সিডনী রবিবার, ৩১শে মে ২০২০, ১৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭


স্বপ্ন পোড়ে ঈদের চাঁদে : আনোয়ার আল ফারুক


প্রকাশিত:
২১ মে ২০২০ ১৫:৫১

আপডেট:
৩১ মে ২০২০ ২২:৪৮

 

এক.
জমির উদ্দিন স্থানীয় বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শহর থেকে বিএ পাশ করে এসে গ্রামের ছেলে মেয়েদের শিক্ষিত করতে তিনি নিজেই গড়ে তুলেন এই প্রাথমিক বিদ্যালয়। আগে গ্রামের ছেলে মেয়েদের দু তিন মাইল হেঁটে অন্য গ্রামে গিয়ে পড়তে হতো।এখন আর তা করতে হয় না। জমির উদ্দিন স্বপ্ন দেখেন একদিন তার স্কুলটি সরকারীকরণ হবে সাথে আরো পাঁচ ছয় জন শিক্ষক পরিবারের ভাগ্য উন্নয়ন হবে। উপজিলার বেশ কিছু রেজিষ্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারী করা হলেও করা হয়নি জমির উদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত পাইক পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। তবুও জমির উদ্দিন স্বপ্ন দেখেই যাচ্ছেন। জমির উদ্দিন ভাবুক প্রকৃতির মানুষ।স্কুলের বাহিরে সারা সময় লেখালেখি করেন। তিনি দারুণ গল্প কবিতা লিখতে পারেন। লিখার হাতও আছে বেশ।আবৃতিতেও রয়েছে তার বেশ যশ। ইদানিং তার লেখা জাতীয় পত্রিকাও প্রকাশ হয়। মাসের শেষে ডাকযোগে তার ঠিকানায় দু চারটা সাহিত্য ম্যাগাজিনও আসে।দৈনিক পত্রিকাগুলোও সৌজন্য কপি দেয়া হয়।পত্রিকা ম্যাগাজিনে নিজের লেখা দেখে জমির উদ্দিন যারপরনাই খুশি হয়। বন্ধু বান্ধবদের ডেকে পত্রিকায়  নিজের লিখা দেখান। অনেকে তাচ্ছিল্য করে আবার অনেকে উৎসাহ দেয়। জমির উদ্দিন প্রায় পাঁচ শতাধিক কবিতা গল্প লিখছেন। কখনো স্কুল সরকারী হলে বেতনের টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করার স্বপ্ন আঁকছেন বুকে। লেখকের পূর্ণতাতো বই প্রকাশে। 

দুই
রমজান মাস। জমির উদ্দিন ঈদ সংখ্যায় অনেক ম্যাগাজিন পত্রিকায় লিখা দিয়েছেন। ইদানিং তার পাঠানো লিখা খুব একটা বাদ যায় না। পত্রিকা ম্যাগাজিনে ছাপানোও হয়। আবার অনেক পত্রিকা ম্যাগাজিন সম্পাদক আগেই চিঠি লিখে তাদের পত্রিকা ম্যাগাজিনে লিখা দেয়ার অনুরোধও জানান। জমির উদ্দিন বসে বসে লিখছেন। এই ফাঁকে বার কয়েক তার স্ত্রী রাহিমা খাতুন এসে তরি তরকারী কিছু এনে দেয়ার তাড়া দিয়ে গেলেও জমির উদ্দিন কোন কথাই বলেননি। হাতে কোন টাকা পয়সা নেই।তার উপরে ঈদের সময় কেউ এখন ধার দেনাও দেয় না। আবার মাঝে মাঝে বাচ্চারাও এসে বলে যাচ্ছে আব্বু কখন বাজারে যাবেন? ঈদতো চলে আসছে। আমাদের নতুন জামা জুতো কখন কিনবেন? জমির উদ্দিন বাচ্চাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেন এইতো সময় করে যাবো। 

তিন
জমির উদ্দিন শুনতে পেলেন বাহিরে কে যেন ডাকছে স্যার ঘরে আছেন? জমির উদ্দিন দরজা খুলে দেখেন স্থানীয় পোস্ট অফিসের পিয়ন সবুর আলী। অনেকগুলো পার্সেল নিয়ে আসছেন। জমির উদ্দিন আলাদা আলাদা সই স্বাক্ষর করে প্যাকেটগুলো বুঝে নিচ্ছেন। বাচ্চারা ভাবছে বুঝি ডাকযোগেই তাদের জামা কাপড় আসছে। তারা নিরবে বাবার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। পিয়ন চলে যাওয়ার পর জমির উদ্দিন এক এক করে প্যাকেট খুলছেন।রাহিমা খাতুন এগুলো দেখে তাচ্ছিল্যের সাথে মুখ বাঁকিয়ে অন্যরুমে চলে যান। আজ এই ঈদ সংখ্যার পত্রিকা ম্যাগাজিন দেখেও তিনি আগের মত খুশি হতে পারেননি। ভাবছেন, ইশ! যদি লিখার সম্মানী হিসেবে পত্রিকা ম্যাগাজিন সম্পাদকরা অল্প কিছু টাকাও দিতেন তাহলে ছোট বাচ্চাদের জন্য ফুটপাত থেকে হলেও দু একটা জামা কিনে দিতে পারতেন। ভাবনার সাথে তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে উঠে।এই দিকে রাহিমা খাতুন ঝাঁঝালো কন্ঠেই বলে যাচ্ছেন রাত পোহালেই ঈদ আমি বাচ্চাদের কি দিয়ে ভাত দিবো? জমির উদ্দিন কোন কথাই বলেন না। পকেটতো আর কথা বলার সায় দেয় না।

চার.
মাগরিবের আজান দেয়ার সাথে সাথে জমির উদ্দিন এক গ্লাস পানি আর কয়টা পান্তা ভাত দিয়ে ইফতার করে বাহিরে চলে যান। রাহিমা খাতুন ভাবছেন কারো থেকে ধার দেনা করে হলেও বাচ্চাদের জন্য একটা করে জামা আর কয় টাকার সবজি হয়তো আনবেন। বাচ্চারাও অপেক্ষায় আছে। ঈদের চাঁদ উঠছে তাই মহল্লার ছেলে মেয়েরা বাহিরে খুব হৈ হল্লা করছে। কিছুক্ষণ পর জমির উদ্দিন খালি হাতেই ঘরে ফিরলেন। কারো মুখে কোন কথা নেই।জমির উদ্দিন সোজা শোবার ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে আছেন।নিজের প্রতি একটা অদৃশ্য ঘৃণাবোধ জাগছে। জমির উদ্দিনের নাকে কেমন জানি খুব ধোঁয়াটে ধোঁয়াটে গন্ধ লাগছে তাই ঘর থেকে উঠোনেই বের হয়ে দেখলেন তার স্ত্রী রাহিমা খাতুন রাগে ক্ষোভে গদ গদ করতে করতে তার জীবনের সব লিখার পান্ডুলিপিগুলো কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন। জমির উদ্দিন মুখে শুধু এইটুকুই উচ্চারণ করলেন হায় ঈদের চাঁদ তুই বুঝি আমার সব স্বপ্ন পুড়ে দিলি?  তিনি আগুনের পাশেই নির্বাক ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন।

 

অধ্যক্ষ আনোয়ার আল ফারুক
বায়তুল বেলাল, দাউদপুর চৌধুরী বাড়ি

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top