সিডনী সোমবার, ২১শে জুন ২০২১, ৬ই আষাঢ় ১৪২৮


ডায়ালেসিসঃ কিডনি রোগের শেষ ধাপ : শাহানারা পারভীন শিখা 


প্রকাশিত:
৬ মে ২০২১ ১৭:০৭

আপডেট:
৬ মে ২০২১ ১৭:৪৩

 

বান্ধবী রেবার ফোন। গলার স্বরে উদ্বিগ্নতা আর  ভেঁজা কণ্ঠে একটু চমকে উঠি। এইতো কিছুদিন আগে ওর আব্বা হঠাৎ মারা গেলেন।

 মা ও কিনডির রোগী। বেশ জটিল অবস্থা শুনেছি। মনটা কু’ডাক পারলো। কোন খারাপ সংবাদ না তো! 

"কেমন আছিস বন্ধু? "

 আমি জিজ্ঞেস করলাম। 

বললো, "খুব ভালো নেই। আম্মার জরুরি ভিত্তিতে হাতে ফিস্টুলা করা লাগবে। ডাক্তার বলেছে। ডায়ালেসিস শুরু করে দিতে হবে।"

রেবা আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বান্ধবী। হঠাৎ হঠাৎ ও আমাকে ফোন দিয়ে কিডনি বিষয়ে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে। 

আমার আম্মা কিডনি বিষয়ক জটিলতা থেকে ডায়ালেসিসে চলে যায়। প্রায় তিন বছর ডায়ালেসিস চলতে চলতেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ক'মাস হলো। খুব কাছ থেকে দেখেছি কিডনি এবং ডায়ালেসিস বিষয়েটা।

রেবার আম্মাও কিডনি রুগী। এবং ক্রিয়েটিনিটি উপর গামী। 

আম্মাকে নিয়ে হাসপাতাল কেন্দ্রিক জীবনের জন্য হয়তো ও আমাকে গত একবছর যাবত ফোন দেয়। জানতে চায় এ বিষয়ে। আমি যথা সাধ্য চেষ্টা করি এ বিষয়ে কিছু বলতে। যদিও ওর আম্মার চিকিৎসা বড় ডাক্তার দিয়ে চলছে। 

রেবা আমার কাছে জানতে চাইলো ক্রিয়েটিনিটি কতো হলে ডায়ালেসিস করতে হয়। আমি তো এ বিষয়ে তেমন বলতে পারবো না। তবে আম্মার সাথে থেকে যেটুকু বুঝেছি, তাতে সাধারণত একজন কিডনি রোগীর ক্রিয়িটিনিটি ৮ কিংবা ১০ হলেই ডায়ালেসিসে চলে যেতে হয়। তবে রোগী ভেদে ভিন্নতা হতে পারে। 

ও বললো ওর আম্মার সাড়ে পাঁচ ছিল কিছুদিন আগে। এখন তা বেড়ে আটের উপর। 

তাহলে তো ডায়ালেসিসে যেতেই হবে। 

অবশ্য ওর আম্মার শ্বাসকষ্ট নেই। 

আমার আম্মারও কিডনি পাঁচ থেকে হঠাৎই বেড়ে যায়। একদিন হঠাৎ করেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আমরা ভাবলাম অক্সিজেন নিলেই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক হয়ে যায়নি আম্মা। 

সরাসরি ডায়ালেসিসে চলে যান। অবশ্য আম্মার রেগুলার ডাক্তার হাতে ফিস্টুলা লাগানোর পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে হাতের ব্যায়াম করতে বলেছিলেন। আম্মা প্রস্তুতি নেয়ার খুব একটা সময় পাননি। 

রেবা জানালো গত মাসে ওর আম্মাকে নিয়ে মাদ্রাজ গেছিলো। যদি কিডনি ট্রান্সফার করতে পারা যায়।

 ওর আম্মার বয়স সত্তরের উপর। এতো বয়সীদের কিডনি ট্রান্সফার করা যায় না।

 ও বললো, সবই জানি বন্ধু। কিন্তু মা বলে কথা। মনকে বুঝ দিতেই ওরা গেছে মাদ্রাজ। 

ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছে ওদের পরিবার। ডায়ালেসিস নিয়ে ভীতি কাজ করছে ওদের মধ্যে। 

আমি সাহস দিই ওকে। 

যখন একজন কিডনি রোগী শরীরের রক্ত পরিশোধনের ক্ষমতা হারায় বা কমে যায় তখনই প্রয়োজন হয়ে পড়ে ডায়ালেসিসের। 

একটি বিশেষ ছাকনির মাধ্যমে শরীরের রক্ত পরিশোধন করা হয় হিমোডায়ালাইসিসে। 

জটিল প্রক্রিয়া। 

একটা হাতে ফিস্টুলা লাগানো হয়। এটা একটা মেশিন। সারাক্ষণ চলতে থাকে।

সপ্তাহে দুদিন কিংবা তিন দিন করে ডায়ালেসিস নেবার প্রয়োজন হতে পারে। চারঘন্টা ধরে চলে এটা। 

আমি চার ঘন্টা আম্মার কাছে বসে থাকতাম। দেখতাম প্রক্রিয়াটা। আর আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাতাম এই ভেবে যে, বেঁচে থাকার এতটুকু পথ তিনি রেখেছেন।

ডায়ালেসিস বিষয়টি যতক্ষণ না আমাদের কাছের কারোর করার প্রয়োজন পড়ছে। ততক্ষণ আমাদের  এই বিষয়ে তেমন কোন ধারণায় আসে না। খুবই ভীতিকর মনে হয়। 

হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হাসপাতালের ঐ রুমটায় যেয়ে আমার অনেক ভ্রান্তি দুর হয়ে গেছে। অদ্ভুত একটা পরিবেশ। সারি সারি বিছানায় নারী পুরুষ পাশাপাশি। রুমে টিভি চলছে। সিনেমা বা আনন্দের কোন কিছু চলছে। কেউ ফেসবুক করছে। সময় ধরে খাবার খাচ্ছে কেউ। এই রুমে রোগীর সেবায় নিয়োজিত সবাই রুগীর সাথে মজা করছে। একটা পরিবারের মতো সম্পর্ক সবার মধ্যে। 

এই যে পরিবেশ! প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে এটা ঠিক না। তবে আমি বলবো, অবশ্যই ঠিক। কারণ এই ধরনের জীবনের মধ্যে যে মানুষটা পৌঁছে গেছে। সে নিশ্চিত! এইপথেই তাকে চলে যেতে হবে একদিন। বেঁচে থাকার জন্য এটাই একমাত্র পথ। একটু আনন্দময় সময় অনেক যন্ত্রণাময় জীবনকে কিছু সময়ের জন্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। 

নিশ্চিত মৃত্যু। তারপরও হাসিমুখে ডায়ালেসিসের সময়গুলো কাটিয়ে থাকে। 

বলা চলে জীবনের সাথে চলে ডায়ালেসিস রুগীর সংগ্রাম। 

ডায়ালেসিস মানেই মৃত্যু নয়। কেউ কেউ আট দশ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। কেউ বা অল্প সময়ের মধ্যেই চলে যায়। 

আমি বান্ধবীকে বললাম, ভয় করিসনা বন্ধু।ডাক্তারের পরামর্শ মতো ফিস্টুলা করে ফেল। 

জানি এটা জীবনের সম্পূর্ণ অন্য এক ধাপ। একজন ডায়ালেসিসের রুগীকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই মেশিনের মাধ্যমেই বেঁচে থাকতে হয়। এদের জীবন ঘড়িটা টিকটিক করে চলে ডায়ালেসিস মেশিনের মতো। 

 

শাহানারা পারভীন শিখা 
কবি এবং লেখক 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top