সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২১শে জানুয়ারী ২০২১, ৮ই মাঘ ১৪২৭


সুবীর নন্দী: শুদ্ধ সঙ্গীত চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ : অশ্রু বড়ুয়া


প্রকাশিত:
২৩ নভেম্বর ২০২০ ১৫:৩৩

আপডেট:
২১ জানুয়ারী ২০২১ ২১:৪২

ছবিঃ সুবীর নন্দী

 

গত শতকের ষাট দশককে বলা হয়- আধুনিক বাংলা গানের জাগরণ পর্ব বা স্বর্নযুগ।ওই সময় আমাদের দেশে ভারতীয় বাংলা আধুনিক গানের শিল্পীদের বিস্তর প্রভাব ছিল। ঠিক তেমনি সময়ে বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রতিভাধর, মেধাবি একঝাঁক গুণী শিল্পীর আর্বিভাব ঘটে। ওইসব শিল্পীরা নিজেদের সঙ্গীত প্রতিভাকে কাজে লাগান অকুন্ঠ সাধনায়। এরি ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। তেমনি সময়ের বাংলাদেশের সঙ্গীত অঙ্গনের অন্যতম জনপ্রিয় একটি নাম- সুবীর নন্দী।
গত ১৯ নভেম্বর ছিল কালজয়ী শিল্পী সুবীর নন্দী'র ৬৭তম জন্মদিন। মহান এই শিল্পীর স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিরন্তর।

ইংরেজি ১৯৫৩ সাল ১৯ নভেম্বর । সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার নন্দীপাড়া গ্রামে এক সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন সুবীর নন্দী। বাবা- শুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং সঙ্গীতপ্রেমী। মা- পুতুল রানীও ভালো গাইতেন।

ইংরেজি ১৯৬৩ সাল। তখন সুবীর তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্র। মায়ের কাছে প্রথম গান শেখা শুরু হলেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেন -ওস্তাদ বাবর আলী খান'র কাছে। তবে বিদিত লাল দাস'র কাছে নিয়েছেন লোকগানে তালিম। ছোটবেলা থেকেই গান-বাজনার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সুবীরের শৈশব কেটেছে বাবার কর্মসূত্রে অবশ্য চা বাগানেই।লেখাপড়া করেছেন সেই চা- বাগান এলাকারই খ্রীষ্টান মিশনারীর একটা স্কুলে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করার পর পড়াশোনার জন্য চলে যান হবিগঞ্জ শহরে। সেখানে ভর্তি হন হবিগঞ্জ সরকারি হাইস্কুলে। তারপর পড়েছেন হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজে।এভাবেই ১৯৬৭ সালের দিকে সিলেট বেতারে তালিকাভুক্ত হন সুবীর নন্দী।

ইংরেজি উনিশ'শ সত্তর সালের কথা। সিলেট পেরিয়ে ঢাকা রেডিওতে প্রথম গান রের্কড করেন সুবীর নন্দী।

'যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়'

এই গানটির সুরকার ছিলেন মীর কাশেম। উনিই তাঁকে রেডিওতে গানটি গাইবার সুযোগ করে দেন। ধীরে ধীরে সুবীর নন্দী'র কন্ঠে রোমান্টিক আধুনিক গান ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে।

প্রথমে শুধুমাত্র সিলেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৭২ সাল থেকে তাঁর ঢাকায় আসা-যাওয়া শুরু হয়। প্রথমদিকে নজরুল গীতি নিয়ে মনোযোগী হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ঝুঁকে পড়েন বাংলা আধুনিক গানের দিকে। আধুনিক বাংলা গানের কিংবদন্তী এই শিল্পী দীর্ঘ চার দশকের ক্যারিয়ারে গেয়েছেন প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি গান

কয়েকটি সিনেমায় গান করার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর গানকেন্দ্রিক ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েকগুন। একের পর এক নতুন গান রেডিওতে বাজছে। শ্রোতারাও মন্ত্রমুগ্ধতায় শুনতো সেই গানগুলো।

-হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে
-বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম

ওই সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠে গান দু'টি। এরপর ১৯৮১ সালে ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে প্রথম একক অ্যালবাম সুবীর নন্দীর গান বাজারে আসে। সুবীর নন্দী'র শৈশব-কৈশোর কেটেছে আধুনিক বাংলা গানের জোয়ারের মধ্যে। তাই স্বাভাবিকভাবেই উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী পঙ্কজ মল্লিক, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, জগজিৎ সিং-দের ভক্ত ছিলেন তিনি। এদের গান শিল্পী হওয়ার ক্ষেত্রে সুবীর নন্দীকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে-করেছে প্রভাবিত

এরপর ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত 'সূর্যগ্রহণ' চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন গুণী এ শিল্পী। ওই ছবিতে 'দোষী হইলাম আমি দয়ালরে' সুজেয় শ্যামের সুরে গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে  'মহানায়ক' চলচ্চিত্রে প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা 'র সাথে করেন  দ্বৈত গান। 'তুমি চাও প্রিয় নদী' শীর্ষক গানটির সুর ও সঙ্গীতে ছিলেন শেখ সাদী খান। ওই সময় গানটি পায় তুমুল জনপ্রিয়তা।

বাংলাদেশের সুরের আরেক জাদুকর শেখ সাদী খান'র সুরে সুবীর নন্দী'র কন্ঠে অবশ্য বেশ কিছু গান হয়ে উঠেছে জীবন্ত। মর্মস্পর্শী এবং অত্যন্ত শক্তিশালী কথার ওইসব গান সুবীর নন্দীর কন্ঠে যেন ফিরে পেয়েছে প্রান।একক কিংবা দ্বৈত, সব ধরনের গানেই সুবীর নন্দী ছিলেন সাবলীল। সাবিনা ইয়াসমীনের সাথে তাঁর জুটি ছিল এক কথায় অনবদ্য। সাবিনা ইয়াসমীনের সাথে প্রথম প্লেব্যাক ছিল ‘অশিক্ষিত’ সিনেমায়। একেবারে ক্যারিয়ারের শুরুতে। সেই সিনেমায় সত্য সাহার সুরে ও গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা

-মাস্টার সাব, আমি নাম-দস্তখত শিখতে চাই
গানটি সিনেমপ্রেমী সবার ছিল মুখেমুখে।

 

রুনা লায়লা'র সাথেও তিনি অনেকগুলো গান করেছেন। বিশেষ করে তখনকার সময়ের প্রতিটি সাহিত্য নির্ভর সিনেমাতে থাকতো সুবীর নন্দীর গান। ‘দেবদাস’, ‘শুভদা’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘বিরাজ বৌ’ সিনেমাতে তাঁর দরদমাখা কণ্ঠের জাদুতে
সবাই মুদ্ধ হয়েছে।

সংগীত যে একটা গভীর সাধনার ব্যাপার সেটা সুবীর নন্দীর মতো শিল্পীদের দেখলে বোঝা যায়। সুবীর নন্দী শুধু গায়কই নন, ছিলেন একজন সঙ্গীত সাধকও। তাইতো আধুনিক গানে সতন্ত্র এবং শৈলী নির্মাণে হয়েছেন সক্ষম। গভীর দরদ আর
মমতা দিয়ে গাইতেন গান। গানের বাণীকে উপলব্দি করে সুরের সাগরে তুলতেন ঝড়। তাইতো-

-আমার এ দুটি চোখ,
-হাজার মনের কাছে প্রশ্ন করে,
-বন্ধু হতে চেয়ে তোমার,
-বৃষ্টির কাছ থেকে,
-একটা ছিল সোনার কন্যা,
-চাঁদের কলঙ্ক আছে,
-ও আমার উড়াল পঙ্খী রে,
-দিন যায় কথা থাকে,
-হাজার মনের কাছে,
-কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো,
-সেই দুটি চোখে,
-কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়,
-তোমারই পরশে জীবন,
-বন্ধু তোর বরাত নিয়া,
-মাস্টার সাব, আমি নাম-দস্তখত শিখতে চাই-সহ অসংখ্য গান সবার মনে এখনও সাড়া জাগায়।

গানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকুরী করেন সুবীর নন্দী। গানের প্রতি অত্যন্ত মনযোগী, মেধাবি এই শিল্পীকে  'মহানায়ক'(১৯৮৪) শুভদা (১৯৮৬) শ্রাবণ মেঘের দিন(১৯৯৯) মেঘের পরে মেঘ (২০০৪) এবং মহুয়া সুন্দরী (২০১৫) চলচ্চিত্রে সঙ্গীতে অবদানের জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও ২০১৯ সালে দেশের দ্বিতীয় সব্বোর্চ বেসামরিক সন্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

আধুনিক বাংলা গানের ভূবনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সুবীর নন্দী। শুধু এ প্রজন্মেরই নন, তিনি তাঁর প্রজন্মেরও অনেক শিল্পীর অনুপ্রেরণা।

২০১৯ সালের ৭ মে সুরের বরপুত্র, কালজয়ী এই কন্ঠশিল্পী সব ছেড়ে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। দৈহিক ভাবে তাঁর মৃত্যু হলেও আত্মিক ভাবে তিনি বেঁচে থাকবেন সঙ্গীত -প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল।
আজ মহান এই শিল্পীর স্মৃতির প্রতি অতল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিরন্তর।


অশ্রু বড়ুয়া
গীতিকবি, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক
বাংলাদেশ টেলিভিশন

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top