সিডনী বুধবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ৭ই আশ্বিন ১৪২৭

চলে গেলেন সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরীও : মাহবুবুল আলম


প্রকাশিত:
৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:২৬

আপডেট:
৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:২৭

ছবিঃ কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী

 

একে একে চলে যাচ্ছেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীরা। যারা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তারঁ নামে মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন সেক্টরের নেতৃত্ব দিয়ে পাকিস্তানী দখদার বাহনীর সাথে মরণপণ লড়াই শেষে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন সেইসব বীর সেক্টর কমান্ডারদের মধ্য আমাদের ছেড়ে অনেকেই অনন্তযাত্রায় পাড়ি জমিয়েছেন। আর যে কয়েকজন বেঁচে আছেন তাদের মধ্যে মেজর জেনারেল (অবঃ) সি.আর দত্ত, বীর উত্তম মাত্র কয়েক দিন আগে ২৫ আগস্ট ২০২০ অনন্তযাত্রায় পাড়ি জমিয়েছেন। আর মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে আজ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের ৮ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার লেফপ্টেনেন্ট কর্ণেল আবু ওসমান চৌধুরী। এভাবেই একে একে চলে যাচ্ছেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীরা। অসম্ভব মেধাবী ও দেশপ্রেমিক আবু ওসমান চৌধুরীও ওপারের ডাকে চলে গেলেন। যিনি ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুক্ত অঞ্চল মেহেরপুরের অন্তর্গত বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আম্রকাননে বিশ্বের ৩৯টি দেশের শতাধিক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে নবগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ প্রকাশ্যে বাংলার মাটিতে শপথ গ্রহণ করার পর মেজর ওসমান তাঁর এক প্লাটুন সৈন্য দ্বারা মন্ত্রিপরিষদকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। ১৯৯১ সালে যুদ্ধাপরাধী গোলম আযমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা ‘গণআদালত’-এর অন্যতম বিচারক ছিলেন আবু ওসমান চৌধুরী।  

    

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে গঠিত ৮ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার  আবু ওসমান চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মেজর পদে কুষ্টিয়ায় কর্মরত ছিলেন। অপারেশন সার্চলাইট-এর সংবাদ পেয়ে ২৬শে মার্চ সকালে বেলা ১১টায় তিনি চুয়াডাঙার ঘাঁটিতে পৌঁছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সসৈন্য যোগ দেন। এর আগে ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ আবু ওসমান চৌধুরী কুষ্টিয়া থেকে বরিশাল জেলা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাকে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গণ নামকরণ করে সে রণাঙ্গণের অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন। পরে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার তাকে দক্ষিণ পশ্চিমাংশের আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করেন৷ মে মাসের শেষ সপ্তায় প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনকে দুভাগে বিভক্ত করে ৮নং ও ৯নং সেক্টর দুটো গঠন করেন এবং ৮ নং সেক্টরের দায়িত্ব আবু ওসমান চৌধুরীকে অর্পন করা হয়৷ প্রাথমিকভাবে সে সময় ওই সেক্টরের অপারেশন এলাকা ছিল কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও পটুয়াখালী জেলা৷ মে মাসের শেষে অপারেশন এলাকা সংকুচিত করে কুষ্টিয়া ও যশোর, খুলনা জেলা সদর, সাতক্ষীরা মহকুমা এবং ফরিদপুরের উত্তরাংশ নিয়ে এই এলাকা পুনর্গঠন করা হয়৷ এই সেক্টরের প্রধান ছিলেন আবু ওসমান চৌধুরী এবং পরে মেজর এম এ মঞ্জুর৷ 

 

২৫ মার্চ ১৯৭১-এর রাতে ঢাকার বুকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণ ও গণহত্যার খবর পেয়ে মেজর ওসমান ২৬ মার্চ তাঁর বাহিনী সহকারে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সে সময় তাঁর অবস্থান ছিল তৎলীন কুষ্টিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গা মহকুমা সদরে। ২৭ মার্চ যশোর থেকে আগত একজন পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন ও ৩ জন সৈনিক তাঁর এলাকাতে ছোট একটি সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পর মেজর ওসমান আন্তর্জাতিক সীমানায় অবস্থিত তাঁর ৪ কোম্পানি সৈন্যকে অগ্রগামী করে স্থানীয় জনগণের সহায়তা নিয়ে ৩০ মার্চ কুষ্টিয়া আক্রমণ করেন। সেখানে অবস্থানরত ৪ জন অফিসার ও ২শ' পাকিস্তানী সৈন্যের এক বিরাট বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে কুষ্টিয়া জেলা শত্রুমুক্ত করেন। আবু ওসমান বুঝতে পারছিলেন যশোরকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে হলে প্রথমে কুষ্টিয়াকে মুক্ত করতে হবে। ২৮ মার্চ কোম্পানীগুলো সমবেত হয়ে ক্যাপ্টেন এ আর আজম চৌধুরীকে কুষ্টিয়ার রণাঙ্গনের সার্বিক সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব প্রদান করেন এবং ৩০ মার্চ ভোর ৪ টায় আক্রমণের সময় নির্ধারণ পূর্বক কুষ্টিয়া আক্রমণের নির্দেশ দেন। পরিকল্পনা মোতাবেক সুবেদার মেজর মোজাফফরের কোম্পানী কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন, ক্যাপ্টেন আজমের বাহিনী কুষ্টিয়া জেলা স্কুল এবং নায়েব সুবেদার মুনিরুজ্জামানের কোম্পানি মোহিনী মিল ও ওয়ারলেস স্টেশন একযোগে আক্রমণ করে। তিন দিকের যুগপতৎ আক্রমণে এবং প্রতি কোম্পানীর সৈন্যের পশ্চাতে অনুসরণকারী লাঠি, দা-বল্লম সজ্জিত হাজার হাজার বেসামরিক লোকের জয়বাংলা ধ্বনিতে পাকিস্তানী সেনারা হতবুদ্ধি হয়ে পুলিশ লাইন ও ওয়ারলেস স্টেশন ছেড়ে মূলঘাঁটি জেলা স্কুলে জমায়েত হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পালাবার পথে অধিকাংশ হানাদার সৈন্য নিহত হয়।

 

৮ নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার বেনাপোলে থাকলেও কার্যত এ হেডকোয়ার্টারের একটা বড় অংশ ছিল ভারতের কল্যাণী শহরে। সেক্টরের সৈন্যদের মধ্যে ২ হাজারের মতো ছিল নিয়মিত বাহিনী এবং ৮ হাজার ছিল গণবাহিনী। এই সেক্টর ৭টি সাব সেক্টরে বিভক্ত ছিল। সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই আবু ওসমান তাঁর বাহিনী পুনর্গঠন করেন এবং এক পর্যায়ে সম্মুখ সমর পরিহার করে যথাসম্ভব তিনি গেরিলা পদ্ধতিতে শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য নির্দেশ দেন। সমস্ত সাব সেক্টরেই তিনি এই নির্দেশ প্রচার করেন। ১৫ মে থেকে নিয়মিতভাবে প্রত্যেক কোম্পানীকে সাপ্তাহিক অপারেশনাল টাস্ক দিতে থাকেন আবু ওসমান। সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি প্রতিনিয়তই কোম্পানী থেকে কোম্পানী এলাকা ভ্রমণ, পরিদর্শন ও অপারেশনাল কাজকর্মগুলো সমন্বয় করেন। প্রায় প্রত্যেক অপারেশন টাস্ক সম্পন্ন করতে গিয়ে কিছু না কিছু পাক সেনা হতাহত এবং অস্ত্রশস্ত্র হস্তগত করা হতো। মাঝে মাঝে শত্রুসেনা বন্দিও করা হতো। রাজাকারদের আত্মসমর্পণ ও দালাল নিধন ছিল প্রায় নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

 

১৯৭১ সালের ২৭ মে ভোর ৪টায় পাকিস্তানিরা ২ কোম্পানী সৈন্য নিয়ে সাতক্ষীরার ডোমরায় অবস্থানরত আবু ওসমান বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে। শুরু হয় তীব্র যুদ্ধ। আবু ওসমান তাদেরকে প্রতিহত করতে সমর্থ হন। এরপর মুহূর্মুহু তারা আক্রমণ চালায়। কিন্তু প্রত্যেকবারই ওসমান বাহিনী তাদের এ আক্রমণ ব্যর্থ করে দেয়। ১৭ ঘন্টা স্থায়ী ওই যুদ্ধে পাকিস্তানের প্রায় তিনশ সৈন্য হতাহত হয়। এদিকে পাকিস্তানী ব্যাটালিয়নের দ্বিতীয় কমান্ডার, একজন ক্যাপ্টেন ও কয়েকজন জওয়ানও ওই হামলায় নিহত হন। এ যুদ্ধের পর থেকে ভারতীয় জনসাধারণ বাঙালীদের বীরত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে। এভাবেই চলতে থাকে ওসমানবাহিনীর দৈনন্দিন মুক্তিযুদ্ধ ও শত্রুহনন অভিযান। এক হিসেবে দেখা গেছে, এই সেক্টরে গড়ে প্রতিমাসে ৭০০ শত্রুসেনা নিধন হয়েছে।

 

১১ আগস্ট আবু ওসমান চৌধুরীকে বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর এম এ মঞ্জুর। আবু ওসমানকে মুক্তিবাহিনীর সদর দফতর মুজিবনগরে এসিসট্যান্ট চিফ অব স্টাফ (লজিস্টিকস) এর দায়িত্ব পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়। আকস্মিকভাবে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনাটি মেনে নিতে পারেননি তিনি। এ সংবাদে সেক্টরের নিয়মিত বাহিনীও অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। ওদিকে মেজর এম এ মঞ্জুর দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর বাহিনী পুনর্গঠন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে ডিসেম্বরে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় মিত্রবাহিনী। যৌথবাহিনী শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে একের পর এক এলাকা জয় করতে থাকে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ মুক্ত হয়। স্বাধীন হওয়ার পর জনমনে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। জয়বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বাংলার আকাশ বাতাস।

 

আবু ওসমান চৌধুরী ও তাঁর অধীনস্থ মুক্তিবাহিনী রণাঙ্গনের বহু সংঘর্ষে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু মেজর ওসমানকে তাঁর ন্যায্য পাওনা পদোন্নতি ও পদক থেকে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বঞ্চিত করা হয়। যুদ্ধোত্তরকালে এক পর্যায়ে মেজর ওসমানকে পদত্যাগ করতেও বাধ্য করা হয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে ছিলেন। তিনি মেজর আবু ওসমানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে যথোচিত অনুসন্ধানের পর মেজর ওসমানকে লেফটেনেন্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাঁর কোরের (এএসসি) পরিচালক পদে নিযুক্ত করেন।

 

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। সিপাহী বিদ্রোহের আড়ালে মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস তখন তুঙ্গে। পাকিস্তানী হানাদারদের বুলেট থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া আবু ওসমানকে তত্কালীন গুলশানের বাড়িতে হত্যা করতে আসে সিপাহীরা। আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সমর্থনই ছিল তাঁর অপরাধ। সেইসময় তিনি বাসায় ছিলেন না। কিন্তু সিপাহীদের ধারণা তিনি হয়তো বাসার ভিতরেই কোথাও লুকিয়ে আছেন। তাই প্রত্যেকটা ঘরের আনাচে কানাচে তারা চালাতে থাকে বেপরোয়া গুলি। ফলে বাসায় যারা ছিলেন মুহূর্তের মধ্যেই তাদেরকে চলে যেতে হলো অন্য দুনিয়ায়। নাজিয়া খানম। তিনি ছিলেন আবু ওসমানের প্রাণপ্রিয় স্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধে সারা বাংলার নারী জাতির একজন প্রতিনিধি। ৭ নভেম্বর সিপাহীদের বুলেটে তিনি ঝাঁঝড়া হয়ে যান। অথচ তাঁর অনুপ্রেরণায় আবু ওসমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সফল সেক্টর কমান্ডার।

 

মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী আবু ওসমান চৌধুরী ১৯৩৬ সালের ১ জানুয়ারী বর্তমান চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানাধীন মদনেরগাঁও গ্রামের চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আব্দুল আজিজ চৌধুরী ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। তাঁর মা ছিলেন হাজিগঞ্জ থানাধীন কাঁঠালি গ্রামের কাজী পরিবারের সন্তান। অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন তাঁর মা। জমিদার মিয়ারাজা হাজি তাঁর কনিষ্ঠ ছেলে আব্দুল আজিজ চৌধুরীর বউ হিসেবে ১৯২৮ সালে তাঁকে ঘরে তুলে আনেন। তাঁর নাম ছিল মাজেদা খাতুন। ৯ বছর ঘরকন্নার পর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে মাজেদা খাতুন অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মায়ের মৃত্যুর সময় আবু ওসমান চৌধুরীর বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। আবু ওসমান তাঁর নিজ গ্রাম মদনেরগাঁওয়ের ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে পার্শবর্তী গ্রামে মানিকরাজ জুনিয়র হাই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণী এ স্কুলে অধ্যয়নের পর ১৯৪৭ সালে তাঁর নিজ গ্রামের চান্দ্রা ইমাম আলী হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে দীর্ঘ ৪ বছর পর ১৯৫১ সালে এ স্কুল থেকেই ১ম বিভাগে এস.এস.সি. পাশ করেন। পরে ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে এইচ.এস.সি.-তে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, শারীরিক অসুস্থতা ও পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে ঢাকা কলেজে এইচ.এস.সি. সম্পন্ন করতে পারেননি তিনি। পরে ১৯৫৪ সালে চাঁদপুর কলেজ থেকে এইচ.এস.সি. ও ১৯৫৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে তিনি বি.এ. পাস করেন। গ্রাজুয়েশন লাভের পর পরই ১৯৫৭ সালে আবু ওসমান ঢাকা বিমানবন্দরে এয়ারপোর্ট অফিসার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।

 

এই পদের প্রশিক্ষণে থাকাকালীনই তিনি সেনাবাহিনীতে কমিশনের জন্য প্রদত্ত পরীক্ষায় পাস করায় আন্তবাহিনী নির্বাচন বোর্ডে উপস্থিত হবার জন্য আহ্বান পান। সেটিও তিনি সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করেন। ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোহাটে অবস্থিত অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে (ওটিএস) যোগ দেন। সেখানে ৯ মাসের কঠিন প্রশিক্ষণের পর ১৯৫৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে তিনি মেজর পদে পদোন্নতি লাভ করেন। আবু ওসমান ১৯৬০ সালের ২৫ মার্চ কুমিল্লার মৌলভী পাড়ার মনসুর আহম্মেদের জ্যেষ্ঠ কন্যা নাজিয়া খানমকে বিয়ে করেন। তাঁর দুই কন্যা নাসিমা ওসমান ও ফাওজিয়া ওসমান।

 

তিনি একজন সফল সেক্টর কমান্ডারই ছিলেন না; ছিলেন একজন সফল লেখকও। ১৯৯১ সালের ৭ মার্চ তাঁর লেখা বই প্রকাশিত হয়। বইটি ১৯৪৭ এর স্বাধীনতা থেকে ১৯৭১ এর স্বাধীনতায় উত্তরণের ধারাবাহিক ইতিহাস সম্বলিত এক অমূল্য গ্রন্থ- 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল এই বইখানি ১৯৯৩ সালে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক পুরস্কৃত হয় । 'সময়ের অভিব্যক্তি' নামক সংকলিত বইটি ১৯৯৬ সালের ১৭ এপ্রিল, 'সোনালী ভোরের প্রত্যাশা' সংকলন ১৯৯৬ সালের ২ জুলাই এবং 'বঙ্গবন্ধু: শতাব্দীর মহানায়ক' সংকলনটি একই বছর ২ আগস্ট প্রকাশিত হয়। 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি' এর অন্যতম সংগঠক ও কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তিনি জাতীয় দায়িত্ব পালন করে করেছেন।

 

আবু ওমান চৌধুরীর সাথে ব্যক্তিগত একটি সুন্দর স্মৃতির উল্লেখ করেই লেখা শেষ করবো। ২০১১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে আমার উপন্যাস- ‘কেবলই ভেঙে যায়’ এবং ‘ প্রেম-প্রণয়ের কাব্য’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবের প্রধান অতিথি ছিলেন আবু ওসমান চৌধুরী। সেই অনুষ্ঠানে তিনি আমার দুইটি বইয়ের ওপর আলোচনার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ওপরও প্রাণবন্ত আলোচনা করেছিলেন। সেই স্মৃতির প্রসংগ ধরে তাই আজ বলতে চাই, আবু ওসমান চৌধুরীর মৃত্যুতে জাতি তার আরও একজন কৃতি সন্তানকে হারালো। যার অভাব কোন দিনই পূরণ হবার নয়। যতদিন পৃথিবীতে বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন বাংলাদেশ তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন তিনি। তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করে বিদায়ী স্যালুট জানাই!

 

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, বিভিন্ন সংবাদপত্র ও নিউজপোর্টাল

 

 

মাহবুবুল আলম
কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top