সিডনী মঙ্গলবার, ২৬শে জানুয়ারী ২০২১, ১২ই মাঘ ১৪২৭

যুব দিবসে বীর বিবেকানন্দ : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
১৩ জানুয়ারী ২০২১ ১৬:০৯

আপডেট:
১৩ জানুয়ারী ২০২১ ১৬:৫৮

ছবিঃ লেখক ডঃ সুবীর মণ্ডল এবং স্বামী বিবেকানন্দ

 

স্বামী বিবেকানন্দ (নরেন্দ্রনাথ দত্ত) (১২ই জানুয়ারী, ১৮৬৩ – ৪ঠা জুলাই, ১৯০২) ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় অতীন্দ্রিয়বাদী রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য। তার পূর্বাশ্রমের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে হিন্দুধর্ম তথা ভারতীয় বেদান্ত ও যোগ দর্শনের প্রচারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। অনেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বিভিন্ন ধর্মমতের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক স্থাপন এবং হিন্দুধর্মকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রচার করার কৃতিত্ব বিবেকানন্দকে দিয়ে থাকেন। ভারতে হিন্দু পুনর্জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাটি প্রবর্তন করেন। বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতাটি হল, "আমেরিকার ভাই ও বোনেরা ...,"১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় প্রদত্ত চিকাগো বক্তৃতা, যার মাধ্যমেই তিনি পাশ্চাত্য সমাজে প্রথম হিন্দুধর্ম প্রচার করেন।

স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার এক উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি তিনি আকর্ষিত হতেন। তার গুরু রামকৃষ্ণ দেবের কাছ থেকে তিনি শেখেন, সকল জীবই ঈশ্বরের প্রতিভূ; তাই মানুষের সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়। রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর বিবেকানন্দ ভারতীয় উপমহাদেশ ভালোভাবে ঘুরে দেখেন এবং ব্রিটিশ ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দের বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় ভারত ও হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড ও ইউরোপে তিনি হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অসংখ্য সাধারণ ও ঘরোয়া বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ক্লাস নিয়েছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিকাগো বক্তৃতা, কর্মযোগ, রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বেদান্ত, ভারতে বিবেকানন্দ, ভাববার কথা, পরিব্রাজক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, বর্তমান ভারত, বীরবাণী (কবিতা-সংকলন), মদীয় আচার্যদেব ইত্যাদি। বিবেকানন্দ ছিলেন সংগীতজ্ঞ ও গায়ক। তাঁর রচিত দুটি বিখ্যাত গান হল "খণ্ডন-ভব-বন্ধন" (শ্রীরামকৃষ্ণ আরাত্রিক ভজন) ও "নাহি সূর্য নাহি জ্যোতি"। এছাড়া "নাচুক তাহাতে শ্যামা", "৪ জুলাইয়ের প্রতি", "সন্ন্যাসীর গীতি" ও "সখার প্রতি" তার রচিত কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা। "সখার প্রতি" কবিতার অন্তিম দুইটি চরণ– “বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? / জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" – বিবেকানন্দের সর্বাধিক উদ্ধৃত একটি উক্তি।

ভারতে বিবেকানন্দকে ‘বীর সন্ন্যাসী’ নামে অভিহিত করা হয় এবং তাঁর জন্মদিনটি ভারতে জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয়।

স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন যে আদি শঙ্করের ভাষ্যের ভিত্তিতে বেদান্ত দর্শনে হিন্দু ধর্মের সারাংশ সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিম্নলিখিতভাবে বেদান্তের শিক্ষাসমূহের সারসংক্ষেপ করেন:
"প্রত্যেক আত্মাই সম্ভাব্যরূপে ঐশ্বরিক/দেবসুলভ।
লক্ষ্য হচ্ছে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের দ্বারা এ দেবত্বকে সুষ্পষ্টভাবে দেখানো।
কর্ম, বা পূজা, বা মন নিয়ন্ত্রণ, বা দর্শন - একটির দ্বারা, বা অধিকের দ্বারা, বা এ সকলগুলির দ্বারা এটি কর - এবং মুক্ত হ্‌ও। এটি হচ্ছে ধর্মের সমগ্রতা। মতবাদ, বা গোঁড়া মতবাদ, বা ধর্মীয় আচার, বা গ্রন্থ, বা মন্দির, বা মূর্তি হচ্ছে গৌণ খুঁটিনাটি বিষয় ছাড়া কিছুই নয়।
যতক্ষণ পর্যন্ত আমার দেশের একটি কুকুরও ক্ষুধার্ত, আমার সমগ্র ধর্মকে একে খাওয়াতে হবে এবং এর সেবা করতে হবে, তা না করে অন্য যা-ই করা হোক-না-কেন তার সবই অধার্মিক। জেগে ওঠো, সচেতন হও এবং লক্ষ্যে না-পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না। শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা উৎকর্ষের প্রকাশ।
ধর্ম হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে থাকা দেবত্বের প্রকাশ। মানুষের সেবা করা হচ্ছে ঈশ্বরের সেবা করা।"

বিবেকানন্দের মতানুসারে, রামকৃষ্ণ দেবের কাছ থেকে পাওয়া তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে "জীব হচ্ছে শিব"। এটি তাঁর মন্ত্রে পরিণত হয়, এবং দরিদ্র নারায়ণ সেবা-র ধারণা উদ্ভাবন করেন - (দরিদ্র) মানুষের মধ্যে এবং মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেবা। "যদি সত্যিই সকল ইন্দ্রিয়গোচর বস্ত্তু বা বিষয়ের নিমিত্তে ব্রহ্মের একতা থাকে, তাহলে কিসের ভিত্তিতে আমরা অন্যদের থেকে আমাদের ভালো বা মন্দ বিবেচনা করব?" - এ প্রশ্ন তিনি নিজেকে করতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে এ পার্থক্য বা স্বাতন্ত্র্যসমূহ একতা/সমগ্রতার মধ্যস্থিত আলোর শূন্যতায় মিলিয়ে যায় যখন ভক্ত মোক্ষে পৌঁছান। তখন এ একতা/সমগ্রতা সম্পর্কে অসচেতন 'ব্যক্তিদের' জন্য সমবেদনা এবং তাদের সাহায্য করার দৃঢসংকল্প জাগ্রত হয়।

স্বামী বিবেকানন্দ বেদান্তের সে শাখার অঙ্গীভূত বলে নিজেকে মনে করতেন যে শাখার মতে কেউই প্রকৃতভাবে মুক্ত হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের সকলেই মুক্ত হচ্ছি। এমনকি ব্যক্তিগত পাপমোচনের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে, এবং শুধুমাত্র অন্যদের পাপমোচনের জন্য ক্লান্তিহীন কর্ম আলোকিত মানুষের প্রকৃত চিহ্ন। আত্মনো মোক্ষার্থম্ জগদ্ধিতায় চ (দেবনাগরী: आत्मनो मोक्षार्थम् जगद्धिताय च) (নিজের মোক্ষলাভ এবং জগতের মঙ্গলের জন্য) - এ নীতিতে তিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।

বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্যদের পবিত্র, অস্বার্থপর হতে এবং শ্রদ্ধা/বিশ্বাস যাতে থাকে সে উপদেশ দেন। তিনি ব্রহ্মচর্য চর্চা করতে উপদেশ দেন। তাঁর শৈশবের বন্ধু প্রিয়নাথ সিনহার সঙ্গে এক আলোচনায় তিনি তার দৈহিক ও মানসিক শক্তি এবং বাগ্মিতার উৎস/কারণ হিসেবে ব্রহ্মচর্য চর্চাকে অভিহিত করেন।

বিবেকানন্দ প্যারাসাইকোলজি এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের আবির্ভূত ক্ষেত্রকে সমর্থন করেননি (এর এক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর এ বক্তৃতায় মানুষ নিজেই তাঁর ভাগ্য নির্মাতা, সম্পূর্ণ কর্ম, ভলিউম ৮, নোটস অফ ক্লাস টকস এবং বক্তৃতাসমূহ) এ কারণে যে তাঁর মতে এ ধরনের কৌতূহল আধ্যাত্মিক অগ্রগতিকে সাহায্য করেনা বরং তা ব্যাহত করে।

বিবেকানন্দ ছিলেন নয়া-বেদান্তের প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী, যা মূলত পশ্চিমী অভ্যন্তরীণ ঐতিহ্য, বিশেষত অতীন্দ্রিয়বাদ, নতুন চিন্তাধারা ও ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হিন্দুধর্মের নির্বাচিত দিকের একটি আধুনিক ব্যাখ্যা। বিবেকানন্দ ভারতে ও ভারতের বাইরে হিন্দুধর্মকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে তুলতে সফল হয়েছিলেন। তার জন্যেই পাশ্চাত্য সমাজে যোগ, ধ্যান ও আত্মবিকাশের অন্যান্য ভারতীয় পদ্ধতিগুলি সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছিল। অগেহানন্দ ভারতী বলেছেন, "...আধুনিক যুগের হিন্দুরা হিন্দুধর্ম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জ্ঞান বিবেকানন্দের রচনা থেকেই আহরণ করেন।" বিবেকানন্দ বলেছিলেন, হিন্দুধর্ম (ও অন্যান্য সব ধর্মের) সব কটি শাখাসম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্ন পথে একই লক্ষ্যের পথে অগ্রসর হচ্ছে। যদিও কেউ কেউ তার এই উক্তিকে হিন্দুধর্মের অতিসরলীকরণ বলে সমালোচনা করেছেন।

ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে জাতীয়তাবাদী ধারণার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে স্বামী বিবেকানন্দ জাতীয়তাবাদী আদর্শটিকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। সমাজ সংস্কারক চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজের ভাষায়, "স্বামী বিবেকানন্দের নির্ভীক দেশাত্মবোধ সারা ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ভারতের নবজাগরণে স্বামী বিবেকানন্দ যতটা অবদান রেখেছিলেন, ততটা অন্য কেউ এককভাবে রাখতে পারেননি।" বিবেকানন্দ ভারতের সর্বব্যাপী দারিদ্রের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন, এই দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্যই ভারতে জাতীয় নবজাগরণের প্রয়োজন আছে।তাঁর জাতীয়তাবাদী ধারণা ভারতীয় দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবিত করেছিল। শ্রীঅরবিন্দ বলেছিলেন, বিবেকানন্দ ভারতকে আধ্যাত্মিক চেতনায় জাগরিত করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর মতে বিবেকানন্দ ছিলেন সেই অল্প কয়কজন হিন্দু ধর্মসংস্কারকদের একজন "যিনি হিন্দুধর্মের প্রথা ও রীতিনীতির মৃত শাখাপ্রশাখাগুলিকে ছেঁটে ফেলে হিন্দুধর্মের সৌন্দর্য রক্ষা করেছিলেন।"

স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর-জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী বলেছিলেন, "বিবেকানন্দ হিন্দুধর্ম ও ভারতকে রক্ষা করেছিলেন।" বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, বিবেকানন্দ ছিলেন "আধুনিক ভারতের স্রষ্টা"। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, বিবেকানন্দের রচনা তাঁর "দেশপ্রেম হাজারগুণ" বৃদ্ধি করেছিল। বিবেকানন্দ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শ্রীঅরবিন্দ, বাল গঙ্গাধর তিলক ও বাঘা যতীন প্রমুখ স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অলডাস হাক্সলি, ক্রিস্টোফার ইশারউড, রোম্যা রোলাঁ প্রমুখ বুদ্ধিজীবীকে বিবেকানন্দের রচনা অনুপ্রাণিত করেছিল। বিবেকানন্দের মৃত্যুর বহু বছর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারবিজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক রোম্যা রোলাঁকে লিখেছিলেন, "ভারতকে জানতে চাইলে বিবেকানন্দের লেখা পড়ো। তার মধ্যে সব কিছুই ইতিবাচক। নেতিবাচক কিছুই নেই।" রোম্যা রোলাঁ লিখেছেন, "তার লেখাগুলি মহান সঙ্গীতের মতো এবং পংক্তিগুলি বেটোফেন শৈলীর মতো। চিত্তাকর্ষক ছন্দগুলি হ্যান্ডেল কোরাসের কুচকাওয়াজের মতো। আজ ত্রিশ বছর পরেও তাঁর বাণীগুলিকে স্পর্শ করলে আমার শরীরে বৈদ্যুতিক আঘাতের মতো শিহরণ জাগে। এই মহানায়কের মুখ থেকে যখন এই জ্বলন্ত শব্দগুলি উচ্চারিত হয়েছিল, তখন নিশ্চয় অনেকে এই শিহরণ অনুভব করেছিলেন!"

বিবেকানন্দের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে জামশেদজি টাটা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন, যা ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রথম সারির গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়। বিদেশে বিবেকানন্দ প্রাচ্যবিদ ম্যাক্স মুলার ও বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলেন। এরা দুজনেই তার বৈদিক শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ভারতে তার জন্মদিন ১২ই জানুয়ারী পালিত হয় জাতীয় যুব দিবস (ভারত) হিসেবে। অন্যদিকে, ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দের ১১ই সেপ্টেম্বর তারিখে বিবেকানন্দ বিশ্বধর্ম মহাসভায় তার বিখ্যাত 'শিকাগো বক্তৃতা' উপস্থাপন করেছিলেন বলে ১১ই সেপ্টেম্বর তারিখটি 'বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব দিবস' হিসেবে পালিত হয়। ২০১০ খ্রীস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের অর্থ মন্ত্রক ভারতের আর্থনৈতিক পরিবেশে বিবেকানন্দের শিক্ষা ও মূল্যবোধের গুরুত্বের উপর আলোকপাত করেন। তদনীন্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় ১০০ কোটি টাকার "স্বামী বিবেকানন্দ ভ্যালু এডুকেশন প্রজেক্ট" অনুমোদন করেন। এই প্রকল্পে যুবসমাজকে প্রতিযোগিতা, প্রবন্ধ রচনা, আলোচনা ও পাঠচক্রে যুক্ত করা এবং বিবেকানন্দের রচনাবলী একাধিক ভাষায় প্রকাশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০১১ খ্রীস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ট্রেনিং কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় "স্বামী বিবেকানন্দ রাজ্য পুলিশ আকাদেমি"। ছত্তিসগড়ের রাজ্য প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পালটে রাখা হয়েছে "ছত্তিসগড় স্বামী বিবেকানন্দ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়"। ২০১২ সালে রায়পুরের বিমানবন্দরটির নামও পালটে রাখা হয়েছে "স্বামী বিবেকানন্দ বিমানবন্দর"।

স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম-সার্ধশতবর্ষ ভারত ও ভারতের বাইরে মহাসমারোহে পালিত হয়েছে। ভারতের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ মন্ত্রক বিশেষভাবে ২০১৩ খ্রীস্টাব্দকে উদযাপন করেছে। রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি, বিভন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও যুব গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এই উপলক্ষে বর্ষব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। বাঙালী চলচ্চিত্র পরিচালক উৎপল সিংহ বিবেকানন্দের সার্ধশততম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে দ্য লাইট: স্বামী বিবেকানন্দ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

স্বামী বিবেকানন্দ শুধুমাত্র একজন সাত্ত্বিক পণ্ডিতই ছিলেন না, বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই বিবেকানন্দ ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাগ্মী ও লেখক। তাঁর অধিকাংশ বই-ই হল বিশ্বের বিভিন্ন শহরে দেওয়া বক্তৃতার সংকলন। তাঁর প্রধান কাজ, রাজযোগ, মূলত তাঁর নিউ ইয়র্কে প্রদত্ত বক্তব্যের আলোচনা নিয়ে গঠিত।

বানহাত্তা অনুসারে, গায়ক, চিত্রশিল্পী, আশ্চর্য ভাষাবিশারদ ও কবি বিবেকানন্দ ছিলেন একজন সম্পূর্ণ শিল্পী। তিনি অনেকগুলি গান ও কবিতা লিখেছিলেন, যার মধ্যে তাঁর প্রিয় রচনা "মৃত্যুরূপা মাতা" কবিতাটি অন্যতম। বিবেকানন্দের উপদেশগুলির মধ্যে রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায় এবং তার ভাষা ছিল সহজ-সাবলীল। বাংলা রচনার ক্ষেত্রে তিনি মনে করতেন, ভাষা (কথ্য ও লিখিত) এমন হওয়া উচিত যা লেখকের পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের বদলে, লেখকের বক্তব্যের মূল ভাবটিকে ফুটিয়ে তুলতে পারবে।

'বর্তমান ভারত' হল বিবেকানন্দের লেখা একটি বিখ্যাত বাংলা প্রবন্ধ। ১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দের রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একমাত্র বাংলা মুখপত্র 'উদ্বোধন' পত্রিকার মার্চ সংখ্যায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ খ্রীস্টাব্দে প্রবন্ধটি বই আকারে প্রকাশিত হয় এবং পরে 'স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা' গ্রন্থের ষষ্ঠ খণ্ডে সংকলিত হয়। এই প্রবন্ধেই বিবেকানন্দ দরিদ্র ও তথাকথিত হীন বর্ণে জন্ম নেওয়া ভারতীয়দের নিজের ভাই বলে উল্লেখ করেছিলেন।

৪ঠা জুলাই, ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দ, (তাঁর মৃত্যুর দিন) বিবেকানন্দ ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন, বেলুড় মঠের চ্যাপেলে তিন ঘন্টা ধরে ধ্যান করেন। এরপর তিনি ছাত্রদের শুক্লা-যজুর্বেদ শেখান, যা একটি সংস্কৃত ব্যাকরণ এবং যোগ দর্শন। পরে সহকর্মীদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ মঠের বৈদিক কলেজে একটি পরিকল্পনার আলোচনা করেন। তিনি ভ্রাতা-শিষ্য স্বামী প্রেমানন্দের সঙ্গে হাঁটেন এবং তাকে রামকৃষ্ণ মঠের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও নির্দেশনা দেন। সন্ধ্যা ৭:০০ টায় বিবেকানন্দ তার ঘরে ফেরেন এবং তাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করেন; এর প্রায় দুই ঘন্টা পর রাত ৯:১০ মিনিটে ধ্যানরত অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন। তার শিষ্যদের মতে, বিবেকানন্দের মহাসমাধি  ঘটেছিল; আর চিকিৎসকের প্রতিবেদনে বলা হয় এটি হয়েছে তার মস্তিষ্কে একটি রক্তনালী ফেটে যাবার কারণে, কিন্তু তারা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ধার করতে পারেননি। তাঁর শিষ্যদের মতানুসারে ব্রহ্মরন্ধ্র-মস্তিষ্কের চূড়ার রন্ধ্র-অবশ্যই ফেটে থাকবে যখন তিনি মহাসমাধি অর্জন করেছিলেন। বিবেকানন্দ চল্লিশ বছর জীবৎকাল পূর্ণ করার আগেই তার ভাববাণী সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁকে বেলুড়ে গঙ্গা নদীর তীরে একটি চন্দন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চিতার উপর দাহ করা হয়, যার বিপরীত পাশে ষোল বছর আগে রামকৃষ্ণ দেবের মরদেহ দাহ করা হয়েছিল।

স্বামী বিবেকানন্দের ভ্রমণসমূহ, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতাদান, ব্যক্তিগত আলোচনা এবং চিঠিপত্রের আদান-প্রদান তার স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি হাঁপানি, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য শারীরিক অসুখে ভুগছিলেন। তাঁর দেহত্যাগের কিছুদিন পূর্বে তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বর্ষপঞ্জি/পঞ্জিকা পড়তে দেখা যেত। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার তিন দিন পূর্বে তাকে দাহ করার স্থান দেখিয়ে দেন - যে স্থানে বর্তমানে তার স্মৃতিতে একটি মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কতিপয় লোকের কাছে মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচবেন না।

প্রকাশনা:

সঙ্গীতকল্পতরু (১৮৮৭, সহলেখক বৈষ্ণবচরণ বসাক)
কর্মযোগ (১৮৯৬)
রাজযোগ (১৮৯৬ [১৮৯৯ সংস্করণ])
বেদান্ত ফিলোজফি: অ্যান অ্যাড্রেস বিফোর দ্য গ্র্যাজুয়েট ফিলোজফিক্যাল সোসাইটি (১৮৯৬; বাংলা অনুবাদে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বেদান্ত)
লেকচার্স ফ্রম কলম্বো টু আলমোড়া (১৮৯৭, বাংলা অনুবাদে ভারতে বিবেকানন্দ)
বর্তমান ভারত (মার্চ, ১৮৯৯), উদ্বোধন
মাই মাস্টার (১৯০১, দ্য বেকার অ্যান্ড টাইলর কোম্পানি, নিউ ইয়র্ক; বাংলা অনুবাদে মদীয় আচার্যদেব)
বেদান্ত ফিলোসফি: লেকচার্স অন জ্ঞানযোগ (১৯০২)

১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর প্রকাশিত গ্রন্থের তালিকা:

ভক্তি-প্রসঙ্গে
ভক্তিযোগ বা সর্বোচ্চ ভক্তি
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য (১৯০৯)
দেববাণী (১৯০৯)
নারদ ভক্তিসূত্র – অনুবাদ
পরাভক্তি
প্র্যাকটিক্যাল বেদান্ত
জ্ঞানযোগ
রাজযোগ (১৯২০)
স্বামী বিবেকানন্দের বাণী সঞ্চয়ন
স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা (দশ খণ্ড)
কমপ্লিট ওয়ার্কস অব স্বামী বিবেকানন্দ (নয় খণ্ড)
(সৌজন্যে : উইকিপিডিয়া)
-----------------------------------------------------------
কে যেন তাকে বলেছে, চোখ বুজে ধ্যান করলে মাথা থেকে আপনিই জটা গজাবে, শুধু গজাবে নয়, একেবারে পিঠ বেয়ে নেমেও আসবে। এবারে তাই বাবুহয়ে ধ্যানে বসেছে ভয়ানক দুরন্ত 'বিলে'। আর কিছুক্ষণ অন্তর থেকে থেকে চোখ মেলে দেখছে। কখনও মাথায়-পিঠে হাত দিচ্ছে। অনেকক্ষণ পরেও যখন জটা গজাল না।  তখন দৌড়ে মা'য়ের কাছে গিয়ে বললে, কই মা, আমি এতক্ষণ ধরে ধ্যান করলুম, কিন্তু কই আমার তো জটা গজাল না! মা হেসে বললে, তোর জটা গজিয়ে কাজ নেই , তুই বরং শান্ত হয়ে ধ্যান'ই কর গিয়ে। আমরা একটু জিরুই তবে ।

এই ধ্যান, ধ্যান খেলতে খেলতেই ছেলে যে একদিন ঘর ছাড়বে।  মা তখন বোধহয় খানিক আন্দাজও করতে পারেন নি। বাড়ীতে কেউ এসে হাত পেতে দাঁড়ালেই হলো  যা হাতের কাছে থাকতো, তাই দিয়ে দিত। এমনিতে এবাড়ী থেকে খালি হাতে কেউ ফিরত না, তবু বাড়ীর ছেলের তাতে মন ভরে না। বাড়ীর লোক অতিষ্ঠ হয়ে ঘরে বন্ধ করে রাখে। তাতেও কুছ পরোয়া নেই। বন্ধ ঘরের জানালা দিয়েই দিয়ে দিচ্ছে সব।  নতুন কাপড়-জামা সব। আর বলছে, নিয়ে যাও , নিয়ে যাও। এমনি মাঝেমাঝে তাণ্ডব করতো ছেলে, আর সামলাতে না পেরে দম ছেড়ে গালে হাত দিয়ে বসে থাকতেন মা, আর বলতেন, শিবের কাছে চাইলুম এক ছেলে। আর শিব পাঠালেন এক ভূত! তা মা'য়ের সেই ভূত হয়ে গেলেন দেশের স্বাধীনতার মূল অনুপ্রেরণা, সবার ভাবগুরু। সত্যি ব্রিটিশদের সন্দেহের প্রশংসা করতে হয়; সেই কবে, যখন কোথাও কিছু নেই, আন্দোলন কি তা কেউ জানে না, স্বাধীনতা কি তা কেউ বোঝে না, সেই তখনই সন্দেহ করলো কিনা তাঁকেই! কি আছে তাঁর মধ্যে, কি আছে তাঁর লেখায়, আজ এত বছর পরেও মানুষ ছুটছে তাঁর জন্য! সেই তিনি এসেছিলেন বাংলা ১২৬৯ সন, পৌষ মাসের শেষদিন মকর সংক্রান্তি, সোমবার; ইং ১৮৬৩ সাল ১২ জানুয়ারি, বাবা বিশ্বনাথ দত্ত ও মা ভুবনেশ্বরী দেবীর কোল আলো করে।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, 'ও আমাদের কাউকেই বিন্দুমাত্র পরোয়া করে না, গ্রাহ্যই করে না। আর কেনই বা করবে? আমরা হলুম নর আর ও হ'ল নরেদের রাজা নরেন্দ্র। হুকুম করা তো ওকেই মানায়।' অবশ্য শ্রীরামকৃষ্ণ ডাকতেন 'লরেন'।
তথ্যসূত্র: বীরেশ্বর বিবেকানন্দ (প্রথম) - অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত)

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত (গবেষক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প ও ভ্রমণ লেখক)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top