সিডনী সোমবার, ২৭শে জুন ২০২২, ১২ই আষাঢ় ১৪২৯


অন্তরণ : অমিতাভ ভট্টাচার্য্য


প্রকাশিত:
১৯ জুন ২০২১ ০৯:১০

আপডেট:
২৭ জুন ২০২২ ০২:১৬

 

দূর থেকে ফারুক চাচাকে আসতে দেখে মইদূল  আর তার বন্ধুরা তাড়াতাড়ি সামনের অশ্বথ্ব গাছের ওপরের দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য কিছু একটা সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করে দিল। কাছাকাছি এসে ফারুক চাচা ভুরু কুঁচকে একবার তাকাল ওদের দিকে। তারপর সামনের রাস্তা ধরে চলে গেল।  তাই দেখে মইদূল বললে, “বুঝতে পেরেছে মনে হয়। আজ কপালে দুঃখ আছে আমার”। শিবু বললে, “একটা লেবুপাতা চিবিয়ে নিবি সব গন্ধ চলে যাবে”। হারু প্যান্টের পকেট থেকে একটা লেবুপাতা বের করে মইদূলকে দিয়ে বললে, “এই নে, চিবো এটা”। শিবু আর হারু আগে থেকেই বিড়ি খায়। ওরা জানে কিভাবে বিড়ির গন্ধ তাড়ানো যায়। কিছুদিন আগে একবার বাড়ির কাউকে না জানিয়ে ইস্কুলে যাবার সময়ে শহরে গিয়ে বেশ কিছুদিন রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করেছিল ওরা। তখন থেকে ইস্কুলে যাওয়া ওরা বন্ধ করে দিয়েছে। ওদের ভাল লাগেনা সারাদিন একটা ঘরের মধ্যে বন্দি থাকতে। তার ওপরে কাঁচা পয়সা হাতে পাওয়ার স্বাদও অন্যরকম। ইস্কুলে না যাবার খবরটা ওদের বাড়ির লোকজনেরা প্রথম দিনই পেয়েছিল। কিন্তু ওদের কেউ বকাঝকা করেনি। ওরা কাজ করে যা রোজগার করেছিল, তার প্রায় সবটাই বাবার হাতে তুলে দিত। বাঁধাধরা মাস মাইনের কোন কাজ ওরা করে নি। রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ের কাজ প্রায় দিনই পেয়ে যেত। যেদিন কাজ থাকত না, সেদিন তিন বন্ধু গ্রামের মধ্যেই এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াত। কখনও পুকুর পাড়ে যেত দুলির সাথে গল্প করতে। দুলি যে বিরক্ত হত তা ওরা বুঝত না। বুঝবেই বা কি করে। দুলি যে ওদের ছোটবেলার বন্ধু। ছোটবেলা থেকে ওরা একসাথে গাছে ওঠা থেকে শুরু করে পুকুরে ঝাঁপানো, এইসব করতে করতে বড় হয়েছে। কিন্তু এখন যে দুলি বিয়ে হয়ে অন্যের বৌ, সেকথা ওদের মন মানতে চায়না।। কাজ ফেলে দিয়ে ওদের সাথে গল্প করার মত সময় কি আর দুলির আছে? পুকুর পাড় থেকে বেরিয়ে এলোমেলো ঘুরতে ঘুরতে মইদূলের আবার বিড়ি খাবার ইচ্ছে হল। বড়দের লুকিয়ে বিড়ি খাবে বলে ওরা বড় রাস্তার দিকে চলে গেল। বেলা বাড়াতে থাকলে ওদের পেটের খিধেও বাড়তে থাকে। তখন ওরা যে যার বাড়ির দিকে চলে যায়।         

বাড়ি ফিরে ফারুক চাচাকে দাওয়ায় বসে সিগারেট টানতে দেখে মইদূল দমে গেল।। ওর বাড়ির লোকজন ফারুক চাচাকে ঘিরে আছে। শিবুর বাবা, হারুর বাবাও রয়েছে সেখানে। মইদূল বুঝতে পারল তার কপালে নির্ঘাত দুঃখ আছে। “সেলাম ওয়ালেকুম চাচাজান”-খুব নরম গলায় বলল মইদূল। ফারুক চাচা বলল, “ওয়ালেকুম সেলাম,  আয়, বস এখানে”। ফারুক নিজেকে এই গ্রামের মুরুব্বী বলে মনে করে। অনেকেই ওর কাছে আসে শলা- পরামর্শ করতে। বড়ছেলেকে রোজগার করতে আরব দেশে পাঠিয়েছিল বছর পাঁচেক আগে। এখনও সে ঐ দেশেই আছে। মাসে মাসে ভাল টাকা পাঠায়। এক মাসের সবেতন ছুটি পায় বলে বছরে একবার করে দেশে আসে। বয়স ত্রিশ ছুঁতে চলল ছেলের। বাপ এখনও তার বিয়ে দেয়নি। ছেলের বৌ হিসেবে দুলিকে খুব পছন্দ ছিল ফারুকের। ফয়জলের একমাত্র মেয়ে। টাকা পয়সা, জমি জমা খুব একটা কম নেই ওর। ফারুক উঠে পড়ে লেগেছিলো দুলিকে ছেলের বৌ করে ঘরে তুলবে বলে। কিন্তু কি কারনে যে দুলি ওর ছেলেকে বিয়ে করতে রাজী হয়নি, ফারুক তা জানে না। ফারুক এখন খুব শিগগির বড় ছেলের বিয়ে দেবেনা। সম্পত্তির পরিমাণ আরও বাড়িয়ে তারপর বিয়ের কথা ভাববে। ছেলেদের জন্যে আগে থাকতে সবকিছু গুছিয়ে রেখে দিতে চায়। ছোট ছেলের আঠারো পেরোতেই ফারুক এক ঠিকাদারের কাছে পাঠিয়ে দেয় কাজ শেখার জন্য। এখন তার বয়স তেইশ ছুঁই ছুঁই। কিছুদিন হল একটা ঠিকাদারির কাজ পেয়েছে। জন দশেক জোয়ান মরদ দরকার তার। মাইনে দেবে, তারসাথে থাকা খাওয়াও দেবে। শিবু, হারু আর মইদূলদের বাবা মায়েরা রাজী ফারুকের প্রস্তাবে। ছেলেরা বড় হয়েছে। এখন ঘরে বসে থাকলে কি করে চলবে তাদের? মইদূলের বাবা গ্রামের আরও বেশ কয়েকজন ছেলের খবর দিল ফারুককে। ওদের কাজে লাগিয়ে দিতে পারলে, ঐ পরিবারগুলোও বেঁচে যাবে। উপকার করার সুযোগ পেলে ফারুক কখনো কার্পণ্য করে না। সে আজই ওদের সাথে কথা বলবে বলে জানাল।

ফারুক সেখান থেকে বেরিয়ে তারকের সাথে দেখা করার কথা ভাবল। ওর বন্ধু তারকের বাড়ি এই পথেই। সে  তারকের বাড়িতে এসে ডাকল, “তারক আছিস নাকি?” তারক ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ফারুককে নিয়ে দাওয়ায় বসালো। ফারুকের জমির পাশেই তারকের বেশ কয়েক বিঘে জমি আছে। গত বছর সেখানে কোন কিছুর চাষ করেনি সে। এবছরেও এখনো শুরু করেনি। ফারুক জানতে চাইল, জমিটাতে সে চাষ করবে, নাকি ওই ভাবেই ফেলে রাখবে। তারক শুনে একটু হাসল। গত বছরের আগের বছর ঐ জমিতে যে ফসল হয়েছিল, সেই ফসল বিক্রি করে সে ভাল দাম পায়নি। যা পেয়েছিল তাই দিয়ে বীজ কিনতে গেলে সার কেনা হয়না, সার কিনতে গেলে বীজ কেনা হয় না। অনেকটা নুন আনতে পান্তা ফুরনোর মত। গত বছরে ঘরটা ভাল করে ছাইতেও পারেনি খড়ের অভাবে। এবার বর্ষায় ঘরের যে কি হাল হবে কে জানে। ফারুক ওকে ওই জমিটা বিক্রি করার পরামর্শ দিল। শুনে তারক বললে, “ঐ জমি আমার বিপদের দিনে মুশকিল আসান। ও আমি বেচব না।” ফারুক তাকে আশ্বস্ত করে বলল, “তুই আমার দোস্ত, তোর বিপদে তো আমি আছি।” তারপর দাওয়া থেকে নামতে নামতে বলল, “ভাল করে ভাবনা চিন্তা করে আমাকে জানাস। আমি হপ্তা খানেক পরে আসব”। তারকের তিন ছেলে। সবার ছোটটির বয়স উনিশ। তিন ভাইই শহরে গিয়ে জন খেটে কিছু না কিছু রোজগার কোরে কোন রকমে সংসার চালাচ্ছে। ফারুক চাইলেই তারকের ছেলেদের নিয়মিত ভাল রোজগারের জন্য ওর ছোটঁ ছেলের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ওদের তিন জন কে কি ভালো কাজ যোগাড় করে দেওয়া ঠিক হবে? তিন ছেলে নিয়মিত রোজগার করতে শুরু করলে, ঐ জমি তারক আর বেচবে না। তারকের জমিটা কিনতে পারলে ফারুকের চাষের জমি অনেক বড় হয়ে যাবে। অনেক কাজ পড়ে আছে। ফারুক পা বাড়াল বাড়ির দিকে।

দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে ভাতঘুম দেবার অভ্যাসটা ফারুকের কিছুদিন ধরে হয়েছে। বিছানায় গা লাগাতেই আজ ঘুমটা যেন চোখের নাগালে এসে, পাতা দুটোকে বন্ধ করে দিল। আচমকা বেগম সাহেবার ডাকে ওর চোখ খুলল, তাও অনেক বেলায়। ফারুকের নিজেকে আজকাল চাষাভুষোর মুরুব্বী বলে ভাবতে ইচ্ছে করেনা। নিজের জমিজমা তো আছেই। তার ওপরে বড়ছেলের দৌলতে পরিমাণ আরও বেড়েছে। মাঝে মাঝে বৌকে ‘বেগম সাহেবা’ বলে ডাকতে ইচ্ছে করে ফারুকের। ‘বেগম সাহেবা’ বলে ডাকলে মনের মধ্যে কিসের যেন তুফান ওঠে। বেগম ওকে বলল, গ্রামের কিছু লোকজন তাদের ছেলেদের কাজের জন্য এসেছে। ফারুক আর দেরী না করে বাইরে বেরিয়ে গেল দাওয়ায় বসে থাকা লোকজনদের কাছে। তাদের বিস্তারিত ভাবে জানাল, কোথায় কাজ করতে হবে, কি কাজ করতে হবে, কত টাকা হাতে পাবে। তার সাথে এও জানাল, সেখানে থাকা খাওয়ার জন্য কোন খরচ তাদের করতে হবেনা। শুনে তারা খুশি মনে রাজী। কয়েকদিন পরে ট্রেনের টিকিট কেটে, ফারুক সবাইকে একসাথে তার ছোট ছেলের কাছে পাঠিয়ে দিল। এরপর তার কাজের মধ্যে রয়ে গেল, সকালবেলা নিজের জমির কাজের তদারকি করা। তারপর ফিরে এসে খাওয়া দাওয়া করে একটা নির্মল ভাতঘুম দেওয়া। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দাওয়ায় বসে মুরুব্বি গিরি করা। আজকাল এই ভাবেই দিন কাটছে ফারুকের।              

একদিন দুপুর বেলা খেয়ে দেয়ে উঠে ফারুক দেখল ভাত খাবার পর রোজ যে ঝিমুনিটা আসে, আজ সেটা আসছে না। একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।  শুনতে পেল বিছানার ওপরে রাখা ফোনটা বেজে চলেছে। এতক্ষণ খেয়াল করেনি। বিছানার কাছে যেতে যেতে আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেল। কে ফোন করেছে দেখবার জন্য ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে তার ছোট ছেলে ফোন করেছিল। এই সময়ে সে কোনদিন ফোন করে না। কোন অসুবিধেয় পড়ল না তো? সে তার ছোট ছেলেকে ফোন করে জান‌ল, যারা ওর কাছে কাজ করতে গেছে, তাদের কারোর ব্যাঙ্ক একাউন্ট নেই। তাই সে তার বাবার ব্যাঙ্ক একাউন্টে সবার মাইনেটা পাঠিয়ে দিয়েছে। কাজে ব্যস্ত থাকায় ফারুক বুঝতেই পারেনি দেখতে দেখতে একমাস হয়ে গেছে। ঠিক করল পরের দিন ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকা তুলে প্রত্যেককে তাদের মাইনে তাদের বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসবে। আর প্রত্যেকের মাইনে থেকে একশ টাকা করে কাটবে ‘সার্ভিস চার্জ’ হিসেবে।

পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে তাদের মাইনের টাকা দিয়ে এলো।  প্রত্যেককে টাকা দেবার সময় তাদের কাছ থেকে একশ টাকা করে কেটেও রাখল। কেউ তাতে আপত্তি করেনি। ফারুক বাড়ি ফিরে দেখল হাজার খানেক টাকা তার রোজগার হয়েছে। এইভাবে মাস ছয় সাতেক চলার পর একদিন তার ছোটছেলে ফোন করে জানাল, “তিনদিন ধরে আমরা ঘরে বন্দি হয়ে আছি”। ফারুক উদবিঘ্ন হয়ে পড়ল ছোট ছেলের কথায়। কেন বন্দি হয়ে আছে জানতে চাওয়ায় যা বলল তা শুনে ওর মাথা ঘুরে গেল। কি এমন রোগ ছড়িয়েছে যে সারা দেশের সবকিছু বন্ধ করে দিতে হবে? কই, এখানে তো সব কিছু খোলা। একুশ দিন ধরে সব কিছু বন্ধ থাকলে রোগ সেরে যাবে? কি করে চলবে সবার? ছেলেকে কি বলবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে রইল। ঘরে টিভি আছে একটা। কিন্তু দেখা আর হয়ে ওঠেনা। ধৈর্য্য জিনিসটা ফারুকের চিরকালই স্বাভাবিকের থেকে অনেক কম। দেশের খবর জানবার জন্য তখনই টিভি খুলতে গেল। ওর বেগম ওকে বললে, “জামাল ভাইয়ের কাছে গিয়ে খবর নাও। ও অনেক খবর রাখে”। এই কথা শুনে ফারুকের মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। বেগম সাহেবা জামাল ভাইয়ের খবরাখবর রাখে; অথচ নিজের শৌহরের খবর রাখে না। মনে মনে রাগ হল জামালের ওপরে।    

একে নানা চিন্তা মনের মধ্যে; তার ওপরে এই জামাল। বেগম মনে মনে তাকে কি যে ভাবে কে জানে। এই ভাবনা সব সময় তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সে জামালের বাড়ির দিকে রওনা দিল। জামাল শেখ-এর বাড়ির দরজায় পৌঁছে, “দুলাভাই বাড়ি আছো?” বলে হাঁক পাড়তে পাড়তে ঢুকে পড়ল সে। “আরে ফারুক মিঞা, এই অসময়ে তুমি?” জামাল দাওয়ায় বসেছিল। ফারুক দাওয়ায় উঠে জামালের পাশে বসে বলল, “তুমি নিজেকে কি ভাবো বলত দুলাভাই?” জামাল তাড়াতাড়ি উঠে ফারুকের থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে বসল। জামালের এই দূরে সরে বসাটা ফারুকের চোখে কেমন যেন লাগল। সে জামাল কে কিছু বলল না। জামাল মুখে মাস্কটা লাগাতে লাগাতে বলল, “আমি নিজেকে কি ভাবি তা নিয়ে আমি কোনদিন ভাবিইনি। কিন্তু তুমি হঠাৎ আমাকে নিয়ে ভাবতে গেলে কেন, বল দেখি”।

ভাবছি কি আর সাধে? এসেছি বেগম সাহেবার হুকুমে। কী গুণ যে করেছো তাকে, তুমিই জানো। যে সমস্যাই হোকনা কেন, তার জামাল ভাইয়ের কাছ থেকে সমাধান করে না আনলে হবে না।

আসল কথাটা কি, বল দেখি শুনি।

আমার ছোট ছেলে আর তার লোকজন আজ তিন দিন ধরে ঘরে বন্দি। ওদের কোম্পানি কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। বলেছে সরকার থেকে লক ডাউন না কি যেন জারি করেছে। একুশ দিন নাকি সব কিছু বন্ধ থাকবে। ওদের ঘরে যা খাবার ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। এখন বাইরেও বেরতে পারছে না। বেরলে নাকি পুলিশ ধরে ধরে পেটাচ্ছে। এখন কী উপায় আছে ওদের জন্য, বলে দাও।

এখনই ফিরে আসা ছাড়া ওদের আর কিচ্ছু উপায় নেই। তিন দিন ঘরে আটকে থেকে, খাবার শেষ হয়ে যাবার পর ওর মনে হয়েছে এখন বাড়িতে জানানো দরকার। তোমার ছেলে যে তোমার মতই হয়েছে দেখছি। ওদের চলে আসতে বল তাড়াতাড়ি।

সব যদি বন্ধ থাকে তবে ওরা আসবে কি করে?

সেকথা ভাববার ইচ্ছে যদি তাদের থাকতো, তাহলে কি এমন পড়িমরি করে গোটা দেশে লক ডাউন ঘোষণা কোরত? গত তিন চার মাস ধরে করোনা ভাইরাস গোটা পৃথিবীটাকে তোলপাড় করছে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলছে। তখনই আমরা জেনেছি যে, এই ভাইরাসকে শরীরে প্রবেশ করতে না দিলে, ওরা তার ক্ষতি করতে পারবে না। আমরা কি তা করেছি? না এখন করছি? নিজেকেই দেখ, মাস্ক পরোনি, আর সামাজিক দূরত্বের ধারও যে ধারনা সে তো একটু আগে দেখতেই পেলাম। তাছাড়া সাবান দিয়ে হাত ধোওয়ার সময় আছে নাকি তোমাদের? কাজকর্ম বন্ধ করে ঘরে বসে থাকলে মানুষ নিজেই বা খাবে কি, আর ঘরের লোকেদেরই বা কি খাওয়াবে? খাবার তো আমার মতো লোকেদের ঘরে মজুত করা থাকে না। গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে যাবে এই তোমাদের মত লোকেদের জন্য।   

আমি আবার কি করলাম। তুমি সবসময় আমার দোষই খুঁজে বেড়াও, দুলাভাই।

ফারুকের নির্ভেজাল বোকার মত কথা শুনে জামাল হেসে ফেলল; বললে, “সময় নষ্ট না করে ছেলেকে ফোন করে চলে আসতে বল। পরে যে আরও বিপদ আসবে না কে বলতে পারে?”

পরদিন সকালবেলা ফারুকের ঘুম ভাঙল বেগমের চেঁচামেচিতে। ব্যাপারটা কি বোঝবার জন্য উঠে পড়ল তাড়াতাড়ি। বেগমের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল তার বড় ছেলে সকালবেলা এয়ারপোর্ট থেকে ফোন করেছিল। জানিয়েছে, সে চলে এসেছে। সে দেশেও কাজকর্ম সব বন্ধ। এয়ারপোর্টে যে কজন প্লেন থেকে নেমেছে, এয়ারপোর্টে তাদের সবার করোনা টেস্ট করা হয়েছে। বেশ কয়েকজনের করোনা রিপোর্ট পজিটিভ।ফলে কেউই এখন বাড়ি যেতে পারবেনা। চোদ্দ দিন ‘কোয়ারেন্টিনে’ বা ‘সেফ আইসোলেশন’ থাকতে হবে। আর তাই শুনে সাত সকালে তার আম্মা কান্নাকাটি, চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। ফারুক ঘুম থেকে উঠতে তার বেগম তার কাছে ফরমায়েশ করলেন, ছেলেকে যে করেই হোক আজই এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি নিয়ে আসতে হবে। এয়ারপোর্ট দুশ কিলোমিটারের মত দূরে। লক ডাউনের বাজারে সেখানে যাওয়াও তো চাট্টিখানি কথা নয়। বেগম ফারুককে জামালের সাথে পরামর্শ করতে বলল। জামাল শেখকে ফোন করল ফারুক। সমস্যার কথা জানাল। জামাল তাকে বলল, “সরকারের নির্দেশে তোমার ছেলেকে যদি চোদ্দ দিন আলাদা কোথাও থাকতে হয়, গ্রামের লোকেদের পক্ষে সেতো ভাল কথা। সরকারি নির্দেশ অমান্য করাটা ঠিক কাজ হবে না। তুমি চিন্তা কোরোনা, ও ভালই থাকবে সেখানে”।   

শহর থেকে হাই রোড ধরে কিছুটা এগোলে বাঁদিকে একটা রাস্তা নেমে গ্রামের মধ্যে চলে গেছে। রাস্তার ওই মোড়ের মাথায় একটা বিরাট বটগাছ তার জটাজুট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বহু বছর ধরে। লোকের মুখে ওই জায়গাটার নাম ‘বটতলার মোড়’। বটগাছটার নিচে একটাই চায়ের দোকান, বন্ধ করবো করবো করছে। জামালকে সাইকেলে করে আসতে দেখে, সে আবার স্টোভটা জ্বালিয়ে চায়ের জল বসাল। সেই সময় একটা ঝাঁচকচকে গাড়ি এসে দাঁড়ালো চায়ের দোকানটা পার করে বাঁদিকে। গাড়ি থেকে নেমে এলো যে ছেলেটা, তাকে দেখে জামাল অবাক। “আরে লতিফ, তুই চলে এলি কি করে? তোর তো এয়ারপোর্টে চোদ্দদিন আলাদা থাকার কথা”- জামাল লতিফকে বলল। লতিফ বলল “তোমাকে দেখতে পেয়ে দাঁড়ালাম”। যে ছেলেটি গাড়ি চালাচ্ছিলো, সে গাড়ি থেকে নেমে এসেছে ততক্ষণে। জামাল লতিফকে বলল, “ আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে ভালো করেছিস তোরা। এখন গ্রামে ঢুকিস না। আমি তোর বাবাকে এখানে আসতে বলছি। তারপর গ্রামের বাইরে কোথাও একটা বন্দোবস্ত করা যাবে”। লতিফ কিছু বলার আগে ড্রাইভার ছেলেটি বলল, “তাহলে আপনার জিনিস পত্র এখানে নামিয়ে দিচ্ছি। অতক্ষণ আমি থাকতে পারবনা”। লতিফ আর তার ঐ ড্রাইভার ছেলেটির সাথে কথা বলতে বলতে জামাল দেখতে পেল গ্রামের দিকের রাস্তা দিয়ে মোটর সাইকেলে চেপে ফারুক আসছে। তার মানে লতিফ ওকে এর মধ্যে খবর দিয়ে দিয়েছে। ফারুক ওদের কাছে এসে মোটর সাইকেল থেকে নেমে, ছেলেকে বলল, “চল, বাড়ি চল”। জামালকে সে দেখেছে দূর থেকেই। ফারুকের মনে হল, জামাল ইচ্ছে করে আটকে রেখেছে ওর ছেলেকে। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। বেগম তার জামাল ভাইয়ের আসল পরিচয়টা পেয়ে যাবে এবার। জামাল ফারুকের কথা শুনে বললে, “এখন এখান থেকে তোমরা কোথাও যেওনা। আমি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে খবর দিয়েছি। ওরা এলো বলে”। জামালের কথা শুনে লতিফের মুখে  সামান্য পরিবর্তন ঘটে গেল; জামালের তা নজর এড়াল না। ফারুক রেগে গিয়ে জামালকে বলল, “তুমি ওকে এখান থেকে যেতে না দেবার কে? তুমি কি নেতা, যে এইসব করছ?” জামাল সামান্য হেসে বলল, “নেতা হলে আমি আসতামই না”। লতিফ গাড়ির ভেতর থেকে একটা কাগজ নিয়ে এলো জামালকে দেখাবে বলে। সকালবেলা এয়ারপোর্টের কাছাকাছি একটা হোটেলের কোনও একজন লতিফের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলল, “সাত দিনের ঘর ভাড়া দিলে আমরা আপনাকে চোদ্দ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকার সার্টিফিকেট দিয়ে দেব। আপনি আমার সাথে আমাদের হোটেলে আসুন। চোদ্দদিন আপনাকে থাকতেও হবে না”। লতিফের কাছে প্রস্তাবটা মন্দ লাগল না।

অনেকগুলো টাকা খরচ করে ওর জন্যে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধির কাগজপত্র যোগাড় করে নিল সেখান থেকে। তারপর হোটেলের গাড়ি করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। জামালকে লতিফ সেই সব কাগজপত্র দেখতে বলল। জামাল কাগজপত্র না ছুঁয়ে লতিফকে বললে, “আমি এসবের কিছু বুঝবোনা। তবে এইটুকু বুঝি যে, তোর শরীরে যদি কোথাও করোনা ভাইরাস থেকে থাকে তবে তাকে এইসব কাগজপত্র দিয়ে ছড়িয়ে পড়া থেকে আটকাতে পারবি না। স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে যারা আসবে তাদের দেখাস। তারা এলেই আমার ছুটি”। ইতিমধ্যে একটা সাদা রঙের গাড়ি এসে দাঁড়াল ওদের পাশে। গাড়ি থেকে দুজন পুলিশের সাথে আরেকজন যিনি নামলেন, তাঁকে দেখে জামাল উঠে দাঁড়িয়ে বললে, “নমস্কার ডাক্তারবাবু, এই ছেলেটি আমাদের গ্রামের ছেলে। আপনি দয়া করে এই ছেলেটির একটা ব্যবস্থা করে দিন, যাতে এর জন্য আমাদের গ্রামে করোনা ভাইরাস ঢুকতে না পারে; আবার এরও যেন কোন ক্ষতি না হয়। ছেলেটার বাড়ির লোক ওই মোটর সাইকেলের ওপরে বসে। আমার আর থাকার দরকার নেই; আমি এখন চলে যাচ্ছি”। এই বলে জামাল শেখ তার সাইকেলে মৃদু ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ তুলতে তুলতে চলে গেল।  

 

অমিতাভ ভট্টাচার্য্য
কোলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত         

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top