সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৩০শে জুন ২০২২, ১৬ই আষাঢ় ১৪২৯


দৃষ্টি : সুতপা ধর চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
৩১ অক্টোবর ২০২০ ১১:৩৮

আপডেট:
৩১ অক্টোবর ২০২০ ১২:৩২

 

-দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?  

-আমি পার্স নিয়ে বেরইনি। পঞ্চাশ টাকা দাও তো !

পৃথ্বীরাজ পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে টাকাটা বাড়িয়ে দেয় কণ্ঠীর হাতে।

সামনের একটা ছোট গ্রসারির দোকান থেকে টাকাটা দিয়ে দু প্যাকেট বিস্কুট কেনে কণ্ঠী। দোকানের বাঁ পাশে বসে থাকা পাহাড়ি কুকুর দুটোর কাছে গিয়ে প্যাকেট খুলে সব বিস্কুট গুলো একে একে খাইয়ে দেয় দুটোকে।  তারপর ওদের নরম লোমে ঢাকা মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে এগিয়ে যায় পৃথ্বীরাজের দিকে।

-এখানেও? চোখ কুঁচকে বলে পৃথ্বীরাজ, বিরক্তি লুকোতে গিয়েও পিছলে বেরিয়ে আসে চোখ দিয়ে।

কণ্ঠী কিছু না বলে মুখ নামিয়ে হাঁটতে শুরু করে।

পাহাড়ের গা বেয়ে বিকেল গড়িয়ে পড়ছে মাখনের মতো। ঠিক লালও না, কমলাও না, আবার হলুদও না। এ সবের মিশেলে অন্য কী এক সম্মোহনী রঙ! আকাশের পশ্চিম কোণ ঘেঁষে আলাদা করে বসে  বিদায়ী রঙ ছড়াচ্ছে সূর্য। কণ্ঠী  চোখ দিয়ে চেটে নেয় সেই মাখনের স্বাদ।

পাঁচ দিন হোল বেড়াতে বেরিয়েছে কণ্ঠী পৃথ্বীরাজের সঙ্গে। পৃথ্বীরাজের পাহাড় পছন্দ। পাঁচ বছর ধরে তাই পাহাড় দেখতে দেখতে এখন সমুদ্রের বদলে পাহাড়ই পছন্দ করে ফেলেছে কণ্ঠী। বয়েস বাড়ছে বলেই বোধ হয় মুখরতা থেকে মৌনতায় ডুবতে চাইছে মন।

ডালহৌসির ছোট্ট শহরের পাহাড়ি ঢাল বেয়ে অনেকটা ওপরে উঠে এলো ওরা। এই  চত্বরটা বেচাকেনার জায়গা। রাস্তার দুপাশে পরপর সাজানো জিনিসের পসরা। সাজগোজ, জামাকাপড় ছাড়াও বেশ কিছু খাবারের দোকান। সাহেবি মডার্ন কায়দায় সাজানো কফি সপগুলোতে ভারতীয়দের সাথে সাথে বিদেশিদের আনাগোনা চোখে পড়ে, নাকে এসে  লাগে কফি আর চকলেটের সুগন্ধি মৌতাত।

একটা জমজমাটি মোমোর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল পৃথ্বীরাজ। কণ্ঠীর দিকে তাকিয়ে বলল- খাবে?

মোমো পাগল পৃথ্বীরাজ। কলকাতায় শপিং মলে গিয়েও মোমো  খোঁজে ও। কণ্ঠীর অপছন্দের খাবার নয় ঠিকই, তবে কলকাতার মোমো নয়, পাহাড়ের  মোমো  হোতে হবে সেটা। কোলকাতার মোমো ওর  ভালো লাগেনা।

হাল্কা হেসে ইতিবাচক ঘাড় নাড়ল কণ্ঠী। পাহাড়ে এসে মোমো খাবেনা তা কি হয়?

খেতে খেতে অস্বস্তিতে পড়ল কণ্ঠী। সামনে দাঁড়ানো তিনটে ছেলের মধ্যে একজনের দৃষ্টি ঠায় ওর দিকে নিবদ্ধ। খাচ্ছে কম, দেখছে বেশি।

গা টা ঘিন ঘিন করে উঠল কণ্ঠীর। গপগপ করে মুখে পুরতে লাগল গরম ধোঁয়া ওঠা মোমো। যেন ও তাড়াতাড়ি খেলেই পৃথ্বীরাজেরও খাওয়া হয়ে যাবে আর ও-ও ওই চ্যাটচ্যাটে দৃষ্টি থেকে রেহাই পাবে।

-এতো তাড়াতাড়ি খাচ্ছ কেন? মুখ পুড়ে যাবে তো? পটি পেয়েছে?

পৃথ্বীরাজের কথাবার্তাই এরকম। অন্য সময় মজা পেলেও এখন তা বোধ হোল না কণ্ঠীর। কথা না বাড়িয়ে খাওয়ার গতি কমিয়ে দিল ও।

ছেলেটা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সরে এলো কণ্ঠী পৃথ্বীরাজের দিকে।

কি চায় ছেলেটা?

-একটু তাড়াতাড়ি খাও। শীত করছে। কফি খাব। কণ্ঠী তাড়া দেয়।

মোমো খেয়ে দাম মিটিয়ে ওরা দোকান ছাড়ে। ছেলেটা মুখ দিয়ে একটা কুৎসিত ইঙ্গিতের আওয়াজ করে, কণ্ঠীর কান এড়ায় না।

রাস্তা বেয়ে উঠে এসেছিল ওরা। এবার নামবার পালা। ঢালু রাস্তায় নামতে গেলে চলার গতি একটু বেড়ে যায়। সেই গতিতেই নামতে থাকে ওরা। কণ্ঠীর মেজাজটা তেঁতো হয়ে আছে। এখনও ঘিনঘিন করছে ওর ভেতরটা। পৃথ্বীরাজ একা একাই কথা বলে যাচ্ছে।  সামান্য হুঁ হাঁ ছাড়া আর কোন অভিব্যক্তি উঠে আসছেনা ভেতর থেকে।  

হাঁটতে হাঁটতে  কফি শপ দেখতে থাকে পৃথ্বীরাজ। আছে তো অনেক কটাই কিন্তু হয় পছন্দ হচ্ছে না আর নয় তো বড্ড ভিড়। কিছুটা যাওয়ার পর বাঁদিকে একটা ছোট কিন্তু আধুনিক কায়দায় সাজানো কফি শপ পছন্দের আওতায় আসতেই  সেটাতে ঢোকে ওরা।

বাইরের চেয়ার গুলো বিদেশিদের দখলে। কণ্ঠীর ইচ্ছে ছিল বাইরের টেবিল নেয়। বাঁ দিকে তাকালেই সুউচ্চ পর্বত আর তার সবুজ গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সূর্যের রঙ। ডুবু ডুবু সূর্য দেখা যাচ্ছে বেশ খানিকটা।

ভেতরের টেবিলে গিয়ে বসল ওরা। দু একবার আফসোস করল কণ্ঠী বাইরের চেয়ার পায়নি বলে।

-তোমার সবটাতেই বাড়াবাড়ি। এই পাঁচ দিনে কতবার সূর্যের ওঠাপড়া দেখলে। তাও মন ভরে না? পৃথ্বীরাজ ঝাঁঝিয়ে উঠল।  

উত্তর না দিয়ে কণ্ঠী জানলা দিয়ে পাহাড়ের গায়ে ঢলে পড়া  অস্তরাগের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি রাখল।

-কফির সাথে কি নেবে? অর্ডার টা দিয়ে দি

পৃথ্বীরাজের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মুখ ঘোরাতেই একটা ঝটকা এসে লাগল চোখের তারায়। কণ্ঠীর  উলটো দিকে ডানদিক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেলে। মাথায় কোঁচকান চুল, ফর্সা গায়ের রঙ। পরনে কালো টি সার্ট বলে দিচ্ছে ছেলেটি এই কফি শপেই কাজ করে। গভীর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি নিয়ে দেখছে কণ্ঠীকে।

কণ্ঠী সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কি জ্বালা! আজ দেখছি এই দেখেই দিনটা নষ্ট হবে। মনে মনে বলল কণ্ঠী। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার নিজেই দেখল ছেলেটাকে। তাকিয়ে আছে। মুখ ঘোরালো কণ্ঠী। আবার তাকাল। আশ্চর্য! এতো বার ও নিজেই তাকাচ্ছে কেন? গা ঘিনঘিন করছেনা কেন? কণ্ঠী উপলব্ধি করল  সেই চাউনি পাখির শরীরের মতো নরম। একটা দুঃখী ভালমানুষের মতো মুখের ওপর  দুটো চোখ মুগ্ধ আর সম্মানের সঙ্গে দেখছে ওকেই।

চমক!

কণ্ঠীর নাভির কাছ থেকে সিরসিরে একটা স্রোত বয়ে ছড়িয়ে গেল গোটা শরীর জুড়ে।

হঠাত্‌ চোরা একটা ভালোলাগার সুখানুভূতি কণ্ঠীকে স্পর্শ করেই মিলিয়ে গেল।

মুখ ফিরিয়ে পৃথ্বীরাজের দিকে তাকাল। মেনু কার্ডে নিমগ্ন পৃথ্বীরাজ।

কণ্ঠী বলল- ঝাল ঝাল কিছু অর্ডার কর। ঝাল খেলে শীত কমে।

-এই এক শীত কাতুরে বুড়ি। কফি কি খাবে? কেপাচিনো ?

না। এদের লোকাল কফি কিছু নেই? দেখ না?

আবার মেনুতে ঝুঁকে পড়ে পৃথ্বীরাজ।

কণ্ঠী চোরের মতো চারদিকে তাকিয়ে খোঁজে সেই দৃষ্টি।

ডান পাশে একটু ভেতর দিকে কাউন্টারে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। কাউন্টারের পাশে কিচেনের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। তার পাশেই কফি মেশিন।  তিন চারটি ছেলে খাবার কফি বানাতে ব্যস্ত।

সে নজরে এলো না।

কণ্ঠী আবার সূর্যের বিদায়ী রঙ দেখার চেষ্টা করে। মন বসে না।

মুখ ফেরাতেই আবার সেই চোখ। ডান দিকে  কফি মেশিনের পাশ থেকে দেখছে কণ্ঠীকে।

এ কি আশ্চর্য ! কণ্ঠীর এতো ভালো কেন লাগছে এই পাওয়াটুকুকে? ওর রুচি, আজন্মকালের সংস্কার , অভ্যেস বিরুদ্ধআচারণ করছে অথচ কণ্ঠী তাকে শিশুর মতো প্রশ্রয় দিচ্ছে!

পৃথ্বীরাজ অর্ডার দিতে চেয়ে  এক্সকিউজ মি বলে হাত নাড়তেই ছেলেটি ওদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো।

খুব নম্র শান্ত গলায় কথা বলে অর্ডার টা নিয়ে আলগোছে আর একবার কণ্ঠীর চোখের ওপর ওর নরম দৃষ্টি রেখে চলে গেল।

চলতে লাগল এই দেখাদেখির নীরব আদান প্রদান। কণ্ঠী সাবধানী  কায়দায় দেখছে তাকে। বুঝতে দিচ্ছেনা। ছেলেটা তার চেয়ে অনেক সোজা সাপটা। নিজের অকপটতা বুঝিয়ে দিচ্ছে খুব সাবলীল ভঙ্গিমায়।

কফি শপ ছাড়ার সময় কণ্ঠী ছেলেটিকে দেখতে পেল না।

একটু যেন মন খারাপ হয়ে গেল।

সন্ধে পুরো দস্তুর জাঁকিয়ে বসেছে পাহাড়ি শহরটায়। রাস্তায় পর্যটকদের ভিড়। দু পাশ জুড়ে বসা দোকানগুলোয় তাদের দরকার। কেনাকাটার হুজুগ।

ভিড় বাঁচিয়ে ঢালু পথ বেয়ে  তাড়াহুড়ো হীন পায়ে হোটেলে ফিরল কণ্ঠী। গোটা রাস্তাটা ছেলেটার চোখের চাউনি ওকে আচ্ছন্ন করে রাখল।

নিজের মনের গতিবিধির এই আশ্চর্য রকম পরিবর্তন নিয়ে থেকে থেকে আসা ভাবনাটাকে সায় দিল না। ভাবতে গিয়েও ভাবল না- এটা ঠিক নয়।

পরদিন আবার একই জায়গায় ওরা । হাতে লোকাল কফির কাপ, প্লেটে সুস্বাদু স্ন্যাক্স, চোখের সাথে চোখের মিল।

রাত ভর ঘুম হোল না কণ্ঠীর। একই ভাবনা ঘুরপাক খেতে লাগল আলো আঁধারি ঘরের অতন্দ্র নিরবতায়- কেন ওই দৃষ্টি ওকে এভাবে আকর্ষণ করল? সম্মোহিত করল? ওই  দৃষ্টিতে কোন রকম লোভ ছিল না। অসম্মান ছিল না, অতিশয়তা ছিল না, ছিল না কোন পাপ। এই সব ছাপিয়ে যা ছিল  তার তিব্রতায়, তার জোরে সে , কণ্ঠী এতটা পথ হাওয়ায় হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে, সমুদ্র জলে  ডুবতে ডুবতে চলে এলো?

কাল ওদের কোলকাতায় ফেরার ফ্লাইট। এই অভিনব নির্ভেজাল আশা প্রত্যাশা হীন প্রাপ্তি আর ভাললাগা টুকু সঙ্গে নিয়ে ফিরবে কণ্ঠী প্রাত্যহিক জীবনে। কত  পুরুষই তো তাকে বয়সের বিভিন্ন ধাপে কত রকম ভাবে দেখেছে। কিন্তু এমন দৃষ্টি  সে আর কারুর চোখে দেখেনি- এই  অভিজ্ঞতা রোজকার জীবনের ছোঁয়া বাঁচিয়ে রেখে দেবে আজন্ম কাল।

কোলকাতায় ফিরেই বৃষ্টি পেল কণ্ঠী। বৃষ্টি মানে টানা একঘেয়ে অবিরাম।  মানুষকে তিতিবিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে তবে বিদায় নিল তিন দিন পর।

ফিরে এসে ঘরদোর গুছিয়ে কাচাকুচি করে বাক্স  প্যাঁটরা যথাস্থানে তুলে রেখে  দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে ফিরতে কণ্ঠীর তিনটে দিন কেটে গেল।

সেদিন সন্ধে বেলা। হু হু করে ঝেঁপে এলো মন কেমনের ঝড়। সেই নরম মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি কণ্ঠীকে না চাইতেও নিয়ে যাচ্ছে এক অন্য কোথাও যেখানে মন কেমনের আকাশ ওর স্বাভাবিকতাকে ঢেকে দিচ্ছে।

পারছেনা কণ্ঠী সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে।

হঠাৎ  বিছানার একপাশে পড়ে থাকা স্মার্ট ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে  গুগুল সার্চ করে হোটেলের নামটা বের করল কণ্ঠী। ডিটেইল দেওয়া আছে সেখানে। হোটেলের নাম, ফোন নাম্বার লোকেশন ইত্যাদি ইত্যাদি। ইমেজে  ক্লিক করল ও। পেয়ে গেল সেই টেবিল চেয়ার, কফি মেশিন, কাউন্টার  সবকিছুর ছবি।

টানাপড়েন  সামলাতে লাগল বেশ কয়েক মিনিট। তারপর ডায়াল করল নাম্বার।

কয়েকবার বাজতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো গলা।

কাঁপা কাঁপা গলায় কণ্ঠী  চেহারার  বিবরণ  দিল। অনুরোধ  করল ডেকে দিতে।

কয়েক মুহূর্ত দম বন্ধ করা প্রতিক্ষা। চাপা উত্তেজনার ভার সামলাতে পারবেনা বোধহয় কণ্ঠীর চেতনা-  এমনই  তীব্র অনুভূতির মধ্যে থেকে কণ্ঠী যেন শুনতে পেল বহুদূর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠ... হ্যালো

ক্ষিপ্র আঙ্গুলে ফোন কেটে দিল কণ্ঠী।

সব অনুভুতিকে নিজের পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে দেখে দৈনন্দিনতার আওতায় আনার মতো ভুল করতে ইচ্ছে হোল না কণ্ঠীর।

 

সুতপা ধর চট্টোপাধ্যায়
সোদপুর, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত                                              



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top