সিডনী মঙ্গলবার, ১৩ই এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র ১৪২৭


টমেটোর কত গুন - মুন্সি আব্দুল কাদির


প্রকাশিত:
১৬ মার্চ ২০২১ ১৫:০৩

আপডেট:
১৩ এপ্রিল ২০২১ ০৭:৩১

 

টমেটো শীত কালীন সবজি হলেও এখন সারা বছরই পাওয়া যায়। অবশ্য শীত কাল থেকে অন্য সময় টমেটোর দাম খানিক বেশি। খাবারের স্বাদ বাড়াতে টমেটোর জুড়ি নেই। বাজারে টমেটো আছে আর কোন অনুষ্ঠানের খাবার মেনুতে টমেটোর সালাদ থাকবে না। তা কি কল্পনা করা যায়? টমেটোর সস সারা বছরই মুখ রোচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। টমেটো পুষ্টিতে ভরপুর একটি সবজি। টমেটো কাঁচা পাকা দুই ভাবেই খাওয়া যায়। অবশ্য কাঁচা টমেটো রান্নাতেই ব্যবহার হয়। পাকা টমেটো তরকারী, সালাদ, সস তৈরীতে ব্যবহার করা হয়।

ভিটামিন এ, সি, কে, ফলেট এবং পটাসিয়ামে ভরপুর টমেটো। টমেটো থেকে আরও পাওয়া যায় থায়ামিন, নায়াসিন, ভিটামিন বি৬, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, কপার, লাইকোপিন । এ ছাড়াও এক কাপের টমেটোর মধ্যেই থাকে দুই গ্রামের মতো ফাইবার। অনেকটা পানিও রয়েছে এর মধ্যে। ১০০ গ্রাম টমেটোতে আছে ০.৯ গ্রাম আমিষ, ৩.৬ গ্রাম শর্করা, ০.৮ মি. গ্রাম আঁশ, ০.২ মি. গ্রাম চর্বি, প্রোটিন ০.৯ গ্রাম, ২০ কিলোক্যালরি শক্তি, ৪৮ মিঃ গ্রাম ক্যালসিয়াম, ২০ মিঃগ্রাম ফসফরাস, ০.৬৪ মিঃ গ্রাম লৌহ, ৩৫১ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন ও ২৭ মিঃ গ্রাম ভিটামিন ‘সি’, ভিটামিন এ ৪২ মাইক্রোগ্রাম, বেটা ক্যারোটিন ৪৪৯ মাইক্রোগ্রাম, লুটিন জিজানথেন ১২৩ মাইক্রোগ্রাম, থায়ামিন ০.০৩৭ মিঃগ্রাম, নায়াসেন ০.৫৯৪ মিঃগ্রাম, ভিটামিন বি৬ ০.০৮ মিঃগ্রাম, ভিটামিন ই ০.৫৪ মিঃগ্রাম, ভিটামিন কে ৭.৯ মাইক্রোগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১১ মিঃগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ ০.১১৪ মিঃগ্রাম, পটাশিয়াম ২৩৭ মিঃগ্রাম, লাইকোপেন ২৫৭৩ মাইক্রোগ্রাম।

টমেটোর কিছু উপকারিতা:
হাড় ও দাঁতের সুরক্ষায় : টমেটোতে থাকা ভিটামিন কে মজবুত হাড় গঠনে সাহায্য করে। প্রতিদিন দু গ্লাস টমেটোর জুস পান করলে হাড় ও দাঁত মজবুত হয়। এর ফলে অস্টিওপরোসিস, ক্যাভিটি, ইত্যাদি রোধ করা যায়। টমেটোয় রয়েছে উচ্চ বিটা ক্যারোটিন যা শরীরে প্রবেশ করলে ভিটামিন এ-তে পরিণত হয় যার ফলে হাড়ের শক্তি ও কাঠামো বজায় থাকে। ভিটামিন সি হাড় গঠন করতে ও শরীরের কিছু প্রয়োজনীয় কোষ তৈরী করতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি এর অভাব হলে হাড় ও দাঁত ধীরে ধীরে খসে যেতে শুরু করে। এক্ষেত্রে টমেটো ওষধির ভূমিকা নিয়ে থাকে। টমেটোয় থাকা লিউটিন কোলাজেন তৈরী করতে সাহায্য করে। এছাড়া টমেটোয় রয়েছে ভিটামিন কে যা ভিটামিন ডি এর সাথে মিশে হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষা করে।

দৃষ্টি শক্তি বাড়াতে: ভিটামিন এ দ্বারা সমৃদ্ধ টমেটো চোখের জন্যে দারুণ উপকারী। টমেটোতে থাকা ভিটামিন এ দৃষ্টিশক্তিকে আরও উন্নত করে। বিশেষত চোখের মণি ভালো থাকার একটি প্রধান কারণ হল ভিটামিন এ যার ঘাটতি হলে অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। টমেটোয় থাকা লাইকোপেন সেই সমস্ত রেডিক্যাল দূর করে যা চোখের নানা রোগের কারণ হতে পারে। এমনকি, সূর্যের প্রখর তাপ থেকে চোখকে রক্ষা করে এই লাইকোপেন। টমেটোতে থাকা ভিটামিন সি ও কপার বয়স বাড়ার ফলে ছানি বা বিভিন্ন সমস্যাকে অনায়াসে রোধ করতে পারে। নিয়মিত টমেটো খেলে দৃষ্টি শক্তি সজীব থাকে।

হার্ট ভাল রাখতে: টমেটো কাঁটলে দেখতে হার্টেও মতো দেখায়। তাই টমেটো হার্টেও খুব উপকারী। কোলেস্টেরলের মাত্রা ও রক্তচাপ কমাতে সহায়ক এই সবজি। টমেটোতে প্রতি ১০০ গ্রামে ২৫৭৩ মাইক্রোগ্রাম লাইকোপেন থাকে। এই লাইকোপেনের গুণে শরীরের বাজে ও অপ্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল রোধ করা যায়। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে লাইকোপেন সমৃদ্ধ খাবার  সাহায্য করে। প্রতিদিন ২০০ গ্রাম টমেটোর রস এই লাইকোপেন প্রদান করতে সক্ষম।  যেইসব মহিলাদের অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়ার ফলে কোলেস্টরল বেড়ে যায়, তাদের ক্ষেত্রে টমেটো খুব কার্যকরী। টমেটোতে রয়েছে উচ্চ পরিমাণ বিটা ক্যারোটিন, ফোলেট ও ফ্ল্যাভোনয়েড যা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্যে খুব প্রয়োজনীয়। টমেটো হার্টের ক্ষতিকর উপাদার দূর করতে সাহায্য করে। লাইকোপেন যেহেতু ফ্যাটের সাথে গুলে যায়, তাই এটি হার্টকে রক্ষা করে সহজেই অপ্রয়োজনীয় ফ্যাটকে প্রতিরোধ করে। তাই নিয়মিত টমেটো খেলে, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে আসবে। অর্জুন গাছের রসের সঙ্গে টমেটোর রস মিশিয়ে জেলি করে প্রতিদিন খেলে হার্ট ও বুকের ব্যথা কমে যায়।

চর্ম রোগ: চর্মরোগের জন্য টমেটো অত্যন্ত কার্যকর উপাদান। ত্বকে যদি কোনো সমস্যা হয়ে থাকে, তবে প্রক্রিয়াজাত করে টমেটোর ব্যবহার করতে পারেন। চর্মরোগ নিরাময়ে এর রস কাজ করে থাকে।

বয়সের ছাপ দূর করতে: মুখের সৌন্দর্য ধরে রাখতে এবং বয়সের ছাপ দূর করতে টমেটো বেশ কার্যকর। এর রস মুখের ত্বক মসৃণ ও কোমল করে। বয়স বাড়তে থাকলে মানুষের মুখে যে বয়সের ছাপ পড়ে, টমেটো খাওয়ার ফলে সেই ছাপ দূর হয়ে যায়।

ডাবাবেটিস নিয়ন্ত্রনে: ডায়াবেটিসের জন্য টমেটো বেশ উপকারী। এ সবজি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রনে রাখে। টমেটোতে রয়েছে উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন সি ও ই যা ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলিকে প্রতিরোধ করে। নিয়মিত টমেটো খাওয়ার ফলে ডায়াবেটিস হওয়ার প্রবণতাও একেবারে কমে যায়। প্রতিদিন ২০০ গ্রাম টমেটো খেলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ফলে যে উচ্চ রক্তচাপ হয়, সেটাও কমে আসে। এছাড়া টমেটোতে থাকা লাইকোপেন ডায়াবেটিসের অক্সিডেটিভ চাপ কমিয়ে আনে।

অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে: টমেটোর মধ্যে রয়েছে লাইকোপেন এবং ভিটামিন এ। যা অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাই নিয়মিত টমেটো খেতে পারেন।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়: প্রতিদিন টমেটো খাওয়ার ফলে সাদা রক্তকণিকা সঠিক ভাবে তার কার্যকারিতা পালন করে। এর ফলে শরীরে যেকোনো রোগ প্রতিরোধ করা যায়।

সর্দি-কাশি প্রতিরোধে: সর্দি ও কাশি প্রতিরোধে টমেটো বেশ উপকারী। সর্দি-কাশি হলে এক বা দুটি টমেটো নিয়ে স্লাইস করে অল্প চিনি বা অল্প লবণ দিয়ে পাত্রে গরম করে স্যুপ তৈরি করে খেতে পারেন। এর ফলে সর্দি-কাশিতে উপকার পাওয়া যায়।

ওজন হ্রাস করে: টমেটোর দ্বারা খুব সহজে ওজন ও শরীরের বাড়তি মেদ কমানো যায়। এছাড়া টমেটো কোলেস্টরল মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে যা ওজন বৃদ্ধির মূল কারণ। এন্টি অক্সিডেন্ট ছাড়া টমেটোতে রয়েছে ফাইবার ও খুবই কম ক্যালোরি। শরীরে কম ক্যালোরি প্রবেশ করলে ওজন অনায়াসে নেমে যায়।

রক্ত জমাট বাধা দেয়: টমেটোতে থাকা লাইকোপেন উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে অনায়াসে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে ও রক্তকে জমাট বেঁধে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। এর ফলে রক্ত চাপ মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ধূমপান ছাড়াতে: ধূমপায়ী ব্যক্তিকে ধূমপান ছাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে টমেটো। এছাড়া ধূমপানের কারণে শরীরের ক্ষতিগুলোও পুষিয়ে নিতে কার্যকর এই টমেটো।

জ্বর সারাতে: জ্বর নিরাময়ে টমেটো সহায়ক। গায়ের তাপমাত্রা নানান কারণে বাড়তে পারে। সামান্য জ্বর হলে টমেটো খেলেই আরাম পাবেন।

ক্যান্সার প্রতিরোধে:  টমেটো বিশেষ কয়েক ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। এর মধ্যে পাকস্থলী, কোলোরেক্টাল ও প্রোস্টেট ক্যান্সার অন্যতম। টমেটোতে থাকা লাইকোপেনে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান। লাইকোপেন হল এন্টি অক্সিডেন্ট যুক্ত এক ধরণের উপাদান যা শরীরে নানা রকমের ক্যান্সার উৎপন্ন করা জীবাণু ধ্বংষ করে ফেলে। এমনকি টমেটো দিয়ে তৈরী সস, জ্যুস বা অন্য কোনো পেস্টও ক্যান্সার রোধ করতে বেশ কার্যকরী কারণ এগুলিতে থাকে অতিরিক্ত পরিমাণ লাইকোপেন। একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে টমেটোর দ্বারা প্রোস্ট্রেট ক্যান্সার,  ব্্েরস্ট ক্যানসারও রোধ করে। ক্যান্সারের কোষ বৃদ্ধি থেকেও প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে টমেটো।

ইনফেকশন রোধে: টমেটো ন্যাচারাল এ্যান্টিসেপ্টিক। তাই ইনফেকশন রোধ করে।

ক্লান্তি দূর করতে: শারীরিক পরিশ্রমের পর টমেটোর রস যেকোনো কোমল পানীয়ের চেয়ে ক্লান্তি দূরে বেশি উপকারী। গবেষকরা বলেন, ব্যায়াম বা অন্য যেকোনো শারীরিক পরিশ্রমের পর টমেটোর রস পেশি পুনরুদ্ধারে এবং ক্লান্তি দূরে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

উচ্চ রক্ত চাপ: টমেটো উচ্চ রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে একটি বা দুটি টমেটো খেলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে।

রক্তস্বল্পতায়: রক্ত স্বল্পতা দূরীকরণে টমেটো সাহায্য করে। যাঁরা রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য টমেটো বেশ উপকারী। প্রতিদিন এক বা দুইবার টমেটো খেলে রক্তস্বল্পতার সমস্যা অনেকটাই দূর হতে পারে।

গর্ভাবস্থার: গর্ভাবস্থার সময় ভিটামিন সি প্রত্যেকটি মহিলার জন্য খুব বেশি প্রয়োজন। এর ফলে গর্ভের শিশুর হাড়, দাঁত ও মাড়ি মজবুত হয়। টমেটোতে থাকা ভিটামিন সি শরীরে আয়রন শোষণ করতে সাহায্য করে।এই সময় আয়রন ট্যাবলেট ছাড়া টমেটো খাওয়াও খুব প্রয়োজন। এছাড়া টমেটোর লাইকোপেন গর্ভবতী মহিলার শরীরে এন্টি অক্সিডেন্ট উৎপাদন করে। এমনকি, ডায়াবেটিস রোধ করতেও সাহায্য করে।

ব্যাথা সারাতে: টমেটোতে থাকা লাইকোপেন ও ভিটামিন সি শরীরের যেকোনো ব্যাথা বা রোগ সারাতে সাহায্য করে। টমেটোতে রয়েছে এন্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদান। এর ফলে শরীরে থাকা দীর্ঘদিনের ব্যাথা বা জ্বালা খুব সহজেই টমেটোর গুণাগুণ দিয়ে সারিয়ে তোলা যায়।

মাংস পেশী গঠন করে: টমেটো বিশেষ করে সবুজ রঙের টমেটোতে টোমাটিডাইন বলে একটি উপাদান থাকে যা মানুষের শরীরের মাংস পেশিকে সঠিকভাবে গঠন করতে সাহায্য করে। এর ফলে আপনি নিজেকে শক্ত পোক্ত অনুভব করতে পারেন ও দীর্ঘ সময়ে ধরে ব্যায়াম করতে পারেন। বিশেষ করে যারা জিমে গিয়ে শরীর চর্চা করেন, তাদের জন্যে টমেটো খুবই প্রয়োজনীয়।

ত্বক ভাল রাখতে: টমেটো উচ্চ লাইকোপিন সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি ত্বককে ভাল রাখতে সাহায্য করে। টমেটো থেঁতো করে মুখে লাগিয়ে ১০ মিনিট ম্যাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন। রোদে পোড়া ভাব, বলিরেখা ও চোখের নিচে কালো দাগ দূর করতে বিশেষজ্ঞরা টমেটো ব্যবহারের কথা বলেন।

 

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top