সিডনী মঙ্গলবার, ২৩শে এপ্রিল ২০২৪, ১০ই বৈশাখ ১৪৩১

জয় বাংলার ইতিহাস : সালেক খোকন


প্রকাশিত:
৫ এপ্রিল ২০২২ ০০:৩৮

আপডেট:
২৩ এপ্রিল ২০২৪ ২০:০৬

 

‘জয় বাংলা’ স্লোগানটিকে জাতীয় স্লোগান ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারী করেছে বাংলাদেশ সরকার।স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর হলেও এমন সংবাদ আমাদের প্রেরণা দেয়, আন্দোলিত করে।
দুই বছর আগে উচ্চ আদালতের এক রায়ে জাতীয় দিবস, সরকারি অনুষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চারণের ওপর জোর দিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে কার্যকর করার নির্দেশ দেয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে ওই সময় আদালত বলে, ‘জয় বাংলা’ জাতীয় ঐক্যের স্লোগান। ‘জয় বাংলা’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় স্লোগান এবং জয় বাংলা ৭ মার্চের ভাষণের সঙ্গে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত। উচ্চ আদালতের ওই নির্দেশনার আলোকেই সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হাইকোর্টের এমন রায় কার্যকর করতে কেন দুই বছর সময় লাগল? এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
কিন্তু ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি শুরু হয়েছিল কীভাবে?জানা যায় ১৯৬৯ সনের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একটি সভা হয়। সে সভায় ১৭ মার্চ শিক্ষা দিবস পালনের কর্মসূচি প্রণয়ন নিয়ে আলোচনা চলছিল। আলোচনার একপর্যায়ে তৎকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতা আফতাব উদ্দিন আহমেদ(পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন) এবং দর্শন বিভাগের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক চিশতি শাহ হেলালুর রহমান (একাত্তরে শহীদ হন) ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি প্রথম উচ্চারণ করেন। সভা চলাকালীন সময়ে আকস্মিকভাবে সবাইকে চমকে দিয়ে তারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি দেন । সঙ্গে সঙ্গে সাত-আটজন কর্মী প্রতিধ্বনি করে বলেন ‘জয় বাংলা’। ওইসময় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ হাতে লেখা তিন পাতার একটি পত্রিকাও প্রকাশ করে। যার নাম ছিল ‘জয় বাংলা’।
শুরুর দিকে এই স্লোগানটি নিয়ে তৎকালীন নেতা-কর্মীদের অনেকের ভেতরই নানা আলোচনা-পর্যালোচনা হতে থাকে। নেতাদের অনেকেই আপত্তিও তোলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন জয় বাংলা’র পক্ষে।
একটি ঘটনায় তা বেশ স্পষ্ট হয়।১৮ই জানুয়ারি ১৯৭০। পল্টনে বিশাল জনসভা চলছে। মঞ্চের শামিয়ানায় আটকানো হার্ডবোর্ডের উপর লাগানো কাঠের খণ্ডে উজ্জ্বল লাল রঙে লেখা হয়েছে ‘জয় বাংলা’ শব্দ দুটি । ওই সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্যের পরই তিনি মঞ্চে বসা অবস্থায় বললেন- ‘সিরাজ (সিরাজুল আলম খান) স্লোগান দে’।’ দ্রুত মাইকের সামনে গিয়ে সিরাজুল আলম খান আবেগঘন কণ্ঠে বললেন: ‘আসুন, সাত কোটি মানুষের পক্ষ হয়ে আমরা সকলকে জানিয়ে দেই, যার কণ্ঠে যতো জোর আছে আমরা একসঙ্গে বলে উঠি ‘জয় বাংলা’।’ লাখো কণ্ঠে তখন আওয়াজ ওঠে- ‘জয় বাংলা’। এমন ইতিহাসের কথা জানা যায় বিভিন্ন গ্রন্থ ও আত্মজীবনী থেকে।
১৯৭০-এর ৭ জুন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিশাল এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে প্রথম যুক্ত করেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি। ১৯৭১ সনের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েই তার অবিস্মরণীয় বক্তৃতা শেষ করেছিলেন। তাই জয় বাংলা স্লোগান বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্লোগান। এ স্লোগান বাঙালি জাতিকে করেছিল ঐক্যবদ্ধ।
একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিছু মূল নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যার মূলে ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত করেছিল একাত্তরে। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস অর্জনের পথ ছিল কণ্ঠ আকাশে তুলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া। তাদের বীরত্ব প্রকাশের ভাষাটিও ছিল ‘জয় বাংলা’।
এমন সিদ্ধান্তে আনন্দিত মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগান, ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এদেশ আরেক পাকিস্তান বনে যায়। জিয়াউর রহমানের আমলে টেলিভিশন, রেডিও ও পত্রিকায় জয় বাংলা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল৷ বইয়েও লেখা যেতো না৷ বঙ্গবন্ধু শব্দটিও লেখা যেতো না। লেখা হতো শেখ মুজিব৷ মুক্তিযোদ্ধারা প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর নাম ও জয় বাংলা স্লোগান দিতে পারত না। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অপরাধে অনেকের ওপরই নেমে আসত অত্যাচারের খড়গ।

জয় বাংলা প্রসঙ্গে কথা হয় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আহম্মদ বাবুর সঙ্গে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন চার নম্বর সেক্টরে। জয় বাংলা স্লোগান প্রসঙ্গে তিনি অকপটে বলেন‘‘একাত্তরে যখন স্পিরিটের প্রয়োজন হয়েছে আমরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান বলেছি। মুক্তিযোদ্ধারা জীবনও দিয়েছে ‘জয় বাংলা’ বলে। এই স্লোগান দিয়েই আমরা অপারেশন শুরু করেছি। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের জন্যও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানই ছিল আতঙ্ক। সরকার এটিকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা দিচ্ছে এটা আশার কথা। আমি মনে করি ধর্মনিরপেক্ষতার পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি খুবই পজেটিভ উদ্যোগ। ভারতে বিভিন্ন বাহিনীতে ‘জয় হিন্দ’ বলার প্রচলন রয়েছে। তাহলে রক্তে পাওয়া এই স্বাধীন দেশে আমরা কেন একে অপরকে বলি না ‘জয় বাংলা’? সরকারের উচিত হবে এই স্লোগান সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করারও উদ্যোগ নেওয়া।’’
এ নিয়ে কথা বলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগও। ক্যাপ্টেন বেগ নামে তিনি অধিক পরিচিত। একাত্তরে নয় নম্বর সেক্টরের শমশেরনগর সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সমগ্র সাতক্ষীরা অঞ্চলে গেরিলা, সম্মুখ ও নৌকমান্ডো যুদ্ধসমূহ পরিচালনা করেন তিনি। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
‘‘জয় বাংলা স্লোগানই ছিল একাত্তরের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। প্রথম দিকে সবাই ছিল আইডিওলজিক্যাল ফ্রিডম ফাইটার। যারা বুক দিয়ে বিশ্বাস করত বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। পাকিস্তানিরা আসছে অন্যের দেশে। জোর করে একটা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে মাতবরি করতে আসছে। আর আমাদের দেশেই আমরা। নদীনালা, খালবিল, পাহাড় সব চেনা। এখানে আমরাই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও শুনেছেন ৯০ হাজার ওয়েল ইকুয়েপড সেনা সারেন্ডার করেছে। একমাত্র যদি তারা কাপুরুষ না হয়। এমন নয় যে তাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে গিয়েছিল। তবুও সারেন্ডার করতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানি সেনারাই। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই হয়েছে এটা। এই দেশ আমার মায়ের দেশ। মাকে মুক্ত করাই তখন ছিল সবচেয়ে বড় কাজ। প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার বুকে তখন ছিল এই আগুন। আর সাহস ছিল ওই স্লোগান। তাই আমি বলি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েই তো আমরা দেশ জয় করেছি। সে অর্থে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই স্লোগানই ছিল জাতীয় স্লোগান।’’
কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর বিভক্তির রাজনীতির কারণেই জয় বাংলা স্লোগানকে দলীয় স্লোগান হিসেবে দেখিয়ে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছে বলে মনে করেন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতা এবং বর্তমান আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা তোফায়েল আহমেদ। এ নিয়ে ১২ ডিসেম্বর ২০২০ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তার ভাষ্য ছিল এমন ‘‘স্বাধীনতার পরও কিন্তু আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জয় বাংলা স্লোগান দিতাম। যে জাসদ একসময় জয়বাংলা স্লোগান দিত, তারা সেই স্লোগান দেওয়া বন্ধ করে দেয়। জাসদ তো আওয়ামী লীগ থেকেই বেরিয়ে গিয়ে নতুন দল করেছিল ১৯৭২ সালে। এরপর বিভিন্ন দল এটাকে দলীয় স্লোগান হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে। যা ছিল সত্যি দুর্ভাগ্যজনক।’’
কিন্তু জাসদ নেতাদের বক্তব্য, সদ্য স্বাধীন দেশে শেখ মুজিবের সরকারের বিরোধিতা করে নতুন দল জাসদের উত্থান হলে সেই দলটি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহার করেনি সত্য, কিন্তু তারা ‘জিন্দাবাদ’ স্লোগানও দেয়নি। ১৯৭৫-এ জাতির জনক শেখ মুজিবকে হত্যার পরই জয় বাংলার পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগানের প্রচলন শুরু হয়। যারা বাংলাদেশে বিশ্বাসী নন, যারা পাকিস্তানে বিশ্বাস করে এবং যারা ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তখন তারাই এই স্লোগানের প্রচলন ঘটায়। যার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জিয়াউর রহমান।

বিশ্বের প্রায় একশো ষাটটি দেশে জাতীয় স্লোগান আছে। আমাদের ছিল না। ‘জয় বাংলা’ আমাদের জাতীয় ঐক্য ও প্রেরণার প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মিশে থাকা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকেই করা হচ্ছে জাতীয় স্লোগান। এটি যেমন আশা জাগানিয়া খবর তেমনি গৌরবেরও বিষয়।

সালেক খোকন
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top