সিডনী শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭

বঙ্গবন্ধুঃ একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ও আপাদমস্তক বাঙালি : অজিত কুমার রায়


প্রকাশিত:
১০ অক্টোবর ২০২০ ১৪:৪৩

আপডেট:
১০ অক্টোবর ২০২০ ১৬:৪৬

ছবিঃ বঙ্গবন্ধু

 

লণ্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার রিপোর্টার সায়মন ড্রিং এর রিপোর্ট অনুসারে ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর রাত ১০ টার পর পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট নামে গণহত্যা শুরু হয়। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে অপারেশান পরিচালিত হয় ঢাকা মহানগরী ও আশেপাশের এলাকায়। মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজাকে প্রদেশের অবশিষ্টাংশে অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। এরা দুজনই ছিলেন অপারেশানের মূল পরিকল্পনাকারী। অপারেশনের সার্বিক দায়িত্বে থাকেন বেলুচিস্তানের কসাই নামে পরিচিত পূর্ব পাকিস্তানের নব নিযুক্ত গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান।

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই অভিযানের ব্যাপারে অবগত হয়ে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সৈন্যদের প্রথম বহরটি ফার্মগেট এলাকায় এসে গাছ, অকেজো গাড়ি, অচল স্টীম রোলার ইত্যাদি দিয়ে তৈরি ব্যারিকেড দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। কয়েকশ লোকের জয়বাংলা শ্লোগানে মুখরিত প্রতিরোধ সৈন্যদের এলোপাথাড়ি গুলিতে স্তব্ধ হয়ে যায়। ফুটপাতের মানুষ থেকে শুরু করে তারা যাদেরকে সামনে পেয়েছিল তাদেরকেই পৈশাচিক উল্লাসে হত্যা করেছিল। ধ্বংস করেছিল সরকারি বেসরকারি অফিস। আবাসিক এলাকা কামানের গুলিতে বিধ্বস্ত করে ও আগুন ধরিয়ে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে বহু ছাত্র-ছাত্রী হত্যা করে ও অগ্নিসংযোগ করে। জগন্নাথ হলের কয়েক শত ছাত্রকে পাখির মত গুলি করে উপর থেকে ফেলে দেয়। তাদের সামনে শেখ মুজিবকে নিয়ে শ্লেষ করা হয়। অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, গোবিন্দ চন্দ্র দেব সহ অন্তত দশজন শিক্ষককে নৃশংসভবে হত্যা করে তারা। জহুরুল হক হলে হত্যা চালিয়ে দুশোর বেশি ছাত্রকে হত্যা করে, কর্মচারীদেরকে হত্যা করে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনের ঐতিহ্যবাহী বটগাছকে বুলডোজার দিয়ে উপড়ে ফেলে। রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দিলে দৌড়ে বেরিয়ে আসা প্রায় ৩০০ ছাত্রীকে গুলি করে হত্যা করে পাক বাহিনী। তারা রমনা কালীবাড়ি বিধ্বস্ত করে। পুরনো ঢাকার হিন্দু এলাকায় চালায় নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ। নারী ধর্ষণ করে। হিন্দুরাই তাদের প্রধান টার্গেট ছিল। হিন্দু নিধন ও হিন্দু নারীদের গর্ভে মুসলিম সন্তানের জন্ম দেওয়াও তাদের উদ্দেশ্য ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের কিছু সংখ্যক পাকিস্তানপন্থী ছাড়া অন্যদেরকে তারা প্রকৃত মুসলমান হিসেবে গণ্য করত না। কাজেই, যারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার পরিপন্থী ছিল, তাদেরকে নিশ্চিত করাই এই অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল।

 

পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশ্য ছিল পূর্বপাকিস্তানের ভূমিটুকু তাদের আয়ত্বে রাখা। এখানকার বিচ্ছিন্নতাকামী, অবিশ্বাসী ও পাকিস্তানের ভাষা-সংস্কৃতির পরিপন্থী লোকদেরকে তারা অপ্রয়োজনীয় মনে করত। মধ্যরাতে ঢাকার পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, নীলক্ষেত, ইপিআর সদর দপ্তরে হামলা করে বাঙালি জোয়ানদের হত্যা করা হয়। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে ভস্মীভ‚ত করা হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইন। এই অপারেশন ফজরের আজান অব্দি চলে। বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে  কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনে মৃতদের রায়ের বাজার, মীরপুর ইত্যাদি জায়গায় বধ্যভূমিতে ফেলে দিয়ে আসা হয়। ঢাকা তখন ছিল জ্বলন্ত আগুনের নগরী, আর্তচিৎকার, লাশ ও ধ্বংসস্তূপের নগরী। লোকশূন্য, পরিবহণশূন্য, ভুতুড়ে! রাজপথে শুধু পাক সেনাদের ট্যাংকের ঘর্ঘর। ক্যাম্পগুলোতে অসহায় নারীদের চিৎকার, মদ্যপ সৈন্য ও তাদের দোসরদের ঘৃণ্য উল্লাস!

 

মধ্যরাতে আরো একটি উল্লেখযোগ্য অপারেশন হল ধানমণ্ডীর ৩২ নং রোডে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ও পুরোধা ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে। এই অপারেশনের নাম অপারেশন বিগবার্ড। উদ্দেশ্য, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা। এলোপাথাড়ি গুলি করতে করতে ঐ রোডে ঢুকে পড়ল সেনা কনভয়। বঙ্গবন্ধু ঢাকার পরিস্থিতির খবর রাখছিলেন। পনেরো তারিখ থেকে ইয়াহিয়া খানের সাথে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের প্রধান হিসাবে তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠনের ব্যাপারে আলোচনায় কোনো সুরাহা হয় না এবং পঁচিশ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। এটাও তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের সংগে সারা পৃথিবীর বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং সাদা পোশাকে পাকিস্তানি বিমান থেকে বড় বড় সামরিক কর্মকর্তা ঢাকায় অবতরণ করছিল। আলোচনার নামে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো কালক্ষেপণ করে পূর্ব পাকিস্তানে জাহাজভর্তি করে অস্ত্র আমদানি করছিল। শেখ মুজিব ছিলেন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত দূরদর্শী নেতা। পরিস্থিতি অনুধাবন করে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর উপরেও একটা দুর্বিপাক নেমে আসছে। তিনি পরিবারের সবাইকে ঘরের ভেতরে রেখে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাত ১২টার পর এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে তা সম্প্রচারের জন্য ইপিআর ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে চট্টগ্রামে এক ওয়্যারলেস বার্তা পাঠান। তার স্বাধীনতার ঘোষণাটি এরকম  ছিল:

 

এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ হতে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমার আহ্বান, আপনারা যে যেখানেই থাকুন, যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করুন। বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটি বিতাড়িত করুন এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের এ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণাপত্রটি পরে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান কর্তৃক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সেটি আবার ঘোষণা করেন।

 

যা হোক, ২৫ মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে দুজন উচ্চপদস্থ সৈনিক দোতলায় এসে তাঁকে গ্রেপ্তার করল।

তিনি তাদেরকে জিগ্যেস করলেন, আমি কি আমার পরিবারের সংগে একবার দেখা করে আসতে পারি? অনুমতি নিয়ে তিনি পরিবারের সংগে দেখা করে তাদের সংগে সেনাবাহিনীর জীপে গিয়ে উঠলেন। তাঁর মনে পড়ল পাইপটি থেকে গেছে টেবিলে। তাদেরকে সংগে করে পাইপটি নিয়ে গেলেন টেবিল থেকে। সে রাতে তাঁকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে রাখা হল। পরের দিন পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে কারাবন্দি করে রাখা হল। তাঁকে খবরের কাগজ ও টিভি পর্যন্ত দেখতে দেওয়া হত না। ওখানে বঙ্গবন্ধুকে সামরিক ট্রাইবুন্যালে বিচার করে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয় এবং সেলের সামনে তাঁর কবর খোঁড়া হয়। কিন্তু, তিনি ছিলেন অকুতোভয়। তিনি দেশকে ভালোবেসেছিলেন। দেশের মানুষের মুক্তির জন্যে তিনি যে কোনো পরিণাম মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন।

 

তিনি পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের কাছে মাথা নত না করে বলেছিলেন, আমার মৃত্যুর পর আমার লাশটি যেন আমার দেশের মানুষের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এমনই ছিল বাংলার প্রতি তাঁর ভালোবাসা। এমনই ছিলেন তিনি আত্মপ্রত্যয়ী, নির্ভীক ও আপোসহীন। তিনি ছিলেন হিমালয়ের মতো অটল ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব।

ফিডেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখি নাই। কিš,‘ আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।....

 

কিন্তু, তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা ও গ্রেপ্তারের সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে মুজিব নগরে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি করা হয়। এই সরকারের অধীনে চলে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্য, ইবিআর, ইপিআর, ইপিপি মিলে নিয়মিত বাহিনী ও অন্যান্য সব শ্রেণির মানুষের সমন্বয়ে গঠিত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের অনিয়মিত বাহিনী। নিয়মিত বাহিনী সামনাসামনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হত। অনিয়মিত বাহিনী গেরিলাযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের নাস্তানাবুদ করে তুলত। তাদের প্রশিক্ষণ দেশে বা ভারতের নানা জায়গায় দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। ভারত সরকার ২৭ মার্চ ১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন দেয়। সেই উদ্দেশ্যে অস্ত্র ও গোপনে সেনা সরবরাহ করে। বিমান ও যুদ্ধ জাহাজ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে থাকে। ভারত বাংলাদেশের সংগে তাদের সীমান্ত খুলে দেয় শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য। শরণার্থীরা ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণ করে। মু. আতউল গনি ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। সমগ্র দেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ বাহিনীর হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয়।

পাকিস্তানের পক্ষের শক্তি হিসাবে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, শ্রীলংকা, সৌদি আরব ও তুরস্ক। অপর দিকে, বাংলাদেশের পক্ষে থাকে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপান ও মিত্রদেশ সমূহ।

 

ওদিকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচানোর জন্যে তৎপর হয়ে ওঠেন। ইন্দিরা গান্ধী নানা দেশ ভ্রমণ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন অর্জনে তৎপর হন। কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্যে ভারত সরকার ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে। মিত্রবাহিনীর সমর্থন পাবে মনে করে পাকিস্তান ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পাকিস্তানের অমৃতসর, শ্রীনগর ও কাশ্মীর উপত্যকায় বোমাবর্ষণ করার পরেই মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী একযোগে পাক বাহিনীকে আক্রমণ করে তাদেরকে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। তখন কৌশলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রয়োগ করায় সেটি নস্যাৎ হয়ে যায়।

 

অবশেষে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা ১ মিনিটে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যৌথকমাণ্ডের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরার কাছে পাকিস্তান বাহিনীর পক্ষ থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন ৯৩০০০ সৈন্যসহ। এভাবে, ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে ও প্রায় ৪ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হল।

 

কিন্তু, প্রশ্ন উঠতে পারে কেন এতো রক্তক্ষয়? কেন এই বিভ্রাট? ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যে পাকিস্তান তৈরি হল জিন্নাহর নেতৃত্বে মুস্লিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নিয়ে, সেখানে কেন এতো অশান্তি? এর উত্তর একটাই। সেটা হল, পশ্চিম পাকিস্তানিদের অস্বাভাবিক ক্ষমতা লিপ্সা, স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মকে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসাবে গণ্য করা, ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত দিকটা অবহেলার চোখে দেখা, অসম আর্র্থিক বন্টন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বঞ্চনা, জনগণের ম্যাণ্ডেটেকে অস্বীকার করা ইত্যাদি। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের তারা প্রকৃত মুসলমান মনে করত না। অন্য ধর্মের মানুষদেরকে তারা কাফের বলে গণ্য করত। পূর্ব পাকিস্তানিদের ভাষা হিন্দু ভাষা সংস্কৃত থেকে উৎপন্ন। সেকারণে, তারা বাংলা ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বিশেষত, রবীন্দ্রসংগীত বিদ্বেষী ছিল। এই জন্যে তারা প্রথমে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পায়তারা করে ও আরবি-ফারসি হরফে বাংলা প্রচলনের ষড়যন্ত্র করে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যার পরিসমাপ্তি ঘটে। বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনে অন্যতম নেতৃত্ব দান করেন। এই ভাষা আন্দোলন থেকেই বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং পাকিস্তানিদের ভমি তাঁর কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। পাকিস্তানি শাসনের প্রতি মোহভঙ্গ হবার পর থেকেই তিনি বাঙালি হিন্দু, মুস্লিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের স্বাধীকারের কথা ভাবতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে সমতা ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে চলা সম্ভব নয়। তাঁর ভেতরে ধর্ম নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি পূর্ণ বিকশিত হয়। তিনি মাওলানা ভাসানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ১৯৫৩ সালে এবং ১৯৫৫ সালে দলকে ধর্ম নিরপেক্ষ করার জন্য মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয় তারই উদ্যোগে। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা ভাবতে  থাকেন। তিনি স্বাধীনতার কথাও ভাবতে শুরু করেন। ১৯৫৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি পাকিস্তান গণপরিষদে বলেন, আমরা এখানে বাংলায় কথা বলতে চাই...। ১৯৫৫ এর ২৫ আগস্ট আরো এক ভাষণে বলেন, আমরা বহুবার দাবি জানিয়ে এসেছি যে, পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে আপনাদের পূর্ববঙ্গ ব্যবহার করতে হবে। কারণ, বঙ্গ শব্দটির একটি ইতিহাস আছে, আছে নিজস্ব একটি ঐতিহ্য...।

 

ক্রমে বঙ্গবন্ধু বাঙালির নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তাঁকে স্তব্ধ করার জন্য আয়ুব সরকার তাঁকে সহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন যা বাঙালির অনুভূতিকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। গণ আন্দোলনের চাপে সরকার ১৯৬৯ এর ২২ ফেব্রæয়ারি তাঁকে নি:শর্ত মুক্তি দেয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমেদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন।

১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানের মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান জনগণের ম্যান্ডেট অস্বীকার করে পূর্ব পাকিস্তানকে নেতৃত্বশূন্য করতে গণহত্যা শুরু করে ২৫ মার্চ রাতে। কিন্তু, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ভূখণ্ডরূপে বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। তিনি ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লণ্ডনের পথে দিল্লী আসেন। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়সহ বিশিষ্ট জনদের সামনে ইংরেজিতে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধী তাঁকে বাংলায় বক্তব্য দিতে অনুরোধ করলে তিনি বাংলায় বক্তব্য দেন। ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তাঁকে বাংলাদেশের জাতির জনক বা জাতির পিতা হিসাবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হয় বাংলা। জাতীয় সংগীত হয় কবিগুরুর ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। জাতীয় পতাকায় শোভা পায় বাংলার সবুজ প্রকৃতি, তারুণ্য, শহিদদের পবিত্র রক্ত ও স্বাধীনতার সূর্যোদয়।

 

 

তথ্যসূত্র:

১. রশীদ, হারুণ-অর। রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর।
২. The Hindu: Mujib, Tagore, Bose among ‘greatest Bengalees of all time
৩. BBC Listeners’ Poll: Bangabandhu judged greatest Bengalee of all time
৪. The Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman.
৫. গুগল।

 

অজিত কুমার রায়
কবি, ছড়াকার, কথা সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক
রিটায়ার্ড প্রফেসর অভ ইংলিশ, খুলনা, বাংলাদেশ

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top