী পূর্ণচন্দ্রিমার স্নিগ্ধতায় সম্পূৰ্ণ হয়ে আসন্ন সন্ধ্যায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে ধনদাত্রীর পবিত্র আরাধনায়।

 

শান্তনু কুমার
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top