সিডনী মঙ্গলবার, ২৬শে জানুয়ারী ২০২১, ১৩ই মাঘ ১৪২৭

ও নীলগিরি : আবু আফজাল সালেহ


প্রকাশিত:
২৬ নভেম্বর ২০২০ ১৬:০২

আপডেট:
২৬ নভেম্বর ২০২০ ১৯:১৪

চিম্বুকে মেঘের ভেলা, পাহাড়ের মেলা

 

বাংলাদেশের ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় জেলা বান্দরবান জেলা। এ পার্বত্যজেলায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসবাস। বাঙালি ও বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যকার সম্প্রীতির এক বিরল দৃষ্টান্ত। নীলগিরি, নীলাচল, মেঘলা, বগালেকের মত অসংখ্য ট্যুরিস্টস্পট এ জেলায়। একমাত্র পাহাড়ি নদী সাঙ্গুর অনুপম দৃশ্য মন জুড়িয়ে দেয়। বান্দরবানের চমৎকার একটি স্পট নীলগীরি। শহর থেকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি প্রায় ৫০ কিমি পথ বেয়ে পাহাড়চূড়ায় এ নান্দনিক স্পট। জনপ্রতি প্রবেশ ফি ৬৫ টাকা। সিএনজি/চাঁদের গাড়ি পার্কিং করতেও গাড়িভেদে ৩০/১০০/৩০০ টাকা চার্জ লাগে। নীলগিরি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যটন কেন্দ্র। এ পর্যটন কেন্দ্রের উচ্চতা প্রায় ৩ হাজার ফুট। এটি বান্দরবান জেলার থানছি উপজেলায় অবস্থিত।

লেখক

নীলগিরি যাওয়ার পথেই মেঘের দল। মেঘ ছুতে মন চায়।

শহর থেকে সিএনজি করে পারিবারিক ভ্রমণ শুরু করলাম। দু-মেয়ে সহ আমরা চারজন। শুরু থেকেই রোমাঞ্চকর যাত্রা। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ রোমাঞ্চজাগানিয়া। একটু যেতেই মেঘপরিদের খেলা। মেঘের খেলা দেখতেই আমরা ভোরেই বের হয়েছি। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মেঘপরিরা ক্লান্ত হয়ে যায়। খেলা কমিয়ে দিতে থাকে। ফলে আমরা প্রথমেই ৪৭ কিমি দূরের নীলগিরি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।পাহাড় মেঘ আর সবুজের মধ্য দিয়ে আমাদের গাড়ি চলতে লাগল। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অস্থায়ী বাজার দেখা গেল। পেঁপে, আনারস, কলার আধিক্য দেখলাম। পাহাড়িদের বিচিত্র জীবনযাত্রা উপভোগ করতে করতে ছুটে চললাম গন্তব্যের দিকে। মাঝেমধ্যে পাহাড়ি শিশুদের হাত নেড়া শুভেচ্ছা। যাওয়ার ডান বা বা দিকে সারি সারি পাহাড়শ্রেণি। উঁচু উঁচু সবুজ পাহাড়ে মেঘ আটকে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পাখির কলতান মুগ্ধ করছে। এসব উপভোগ করতে করতেই পৌঁছে গেলাম স্বপ্নের নীলগীরি। টিকিট কেটে প্রবেশ করতেই কী প্রশান্তি! কী নান্দনিক দৃশ্য! আমরা অনেক উঁচুতে। আর মেঘমালা ভেসে বেড়াচ্ছে আমাদের নিচে, পাহাড়ে। দূরের সিঁড়ির মতো পাহাড়। আকাঁবাঁকা পথ- কী দারুণ দেখতে!

মিলনছড়ি পুলিশ চেকিং পয়েন্ট থেকে পাহাড়ি নদী সাঙ্গু

এবার ফেরার পালা। ২০-২৫ কিমি আসতেই পাহাড়ি সাঙ্গু নদী উঁকি দিচ্ছে। কী মনোলোভা! মিলনছড়ি পর্যন্ত সাঙ্গুর এমন কোমনীয় দৃশ্য মন ভরিয়ে দেবেই। এরপরেই চিম্বুক পাহাড়। এখানে থামলাম। ২০ টাকার জনপ্রতি টিকিট কেটে উঠতে থাকলাম চিম্বুক পাহাড়ে। চিম্বুক সারা দেশের কাছে পরিচিত নাম। বান্দরবান জেলা শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে চিম্বুক পাহাড়ের অবস্থান। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ২৫০০ শত ফুট। চিম্বুক বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম পর্বত। একটু উপরে উঠতেই চোখ ছানাবড়া। পাহাড় আর পাহাড়! আহা, কী সুন্দর বান্দরবান! চোখ ফেরানো যায় না! যতদূর চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ে লুকিয়ে শুভ্র মেঘ। কিছু মেঘমালা ওড়াউড়ি করছে। কী যে শিহরণ জাগানিয়া দৃশ্য! না দেখলে বিশ্বাস করানোই কঠিন! চিম্বুক যাওয়ার রাস্তার দুই পাশের পাহাড়ি দৃশ্য খুবই মনোরম।

নীলগিরি হেলিপ্যাড থেকে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। এ পথটিই বান্দরবান শহরে নিয়ে যাবে।

কী অপরূপ পার্বত্য বান্দরবান জেলা

এরপর রওনা দিলাম শৈলপ্রপাতের উদ্দেশ্যে। শহর থেকে ৮/১০ কিমি দূরের এ ঝর্ণা। এখানে উপজাতীয়দের ছোট বাজারও আছে। ফলমুল ও পাহাড়ি পোশাক কেনাকাটা করতে পারবেন। কিছুদূর যেতেই সাঙ্গুর অপরূপ দৃশ্য। মিলনছড়ি পুলিশ চেকিং পয়েন্টের নিকট ছবি তুললাম। মনে মনেই বলে উঠলাম, কী সুন্দর, কী সুন্দর! সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতেই যেন আগলে রেখেছে বান্দরবানের এমন সৌন্দর্য। দুপুর ১টা নাগাদ ফিরে এলাম বান্দরবান শহরে। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে ও খাওয়া দাওয়া করে বেলা ৩টার দিকে নীলাচল ও মেঘলার দিকে যাত্রা করলাম। যাতায়াতের সিএনজি ভাড়া নিল ৮০০ টাকা। বিকালে নীলাচলের অভূতপূর্ব দৃশ্য পর্যটিকদের মন ভরিয়ে দেয়। মেঘলা দেখে টাইগার পাড়া। উপজাতীয়দের জীবনকালচার উপভোগ্য।

চিম্বুক পাহাড় থেকে অকৃত্রিম প্রাকৃতিক দৃশ্য

যাতায়াত:
বাসযোগে দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে চট্টগ্রাম। ট্রেনে ঢাকা/সিলেট/ময়মনসিংহ থেকে ট্রেনেও চট্টগ্রাম যাওয়া যাবে। এরপর বদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে এসি/ননএসি বাসে বান্দরবান। ঢাকা থেকে শ্যামলী, ইউনিক, হানিফ, সেন্টমার্টিন পরিবহনসহ বেশ কিছু বাস সকাল-রাতে সরাসরি বান্দরবান যায়। ভাড়া ৬৫০ থেকে শুরু।

থাকা ও খাওয়া:
থাকা ও খাওয়ার জন্য বান্দরবানে বিভিন্ন মান ও দামের অনেক হোটেল/রিসোর্ট পাওয়া যাবে। বাসটার্মিনালের কাছেই বেশ কিছু আবাসিক ও খাওয়ার হোটেল পাবেন।

নীলগিরির সবোর্চ উচ্চতা থেকে পাহাড় ও মেঘের মিতালি। পর্যটন কেন্দ্রের উচ্চতা প্রায় ৩ হাজার ফুট।
চাঁদের গাড়ি ভাড়া:
টার্মিনালের কাছেই নীলগীরি, নীলাচল বা থানচি যাওয়ার সিএনজি, চাঁদের গাড়ি পাওয়া যাবে। ছোট-বড় চাঁদের গাড়ি ২৩০০ টাকা থেকে শুরু। ৫-১৫ জন যাতায়াত করা যাবে। আর ২/৩ জনের জন্য সিএনজি ভাড়া পাওয়া যাবে। ভাড়া কমবেশি দুই হাজার। এ চুক্তি নীলগিরি, মিলনছড়ি, চিম্বুক পাহাড় ও শৈলপ্রপাতের প্যাকেজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নীলাচল, মেঘলা বা শহরের কাছাকাছি ভ্রমণের জন্য কমবেশি হাজারের কাছাকাছি (স্পট প্রতি) সিএনজি/চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করে নিতে হবে। এক বা দুই জন হলে অন্য কোন পার্টির সঙ্গে শেয়ার গাড়ি ব্যবহার করতে হবে। নতুবা খরচ অনেক বেশি পড়বে। এখানে রিজার্ভ ছাড়া গাড়ি পাওয়া যায় না।

যেতে যেতে উপজাতীয়দের অস্থায়ী বাজার। সকালের দিকে নিজস্ব কৃষি দ্রব্যাদি কেনাবেচা হয়।

উপজাতীয় বাজার:
বান্দরবান শহরে দিন-রাতে উপজাতীয় বাজার বসে। এটা মগ বাজার নামেই পরিচিত। পাশেই বার্মিজ বাজার। এছাড়া জেলার বিভিন্ন রোডসাইডে ছোট-বড় উপজাতীয়দের বাজার বসে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা হয়।

 

আবু আফজাল সালেহ
কবি ও প্রাবন্ধিক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top