সিডনী মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

শ্বেত মর্মর : লিপি নাসরিন


প্রকাশিত:
২৯ অক্টোবর ২০২০ ১৪:৫৮

আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২০ ১৭:৪২

 

চাচিদের দোতলার ছাদের বেশ খানিকটা অংশ জুড়ে একটা ফুল বাগান। মূল ছাদ থেকে পিলার দিয়ে আরেকটা চাতাল করে তার উপর মাটি ফেলে এই ফুলবাগান বানানো হয়েছে। চাচি আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন। আমি প্রায়ই বিভিন্ন ছুতোয় ও বাড়ি যেতাম কিন্তু দোতলায় উঠতাম খুব কম। চাচির ঘরটা ছিলো পুবের কোণার দিকে। দক্ষিণের জানালা খুলে দিলে পিছনের বাগানের কামিনীর গন্ধে ভরে যেতো ঘরটা। মাঝে মাঝে চাচির ঘরে গিয়ে বসতাম। চাচি হয়তো কোথাও যাবেন বেড়াতে সাজগোজ করছে, আমি মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছি হঠাৎ চাচি বলবে, ব্যাটা আমার চুলটা একটু ছাড়িয়ে দে না।

লম্বা চুল চাচির। আমি চিরুনি টানতে টানতে দুহাতে চুল নিয়ে গন্ধ শুকতাম।কী মায়া, কী আপন মনে হতো সে গন্ধকে!

বাড়ির আর সবার সাথে আমার তেমন কথা হতো না কেবল বড় চাচি ছাড়া। অন্য দুই চাচাকে মাঝেমধ্যে দেখলেও বড় চাচার সাথে দেখা হয় কদাচিৎ। আমাকে তিনি হয়তো চেনেন না, অবশ্য বয়স্ক পাড়া প্রতিবেশীদের তিনি চিনলেও আমাদের বয়সি ছেলে-মেয়েদের কেউ না বলে দিলে তিনি চিনতে পারবেন না। যদিও যাওয়া আসার পথে চাচির কোল ঘেঁসে, কখনো বা লম্বা মার্বেল পাথরের বারান্দার বড় বড় থামের এপাশ ওপাশ দীপনের সাথে ছোটাছুটি করতে দেখেছে। সেসব সেই খেলার বয়সে। দীপন বিদেশে চলে গেলে চাচি খুব মন খারাপ করে থাকতো। আমার যাতায়ত ও বাড়িতে সীমিত হতে থাকলো চাচি হয়তো বুঝতেন তাই তেমন কিছু বলতেন না। অনেকদিন পর গেলে বলতেন,

মাহী ব্যাটা তোর মুখটা এতো শুকিয়ে গেছে কেন রে?

কই নাতো। সামনে পরীক্ষা একটু পড়ার চাপে আছি হয়তো তাই বলে আমি নিজেকে আড়াল করতাম।

এদের পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে। শুনেছি এই পরিবারের চারপুরুষ আগের যিনি প্রধান ছিলেন তিনি গুজরাট থেকে ব্যবসাপাতি গুটিয়ে নিয়ে ঢাকায় একেবারে চলে এসেছিলেন। ঢাকার বাইরেও তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রসার ঘটিয়েছিলেন।

এই বাড়িটি তারা বানিয়েছিলেন এখানকার  ব্যবসাপাতি দেখাশুনো করতে। পরে ঐ পরিবারের এক শৌখিন পুরুষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে  ঢাকা ছেড়ে এখানে এসে স্থায়ীভাবে থেকে যান।

দীপন এই পরিবারের পঞ্চম বংশধর। ছোটবেলা থেকে দীপন আর আমি একসাথে খেলতে খেলতে বড় হয়েছি। ওরা বড়লোক বলে বাবা-মা অনেকসময় ওদের বাড়িতে গেলে অল্প বিস্তর শাসন করতো। চাচি সেটা বুঝতে পেরে আমার মাকে একদিন ডেকে বলেছিলেন, মাহীর  মা বাচ্চারা অবুঝ, ওদের মনটা পবিত্র, সেখানে বৈষম্যের প্রাচীর তুলো না। মাহীকে এ বাড়ি আসতে আটকিয়ো না।

মা বলেছিল, বুবু, আপনি নাহয় মাহীকে আপন ভাবেন কিন্তু বাড়ির আর সকলে...

সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও। চাচির এই কথার পর দীপনদের বাড়ি আমার সেকেন্ড হোম হয়ে গিয়েছিল। চাচি আমাকে ডাকতো ব্যাটা বলে। সদর দরজা দিয়ে আমাকে ঢুকতে দেখলেই বলতেন, আয় ব্যাটা। যখন একটু বুঝতে শিখেছি তখন চাচির মুখে এই ব্যাটা শব্দ শুনে আমার ভিতরে একটা আলোড়ন টের পেতাম। আমাকে দেখলে দীপন ঠাট্টা করে বলতো, আম্মা তোমার মাহী ব্যাটা এসেছে।

মারবো এক চড় বলেই চাচী আমাকে ড্রয়িং রুমে নিয়ে বসাতেন। তবে এটা ঠিক বড় হবার সাথে সাথে ও বাড়িতে যাওয়া তুলনামূলকভাবে  আমার কমে গিয়েছিল। দীপন আমার বছর তিনেকের বড়।

মেট্রিকে ওর আটশোর উপরে নম্বর ছিলো কিন্তু স্ট্যান্ড করতে পারে নি তাই নিয়ে চাচার মনে বেশ কষ্ট ছিলো। কিন্তু দীপন কোনদিন রেজাল্ট নিয়ে ভাবতো না। চাচি বললে বলতো, যেটা হবার সেটাই হয়েছে আম্মা।

তোর বাবা যে কষ্ট পায় ব্যাটা, চাচি মুখ ভার করে বলতেন।

এখন এ বয়সে এসে আমি বুঝতে পারি ও কী রকম জীবন সম্পর্কে আশাবাদী ছিলো। খুব বেশি মন খারাপ করতে কখনো দীপনকে দেখি নি আমি।

স্কুলের পাঠ চুকিয়ে দীপন ঢাকা চলে গেলো। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। বয়সটার প্রকৃতি  কাছের জনকে ভালোবাসার। ততোদিন পর্যন্ত দীপনের জন্য আমার ভালোলাগাটা ভালোবাসা কিনা বুঝি নি। দীপন চলে গেলে কেমন একটা শূন্যতা বোধ হতো। চাচির কাছে গেলে দীপনের চিঠি আমাকে দিও বলতো, ব্যাটা পড়তো দীপন কী লিখেছে।

আমি দেখতাম চিঠির খাম ছেঁড়া তারপরও চাচি আমাকে পড়তে দিতেন।  আমার কথা কিছু লেখা আছে নাকি ভেবে বুকের রক্ত সঞ্চালন বাড়তো।দীপন শেষের দিকে লিখতো, আম্মা তোমার মাহী ব্যাটা কেমন আছে? ওকে পড়তে বলো ভালো করে।

আমি পড়তে পড়তে বুঝতে পারতাম চাচি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

পড়া শেষ হলো বলতো, বুঝতে পারলি ব্যাটা, ভালো করে পড়বি।

দীপন ছুটিতে বাড়ি আসলে ওর কাছে ওর কলেজের গল্প শুনতাম।

জানিস মাহী আমার কলেজের বান্ধবীরা কী সুন্দর! আমার মাথা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বলতো, তুই একটা পেত্নি। সুন্দর হয়ে থাকতে পারিস না। যা ভাগ..

আমি হয়তো মন খারাপ করে আর কদিন ও বাড়ি মুখো হতাম না। তারপর একদিন অভিমান ভেঙে গিয়ে বসতাম অংক বা ইংরেজি বইটা নিয়ে।

দীপন দুটোতেই খুব পটু। আমি কোন অংক না বুঝতে পারলে ঠাস করে আমার মাথায় একটা চড় দিয়ে বলতো, তুই শুধু পেত্নি না গাধাও।

চাচি কখনো ড্রয়িং রুমে এসে বসতো। আমাকে এভাবে হেনস্থা হতে দেখে বলতো, মারিস না ব্যাটা বুঝিয়ে দে ভালো করে।

কী অসাধারণ রূপসী ছিলেন চাচি তার যৌবনে! একেবারে দুধে আলতা রঙ। এই বয়সে সেই রঙ একটুও মলিন হয়নি। কাঁচা-পাকা চুলে চাচির সমস্ত অবয়ব জুড়ে যেন এক অলৌকিক সৌন্দর্য খেলা করে। চাচা নাকি দেখেই প্রেমে পড়েছিলেন আর সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই দীপনের দাদি বড় ছেলের বিয়ে করিয়েছিলেন পাত্রীর অভিভাবকের সাথে কথা বলে।

দীপন একদম মায়ের রঙ পেয়েছে। আমি ওকে খেপানোর জন্য বলতাম রাঙা মূলো। ও আমাকে বলতো কালো তিল।আমার ডান পাশের চিবুকে একটা কালো তিল আছে। ও ওটাকেই ইঙ্গিত করে বলতো কিনা জানি না।

দীপনের মেজো ও ছোট চাচার বাচ্চরা প্রায় আমাদের সম বয়সি কিন্তু ওদের সাথে ছোটবেলা থেকে আমার কখনো বেশি মেলামেশা হয় নি। একই বাড়ির সন্তান হয়েও দীপন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠেছে সেটি চাচির জন্য। চাচির আদর্শ নিয়েই দীপন বড় হয়ে উঠেছে।

একটা কথা ভেবে আমি খুব অবাক হই,যে বয়সটাতে আমি আর দীপন অবাধ মেলামেশা করেছি সেই বয়সটা সাংঘাতিক আবেগের। আমাদের সেই উঠতি বয়সে দীপন আর আমি যে কাছাকাছি আসিনি তা নয় কিন্তু আমাদের উভয়ের  অভিভাবকের যেন কোন ভাবনা ছিলো না আমাদের নিয়ে। যেন তারা জেনে গিয়েছিল আমাদের মধ্যে কোন প্রকার স্থায়ী সম্পর্ক কখনোই সম্ভব নয় তাই হয়তো আমাদের অবাধ মেলামেশায় তারা বাঁধা দিতো না।

সেই যে সেবার আমরা পাহাড় দেখবো বলে বের হলাম রাঙামাটি,খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এর উদ্দেশ্যে। আমার যেতে খুব ইচ্ছে করছিল কিন্তু বাবা-মা রাজি হচ্ছিল না। যাবার দিন ঘনিয়ে আসতে লাগলো আর আমার মন খারাপ বাড়তে থাকলো। আমি তখন সবেমাত্র কলেজে উঠেছি।

শেষে তো চাচা বাবাকে বললে আমার যাওয়া নিশ্চিত হয়।

খাগড়াছড়িতে আমি আর দীপন একদিন একা বের হয়েছিলাম বিকাল বেলা। চাচি পইপই করে নিষেধ করে দিয়েছিল যেন অচেনা জায়গায় একদম না যাই। দীপন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্র।

বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ দীপন বললো, মাহী গুহা দেখতে যাবি?

আমি বললাম, কোথায় গুহা?

চল দেখাবো।

না থাক দীপন। গুহার মধ্যে অন্ধকার তাছাড়া যদি বাঘ বা সাপ থাকে।

আরে নারে পেত্নি ওসব নেই। সবাই সবসময় যায় ওখানে।

তুমি কী করে জানলে সবসময় মানুষ যায় ওখানে? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।

তুই আসলেই একটা গাধী। চল, ভয় নেই আমি আছি না।

সেদিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও সিঁড়ি বেয়ে অনেক নীচে নেমেছিলাম। কী ঠাণ্ডা! এত নিচেও গাছ আছে, জঙ্গল আছে দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। গুহার মুখে নেমে গিয়েছিল দীপন। আমি তখনো উপরে দাঁড়িয়ে আছি। ও বলছিল, নাম তাড়াতাড়ি।

আমি ভয়ে সেঁধিয়ে যাচ্ছিলাম। স্থানীয় আরো দুজন আমাদের থেকে বয়স কম গুহায় মধ্যে ঢুকে গেছে ততক্ষণে।

দীপন বারবার বলছিল, ওরা ছোট ভিতরে চলে গেলো আর তুই এখনো উপরে দাঁড়িয়ে আছিস।

আমি পাথুরে ধাপে পা রাখতেই দীপন হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার হাত ধরলো। যেতে যেতে বলছিল, এই গুহার নাম কী জানিস? আমি ছোট টর্চের আলোয় ভয়ে ভয়ে পা ফেলতে ফেলতে বলেছিলাম আলুটিলা গুহা।

বাহ! তুইতো অনেক জেনে ফেলেছিস।

ভিতর দিয়ে ঠাণ্ডা পানির ক্ষীণ স্রোতে পা ফেলতে ফেলতে আমারা এগোচ্ছিলাম। ছেলে দুজন হেসে হেসে গল্প করতে করতে অপরপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। হঠাৎ কী একটা ক্যাচ করে শব্দ হলো আর আর সে শব্দের প্রতিধ্বনি গুহার গায়ে আছড়ে পড়লো। আমি ওরে বাবা বলে দীপনকে জড়িয়ে ধরলাম।দীপন আমাকে একহাতে জড়িয়ে রেখে টর্চ ঘুরালো চারিদিকে।

কিছুই তো নেই।

হঠাৎ দীপন টর্চ অফ করে আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো। নিকষ অন্ধকারের মাঝে পরস্পরকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন ছেলেমেয়ে। কোথাও কোন শব্দ নেই। আমার নারীচিহ্ন গুলো দীপনের ছোঁয়ায় যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। এক ঘোর লাগা মাদকতায় আমি ওকে জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা অনুভব করেছিলাম। হঠাৎ কাদের আওয়াজ যেন স্পষ্ট হচ্ছিল।দুজনের আলিঙ্গন ভেঙে গিয়েছিল।

সেদিন হোটেলে ফিরে আমার ভয় পাবার গল্প চাচা- চাচিকে বর্ণনা করার সময় খুব হেসেছিল।

চাচা-চাচিকে সেই প্রথম দেখেছিলাম দীপনের উপর রাগ করতে কেন আমাকে এভাবে গুহা দেখাতে নিয়ে গেলো সেজন্য।

দীপনের তখন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবার সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। পরের সেশনে দীপন চলে যাবে। চাচি  আড়ালে চোখ মুছতো, আমাকে দেখলেই হেসে হেসে কথা বলতো। আমি সব বুঝেও না বোঝার ভান করতাম। আমার সামনে আই এসসি পরীক্ষা। আমি মন খারাপ প্রকাশ করতে পারি না দীপনের কড়া নির্দেশ ভালো রেজাল্ট করতে হবে। মনের মধ্যে কষ্ট পুষে রেখে আমি পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠতাম না। মাঝে মাঝে ও বাড়িতে যেতাম গাছ যেমন করে অন্ধকার থেকে একটু  আলোর জন্য  সেদিকে বেঁকে যায় তেমন করে। দীপন তখনো ঢাকাতে। প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে ও বাড়ি এলো বাবা-মার সাথে দেখা করতে।

সেদিন দীপন দুপুরের পর আমাদের বাড়িতে এসেছিল। আমি তখন খাটের উপর উবু হয়ে বইয়ের পাতা উল্টে চলেছিলাম। ও সোজা মাহী ব্যাটা, মাহী ব্যাটা বলতে বলতে আমার ঘরে চলে এসেছিল, মাও এসেছিল ওর সাথে। আমি উঠে বসতেই বলেছিল, কী রে তুই কি সারাক্ষণ বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে থাকিস? চল আমাদের বাড়িতে আম্মা ডাকছে তোকে।

মায়ের দিকে ফিরে বলেছিল, চাচী, মা মাহীকে নিয়ে যেতে বলেছে। আমি সামনের সপ্তাহে চলে যাবো। আমার জন্য দোয়া করবেন।

আমার কাছে কি তোমাকে দোয়া চাইবে হবে বাবা, বলে মা অনেকক্ষণ দীপনের মাথায় হাত রেখেছিল।

আমি আর দীপন গিয়ে বাড়ির পিছনে বাগানে বড় বকুল গাছটার নীচে বানানো সিমেন্টের চেয়ারে বসেছিলাম।

ও যেন ছটফট করছিল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে  বলেছিলাম, বিদেশ তোমাকে টানছে তাই না, তুমি এতো ছটফট করছো কেন? স্থির হয়ে বসো না।

দীপনকে তুই বলে ডাকতাম। কখন যে তুই থেকে তুমি হয়ে গিয়েছিল মনে নেই।

বকুল তলায় আমার পাশে বসে শান্ত কণ্ঠে বলেছিল, মাহী, চাঁদনি রাত কবে বলতো?

কেন জিজ্ঞেস করতে বলেছিল, জানিনা আবার কবে এই বকুলতলায় বসে চাঁদের আলো দেখবো।

তুমি ঢাকা কবে যাবে?

পরশু

আমি বলেছিলাম, কাল ফুল মুন

ও প্রায় লাফিয়ে উঠে বলেছিল, শোন কাল তুই সারাদিন পড়া ছেড়ে উঠবি না। সন্ধ্যার পর আমরা এখানে এসে মাঝরাত পর্যন্ত আড্ডা দিবো। ঠিক আছে মাহী ব্যাটা? যা এখন বাড়ি যা।

আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম চাচি দেখা করতে বলেছে না?

ওর স্বভাবসুলভ চঞ্চলতা এনে বলেছিল, সাধে কি তোকে গাধা বলি। যা আম্মার সাথে দেখা করে আয়। আমি আর একটু বসি।

আমিও বসি। পরে দেখা করতে যাবো।

দীপনকে সেদিন খুব উদাস দেখাচ্ছিল।

বকুল গাছের পশ্চিম পাশ ধরে সামনে গেলে পুকুর। এতো সুন্দর পরিপাটি করে সবকিছু রাখা। দেখে দেখে যেন নয়ন ভরে না। এই বাড়িটা খুব সুন্দর। চাচির কাছে শুনেছি এই বাড়িটা কেনা হয়েছিল কোন এক হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে। পরে চাচার বাবা মার্বেল পাথরে সাজিয়ে নিয়েছিলেন বসবাসের জন্য।আগেকার জমিদারি স্টাইলে বাড়িটি।পূর্ণিমার রাতে এর রূপ যেন ঠিকরে বের হয় মার্বেলে প্রতিফলিত হয়ে।

 

ও বাড়ি থেকে লোক পাঠিয়েছে চাচি। স্কুল ছুটি শেষে আগে যেন দেখা করে আসি।

কেন বলতো নুরু কাকা? চাচিদের বহু পুরানো লোক নুরু কাকা। ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি।

তাতো  বলতে পারবো না মা। তুমি কিন্তু আগে বড়বিবির সাথে দেখা করবে।

আমি গেট ঠেলে ঢুকতেই চাচি দোতলা থেকে বললো, আয় ব্যাটা, উপরে চলে আয়।

আমি দোতলায়  ঘরে যেতেই আমার মুখে পায়েস তুলে ধরে বললো, হ্যাপি বার্থডে ব্যাটা।

আজ তোর চল্লিশতম জন্মদিন। একচল্লিশে পা দিলি।

আমি নিচু হতেই আমাকে ধরে ফেলে বলে,তোর জন্য আশীর্বাদ  আমার সারাজীবন।

আমি চল্লিশ পেরিয়ে এলাম। তুমি এতো বছরেও একবারও ভোলো নি?

ওকি ভুলে থাকার জিনিস রে। শোন দীপন ফোন করেছিল সকালে।

ভাবলাম আমাকে হয়তো উইশ করেছে চাচি তাই বলবে।

বললাম কেমন আছে ওরা?

আছে , ভালোই আছে হয়তো। চাচির চেহারা আমাকে অনেক কিছু বলে যায়। আমি ঐ মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর প্রতিটি শব্দের অর্থ বোঝার চেষ্টা করি।

চাচি আমার মাথায় হাত রাখে যখন, তখন বুঝতে পারি কী বলতে যাচ্ছেন এখন।

থাক না চাচি।

তোকে এরকম দেখতে আমার ভালো লাগে না।

কেন? আমি তো বেশ আছি। খাই দাই তোমার চুলে বেণী  করে দি। মায়ের জন্য ওষুধ কিনি। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে গুলো আমাকে ঘিরে আনন্দ করে। হা হা হা ...

চাচির দুধে আলতা রঙের মুখটায় বিষাদের ঘন ছায়া নামে।

স্বাভাবিক হতে বলি, পায়েসটা দাও আমি স্কুল থেকে এসেছি। খুব খিদে পেয়েছে।

আমি যাই বলে উঠতেই হাতে ধরিয়ে দেয় একটা প্যাকেট। এই এতোগুলো বছরে তার ব্যতিক্রম হয় নি।

বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে প্যাকেটটা দিয়ে আমি ঘরে ঢুকতেই দেখি দীপনের চিঠি।

খামের মুখটা ছিঁড়লাম। চিঠিটা বের করে আর ভাঁজ খুলতে ইচ্ছা হলো না। কতক্ষণ বসে রইলাম। মা এস বললো, ভাত খাবি এখন নাকি চা করে দেবো?

কিছু খাবো না মা, চাচি পায়েস খাইয়েছে।

মা পাশে এসে বসে। জানি এখন কী বলবে।

সেই পুরানো কথা। তবুও আজ মাকে নিষেধ করবো না। বলুক মা যা বলতে চায়। আমি চুপ করে শুনবো।

মাহী কী এমন বয়স হয়েছে মা? এখনো কি ভাবা যায় না?

আমি শুকনো হাসি দিয়ে বললাম, যায় তো মা।

মা সে কথার অর্থ বোঝে। পাঁচ বছরের ভাইঝিটা আমার ঘরে ঢুকে গলা জড়িয়ে ধরে। কপালে চুমু দেয়।

মাকে বলি, দেখেছো মা, এই আমার আনন্দ।

মা আস্তে করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তাঁর এই নিঃশব্দ চলে যাওয়া আমার বুকের মধ্যে কান্নার ঢেউয়ে আছড়ে পড়তে চায়। একমুহূর্ত দেরি না করে চিঠিটা ছিঁড়ে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে উড়িয়ে  দি। চিঠিটা সাদা পাখি হয়ে দূরে উড়ে যায়।

আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি ক্লাস, পরীক্ষা এসব নিয়ে।

কিছুদিন এত ব্যস্ত ছিলাম যে ও বাড়ি যেতে পারিনি। তার মধ্যে আমার যেতে সমন এসেছে কিন্তু আমি এতো ক্লান্ত হয়ে ফিরি যে আর ইচ্ছা হয় না যেতে। সেদিন মস্ত দালানে সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই বড় চাচার সাথে দেখা।

কী রে মাহী? কেমন আছিস মা?

আমি একটু অবাক হলাম। চাচা তো এ সময়ে বাড়ি থাকেন না।

ভালো আছি চাচা। আপনার শরীর কেমন? জিজ্ঞেস করতে করতে আমি একটা থামের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াই।

বয়স হয়েছে, এখন থাকার জন্যই  থাকি।

আপনি তো এ সময়ে বাড়িতে থাকেন না।

শরীরটা বোধহয় ইঙ্গিত ভালো দিচ্ছে না মা।

ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন? আমি একটু উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করি।

যাবো, যাবো রে মা।

চাচা সাদা ধবধবে দালানে পেতে রাখা ইজি চেয়ারে মাথা এলিয়ে দেয়।

চাচা এ সময়ে বসে না থেকে একটু হাঁটাহাঁটি ভালো। চলুন বাগানে যাই। আমি চাচিকে ডেকে আনি বলি প্রায় লাফাতে লাফাতে দোতলার সিঁড়ি ভাঙি।

এ বাড়ির এক তলার বারান্দায় উঠতেও বেশ কটি সিঁড়ি ভাঙতে হয়; ভীত অনেক উঁচুতে।

আমরা তিনজন মিলে বাগানে হাঁটি। এতো যত্নে এ বাগানটি করা। এখানে হাঁটলে  মন এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। এ বাড়ির ছাদ বাগানে সব মৌসুমি ফুল  আর নিচে বাগানে ফল আর বৃক্ষ ফুলের সমাহার। চাঁপার মিষ্টি গন্ধ ভাসছে বাতাসে।

চাচা হঠাৎ বললেন , মারে, একটা কথা বলি অন্যভাবে  নিস না।

আমি হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়ি।

তুই যদি রাজি থাকিস একটা ভালো ছেলে আছে।

তোর চাচি তোর জন্য কতো গয়না করে রেখেছে।

আমি হেসে উঠে বললাম, তা গয়নাগুলো তো আমাকে দিলে হয় আমি একটু পরে টরে ঘুরে বেড়াতে পারি।

চাচির মুখে সেই বিষণ্ণতার ছায়া ভাসে এই ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যায়।

চল এবার যাই বলে চাচির হাত ধরে চলে আসি।

বিদেশের পাঠ চুকিয়ে ওখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর দীপন। বছরে একবার বাড়ি আসে তবে এবার প্রায় দুবছর হতে যায় ও বাড়ি আসে না।

প্রথম দিকে ফোন করে কথা বলতো আমার সাথে। চিঠি লিখতো। চিঠিতে ওর বিদেশি সহপাঠী সহপাঠিনীর  কথা থাকতো। বাড়ি এসেও কতো গল্প করতো সারাক্ষণ। ও যে কদিন দেশে থাকতো আমি থাকতাম ওর সারাক্ষণের গাইড।

তবে সবচেয়ে অবাক হতাম ও যেন বছরে বছর কেমন বদলে যেতে থাকলো। আমার সাথে সারাক্ষণ থেকেও যেন অন্য কোথাও। ওর বন্ধু বান্ধবীদের ছবি দেখাতো আমাকে। নানান দেশের নানান মানুষ। একবার এক বান্ধবীর ছবি দেখিয়ে বলেছিল, বলতো কেমন দেখতে?

 খুব সুন্দর বলতেই ও বলেছিল, যাক তোর তাহলে বুদ্ধি কিছু হয়েছে, সাউন্ডস গুড।

আমি সেদিন কিছু বুঝিনি। তারপর ধীরে ধীরে ওর অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল।

দীপন প্রথমবার যাবার আগে সেদিনের চাঁদনি রাতে আমরা বকুল তলায় অনেক রাত অব্দি গল্প করেছিলাম। সেই রাতেও সে আমার নারীত্বকে ছুঁয়ে দিয়েছিল। দুজন দুজনকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে ছিলাম বকুল গাছের আড়ালে। সেদিন ভালোবাসার মানে আমার কাছে তাই ছিলো। দীপনের শরীরের উষ্ণতা। সে উষ্ণতা আমাকে পোড়াতে পারে নি কোনদিন শুধু আঁচ রেখে গেছে।

আমার দিক থেকেও ওর কোন বাধ্যবাধকতা ছিলো না। আমার বাবা হঠাৎ মারা গেলে আমরা যেন অথৈ সাগরে পড়ি। বাবার পেনশনের টাকায় আমাদের দুভাইবোনের পড়াশুনার খরচ চালিয়ে সংসার টেকানো খুব কষ্টের ছিলো মার জন্য। চাচা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে মা বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়েছিল। আমার জীবন সংগ্রামের মাঝে দীপনের বিয়ে আমার অনুভূতিতে তেমন দাগ কাটতে পারে নি এক অর্থে। ভালোবাসার জন্য কান্নাকে তখন আমার মনে হয়েছিল বিলাসিতা। অনার্স শেষ করে রাতদিন খেটেখুটে আমি স্কুলের চাকরিটা পেয়ে যেন হাতে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড হাতে পেয়েছিলাম। মাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। তবে মা কখনোই তার দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায় নি।আমার স্কুলের চাকরির পর পরই আমাকে বিয়ের জন্য বলতে থাকে। আমি সবসময় মাকে বলেছি, একটু গুছিয়ে দি তোমাকে তারপর বিয়ের কথা ভাবা যাবে। বিয়ে তো পালিয়ে যাচ্ছে না মা। মার তবুও শঙ্কা থেকে যেতো। আত্মীয় স্বজনরা বিয়ের পাত্রের খোঁজ নিয়ে আসতেন। আমি না করতাম। মা অনেকসময় বিব্রত বোধ করতো। এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিন আজ পর্যন্ত।

আমি আর দীপন কিন্তু কখনোই পরস্পরের কাছে ভালোবাসার কথা মুখে প্রকাশ করি নি। প্রথমদিকে দীপনের চিঠি আসতো নিয়ম করে দুটো। একটা চাচা-চাচীর জন্য আরেকটা আমার জন্য। আমার চিঠিটা চাচীর সামনে পড়তাম। চাচী বলতেন বাড়ি গিয়ে পড়িস।

আমার কখনো মনে হয়নি দীপন এমন কিছু লিখেছে যা আমাকে একাকী পড়তে হবে। সেইসব বর্ণনা তার বন্ধু- বান্ধবী, ক্লাসের কথা, শিক্ষকদের কথা, কী খায়, কখন ঘুমায়,ডরমেটরিতে ছেলে মেয়েরা পাশাপাশি রুমে থাকে এসব, আর আমাকে ভাল করে পড়ার তাগিদ। এটা পড়ার জন্য তো আমার নিভৃতলোকের দরকার পড়তো না।

ও একটু গুছিয়ে নিয়ে আমেরিকা থেকে ফোন করতো একমাস বা দু মাসের ব্যবধানে।

একদিন ও বাড়িতে গিয়ে দেখি থমথমে পরিবেশ। চাচি অবেলায় শুয়ে আছে যা এতো বছরে তার মধ্যে আমি কোনদিন দেখি নি। চাচাও বাড়িতে।

দীপন তার এক স্প্যানিশ সহপাঠিনীকে জীবনসঙ্গী করেছে। বাবা- মার অনুমতি নিয়েই করেছে তারপরও চাচা-চাচী ভেঙে পড়েছিল। তাঁরা কোনদিন দীপনের কোনকিছুতে বাধা দেয় নি, দীপন সে স্বাধীনতার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছে সব সময় কিন্তু সেদিন তার এ সিদ্ধান্ত চাচা-চাচি মেনে নিলেও কষ্টে জারিত হয়েছিল ভীষণ।

আমাকে জড়িয়ে ধরে ক্ষীণ শব্দে কেঁদে উঠে জানান দিয়েছিল তাঁর কষ্ট। আমি জীবন সংগ্রামে জয়ী  কিনা জানিনা তবে সে পথের সংগ্রাম আমাকে দিয়েছিল প্রচণ্ড এক মানসিক শক্তি। দীপন আমার খেলার সাথী চিরদিন তাই হয়ে রইলো।

দীপন ওখানেও ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির জাঁদরেল প্রফেসর। বান্ধবী জুলিয়ান জেফারকে বিয়ে করেছে। বড় বড় খামে তাদের বিয়ের ছবি আসে। আমি সেসব ছবি দেখি, জুলিয়ানকে দেখি, জুলিয়ানের মুখের আদলে নিজেকে কল্পনা করে অসীমলোকের সুখ খুঁজে ফিরি।

চাচা-চাচিও কষ্টের কথা ভুলে গিয়েছিল। দীপনকে বারবার বউ নিয়ে দেশে আসতে বলে, তাড়াতাড়ি বাচ্চা নিতে বলে। ফোনের ওপাশ থেকে হয়তো দীপন হাসে ওর যা স্বভাব।

বাতাসে চাঁপার গন্ধ আসে মিলিয়ে যায় সময় উড়ে চলে হয়তো সৌর ঝড়ে। আমরা জীবনের কক্ষপথে ছুটে চলি।

বিয়ের এক বছর পর দীপন বউ নিয়ে এসেছিল।

সারা বাড়ি বিয়ে বাড়ির মতো সাজানো হয়েছিল। এমনিতেই ও বাড়িতে কাজের লোক ভরা তার উপর নতুন বউ বলে কথা। সাদা বাড়িটা  রাতে যেন বিরাট এক হীরকদ্যুতিতে ভরে ফেলতো চারপাশ। সে দ্যুতিতে আমার নোনা জলে ঘূর্ণিপাক উঠতো। আমি বাড়ি থেকে কতো রাতে ঐ আলোকচ্ছটা দেখতাম। দীপন আসার এক সপ্তাহ আগে থেকেই বাড়ি সাজানো হয়েছিল। ওদের অনেক আত্মীয়স্বজন। সবাই জড়ো হচ্ছিল একে একে। চাচির আবদার মাঝে মাঝে রক্ষা করি। ও বাড়িতে যাই, টুকিটাকি কাজে হাত লাগাই। স্কুল সামলাই। সবই চলছিল আমার নিয়মে।

কখনো অভিমানের সুরে বলতাম, এখন তোমার ব্যাটার বউ আসবে তুমি তো আমাকে ভুলে যাবে! চাচি কেমন উদাস চোখে তাকাতো।আমি  দেকেও না দেখার ভান করে কাজ করতাম।

ওরা এসেছিল আবার চলেও গিয়েছিল। মা ওদেরকে আমাদের বাড়িতে দাওয়াত করে খাওয়ালো। আমিই রান্না করেছিলাম। এক সপ্তাহ ছিল বাড়িতে। দেশে দীপনের একমাস  সময়ের বেশিরভাগ কেটেছে জুলিয়ানকে নিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান  ঘুরে বেড়িয়ে।

এক সপ্তাহে আমার সাথে যতটুকু ঘনিষ্ঠতা হবার জুলিয়ানের সাথে সেটুকুই হয়েছে। দীপনের সাথে আয়, বস, কোথায় ছিলে এতক্ষণ এসব ছাড়া তেমন আর কোন কথা হয় নি। অ্যালবাম ভরা ছবি এনেছিল  সাথে করে। ও বাড়িতে গেলে আমি সেই ছবি দেখতাম অ্যালবাম খুলে বারবার।

বউকে নিয়ে দীপন বাইরে গেলে ওদের ঘরটাতে গুছিয়ে দেবার ছুতোয় ঢুকতাম। দীপনের পোশাকের গন্ধ নিতেই আমাদের ছোটবেলার দিনগুলো ফিরে আসতো হুড়মুড় করে।

এই মাহী তোকে আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন?

এইতো তোকে ধরেছি।

তুই শুধু কাঁদিস কেন? বোকা মেয়ে।

তুমি আমাকে মারো কেনো? তোমার সাথে কথা বলবো না যাও।

এই মাহী তুই বউ হবি, আমি বর।

না, না আমি বর হবো, তুমি বউ

ইস তুই ভীষণ বোকা! মেয়েরা কখনো বর হয় নাকি?

চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বাচ্চাদের দৌড় ঝাঁপের শব্দ, হাসির কলধ্বনি।

আমি আর এক মুহূর্ত থাকতে পারতাম না। ছুটে চলে আসতাম বাড়ি।

এত হৈ চৈয়ের মাঝে দীপন আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, তুই কি আমার উপর রেগে আছিস মাহী?

আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়েছিলাম। কী বলা উচিত আমার বুঝতে না পেরে বলেছিলাম, একটা টানা সুতোর জায়গায় জায়গায় অনেকগুলো গিট পড়েছে দীপন।

ও কী বুঝেছিল কী জানি।

এবার আম্মাকে বলবো ভালো ছেলে দেখে তোকে বিয়ে দিতে।

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

সেদিন কি আমি ভয় পেয়েছিলাম? যদি আবার ও আমার নারীত্বকে ছুঁয়ে দেয়।

পালিয়ে গিয়েছিলাম আমি।

পাঁচ বছর পর দীপন আসছে। এই পাঁচ বছরে চাচা-চাচি অনেকটাই ক্ষয়ে গেছেন। সামনে তাঁদের পঁয়তাল্লিশতম বিয়ে বার্ষিকী। দীপন সেই দিনকে সামনে রেখেই এতোদিন পর আসবে।

ও বাড়িতে মৃদু আনন্দের ঢেউ। এবার দীপন একা আসছে। কোথাও ছন্দপতন হয়েছে হয়তো আমি জানতে চাইনি কোনদিন, চাচিও বলেননি আমায়। শুধু থেকে থেকে মাঝরাতে শ্বেত মর্মর থেকে গুমোট কষ্টের তপ্তশ্বাস আমার গায়ে এসে লাগতো। মাঝরাতে হঠাৎ চাচি কেঁদে উঠতো ঘুমের ঘোরে। চাচা কোনদিন হয়তো আমাকে ডাকতে পাঠাতেন সেই মাঝরাতেই। চাচির বড় বড় চোখগুলোর নিচে কালি পড়তে শুরু করেছে। চাচা উদ্বিগ্ন হয়। আমি কতো বুঝাই। বাচ্চা মেয়ের মতো আমার দিকে তাকিয়ে থেকে ধাতস্থ হয়। সংসারে মন দেয়। দ্বিতীয় ও শেষবার যখন দীপন বউ নিয়ে আসলো চাচি তাঁর শাশুড়ির দেওয়  মটরমালাটি খুলে জুলিয়ানকে পরিয়ে দিয়ে দীপনকে বলেছিল, যখন মায়ের কথা তোর মনে পড়বে তখন এই মালাটা ছুঁয়ে দেখিস ব্যাটা। এই মালার মাঝে আমি মিশে থাকবো।

দীপন শুয়ে আছে ওর ঘরে কিছুক্ষণ আগে ও পৌঁছেছে। চাচি আজ বিয়ের বেনারসি পরেছে। সোনার সুতায় মোড়ানো। আমি সাধ্যমত সাজিয়ে দিয়েছি। চাচাকে বলেছি রেডি হতে। দীপনকে জাগিয়ে দিয়ে ফ্রেশ হতে বলেছি।

সন্ধ্যায় চাচি  আমার হাত ধরে নিয়ে গেলেন একটা বিরাট হলঘরের সামনে। তিন চার ভাঁজের কারুকার্যময় সেগুন কাঠের দরজা ঠেলে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম।বিমানের ছোট অ্যাপ্লিক থেকে প্রাচীন নানারকম অ্যান্টিকে ঘর সাজানো। আচ্ছা আমি কি স্বপ্ন দেখছি! এ বাড়িতে এ ঘরটা কোনদিন আমার চোখে পড়ে নি কেন?

চাচিকে উইশ করতে হবে আমি ছুটে বেরিয়ে ছাদ বাগানে গেলাম ফুল তুলতে। অবাক ব্যাপার বাগানে গাছে একটা ফুলও নেই। কটা ঝরা ফুল কুড়িয়ে নিলাম সুন্দর করে তোড়া করে চাচির হাতে দিলাম।চাচিকে কী স্নিগ্ধ লাগছে!

আমি টাকা জমিয়ে দীপনের জন্য একটা নীল স্যুট করিয়ে রেখেছিলাম। চাচি দীপনকে সেটি দিয়ে বললো মাহী ব্যাটা বেতনের টাকা থেকে জমিয়ে তোর জন্য কাটিয়ে রেখেছে। পরে দেখতো ব্যাটা। তোকে দারুণ মানাবে!

ওয়াও! তুই এটা আমার জন্য বানিয়ে রেখেছিস।

আম্মা তোমরা মাহীকে বিয়ে করাচ্ছো না কেন? এবার কিন্তু ওকে বিয়ে করিয়ে আমি ফিরে যাবো।

আমি সিঁড়ি ভাঙছি। কথাগুলো আমার কাছে অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর হয়ে যায়।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top