সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২১শে জানুয়ারী ২০২১, ৮ই মাঘ ১৪২৭

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু : মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার


প্রকাশিত:
৩১ ডিসেম্বর ২০২০ ১৪:৩২

আপডেট:
২১ জানুয়ারী ২০২১ ২০:২৪

 

বিশ্বনন্দিত রাজনৈতিক নেতা বাংলাদেশের স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি স্বীয় কর্মপ্রয়াস ও দেশপ্রেমের অতুল নজীর স্থাপন করে বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার নয়নমনি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। একজন খাটি বাঙালি হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামী জীবন, কর্মকীর্তি এবং সর্বস্তরের মানুষের ভালবাসা অর্জন করে তিনি যে ইতিহাস গড়েছেন তারই স্বীকৃতি স্বরূপ ‘জাতির জনক’খেতাব তাঁর নামের সাথে অনায়াসে যুক্ত হয়েছে। তবে নামের পূর্বে যুক্ত ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।    

‘বঙ্গবন্ধু’ সেই সম্বোধন যা কোটি কোটি মানুষের ভালবাসায় সিক্ত একজন শ্রেষ্ঠ মানুষের নামবাচক অভিধায় সুপ্রতিষ্ঠিত। একটি দেশ একটি জাতির আজন্ম শৃঙ্খল ভেঙ্গে মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা সেই মানুষ হঠাৎ করেই একদা নিজের নামকে অতিক্রম করে কেবল একটি সম্বোধনে সমাজ-দেশ-জাতির গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব সভায় পরিচিত হয়ে গেলেন। তিনি আজ যত না শেখ মুজিবুর রহমান হিসেবে, যত না জাতির জনক হিসেবে পরিচিত তার চাইতে অধিক পরিচিত ‘বঙ্গবন্ধু’হিসেবে। আজ শেখ মুজিব মানে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ। সেই প্রিয় মানুষের এই যে পরিচিতি, সেটা কারো দয়া বা দান নয় বন্ধুর পথ মারিয়ে তিল তিল করে লালিত স্বপ্নের পথে অগ্রসরমান একজন মানুষের অর্জন। দুর্গম কণ্টকাকীর্ণ পথে চলার এই অর্জন বাঙালি জাতির এ যাবৎ কালের যে কোনো মানুষের চিন্তা-চেতনা-প্রয়াশ-প্রাপ্তির মাত্রাকে অতিক্রম করে এক অতুল উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক কারণে বৃহৎ বাংলার মুক্তি নিশ্চিত করতে না পারলেও এর অর্ধাংশকে স্বাধীন-সার্বভৌম অস্তিত্ব দিতে যে তিনি সফল হয়েছেন তা যেমন বিশ্বসভায় স্বীকৃত তেমনি বাংলাদেশের মানুষ এর সুফল ভোগ করে ধন্য মনে করছে।

মুক্তির অন্বেষা মানুষের আজন্ম প্রয়াশ। যে বাঙালি সমাজ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বার বার বিজাতীয় আগ্রাসনের শিকার হয়ে সঙ্কর সম্বন্ধীয় এক অভিনব জাতিতে পরিণত হয়েছিল; ইতিহাসকালেও যারা নানা জাতি, নানা ধর্ম ও নানা বর্ণের শাসন-শোষন-নিষ্পেষণ হজম করে বিবর্ণ পোড়ামাটির রূপ ধারণ করেছিল; প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত সময়-সমুদ্রের বিভিন্ন পর্যায়ে এই আগ্রাসনের অক্টোপাশ থেকে এরা মুক্তির প্রত্যাশায় প্রহর গুণেছে কিন্তু মুক্তি কখনো পায়নি। প্রতিবারই তাদেরকে ব্যর্থতার গ্লানি হজম করতে হয়েছে। মিশ্র জাতিসত্ত্বার কারণেই হোক আর নিয়তির নির্মম পরিহাসেই হোক তারা যে কেবলই বিদেশী-বিজাতীয় আগ্রাসনেই নিষ্পেষিত হয়েছে তা কিন্তু নয়; স্বজাতীয়-স্বগোত্রীয়দের দ্বারাও প্রতারিত ও শোষিত হয়েছে বহুবার। তবু তারা আশায় বুক বেধেছে, স্বপ্ন দেখেছে মুক্তির।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুদূর অতীতের ধারাবাহিকতায় ইতিহাসের কোনো বাঁককেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ঐতিহাসিক পলাশী প্রান্তরে বাংলায় দেশীয় শাসনের অবসান হওয়ার পর ব্রিটিশ বেনিয়াদের শোষণ-শাসনে সর্বস্তরের মানুষ ক্রমেই তাদের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করতে থাকে। প্রতিনিয়ত বহিরাগতদের আচরণে সর্বস্তরের মানুষের মনে পুঞ্জিভূত হতে থাকে না বলা ক্ষোভ । তাদের উৎপীড়নে যখন আপামর জনতার অন্তরাত্মা ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছিল, কলুর বলদের মতো অবিরাম খেটেখুটেও মানুষ যখন পাচ্ছিল চরম বৈষম্যমূলক আচরণ আর নির্যাতন, তখন থেকেই আমাদের চেতনা বেশি করে মুক্তির পথ খুঁজে। শ্রমের মূল্য আর সম্পদের হিস্যা হয়ে উঠে আরাধ্য। এক সময় গোটা উপমহাদেশে এই চেতনা বিস্তৃতি লাভ করে। ফোঁসে উঠতে থাকে জনমানস। পাশাপাশি মৌলিক অধিকারকেন্দ্রীক এই বঞ্চনার যথার্থ মূল্যায়ন করতে গিয়ে এ অঞ্চলে ধর্মীয় জাতীয়তাভিত্তিক অনুভূতির অঙ্কুরোদ্গম হয়।

ধর্মীয় স্বাতন্ত্রভিত্তিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা মুসলিম সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে বটে কিন্তু অবিভক্ত বাংলার দাবি তখনও জাগরুক ছিল। ‘সিলেটের বাংলাদেশভুক্তি : সাতচল্লিশের রেফারেন্ডামে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক নিবন্ধে অবিভক্ত বাংলার সপক্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রয়াশ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাতে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর স্পষ্ট অভিমত প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলার তৎকালীন নেতৃবৃন্দ তখনও কোনো অবস্থায়ই বিভক্ত বাংলা চায়নি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অবিভক্ত বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বহু চেষ্টা করেও কংগ্রেসের জোর আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অতঃপর পরিস্থিতিগত কারণে শেষ পর্যন্ত এদেশের মানুষকে ধর্মীয় স্বাতন্ত্রভিত্তিক একটি নজিরবিহীন অসম্ভব রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হতে হল। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক বৈষম্য-বঞ্চনার সূত্র ধরে সে সময়ে ধর্মীয় চেতনার যে উন্মেষ ঘটে তারই প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগষ্ট থেকে সেই অসম্ভব রাষ্ট্র পাকিস্তানের আনুগত্য মেনে নেয় এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।

পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হওয়ার পর পরই মানুষ তাদের ভুল বুঝতে শুরু করে। পাকিস্তানের নেতৃত্ব প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে থাকায় প্রথম থেকেই তাদের স্বরূপ উন্মোচিত হতে থাকে। মানুষ বুঝতে পারল, কেবলমাত্র ধর্মীয় চেতনার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক দিক থেকে পৃথক জাতি সত্ত্বার ভিত্তিতে সৃষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিণাম কি হতে পারে। পাকিস্তান প্রমাণ করল রাষ্ট্র গঠনের জন্য ধর্মীয় অনুভূতির চাইতে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত প্রভাব অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রকে উপেক্ষা করে ধর্মের অন্তর্নিহীত উদার চেতনাকে পাশ কাটিয়ে ব্যবহারিক স্বরূপকে প্রশ্রয় দিলে যথাযথ সুফল পাওয়া যায় না। ঠিক এ কারণেই এদেশের মানুষের মনে বঞ্চনার চেতনায় জন্ম নেয়া বঙ্গভঙ্গের ক্ষত থেকে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটলো তার পরিণতি শুভ হতে পারেনি। শাসক চক্রের অপরিনামদর্শী আচরণে দ্রæতই আশাহত মানুষের মনে চৈতন্যোদয় হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের কারণ ও পরিণাম এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে রোধ করার প্রবণতা এবং এর প্রতিবাদে অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দেয়ার যে অবিস্মরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করল বাংলার মানুষ, তা বিশ্বের ইতিহাসে একটি নজীরবিহীন ঘটনা।

তখন থেকেই এদেশের মানুষের চেতনার দিক পরিবর্তন ঘটে। অর্থনৈতিক বঞ্চনার সূত্র ধরে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে সাধারণ মানুষের মনে ধর্মীয় চেতনার ভিত্তিতে স্বাতন্ত্র বা স্বাধীনতার যে বীজ প্রোথিত হয়, পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে প্রথমে তা পূর্ণতা পায়। কিন্তু ৫২’র ভাষা আন্দোলনে ধর্মীয় চেতনা ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রের কাছে হার মানে। অতঃপর শাসক চক্রের অর্থনৈতিক আগ্রাসন আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে নতুন করে শাণিত করে। বঞ্চনার প্রতিটি ক্ষেত্র নগ্নভাবে গোটা জাতিকে উপহাস করতে থাকে। এমনি প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতার চেতনা ধর্মীয় চেতনার আক্টোপাশম্ক্তু হয়ে ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আকড়ে ধরে। এরই ধারাবাহিকতায় এ অঞ্চলের গণমানুষের রাজনীতি শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ হয়ে আওয়ামী লীগের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বস্তুতঃ তখন আওয়ামী লীগের সকল প্রকার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও কর্মসূচী এদেশের মানুষের বিবেককে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়। তাই আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আপামর জনতার হৃদয়ে স্থান করে নেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এদেশের সর্বস্তরের মানুষকে মুক্তির মহামন্ত্রে উদ্দীপ্ত করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনতা অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বিজাতীয় ভাষা-সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় প্রহর গুণে এবং সত্তরের নির্বাচনের মাধ্যমে তার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

নির্বাচনপূর্ব কালে ইয়াহিয়ার নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সামরিক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আন্দোলনের তীব্রতা অনুভব করলেও আওয়ামী লীগের পক্ষে এমন সংখ্যাগরিষ্টতা আসবে ভাবতে পারেনি। যে কারণে আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে সাধারণ নির্বাচন দিলেও এর ফলাফল মেনে নিতে পারেনি। স্বাভাবিক নিয়মে নির্বাচনে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কথা থাকলেও তারা তা না করে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে পদদলিত করে সামরিক শাসন জারি করে। ফলে এ দেশের স্বাভাবিক রাজনীতি ধর্ষিত হয়। এই রাজনৈতিক ধর্ষণ থেকেই পাকিস্তানের বিভক্তি অনিবার্য হয়ে উঠে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাভাবিক রাজনীতিকে পদদলিত করার সময়ে শাসক চক্রের ধারণায়ও আসেনি যে, এ অঞ্চলের মুক্তিপাগল মানুষ তাদের স্বতঃষ্ফুর্ত রায় বাস্তবায়নের জন্য এমন বেপরোয়াভাবে অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিতে পারে।

১৫ ফেব্রুয়ারী ভুট্টো নির্ধারিত ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য সংসদ অধিবেশনে যোগদান না করার ঘোষণা দিলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১ মার্চ নির্ধারিত সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবি, আইনজীবি প্রভৃতি পেশার মানুষ তথা সকল সম্প্রদায়ের লোক মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। শহরে, বন্দরে, গ্রামে, গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভের দাবানল। এ সুর ধরেই বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চ পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণার জন্য নির্ধারণ করেন। দেশের প্রতিটি মানুষ বঙ্গবন্ধুর ঐ ৭ মার্চের ঘোষণায় যথাযথ দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করে প্রহর গুণে।

বঙ্গবন্ধু কার্যতঃ ৩ মার্চ থেকেই স্বাধীনতা ঘোষণা না করেও মৌখিক ভাবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালাতে শুরু করেন। সেক্রেটারিয়েট থেকে মহকুমা হাকিম পর্যন্ত এবং পুলিশ বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল থেকে থানার দারোগা পর্যন্ত তার নির্দেশ মতো কাজ করতে থাকেন। দেশের অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্টেট ব্যাংক থেকে শুরু করে সকল বাণিজ্যিক ব্যাংক তার নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করে। তখন একমাত্র সেনানিবাস ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের অন্য কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত হয়নি।

অনেকেই অনুমান করেছিলেন যে, ৭ মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। এই অনুমানের ভিত্তিতে ৬ মার্চ রাত্রে মার্শাল’ল এ্যাডমিনিস্ট্রেটর সাহেবজাদা ইয়াকুব খান ও গভর্নর এ্যাডমিরাল আহসান বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত করে জানালেন যে, তাদের দু’জনকেই পরের দিন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেতে হবে। এ দু’জনের স্থলে জেনারেল টিক্কা খান মার্শাল’ল এ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও গভর্নর দুটো পদেই নিযুক্ত হয়েছেন। টিক্কা খান সম্বন্ধে জেনারেল ইয়াকুব বঙ্গবন্ধুকে বলেন যে, তিনি এক সাধারণ সৈনিক থেকে পদোন্নতি পেয়ে লেঃ জেনারেল হয়েছেন। এ পুরস্কার তিনি পেয়েছেন বিশেষ করে তার নিষ্ঠুরতার জন্য এবং সঙ্গে সঙ্গে একজন নামকরা ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে। বেলুচিস্তানে টিক্কা খান কিভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলেন তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ বঙ্গবন্ধুর সামনে তুলে ধরেন। তারা আরো জানান যে, টিক্কা খানের পক্ষে রেসকোর্সের সভায় জনতার উপর বোমাবর্ষণ করাও সম্ভবÑ যদি তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণা না করলেও তিনি কমান্ডোদের সাহায্যে কিছু অবাঙালিদের হত্যা করে এবং সৈনিকদের কর্তব্যে বাঁধা দিয়ে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গার সুত্রপাত ঘটাবেন। পরে ঐ দাঙ্গার সূত্রধরে বাঙালিদের উপর হত্যালীলা চালাবেন। এ্যাডমিরাল আহসান ও সাহেবজাদা ইয়াকুব দু’জনেই শেখ সাহেবকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন।

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বললেও সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি দিয়েছেন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক। বলেছেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইল প্রত্যকে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শ্ত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’বঙ্গবন্ধুর সেদিনের নির্দেশে সরকারী ও বেসরকারী অফিস, হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতসমূহ, সকল বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। সরকারি সকল প্রকার কর এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার সকল লেনদেনও বন্ধ হয়ে যায়। হাইকোর্টের বিচারপতি থেকে যেকোনো অফিসের পিয়ন পর্যন্ত কেউই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অমান্যের কথা ভাবতে পারেনি। সবচাইতে বড় কথা এই অসহযোগ আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। উল্লেখ্য যে, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ‘শপথ কার্য’পরিচালনা করতে রাজী না হওয়ায় টিক্কাখান গভর্নর হিসেবে কাজ করতে পারেননি। যে সব কন্ট্রাক্টর ক্যান্টনমেন্টে খাদ্য সরবরাহ করতেন তারাও সরবরাহ বন্ধ করে দেন। মোট কথা সর্বস্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরকারি যেকোনো কর্মকান্ডে অসহযোগিতা করতে থাকেন।

সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমশঃ অত্যন্ত নাজুক আকার ধারণ করতে থাকে। অবশেষে ২৫ মার্চের সেই ভয়াল কালো রাত্রিতে ঢাকায় মঞ্চস্থ হয় বিশ্বের নিষ্ঠুরতম গণহত্যার নাটক। মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতারের পর রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, বিশ্ববিদ্যালয় হলসহ ঢাকার রাজপথে চলে হত্যার মহোৎসব। ফলে বর্বর পশ্চিমাদের নারকীয় ঘটনা আর ৭ মার্চের কালজয়ী আহ্বানের অনিবার্য প্রতিক্রিয়ায় বাংলার সর্বস্তরের মানুষ জীবন বাজি রেখে লিপ্ত হয় সশস্ত্র সংগ্রামে। কেবলমাত্র আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে নিরস্ত্র-সমরজ্ঞানহীন মানুষ মাত্র নয় মাসে অভিজ্ঞ, সুসজ্জিত ও হিংস্র সমরকুশলী এক বিশাল বাহিনীর থাবা থেকে ছিনিয়ে আনে তাদের মানচিত্র আর জাতিসত্ত্বার নতুন পরিচিতি। বিশ্বের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল।

আমরা জানি যুদ্ধের জন্য সবচাইতে শক্তিশালী উপকরণ হচ্ছে উন্নমানের অস্ত্র। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে তার চাইতেও শক্তিশালী উপকরণ হচ্ছে মনোবল। একজন যোদ্ধা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, যত উন্নত মানের অস্ত্রই তার কাছে থাকুক না কেন, যদি তার দৃঢ় মনোবল না থাকে তবে চরম মুহূর্তে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে সে পালাতে বাধ্য। কেবল মাত্র মনোবলের জোরে অসম যুদ্ধে ক্ষুদ্র প্রতিপক্ষ বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছে, বিশ্বের ইতিহাসে এমন বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সুনিপুণ, শক্তিশালী, সুসজ্জিত ও হিংস্র বাহিনীর বিপরীতে সম্পূর্ণ আনাড়ী, নিরস্ত্র ও শৃঙ্খলাজ্ঞানহীন বাহিনীর অসম যুদ্ধ।

শুরুতে পাক বাহিনীর মোকাবেলায় দাড়ানোর মতো আমাদের যেমন ছিল না অস্ত্র, তেমনি ছিল না পর্যাপ্ত সামরিক জ্ঞান। এক্ষেত্রে একমাত্র শক্তি ছিল মনোবল। ২৫ মার্চ রাতের সেই বর্বরতার জবাব দিতে তাৎক্ষণিক ভাবেই এদেশের আপামর জনতা ৭ মার্চের আহ্বান অনুযায়ী ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে’রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। এক সুশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এভাবে লাঠিসোটা হাতে ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের রাস্তায় বের হওয়ার বিষয়টি বাহ্যিকভাবে হাস্যকর জ্ঞান হলেও এর পেছনে কাজ করেছে আমাদের জাতীয় চেতনা, অতুল সাহস আর মুক্তির অদম্য স্পৃহা। ঠিক একই চেতনার সূত্রে তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরস্থ ক্ষুদ্রতম অংশ বাঙালি জোয়ানরাও চরম মুহূর্তে বিদ্রোহ ঘোষণা করে যার যার অবস্থান থেকে। তারা পাক বাহিনীর শক্তিমত্তার বিষয়টি অধিক অবগত থাকা সত্তে¡¡ও সাহসে ভর করে স্বদেশের সাধারণ প্রতিবাদী মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। ফলে সেনা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত শক্তি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে নতুন মাত্রা দান করেÑ মুক্তিযুদ্ধ পরিণত হয় জনযুদ্ধে।

২৬ মার্চে দেশের আপামর জনতা কারো আহ্বানের অপেক্ষা না করে স্ব স্ব অবস্থান থেকে স্ব স্ব শক্তি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। এরপরে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমানের যে আহ্বান ও ঘোষণা প্রচারিত হয় তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তিনিও অন্যান্য সকলের মতো উদ্বুদ্ধ হয়েই এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই উদ্বুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি একদিনের নয়। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় নিষ্পন্ন ’৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল এবং উক্ত ফলাফল মেনে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় পাক সরকারের নগ্ন তালবাহানায় সৃষ্ট পরিস্থিতি সকলকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এই বিক্ষুব্ধ মনে যে আলোড়নের সৃষ্টি করে তাতেই আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিজেকে প্রস্তুত করে। তাই সেনা থেকে সাধারণ স্তরের প্রতিটি মানুষ ২৬ মার্চ জীবন বাজি রেখে রাস্তায় নেমে আসে এবং সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত ভাবে চরম ক্ষতির সম্ভাবনা জেনেও মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে যে তাগিদ এবং প্রেরণা অনুভব করে সেই অনুভবের ক্ষেত্রটি ধারাবাহিক আন্দোলনের মাধ্যমে রচনা করেছেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আজ বাংলাদেশ তো বটেই সমগ্র বিশ্বে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো পৃথক পরিচিতির প্রয়োজন হয় না। তাঁর সবচাইতে বড় পরিচয় তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত, নির্যাতিত-নিষ্পেশিত মানুষের মুক্তির প্রয়াশকে নাগালে নিয়ে আসতে তিনি যে ইতিহাস গড়েছেন তার সাথে কেবল নেলসন মেন্ডেলারই তুলনা চলে। সফল সংগ্রাম পরিচালনায় তাঁর আপোষহীন নেতৃত্ব এ ভূখÐকে ধাপে ধাপে স্বাধীনতার পথে নিয়ে যায়। তাঁর অসাধারণ মেধা, দেশপ্রেম, কঠিন সংকল্প, সম্মোহনী জনসংযোগ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বাঙালি জনমানসে যে মুক্তির অদম্য স্পৃহা জাগ্রত করে তার পরিণতিতেই স্বল্প সময়ে মুক্তিযুদ্ধে সফলতা অর্জন সম্ভব হয়। অনিবার্য বাস্তবতায় তাঁর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন এবং বিজয় অর্জনে সর্বস্তরের মানুষের যে প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত হয় তার একমাত্র প্রেরণা ছিলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু কৈশোর থেকেই গণমুক্তির সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করে মুসলিম লীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমস্ত সময় জুড়ে জনগণের মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। জয়ের জন্য সম্ভাব্য সকল পথ পরিভ্রমণ করে লব্ধ অভিজ্ঞতা আর সতীর্থদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠন করেছেন। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত সময় কালে সরকার পরিচালনার মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন, গতানুগতিক রাজনীতি দিয়ে স্বাধীনতা রক্ষা বা স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া সম্ভব নয়। তাই শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতির দিক পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ নতুন ধারণায় একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালুর তাগিদ অনুভব করেন। যার রাজনৈতিক স্বরূপ হলো ‘বাকশাল’। এটি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সর্বশেষ নির্যাস ভাবাই যুক্তিযুক্ত।

বঙ্গবন্ধু দেশের জনসংখ্যার শতকরা ৮৫% ভাগ শোষিত, বঞ্চিত, কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যেই শাসনতান্ত্রিক আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের লব্ধ অভিজ্ঞতা ও সরকার পরিচালনার ব্যাবহারিক জ্ঞানসমৃদ্ধ সর্বশেষ রাজনৈতিক অভিসন্দর্ভ বাস্তবায়নের সুযোগ দেয়া হয়নি। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির গতিধারা বুঝতেন; বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মানুষকে জানতেন; দলীয় নেতৃত্বের স্বরূপ সম্পর্কেও তাঁর পূর্ণ ধারণা ছিল। এমনি বাস্তবতায় তাঁর সর্বশেষ রাজনৈতিক মতবাদ বাস্তবায়নের সুযোগ পেলে হয়তো স্বাধীনতা রক্ষা, জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনের কৌশল এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঠিক তাৎপর্য বুঝার সুযোগ আমরা পেতাম।

মুক্তিযুদ্ধের কমস্পৃহা ও কর্মপদ্ধতি আর গণমুক্তির কর্মপ্রয়াশ ভিন্নধর্মী। যুদ্ধের জন্য কৌশলসমৃদ্ধ শক্তির মহড়া যতনা প্রয়োজন, গণমানসের মুক্তির জন্য তার চেয়ে অধিক প্রয়োজন চারিত্রিক উৎকর্ষ। এ উৎকর্ষের প্রথম শর্ত সততা, এরপরে মানসিক ত্যাগ, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি গুণাবলীর চর্চা অপরিহার্য। এর ব্যত্যয় ঘটলে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা কষ্টসাধ্য।

অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, তৎকালে বাংলাদেশে দুর্নীতি মহামারী আকারে চেপে বসেছিল। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও নেতৃত্ব ব্যতীত স্বাধীনতা রক্ষা ও সমৃদ্ধি অর্জনের সংগ্রামে সফল হওয়া অসম্ভব। স্বাধীনতা উত্তর কালে অসৎ মানুষে সয়লাব হয়ে যায় সমগ্র বাংলাদেশ। স্বাধীনতা নস্যাতেও কোনো কোনো মহল তৎপরতা প্রদর্শনে কার্পণ্য করেনি। যে কারণে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। তাই অনিবার্য কারণেই বঙ্গবন্ধু সংসদে চতুর্থ সংশোধনী পাশের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সংশ্লিষ্ট সংশোধনী পাশের সময়ে বঙ্গবন্ধু সংসদে তাঁর ভাষণে আক্ষেপের সুরে তাই বলেছিলেন, ‘স্পীকার সাহেব, আজকের এই সংশোধন কম দুঃখে করি নাই।’

ভাষণের অন্যত্র তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় বলেন, ‘এই বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে। করাপশন আমার বাংলার কৃষক করেনা, করাপশন আমার বাংলার মজদুর করেনা। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ, যারা তাদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি। আজ যেখানে যাবেন, করাপশন দেখবেন। আমাদের রাস্তা তৈরি করতে যান করাপশন, ফুড কিনতে যান করাপশন, জিনিষ কিনতে যান করাপশন, বিদেশে গেলে টাকার উপর করাপশন। এই করাপশন যারা করে তারা কারা? আমরা ৫ পারসেন্ট শিক্ষিত সমাজ, আমরা হলাম দুনিয়ার সবচাইতে বেশী করাপ্ট পিপল। আর আমরাই করি বক্তৃতা, আমরা লিখি খবরের কাগজে, আমরাই বড়াই করি। আজ আত্ম-সমালোচনার দিন এসেছে। এসব চলতে পারে না। মানুষকে একদিন মরতে হবে, কবরে যেতে হবে। কিছুই সে নিয়ে যাবেনা। তবু মানুষ কেমন করে ভুলে যায়, কি করে এইসব কাজ করতে পারে?’

আপাত দৃষ্টিতে এখানে এসব উক্তির অবতারণা কারো কারো কাছে অসঙ্গত বা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু এর কারণ এই যে, বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতাই কেবল পারেন মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আত্ম-সমালোচনার এমন কসরত করতে। তিনি সংশ্লিষ্ট ভাষণে নির্দ্বিধায় পরিস্থিতির স্বাভাবিক মূল্যায়ন এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য সঠিক পথের সন্ধান দিতে সচেষ্ট হয়েছেন। পরিস্থিতির চাপে স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছর সময়েও যে আমরা মুক্তির আস্বাদ গ্রহণ করতে পারিনি, জীবনের শেষ সময়ে তা-ই অকপটে স্পষ্ট করে গেছেন বঙ্গবন্ধু। অর্থাৎ মাত্র নয় মাসে কঠিন রক্তক্ষয়ী সমরের মাধ্যমে স্বাধীন হতে পারলেও তৎপরবর্তী সাড়ে তিন বছরেও স্বাধীনতার স্বাদভোগের সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ। কিন্তু এমনতো কথা ছিলনা? বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক প্রতিশ্রæতির এই বিপর্যয় থেকে বেরুতেই শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগুচ্ছিলেন।

বাংলাদেশের জাতীয়তায় ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’সম্পর্কিত ধারণা কারো কারো কাছে অসঙ্গত বা বেমানান মনে হলেও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, পাকিস্তান গঠনের সময়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। বৈরি পরিস্থিতি সে সুযোগ না দিলেও বঙ্গবন্ধু বৃহৎ বাংলার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই বাঙালি জাতীয়তার সাথে বৃহৎবাংলার কোনো যোগসূত্র ছিল কি-না, বঙ্গবন্ধু তেমন কোনো স্বপ্ন লালন করতেন কি-না, তা জানার সময় এবং সুযোগ সৃষ্টির পূর্বেই আমাদেরকে আশাহত হতে হয়। তাঁর অকাল মৃত্যু না হলে বাঙালি জাতীয়তা সম্পর্কে তাঁর সুপ্ত ধারণার তত্ত্ব হয়তো যথা সময়ে জানা যেতো। ভবিষ্যতে কোনো মহান গবেষক যদি কখনও এ তত্ত¡ আবিস্কার করেন যে, বঙ্গবন্ধু জেনে বুঝেই বাংলাদেশের জাতীয়তায় বাঙালিত্বের ধারণাকে গ্রহণ করেছিলেন কিংবা যদি অনিবার্য আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে কখনও সম্পূর্ণ বাংলার নতুন রূপ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ সৃষ্টি হয় তবেই হয়তো বঙ্গবন্ধুর দার্শনিক তত্ত্ব উন্মুচিত হবে। বাঙালি আর বাংলাদেশী জাতীয়তার অনর্থক বিতর্কে পরিসমাপ্তি ঘটবে। ভাষা ও সংস্কৃতিগত ঐতিহ্যের সূত্রে স্বাধীন সার্বভৌম একাধিক রাষ্ট্রে সংযুক্তির নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল নয়। প্রসঙ্গত জেনারেল ওসমানীর একটি বক্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে দুই বাংলা এক হত। ওপার বাংলার বাঙালিরা তাঁকে তাদের নেতা বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সে জন্যই তাঁর অকাল মৃত্যু।’

ইয়াহিয়া সরকার ২৫ মার্চের কালোরাত্রিতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিয়ে যাবার পর তাঁর বন্দীদশায়ই বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়। সুতরাং দীর্ঘ নয়মাস ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিল না এ কথা ধ্রæবসত্য। এই সত্যের সুযোগে অনেকেই বলে থাকেন যে, মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কোনোই অবদান নেই। অনেকে আবার অতি আবেগে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করায় প্রয়াসী। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রশ্নেও বাস্বতাকে পাশকাটিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে আমাদের জাতীয় চেতনার মুল স্বরূপটাকেই ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। এতে জাতীয় ঐক্য ও সমৃদ্ধির কি রকম কল্যাণ সাধিত হচ্ছে জানি নাÑ তবে বিভক্তির দেয়ালটা যে উত্তরোত্তর পুষ্ট হচ্ছে, প্রতিহিংসার দাবানল যে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে শান্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ, পরমতসহিষ্ণুতা প্রভৃতিকে সংহার করে মানবতা বোধকে রক্তাক্ত করছে, তা আন্দাজ করতে কষ্ট হয় না। যা হোক মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আদৌ কোনো অবদান ছিল কি-না, থাকলে তাঁর কী রকম অবদান ছিল সংক্ষিপ্ত কলেবরে সে ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। এখানে শুধু এটুকুই বলা যায় যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে যদি একটি প্রদীপের সাথে তুলনা করা হয় তবে সে প্রদীপের শিখা হবে স্বাধীনতা, সলতে হবে মুক্তিবাহিনী, সরকার এবং বিভিন্নভাবে সহায়তা দানকারী মহল হবে তৈল, আর সেই তৈলাধারটি ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার
হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস, হাওরের ইতিবৃত্ত, প্রসঙ্গ : মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ, মুক্তিযুদ্ধে মাধবপুর প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা। সমন্বয়ক (হবিগঞ্জ জেলা): এনসাইক্লোপিডিয়া অব বাংলাদেশ ওয়ার অব লিবারেশন, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। তারিখ: ২৯-১২-২০

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top