সিডনী মঙ্গলবার, ১৩ই এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র ১৪২৭

নৌ বিহার : শাহানারা পারভীন শিখা


প্রকাশিত:
৬ মার্চ ২০২১ ১২:৩৯

আপডেট:
৬ মার্চ ২০২১ ১৬:৩২

 

নৌ ভ্রমণের সুযোগ পেলে ছাড়িনা সহজে। ক্র্যাবের এবারের পিকনিক এবং ফ্যামিলি ডের আয়োজন হয় নৌ বিহারের। বুড়িগঙ্গা হয়ে মেঘনা নদী ঘুরে ফের সদরঘাটে ফিরে আসা। নৌ ভ্রমণ আমার কাছে অন্য রকম এক অনুভূতি নিয়ে আসে বরাবর।

নদীর বুকে ঢেউ গুনতে গুনতে। জলযান গুলোর নদীর বুকে ঢেউ তুলে ছুটে চলা। আর দুপারের প্রকৃতি দেখতে দেখতে যাওয়া। সত্যিই অত্যন্ত আনন্দদায়ক আমার কাছে। এবারের নৌ ভ্রমনের বিশেষত্ব একটু ভিন্ন।

মেঘনা নদীর ওপারে যাত্রা বিরতি আছে।

নির্দিষ্ট সময়ের বেশ আগেই পৌঁছে যায় সদরঘাটে। মানুষের কোলাহল আর হাঁকডাঁক পেরিয়ে লঞ্চে এসে উঠি। এডভেঞ্চার - ৯। বিশাল লঞ্চ। আমাদের জন্য নির্ধারিত কেবিনের চাবিটা নিয়ে তিনতলায় চলে আসি।

লঞ্চ ছাড়তে বেশ দেরি তখনও। আমি কেবিনের সামনের বারান্দায় বসে দেখতে থাকি শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা নদীর ক্ষয়ে যাওয়া রূপ। ময়লা আবর্জনা আর দুর্গন্ধ চারপাশ জুড়ে। কুচকুচে কালো রঙের পানি। বিষাদমাখা মন নিয়ে চারপাশটা দেখতে থাকি। এরমধ্যে লঞ্চ ছাড়ার শব্দ ভেসে আসে।

আমাদের যাত্রা শুরু হয়। নাস্তা পর্ব শেষ করে ছাদে চলে আসি। ওখান থেকেই দেখতে থাকি বুড়িগঙ্গার রূপ। দুপারে পরিকল্পনাহীন নানা স্থাপনা। কলকারখানার কালো ধোঁয়া, দূষিত বর্জ্য নদীর পানিতে এসে মিশছে।

এর মধ্যেই চলছে জীবিকার আয়োজন। বিশাল লঞ্চ, ছোট ছোট নৌকা সবই ছুটে চলেছে। নদীর বুকে ঢেউ এঁকে।

লঞ্চ এগিয়ে চলেছে। পেছনে রেখে এলাম শহরের সুউচ্চ অট্টালিকার সামনে দিয়ে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা নদী।

নদীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আমার পুরনো। আমি ছুটে চলা জাহাজ দেখি। দুপারের প্রকৃতি দেখতে থাকি মুগ্ধ মনে। আস্তে আস্তে বদলে যেতে থাকে নদীর চেহারা। টলমলে স্বচ্ছ পানি। বুঝলাম আমরা মেঘনা নদীর বুকে চলে এসেছি। প্রান ভরে শ্বাস নিই। এবারের নৌ ভ্রমণে যাত্রা বিরতি আছে মেঘনা নদীর ওপারে মোহনপুরে। ওখানে নাকি সমুদ্রের আদলে সৈকত আছে। শুনার পর থেকেই আমি মনে মনে বেশ স্বপ্ন এঁকে ফেলি। একটা পাড়। বালুতে পা ফেলে হাটাহাটি। ঢেউ এসে আলতো ছুঁয়ে যাবে আমাকে। সারি বেঁধে সাজানো রঙিন ছাতার নিচে একটু জিড়িয়ে নিব।

লঞ্চ জলকেটে এগিয়ে চলেছে। আমিও সাগর সৈকতের কল্পনায় ভাসতে থাকি। আর নদীর সৌন্দর্য দেখতে থাকি। মুঠোফোনে তুলে রাখি নদীর সৌন্দর্য। এরমধ্যে শুনতে পেলাম লঞ্চ মোহন পুরে চলে এসেছে।

 দূর থেকে সাজিয়ে রাখা বাহারি ছাতা আর তার নিচে সাজিয়ে রাখা সারি সারি রঙিন রঙিন চেয়ারগুলোর দিকে চোখ যায়।

আসলেই কি এখানে কোন সৈকত আছে। নাকি মজার ছলে কেউ বানিয়েছে এ গল্প। ঘাটে বিশাল আকারের রূপালি ইলিশের দিকে চোখ পড়ে। রোদে চিক চিক করছে। শিল্পির হাতে তৈরি স্থাপনা এটা। মোহনপুর বিনোদন পার্ক। গেটে আমাদেরকে ফুল দিয়ে অভর্থনা জানালো। টকটকে লাল গোলাপটা মাথায় গুজে নিয়েছি ভালোবেসে।

একটু এগিয়েই থমকে গেছি। সামনে সৈকত। গল্প নয়। একেবারে সত্যি। বাতাসে উড়তে থাকা রঙ বেরঙের ছাতা। দেখেই নেমে গেলাম সৈকতে। বালির উপর দিয়ে হাঁটতে থাকি। মধ্য দুপুর। কড়া রোদ। তবুও এলোমেলো বাতাস এসে গায়ে লাগে। একটা ছাতার নিচে যেয়ে বসি। সামনে মেঘনার তীরের বালিতে হালকা হালকা ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে স্বচ্ছ পানি। বর্ষায় এই ঢেউ আরও প্রবল হয়।

মোহনপুর বিনোদন পার্ক। সদরঘাট থেকে মাত্র ঘন্টা দুয়েকের পথ।  বেশ নতুনই হয়েছে। এখনো আনন্দ আয়োজনের নানা কাজ চলছে। সমূূ্দ্র আমায় খুব টানে। যাওয়া হয়নি বেশ কয়েক বছর। ছাতার নিচে বসেই ভাবছিলাম আমি কোন সৈকতে বসে আছি। পায়ের নিচে চিকচিকে বালি।

দুজন নেমে যাই নদীর পাড়ে। হালকা ঢেউয়ের মাঝে পা ভিজিয়ে হাঁটতে থাকি। অনেকেই নেমে পড়ে পানিতে। আছে সাজানো ঘোড়া। বাচ্চারা তাতে চড়ে ঘুরছে মনের আনন্দে। আছে স্প্রীডবোর্টে চড়ে মেঘনার বুকে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা। দুপুরের খাবারটা এই পার্কের সুবিশাল হলরুমে আয়োজন করা হয়। জায়গাটা আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে। ভরা বর্ষায় যাওয়ার ইচ্ছে নিয়ে আর সমুদ্রের আবেশ নিয়ে আবারও লঞ্চে ফিরে আসা।

বিকেলের মেঘনা নদীর অপরূপ ছবি চোখে পড়ে। টকটকে লাল সূর্যের আলো নদীর বুকে পড়ে অপার্থিব এক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। সোনালী আভায় তৈরি হওয়া পথ যেন স্বর্গের সিড়ি। দুচোখ ভরে দেখি সৃষ্টির অপার সৌন্দর্য।

মেঘনার স্বচ্ছ জল পেরিয়ে বিকেলের টকটকে লাল সূর্য দেখতে দেখতে বুড়িগঙ্গা নদীতে এসে পরেছি আমরা।

এখানেও নদী আছে।আকাশে টকটকে লাল সূর্য আছে। আভা ছড়িয়েছে নদীর বুকে। কিন্তু জৌলুশহীন সেই রূপ। ইটভাটার চিমনির কালো ধোঁয়ায় সূর্যটাও ঢেকে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। মন খারাপ করা দৃশ্য।

আমাদের ভ্রমণ প্রায় শেষের পথে। প্রায় ঘাটের কাছাকাছি চলে এসেছি।  সন্ধ্যা নেমে এসেছে। এরমধ্যেই গোধূলির মায়াবী সূর্যটাকে ডুবে যেতে দেখেছি নদীর একপাড়ে। আরেক পাড়ে দেখেছি হলদে আভায় বিশাল পূর্ণিমার চাঁদ উঠতে।  অন্ধকার কেটে যেয়ে চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে যাবে আমাদের চারপাশ। হুইসেল বেজে ওঠে। আমাদের আনন্দ  ভ্রমণ শেষ হয়।

মানুষের ভালোবাসা আর যত্নে আমাদের খুব কাছের এই বুড়িগঙ্গা নদীটা ফের ফিরে পাবে তার হারানো জৌলুশ। নিঃশ্বাস বন্ধ করে নয়, প্রাণভরে যেন বিশুদ্ধ বাতাস বুকে টেনে নিতে পারি। এই স্বপ্ন নিয়ে যার যার গন্তব্যে ফিরে আসি।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top