সিডনী শনিবার, ৩১শে অক্টোবর ২০২০, ১৫ই কার্তিক ১৪২৭


যখন বৃষ্টি নামে : সুমন মহান্তি


প্রকাশিত:
১৫ অক্টোবর ২০২০ ১৫:৪৮

আপডেট:
৩১ অক্টোবর ২০২০ ০৪:০৭

 

গ্রামসম্পর্কের দাদা অলকেশকে দেখে মনে মনে বিব্রত হল আকাশ।

মাঝেমধ্যেই এরকম কিছু লোক এসে পড়ে বাড়িতে। সৌজন্যের খাতিরে অভদ্রতা করা যায় না।সেটা করবেই বা কেন? সে আদপে নরম মনের মানুষ,স্মিত হাসি লেগে থাকে মুখে,কখনো উঁচু গলায় কথা বলে না। তাছাড়া মানুষগুলির সঙ্গে তার ছেলেবেলা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে।

অলকেশের সঙ্গে ড্রয়িংরুমে কিছুক্ষণ গল্প করল আকাশ। এখন আর খেজুরে গল্প করতে ভালো লাগে না। মানসিকতা মেলে না, কথা হারিয়ে যায়,অন্তর্মুখী আকাশ সেভাবে কারও সঙ্গে এখন আর মেশে না। তার নিজস্ব জগতের কয়েকজন ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলে প্রাণের আরাম খুঁজে পায় না আকাশ। অলকেশ ওঠার নাম করছে না দেখে আকাশ ঘরের ভেতরে গেল। সুলগ্নাকে ইতস্তত করে বলল, “চা বসাবে একটু?’’

সুলগ্না বিরক্তগলায় বলে, “এই স্কুল থেকে এলাম। পারব না। কে এসেছে?’’

“অলকদা।’’

“এমন কোনও বিশেষ অতিথি নয় সে। এই লোকগুলো হুটহাট আসেই বা কেন?”

আকাশ নিভন্ত গলায় বলে, “এসেছে যখন কিছু খেতে না দেওয়াটা অভদ্রতা।’’

“আকাশ, বি প্র্যাকটিকাল। অত সৌজন্য না দেখালেও চলবে। নিজে তো করে নিতে পারো।’’

“ঠিক আছে,” আকাশ ড্রয়িংরুমে এসে মৃদুগলায় বলে, “অলকদা,তোমার বউমা একটা দরকারি কাজে বেরোবে। আমাকেও যেতে হবে।’’

অলকেশ সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল, “আমারও কাজ আছে। পরে একদিন আসব।”

“হ্যাঁ, অবশ্যই এসো একদিন। ফোন করে আসবে। অনেক গল্প করা যাবে তখন।”

অলকেশ ম্লান হাসে, “তুই তো ফোন ধরিস না। হঠাৎ করে এভাবে না চলে এলে দেখাও হত না। তোকে অনেকদিন দেখিনি, দেখতে ইচ্ছে হল, খোঁজখবর পেলাম। ভালো লাগল। আসছি।”

অলকেশ চলে গেলে আকাশ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সোফায় বসে পড়ল। অলকদা কি কিছু টের পেল? টের পেলেও কিছু যায় আসে না তার। এই লোকগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক তেমন নেই, রাখতেও চায় না। সুলগ্না পছন্দ করে না। সুলগ্নার অপছন্দ মানে তারও অপছন্দ। সামনের দিকে তাকানো বুদ্ধিমানের কাজ। জীবনবোধ, রুচি কিছুই মেলে না এমন মানুষদের সঙ্গে ফাঁপা সম্পর্ক রেখে লাভ কিছু নেই। হয়তো গ্রামে গিয়ে বলবে,আকাশের বাড়িতে গিয়েছিলাম। কিছু খেতে দেয়নি।

ওসব লোকনিন্দা থোড়াই পরোয়া করে আকাশ। গ্রামের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় চুকে গিয়েছে। সেখানে ফিরেও যাবে না কখনো। তাই তাকে নিয়ে কী আলোচনা হল এসব গ্রাম্যতা নিয়ে মাথা ঘামাতে সে রাজি নয়।

আকাশ ফোনে নেট অন করে ফেসবুক খোলে। খুলেই মন তার খুশিতে উচ্ছল হয়ে যায়। ইনবক্সে চারখানা মেসেজ। তন্বী লিখেছে, “আকাশদা, তোমার শিকড়ের গভীর দেশে কবিতাটি পড়লাম। মুগ্ধ হলাম। তুমিই পারো এরকম কবিতা লিখতে। তুমি আর পাঁচটা কবির মতো কৃত্তিম লেখো না।’’

জয়িতাদি লিখেছে, “আকাশ, তোর কবিতাটা ভীষণ ভীষণ ভালো লেগেছে। এভাবেই লিখে যা। অরণ্য, মাটির টান, গ্রামের সরল সৌন্দর্য তোর মতো এভাবে কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারে না। সবাই এখন শহুরে কবিতা লিখে যাচ্ছে।’’

আরও দুখানা মেসেজে তার কবিতার প্রশংসা রয়েছে। আকাশ সবাইকে ধন্যবাদ জানাল,টাইপ করল, “কিন্তু ইনবক্সে শুধু কেন? রসগোল্লা প্রকাশ্যে খেতেই ভালো।কমেন্ট সেকশনে লেখো,প্লিজ। জানোই তো,কবিরা হ্যাংলা হয়ে থাকে।’’

হাসির ইমোজি দিল আকাশ। তন্বী উওর লিখল, “কাল তুমি যে পোস্ট দিয়েছিলে সেখানেও লিখেছি। অনেক কমেন্টের ভীড়ে যদি আলাদাভাবে চোখে না পড়ে তাই ইনবক্সেও জানালাম। তোমার কবিতার ফ্যান বলেই স্পেশালি জানাতে ইচ্ছে হল।”

আকাশ টাইপ করে, “তোমার মতো গুণমুগ্ধ পাঠিকারাই আমার অক্সিজেন।”

তন্বীর অভিমানী জবাব ভাসল ইনবক্সে, “তোমার কত বড় বড় পাঠক আছে। নামকরা ক্রিটিকেরা কাব্যগ্রন্থের রিভিউ লিখছে।আমি তো তুচ্ছ পাঠিকা।”

কথা বাড়াল না আকাশ। গতকাল নামকরা পত্রিকা ‘পারিজাত’ তার একটি কবিতা প্রকাশ করেছে। স্ট্যাটাস দিয়েছিল আকাশ। বিকেল অব্দি বারবার ফেসবুক খুলে দেখেছে সে। তিনশো লাইক আর বাহান্নটা কমেন্ট পড়েছে এখনো অব্দি। দুঘন্টা ফোন অফ ছিল। সাংসারিক কাজবাজ সেরে খুলবে ভাবছিল এমন সময়ে অলকদা হাজির হল।

স্ট্যাটাস দেখে আকাশ প্রসন্ন মনে উঠে দাঁড়াল। তন্বী ভুল বলেনি। আরও অসংখ্য কমেন্ট জমা হয়েছে। সবাই দরাজ প্রশংসা করেছে। এসবে অনেকদিন অভ্যস্ত হয়ে গেলেও বেশ ভালোই লাগে। কবি হিসেবে সে একটা জায়গায় পৌছেছে, সাহিত্য মহলে আকাশ মিত্রকে সবাই একডাকে চেনে, জেলাশহরে বসেও তার কবিতার অসংখ্য পাঠক রাজ্যজুড়ে তৈরি করে নিতে পেরেছে সে। নামী প্রকাশনা থেকে এখনো অব্দি চারখানা কবিতার বই বেরিয়েছে। সে তরুণ কবি,বয়স মাত্র চল্লিশ,একটা উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে, দুখানা পুরস্কার তার ঝুলিতে,হেলাফেলা পুরস্কার নয় মোটেই।  তার এই সুখ্যাতি অনেকের হিংসার কারণ,কবিরা অবশ্য হিংসুটেই হয়ে থাকে, সে কোনও দল-উপদলে ভেড়েনি,নিজের মতো করে নিভৃতে কাজ করে যায়।

সেটেলমেন্ট অফিসের কেরানি সে। সেটা তার কোনও পরিচয় নয়, সে কবি, নিভৃতে থেকে শব্দে তুলে আনে অমৃতলোক,সেটাই তার আসল পরিচয়। হাইস্কুলের দিদিমণি সুলগ্না অনেক বেশি স্যালারি পায়। সুলগ্না কেরানি আকাশকে বিয়ে করেনি,কবি আকাশকে ভালোবেসে বিয়ে করে ঘর বেঁধেছে। এখনকার দিনে যেটা রূপকথা বলে ভাববে অনেকে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এখনো মেয়েরা সমান বা উচ্চতর স্ট্যাটাসের ছেলেকেই জীবনসঙ্গী করে এদেশে। আকাশের অবশ্য আরও একটা প্লাস পয়েন্ট আছে। সে সুদর্শন, মিতভাষী,হাসি সারাক্ষণ লেগে থাকে ঠোঁটে। সুলগ্না নিজের মুখেই তার এই পছন্দের কারণ বলেছে, বাড়িয়ে বলেনি অবশ্যই।

 

মেঘ ঘনিয়ে এসেছে আকাশে, ফাইল রেখে বাইরে করিডরে বেরিয়ে আসে আকাশ। অফিসে কলিগ মৃদুল তালের বড়া এনেছিল, সবাইকে দিয়েছে, আকাশ খেয়েছে ক্ষুধার্তের মতো, খেয়েই বুঝেছে যে তার মায়ের হাতের তৈরি তালপিঠের সেই স্বাদ নেই। ভাদ্র-আশ্বিন মাসের সময়ে তালপিঠে বানাত মা, তার অপূর্ব স্বাদ আর গন্ধ কিছুতেই ভোলা যায় না। কতকাল ওসব মুখে দেয়নি আকাশ,সুলগ্না করতে জানে না, মায়ের কাছে গিয়ে আবদার করার উপায় নেই এখন।

মাত্র ষোলো কিলোমিটার দূরে তার দেশের বাড়ি, তার শিকড়, তার কবিতার গোপন ভুবন, বারবার গ্রাম, অরণ্য, বুনোফুল, গাছপালা আর ঘাসফুলের কাছে শব্দের পর শব্দ সৃষ্টি করে ফিরে যায় সে। সশরীরে যাওয়া আর হয়ে ওঠে না।

একবছর আগে দেশের বাড়ি গিয়েছিল সে। সেখানে যেতে হলে সুলগ্নার অনুমতি নিতে হয়। এটাই নিয়ম। সুলগ্নাকে না জানিয়ে একবার গিয়েছিল সে,বাড়িতে মাত্র একঘন্টা ছিল। মেয়েদের ইন্দ্রিয় বোধহয় বেশি কাজ করে। সুলগ্না ধরে ফেলেছিল, অশান্তি করেছিল খুব, তার ভালোবাসার মানুষ তার সঙ্গে মিথ্যাচার করল! ঝগড়া করা,উঁচুগলায় তর্ক করা আকাশের স্বভাবে নেই। সে গৃহশান্তি বজায় রাখতে বলেছিল, “বেশ।এবার থেকে জানিয়েই যাব। বিধবা মা একা রয়েছেন, তাঁকে দেখতে যেতেই হবে। মানা কোরো না।’’

“যেতে মানা করছি না। কিন্তু জানিয়ে যাবে। রাত কাটানো চলবে না। একা থাকা সম্ভব নয়।”

আকাশ কোনও প্রতিবাদে যায়নি। শ্বশুরবাড়ির পাশেই তারা ফ্ল্যাট নিয়েছে,সারাক্ষণই শ্বশুরবাড়ির কেউ না কেউ আসে এবং থাকে। তাই সে বাইরে কোনও অনুষ্ঠানে বা কাজে এক-দুদিনের জন্য গেলে সুলগ্না আর রিয়াকে একা কখনোই থাকতে হয় না। রিয়ার বয়স এগারো, ইংলিশ মিডিয়ামে সিক্সথ স্ট্যান্ডার্ডে পড়ে, বাবাকে চোখে হারায়।

সমস্যা হল প্রায় একবছর আগে। সুলগ্নাকে জানিয়েই মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল সে। মা তাকে পেয়ে বড় উ্তলা ছিল সেদিন। পরোটা আর আলুপোস্ত বানিয়েছিল বিকেলে। মা ঠিক জানত তার প্রিয় খাবারের কথা,চেটেপুটে খেয়ে আলস্য এসেছিল তার। মাটির বাড়ি,বেশ ঠান্ডা, সারাদিন গরমে তেতে থাকলেও জঙ্গলের পাশের গ্রাম বলে সন্ধে থেকে ফুরফুরে হাওয়া দেয়। তক্তপোশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। ঘুম ভাঙতেই দেখল সন্ধে হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ, ঘড়িতে আটটা বাজে। সর্বনাশ, ফিরতে হবে এবার। মোবাইলে সুলগ্নার তিনখানা মিসড কল দেখে সে বিব্রত হয়ে পড়ল। সে বেরোতে যাবে দেখে মা বলেছিল, “থেকে যা বাবু। আজকের রাতটা এখানে থেকে যা। নিজেরই ঘর,বাবা-ঠাকুর্দার ভিটে, একটা রাত কি কাটানো যায় না?’’

সত্যি কথা বলতে আকাশের নিজেরও তেমন ফেরার ইচ্ছে হচ্ছিল না। কিন্তু সুলগ্নার কথা ভাবতেই ইচ্ছেটা মরে গিয়েছিল নিমেষেই। অশান্তি তার ভালো লাগে না, মন বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, কবিতা মাথা খুঁড়লেও তখন আর ধরা দেয় না।

সে বাইক স্টার্ট দিয়েছিল। ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের সজল  চোখ দেখে সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস পায়নি। মন দুর্বল হয়ে যাবে। ফেরার সময়ে  রুক্মিনতোড়ের কাছে রাস্তায় এক মাতাল টলোমলো পায়ে এসে পড়েছিল বাইকের সামনে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে সজোরে ব্রেক কষেছিল আকাশ। বাইক স্কিড করে পড়ে গিয়েছিল সে, গুরুতর কিছু ঘটেনি, তবে পায়ে চোট লেগেছিল, হাত-পা ছড়ে গিয়েছিল।

ঘটনার সঙ্গে দেশের বাড়ি বা মা কিছুরই যোগ ছিল না,তবু সুলগ্না বিস্তর অশান্তি করেছিল। নিশ্চয়ই আকাশের মন বিক্ষিপ্ত হয়েছিল, সেন্টিমেন্টাল কথাবার্তা বলেছিলেন আকাশের মা। বিয়ের সময় কি আকাশ বোঝেনি যে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জগতকে মেলানো যাবে না? শহরের মেয়ে হয়ে গ্রাম্য আত্মীয়,পরিমন্ডল ইত্যাদির সঙ্গে সে মানিয়ে নিতে পারবে না?

আকাশ বলেছিল, “নিজের মা। অন্য কেউ নয়। তুমি বিয়ের অনুষ্ঠান বাদে একটি দিনও সেখানে থাকোনি। মানিয়ে নেওয়ার প্রশ্নই আসেনি।”

“প্রশ্ন আসেই না।”

“কেন?”

“প্রত্যেক বিয়ের কিছু অলিখিত শর্ত থাকে। তুমি বুদ্ধিমান,বুঝেছ ঠিকই। মুখে বলতে হবে?’’

অলিখিত শর্ত! তাহলে ভালোবেসে বিয়েরও শর্ত ছিল। নিছক ভালোবাসার আড়ালেও হিসেব ছিল। তাকে বিয়ে করলে সুলগ্না তার নিজের শহরে থাকতে পারবে, নিজের বাবা-মায়ের কাছে থাকা যাবে। কম রোজগেরে আকাশের জোর নেই, সে প্রতিবাদ করতে পারবে না, সুলগ্নার আধিপত্য তাকে মেনে নিতে হবেই। প্রতিবাদ শুরুতেই করা উচিত ছিল। সুলগ্নার রূপ আর শরীর তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল,সুখী দাম্পত্য আর সংসারের বড় লোভ ছিল প্রথমে। বিধবা মা নিজের ভিটেতে একা পড়ে থাকেন, তার কাকার পরিবার দেখভাল করেন,ফ্যামিলি পেনশনের টাকায় দিন চলে যায়।

আকাশ ক্রমশ কালো হয়ে আসছে, অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে চারদিকে, সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল আকাশ। সেই সামান্য দূর্ঘটনার পরে আর কখনো দেশের বাড়িতে যেতে দেয়নি সুলগ্না, কতকাল মায়ের মুখ দেখেনি সে। বাইক স্টার্ট করার আগে ফোন করল সুলগ্নাকে, “মহেশগড়ে একটা কবিতা পাঠের আসর আছে। সেখানে যাচ্ছি।ফিরতে রাত আটটা বেজে যাবে।”

“কবিতা পাঠের আসর? আকাশ, কবি হিসেবে তোমার স্ট্যাটাস আছে, নিজেই বলো। যেখানে সেখানে তাই যাও না। আগে তো বলোনি।”

“ভুলে গিয়েছিলাম।”

“আচ্ছা।”

সুলগ্নার স্কুল প্রায় ষাট কিলোমিটার দূরে,ফিরতে সাড়ে ছ’টা বেজে যায়। এই সময়ের মধ্যে দিব্যি ঘুরে আসা যেত। আকাশের তেমন জোরালো ইচ্ছেই হয়নি। শহরে নশো স্কোয়ারফুটের ফ্ল্যাট, সুলগ্নার উষ্ণ সান্নিধ্য, রিয়ার প্রাণচঞ্চল স্পর্শ এতসব ছেড়ে ষোলো কিলোমিটার দূরের অন্ধকার মলিন ঘরে কেন যাবে সে? কিছু পেতে হলে কিছু যে ছাড়তে হয় তা সবাই জানে।

আজ ইচ্ছে তীব্র হচ্ছে, চেপে রাখা যাচ্ছে না, কেমন এক অবাধ্য টান তাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে। দশ কিলোমিটার যাবার পরে মোবাইল বাজল। গাড়ি থামিয়ে দেখল আকাশ। সুলগ্নার ফোন, ধরতেই হবে।

“তুমি এখন শ্যামপুরার কাছে?’’

“ধুর। শ্যামপুরার কথা মনে হল কেন তোমার? মহেশগড় প্রায় পৌঁছে গিয়েছি।’’

ফোনের ওপ্রান্তে সুলগ্নার উত্তেজিত গলা, “তুমি আজকাল মিথ্যে বলতে শিখেছ? তোমার মোবাইলে অ্যাপস সেট করা আছে। গুগল লোকেটর। বাসে বসেও তুমি কোথায় যাচ্ছ তা জানতে পারি।’’

“লোকেটর কেন?’’

“বা রে, এত মহিলা অনুরাগী, ইনবক্সে এত কথা, ফোন, নজরে রাখতে হবে না? তোমার প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে তুমি দেখা করতে গিয়েছিলে বজবজে তা-ও জানি। এসব টুকটাক ব্যাপার মেনে নেওয়া যায়।’’

আকাশ চুপ করে থাকে।

সুলগ্না কড়াগলায় বলে, “আধঘন্টার মধ্যে তুমি ফিরে আসবে। ধানশোলের দিকে পা বাড়াবে না। এই আমি বলে দিলাম।’’

কবে কখন তার মোবাইলে অ্যাপস সেট করেছে খেয়ালই করেনি সে। সোশ্যাল মিডিয়া আর কথা বলা ছাড়া মোবাইলের বিভিন্ন অ্যাপস,কাজ ইত্যাদি ব্যাপার সে খেয়ালই করে না। বজবজে তার প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল তা সুলগ্না জেনেছে। এরপর ফিরে না গিয়ে দেশের বাড়ি ধানশোলে গেলে সমূহ বিপদ। আকাশ বাইকের মুখ ঘোরাল।

মোবাইল আবার রিংটোন নিয়ে জাগল। অচেনা নম্বর দেখেও ধরল সে। বলা তো যায় না সুলগ্নার নম্বর, নতুন নিয়েছে, যা জানেও না সে।

“হ্যালো।”

“আমি কি আকাশ মিত্রর সঙ্গে কথা বলছি?’’

“হ্যাঁ।’’

“আমি সিউড়ি থেকে প্রণয় মালাকার বলছি। এক কবির কাছে আপনার নম্বর জোগাড় করেছি। আপনার ‘মা’ সিরিজের কবিতাগুলো পড়ে আমি অভিভূত।”

আকাশ বিস্মিত হল। প্রায় এগারো বছর আগে বীরভূমের এক লিটল ম্যাগাজিনে দশটি কবিতা নিয়ে  বেরিয়েছিল ‘মা ‘সিরিজের কবিতা। তখন তার বিয়ে হয়নি,কবি হিসেবে প্রায় অখ্যাত। সেখান থেকে কিছু কবিতা নির্বাচিত করে নিজের  দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “ শাশ্বত আলোর গ্রামে” রেখেছিল সে। বইটি প্রশংসা আর পুরস্কার দুটোই পেয়েছিল।

“আপনার কবিতা আগে পড়িনি। কত কবি, কত কবিতা সব কি আর পড়া হয়ে ওঠে? এক বন্ধু আপনার “শাশ্বত আলোর গ্রামে” বইটি পড়তে দিয়েছিল। মুগ্ধ বললেও কম বলা হবে।”

আকাশের শুনতে ভালো লাগছিল, “আচ্ছা।”

“জানেন,আমার মা মারা গিয়েছেন তিনমাস আগে।”

“ওহ, ভেরি স্যাড।”

“কিন্তু আপনার কবিতা পড়ে মা-কে যেন ফিরে পাচ্ছি। চোখের সামনে মা যেন তার স্নেহ-মমতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন,তুলসিতলায় প্রদীপ দিচ্ছেন, ভিজে মাথা গামছা দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছেন। মা আবার ফিরে এসেছেন। মায়ের কথা তো অনেকেই লেখেন কিন্তু আপনার মতো আবেগের শিল্পিত শব্দে কেউ এভাবে মনে দাগ কাটেনি। আপনি  অসাধারণ স্রষ্টা। একটুও বাড়িয়ে বলছি না।’’

মোবাইল অফ করে দিল আকাশ। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল শালবনে,গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়াল সে। বৃষ্টির ধারা ধুইয়ে দিচ্ছিল তার চোখের জল…

 

সুমন মহান্তি
পশ্চিম মেদেনিপুর, ভারত



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top