সিডনী বুধবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ৭ই আশ্বিন ১৪২৭

বধির নিরবধি (পর্ব তিন) : আসিফ মেহ্‌দী


প্রকাশিত:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৪:৫১

আপডেট:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৪:৪১

 

(দেশসেরা দুই ফান ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’ ও ‘রস+আলো’তে লেখার সুবাদে আসিফ মেহ্‌দী রম্যলেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন আগেই। ‘বেতাল রম্য’ নামের প্রথম বইয়েই তিনি লাভ করেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। তারপর একে একে প্রকাশিত তাঁর প্রতিটি বইয়ে ব্যঙ্গ আর হাসির সঙ্গে গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটিয়ে তিনি শুধু পাঠকপ্রিয়তাই লাভ করেননি, তাঁর বইগুলো উঠে এসেছে বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায়। সেগুলোর মধ্যে 'বধির নিরবধি', ‘মায়া’, ‘অপ্সরা’, ‘তরু-নৃ’ অন্যতম। এছাড়া এনটিভিতে প্রচারিত তাঁর লেখা নাটক ‘অ্যানালগ ভালোবাসা’-র বিষয়বস্তুর জীবনঘনিষ্ঠতা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়েছে। ‘ন্যানো কাব্য’ নামে একটি বিশেষ কাব্যধারার প্রবর্তক আসিফ মেহ্‌দী কবিতা প্রেমীদের কাছে ন্যানো কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঁচিশ।)

 

পর্ব তিনঃ

‘জাদুঘরেও ওকে নিতে হবে!’

‘এতে প্রবলেম কোথায়? জাদুঘর কি বাসরঘর?’

‘এভাবে কথা বলছ কেন আমার সঙ্গে?’

‘তুমি আমাকে সন্দেহ করো অ্যান্ড আই জাস্ট হেইট ইট।’

‘সন্দেহ করার কথা কখন বললাম!’

‘সন্দেহ কি কেউ ঘোষণা দিয়ে করে? আই ফিল ইট এভরি টাইম।’

‘তুমি কি কখনো জানতে চেয়েছ, আমি কী ফিল করি?’

‘চাইনি। কারণ আমি জানি, আমাকে নিয়ে তোমার ফিলিংসটাই সন্দেহের।’

‘একদম ভুল জেনেছ আমাকে। আমি চাই তোমার সঙ্গে নিরিবিলিতে ঘুরতে, একান্তে বসে গল্প করতে, দুজনের মতো করে কিছুটা সময় কাটাতে।’

‘আমরা কি বাসাতে দুজনে নিরিবিলি থাকছি না? আর কত নিরিবিলি থাকতে চাও তুমি? আমি তো বোর হতেহতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি!’

‘তাহলে এসো আমাদের মা-বাবাদের নিয়ে ঘুরি। আমাদের ভাইবোনদের নিয়ে ঘুরি। কিন্তু ওকেই কেন যেতে হবে?’

রুহানের কথায় প্রীতি ভয়াবহভাবে রেগে গেল। বলল, ‘তোমাকে কতবার বলব রুহান, ও আমার ভাই? আই কান্ট বিলিভ ইট! একটা মানুষ আরেকটা মানুষের পেছনে এতটা কীভাবে লাগতে পারে! ধ্যাৎ, যাবই না জাদুঘরে।’ 

প্রীতি বাইরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য পেঁয়াজ-রঙের একটি নতুন কাতান শাড়ি পরেছিল। এক ঝটকায় শাড়ি খুলে দলা পাকিয়ে রুহানের সামনে ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর হ্যাঙারে ঝুলিয়ে রাখা বাসার পোশাকটা নিয়ে রুম থেকে গটগট করে বের হয়ে গেল। শ্রাবণী ভিলার তিনতলায় থাকে শওকত সাহেবের ছোট ছেলে রুহানের পরিবার। তিনতলায় প্রায়ই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। দুদিন আগে ঘটে যাওয়া ঝগড়ার দৃশ্য এটি। রুহান হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল। বুঝতে পারছিল না কী করবে। সেদিনও সে তার মনের সুপ্ত পুঞ্জিভূত ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেনি। দিনকে দিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষোভ পলির মতো জমে ক্ষোভের পাহাড় হয়ে উঠছে!

সবসময়ের বিরক্তি রুহানের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। যার কপালই ফাটা, তার আবার ভাঁজভুজে কি আসে যায়! শওকত সাহেবের ছোট ছেলে রুহান চাকরি করে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। একটি টিমের লিড ইঞ্জিনিয়ার সে। কতশত দায়িত্ব কাঁধের ওপর। কিন্তু মন ভালো না থাকলে দায়িত্বের সামান্য ভারও অনেক ভারী মনে হয়। এ মুহূর্তে অফিসে নিজের রুমে মন ভার করে বসে আছে রুহান। সংসারে নিরন্তরভাবে চলা অশান্তি নিয়ে ভাবছে। এক চুনোপুঁটির জন্য নিজের সংসারে খুনসুঁটি করার কোনো মানে নেই; কিন্তু এই চুনোপুঁটিকে কুটিকুটি করে ফেলে দেওয়াও যাচ্ছে না! মাছের মধ্যে পুঁটি আর আবেগের মধ্যে খুনসুঁটি-ছেলেবেলা থেকেই রুহানের অপ্রিয়। ভাগ্য বড় অদ্ভুত। অপ্রিয় বিষয়গুলোই তার সঙ্গে ঘটছে প্রতিনিয়ত।

একই কথা বলতে বলতে রুহান রীতিমতো কাহিল কিন্তু তার সহধর্মিনী প্রীতির একই যুক্তি, ‘ও তো আমার ভাই’! তারপর চলতে থাকে কথার রেলগাড়ি। দুঃখ-দুর্ভাগ্য যেমন একা আসে না, তেমনি মিথ্যা-কুযুক্তি একা আসে না। এগুলো হাজির হলে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য একটার পর একটা আসতেই থাকে। একটা মিথ্যা ঢাকতে হাজির হয় মিথ্যার রেলগাড়ি। একটি কুযুক্তির পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য চলতে হয় টানা কুযুক্তির সঙ্গে। প্রীতি কুযুক্তির ফোয়ারা ছোটায়। একই মায়ের পেটে না জন্মালেও যে ভাই হওয়া যায়, তা নিয়ে নানা ভ্যাজর ভ্যাজর শুরু করে দেয়। অনেক সময় ভ্রাতৃস্নেহে ও দায়িত্বে এসব ভাই নাকি আপন ভাইকেও হার মানায়! 

রুহান ও প্রীতির সংসার বছর পাঁচেকের। তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানপর্ব থেকে শুরু করে পরবর্তীতে প্রায় সব ফ্যামিলি ইভেন্টে প্রীতির পাতানো ভাই নয়ন সঙ্গ দিয়েছে। প্রত্যেকবার রুহানের প্রচ্ছন্ন আপত্তি প্রীতির প্রকট আগ্রহের আগুনে পুড়ে গেছে। রুহান রণে ভঙ্গ দিয়েছে কখনো; কিন্তু নয়নের সঙ্গভঙ্গ হয়নি তখনো। মার্কেটিং থেকে আউটিং; এমনকি দু-একটি ডেটিংয়েও নয়নের ডাক পড়েছে! প্রীতির যুক্তি, নয়ন না থাকলে অত সুন্দর করে ছবিগুলো কে তুলে দিত? বাজারের ভারী ব্যাগগুলো একা তো রুহান বইতে পারত না! অথচ প্রীতি বুঝতে চায় না, বাজারের ব্যাগ ভারী হলেও বয়ে নেওয়া যায় কিন্তু হৃদয় ভারী হয়ে উঠলে তা বয়ে নিয়ে চলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। রুহানের হৃদয় কষ্টে সিক্ত হয়ে দিনেদিনে এতটাই ভারী হয়ে উঠছে যে, অচিরেই সেটি বহন করা তার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ছবি তোলা বা ব্যাগ টানার অজুহাতে একসময়ের ছেলেবন্ধুকে পাশে রাখা মন থেকে মেনে নিতে পারছে না সে। যুক্তিতর্ক দিয়ে ঠিকমতো ঝগড়া করতে পারে না রুহান-তার ধারণা, এটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রুহানের পরিবারের অন্যরা অর্থাৎ বাবা শওকত সাহেব, বড় ভাই সুহান বা ভাবী কেউই প্রীতির ছেলেবন্ধুর সঙ্গে মেশার বিষয়টি পছন্দ করেন না। প্রীতি অন্যের পছন্দের ছন্দে চলা মানুষ না। তাই এটি নিয়ে তাদের মধ্যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে। ওপর আর নিচতলার মধ্যে সেই অদৃশ্য দেয়াল নির্মাণাধীন পর্যায়ে আছে। প্রীতির যুক্তি খুব তীক্ষ্ম, এখন মান্ধাতা আমল নেই যে মেয়েরা বিয়ের পর ছেলেদের সঙ্গে মিশতে পারবে না। বরং প্রীতি মনে করে-তার বেশি সুবিধা হতো যদি এমন আরও শুভাকাঙ্ক্ষী তার জীবনে থাকত। প্রীতির ধারণা, মেয়েরা মেয়েদের শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে না; ঠিক যেমন ছেলেরা হতে পারে না ছেলেদের শুভাকাঙ্ক্ষী। প্রীতি মনে করে, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক বাদে অন্য সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে ঈর্ষাই সত্য এবং এই ঈর্ষার মূল কারণ-মেয়েদের ক্ষেত্রে সৌন্দর্য ও ছেলেদের ক্ষেত্রে সাফল্য। তাই সমাজ ও সংসারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে প্রীতি আধুনিকতার পথে হেঁটে চলেছে। অন্যদিকে, রুহানের মনের যন্ত্রণা বাড়ছেই। মন আগে খোঁচাতো-চাবাতো, এখন রীতিমতো কামড়ায়! তারপরও তার কিছু করার নাই। মনের কাছে মানুষই যে চর্বচোষ্য!

তিন বছরের মেয়ে আছে রুহানের। নাম স্নেহা। স্নেহার কথা ভেবে এখন আরও নিশ্চুপ হয়ে গেছে সে। কিন্তু কানভাঙানির শেষ নেই। বিভিন্ন সময়ে মফস্বলের মানুষ ছুটে এসেছে রুহানের দরবারে সেসব বলার জন্য। রুহান হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়ার ভান করলেও আদতে হালকাভাবে নিতে পারেনি তার হৃদয়। কথার দমকে আরও ভারী হয়ে উঠেছে তার অন্তর। মফস্বলে একই স্কুল-কলেজে পড়েছে প্রীতি ও নয়ন। কখনো কখনো একই রিকশায় চেপে টিউটরের বাসায় পড়তে গেছে। সমাজের মানুষের মুখনিঃসৃত বাক্য তখন বেশ অশ্রাব্য হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে, এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি খলিল সাহেব বিষয়টিকে ভিন্ন মাত্রা দিতে গিয়ে প্রায় যখন সফলতার মুখ দেখছিলেন, ঠিক তার আগেই দুজনের একই রিকশায় যাওয়ার সলিলসমাধি ঘটেছিল। ঘটনা আর মফস্বলের হালে পানি পায়নি সত্যি কিন্তু জল যে গড়ায়নি, তা নয়! 

বিয়ের পর এক রাতে হাসতে হাসতে প্রীতি রুহানকে জানাল, নয়ন নাকি আগে বেশ বোকা ছিল। একদিন ভুল করে প্রীতিকে নিজের প্রিয়া ভেবে দু’চারটি মনের কথা শুনিয়েছিল। প্রীতি এও জানিয়ে দিল যে, নয়ন তার নয়নে চিরকালই কামলা খাটা মানুষ বা ভার বহনের কুলি ছাড়া বেশি কিছু না। তাই সেই দিনটিতে নয়নের উক্তিসমগ্র নাকি প্রীতির জন্য ছিল অষ্টম আশ্চর্যের মতো! অবশ্য প্রীতির ধমকও ছিল নবম আশ্চর্যের মতো। ধমকে সেকালেই তার ছিল পাড়াজুড়ানো খ্যাতি। ধমকের ভয়ে কোনো বখাটে তার ধারে-কাছে ঘেঁষার কল্পনাও করত না। প্রীতির সেই গামা ডেসিবেলের ধমকে নয়নের আইগুঁই চিরতরে কুঁইকুঁই হয়ে গেল। সুতরাং নয়নকে নিয়ে সামান্যতম দুশ্চিন্তার কিছু নেই রুহানের-এটিই আকারে ইঙ্গিতে জানাতে চাইল প্রীতি।

তৃতীয় নয়নের মতো দৃশ্যপটের তৃতীয় মাত্রা আছে। সেই তৃতীয় মাত্রাও রুহানের দৃষ্টিগোচর হয়েছে! প্রীতির বিয়ের সময় এই মহাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি কেঁদেছে নয়ন নামের ছেলেটি। নয়ন হয়তো ভেবেছিল, শিশিতে ছিপি দিয়ে এঁটে রাখা গোপন অভিলাষ একদিন ঠিকই বীরবিক্রমে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে এবং সেদিন নয়ন মুক্ত বিহঙ্গের মতো মুক্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে। প্রীতি এসব বোঝেনি, তা নয়। বুঝেও না বোঝার ভান করতে পারাটা কনটেম্পোরারি প্রেমশিল্পের পর্যায়ে পড়ে বললে ভুল হবে না। সেই শিল্পের উচ্চমার্গীয় শিল্পী প্রীতি। বিয়ের দুদিন আগে সে নয়নকে বলেছে, ‘এত মন খারাপের কী আছে, তোর সঙ্গে তো দেখা হবেই। ঢাকায় চলে আয়। আমি আর তুই একই ভার্সিটিতে পড়ব।’

বিয়ের পর প্রীতি ভর্তি হয়েছে যে ভার্সিটিতে, নয়নও ভর্তি হয়েছে সেই ভার্সিটিতে। এতে নয়নের অতৃপ্তি হয়তো ঘুঁচেছে! কারণ, নয়নকে এখন আর চিরঅতৃপ্ত আত্মা মনে হয় না। তাকে দেখলে মনে হয়, সুখসামাজ্যে বুঁদ হয়ে দুগ্ধপান করে বাস্তবজগতে ফেরা এক তাগড়া তরুণ। স্বপ্নরাজ্যের জাদুর দরজা পার না হলে শরীরজুড়ে এমন আলোকবিচ্ছুরণ সম্ভব না। স্বাভাবিকভাবে সন্দেহ জেঁকে বসেছে রুহানের হৃদয়ে। অফিসে নিজের রুমে এসব হাবিজাবি ভেবেই প্রতিদিন অনেকটা সময় নষ্ট হয় তার। মন ভালো না থাকলে কাজে কার মন বসে? সংসার হলো সুখের উৎস; আবার অসুখেরও উৎস। বিশ্বাস, ব্যবহার, ব্যক্তিত্ব-এই তিন হলো সংসারের সুখী মানুষের ভূষণ। তবে তিনের মধ্যে বিশ্বাস প্রধানতম। বিশ্বাসে ঘুঁণ ধরলে ব্যবহার চাকচিক্য হারায়, ব্যক্তিত্বে ধস নামে।

বয়েজ স্কুল এবং বয়েজ কলেজে পড়ার কারণে ছেলেবেলায় মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয়নি রুহানের। ভার্সিটিতেও মেয়েদের সম্পর্কে যে কথামালা জেনেছে, তাতে নারীকুলকে তার ঝামেলাই মনে হয়েছে। আর চিরকাল ঝামেলা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে রুহান। তাই প্রীতির আগে কোনো মেয়ের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গতা হয়নি। সংসার শুরুর পর রুহান ভেবেছিল, মেয়েদের সঙ্গ বুঝি এমনই হয়; একটা কষ্টবোধ দিনমান প্রাণমনে খেলা করে! কিন্তু অন্যদের সংসারের গল্প শুনে ধীরেধীরে রুহান অনুভব করেছে, তার সংসারে এক জানোয়ার প্রবেশ করায় যুগল-জীবনের নির্মল আস্বাদ থেকে সে বঞ্চিত। সংসার থেকে পোকা বা মশা তাড়ানোর উপায় মানুষের জানা কিন্তু সেখানে মুনষ্যকীট প্রবেশ করলে, তা তাড়ানোর সহজ কোনো কৌশল নেই। তবে হাল ছাড়েনি রুহান, উপায় খুঁজছে। রনি একদিন কোনো এক ব্যক্তির কথা বলেছিল। তার কাছে নাকি সমস্ত সমস্যার সমাধান পাওয়া সম্ভব। রনির কাছ থেকে সেই মানুষের ঠিকানা নেওয়া দরকার।

ইন্টারকমে রুহানের বস সাখাওয়াৎ রিপনের কল এল। তিনি জরুরি ভিত্তিতে দেখা করতে বললেন। রুহান কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পারল, কোনো একটা ঝামেলা ঘটেছে!

একতলা ওপরে বসেন রিপন। রুহানকে দেখে তিনি বসতে বললেন। তারপর বিরক্তির সুরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যাপার কী, বলো তো রুহান?’

‘ঠিক বুঝতে পারছি না বস; কোন ব্যাপারে কথা বলছেন?’

‘তুমি এখনও নোটিশ করোনি!’

রুহান চুপ রইল। রিপন কঠিন স্বরে বললেন, ‘দেখো রুহান, তোমার টিমের ওপর অনেক দায়িত্ব, এটা তোমাকে নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই। উইকলি রিপোর্ট দেখছিলাম। কেবল তোমার টিমের মেম্বারদের পারফরম্যান্স খারাপ। এসএলএ ঠিকমতো মিট আপ করতে পারছে না। তুমি যদি তোমার টিমকে ম্যানেজ করতে না পারো তাহলে জানাও; আমাকে ইমিডিয়েটলি অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে ভলো পারফরম্যান্স না হলে নেক্সট বোর্ড অব ডিরেক্টরস-এর মিটিংয়ে তো আমাকে ধুয়ে ফেলবে!’

‘সরি বস, আমি ব্যাপারটা ট্যাকেল করছি।’

‘আমি তোমাকে এবারই প্রথম এবারই শেষ ওয়ার্ন করছি, ভাই। তুমি যেমন কোম্পানির চাকরি করো, আমিও করি। দুজনেরই জীবনধারণের জন্য চাকরিটা দরকার। গত তিন সপ্তাহে তোমার টিমের টানা খারাপ পারফরম্যান্স আমার চোখে পড়েছে। তোমাকে কিছু বলিনি; কারণ ভেবেছি তুমি অগ্রগতির চেষ্টা করছ। কিন্তু তোমাকে এতটা উদসীন দেখব, আমি ভাবিনি। আমি বলার আগেই তোমার বোঝা উচিত ছিল, কী কারণে আজকে তোমাকে ডেকেছি।’

‘সরি বস, একটু ফ্যামিলিক্যাল ঝামেলায় ছিলাম। তাই টিমের দিকে তেমন নজর দিতে পারিনি।’

পারিবারিক সমস্যার কথা বললে রিপন সবসময়ই তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন, ব্যাপারটি রুহানের জানা। কারণ, রিপনের নিজের পরিবারেও ব্যাপক তালগোল চলছে। তার স্ত্রী আরেক মানুষের সঙ্গে সংসার বেঁধেছে, সন্তান মানুষ হচ্ছে দাদা-দাদীর কাছে। অন্যদিকে, রিপনের প্রেম চলছে এই কোম্পানির এক ইন্টার্নের সঙ্গে। এসব খবর কোম্পানির বড় থেকে ছোট সবারই জানা। যে যত গভীরভাবে পারিবারিক সমস্যা তুলে ধরে, তার প্রতি রিপন তত সহানুভূতিশীল হন। হয়তো এসব শুনলে তার নিজের ক্ষতের যন্ত্রণা কিছুটা প্রশমিত হয়। এ পথে যে তিনি একা না; আরও সঙ্গী আছে, কখনোবা তারও বেশি যন্ত্রণা নিয়ে-এমন চিন্তা হয়তো তাকে মনেমনে সন্তুষ্ট করে। রুহানের কাছে সমস্যা সম্পর্কে আর কিছু জানতে চাইলেন না রিপন। বললেন, ‘টিমের উন্নতি চাই, ভাই। পারফরম্যান্সের এই কার্ভ অব্যাহত থাকলে আমি কিন্তু ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব। অ্যাম আই ক্লিয়ার?’

‘ইয়েস বস। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।’ বলে রুহান বেরিয়ে এল রিপনের রুম থেকে।

(চলবে)

 

আসিফ মেহ্‌দী
কথাসাহিত্যিক ও প্রকৌশলী

 

বধির নিরবধি (পর্ব এক)

বধির নিরবধি (পর্ব দুই)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top