সিডনী রবিবার, ৯ই মে ২০২১, ২৫শে বৈশাখ ১৪২৮


ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ : মোঃ শামছুল আলম


প্রকাশিত:
২৯ এপ্রিল ২০২১ ১৫:১০

আপডেট:
৯ মে ২০২১ ০৪:৪৫

 

১৭ রমজান ঐতিহাসিক ‘বদর দিবস’। ইসলামের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অসামান্য। বদরের যুদ্ধ ছিল আত্মরক্ষার্থের, সত্যের পক্ষে, নিপীড়িতদের পক্ষে, মানবকল্যাণের নিমিত্তে।
দ্বিতীয় হিজরি তথা হিজরতের দ্বিতীয় বছর রমজান মাসের ১৭ তারিখ এ যুদ্ধ হয় মদিনা হতে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৮০ মাইল দূরে বদর উপত্যকায়।
বদর যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত এই যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিমরা সংখ্যায় অনেক কম হয়েও মক্কার কাফির শক্তিকে পরাজিত করে ইসলামের স্বর্নোজ্জল সূচনার সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সূচিত হয়ে যায়। এজন্য এই যুদ্ধকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী বলা হয়। আল-কোরআনে এই দিনকে ইয়াওমূল ফুরক্বান বলা হয়। রাসূল (সা.)- এর মদিনায় হিজরতের মাত্র দেড় বছর পরের ঘটনা এটি। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কুরাইশরা রাসূল (সা.) কে মদিনা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য নানারকম অপচেষ্টা চালায়।

বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটঃ
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার কাফির কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জন্মভূমি মক্কা, খানায়ে কাবা, বাড়িঘর, আত্মীয়-স্বজন প্রভৃতির মায়া কাটিয়ে সাহাবাগণসহ একটু শান্তিতে বসবাস করার আশায় মদীনায় আগমন করেছিলেন। কিন্তু এখানে এসে তিনি শান্তিতে বসবাস করতে পেরেছেন? হ্যাঁ, মক্কা থেকে একটু ভালো পরিবেশ সৃষ্টি হলেও ভিতরে ভিতরে কাফিরদের মনের তীব্র জ্বালা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা গোপনে গোপনে নবী (স.) কে নিঃশেষ করার জন্যে মক্কার কোরাইশ সর্দারদের সাথে সুকৌশলে বৈঠক করত । এবং মক্কা থেকে কোরাইশগণ দলবদ্ধভাবে একাধিক্রমে কয়েকবার মদীনার উপকণ্ঠে এসে দস্যুবেশে হামলা করে লুটপাট করে নিয়ে যায়। মুলত এগুলোই ছিলো মক্কা-মদীনায় যুদ্ধের ভূমিকা বা বদর যুদ্ধের প্রাথমিক সূত্রপাত।
এ ছাড়া বদর যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ হচ্ছে নাখলার খণ্ডযুদ্ধ, কাফেরদের রণ প্রস্তুতি, আবু সুফিয়ানের অপপ্রচার, যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য ওহি লাভ, মক্কাবাসীর ক্ষোভ ইত্যাদি।

যেসব পরোক্ষ কারণে বদর যুদ্ধের সূচনা হয়েছে তা হচ্ছে, মদিনা শরিফে সাফল্যজনকভাবে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় কুরাইশদের হিংসা, আবদুল্লাহ বিন উবাই ও ইহুদিদের ষড়যন্ত্র, কুরাইশদের যুদ্ধের হুমকি, তাদের বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা, কাফেরদের আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা, ইসলামের ক্রমবর্ধমান শক্তির ধ্বংস সাধন করা এবং নবীজি (সা.)-কে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার কাফেরদের অশুভ বাসনা।

শামের রাস্তা মদিনার ওপর দিয়েই ছিল। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মক্কার একটি বিশাল বাণিজ্য কাফেলা শামে গিয়েছিল। এক হাজার মালবাহী উটের এ বাণিজ্য বহরের পাহারায় ছিল ৪০ জন সশস্ত্র অশ্বারোহী যোদ্ধা। তারা যখন ফিরে আসছিল, তাদের ওপর আত্মরক্ষার্থে হামলা করার সিদ্ধান্ত নিল মুসলমানরা। মুসলমানদের আত্মরক্ষার্থে এ হামলার বিকল্প ছিল না। কেননা মক্কার প্রতিটি ঘর থেকে প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুসারে অর্থ দিয়ে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে বাণিজ্য কাফেলা শামে পাঠানো হয়েছিল কেবল মুসলমানদের চিরতরে নির্মূল করার জন্য।

 

বদরে দুই পক্ষের তুলনামূলক অবস্থাঃ
মুসলিমদের পক্ষে ছিলেন মাত্র ৩১৩ জন, অপরপক্ষে কাফেরদের সংখ্যা ছিল এক হাজারের অধিক। মুসলমানদের ৩১৩ জন সাহাবির মধ্যে ৮৫ জন ছিলেন মুহাজির সাহাবি; বাকি সবাই ছিলেন মদিনার আনসার। আনসারদের মধ্যে ৬১ জন আউস গোত্রের আর বাকি ৬৯ জন ছিলেন খাজরাজ গোত্রের। পুরো ৩১৩ জনের দলে উট ছিল ৭০টি আর ঘোড়া ছিল মাত্র দু’টি।
অপরদিকে কাফেরদের এক হাজারের দলের ৬০০ জনের কাছে ছিল দেহ রক্ষাকারী বর্ম এবং তাদের কাছে ঘোড়া ছিল ২০০টি। যুদ্ধক্ষেত্রটিতে মুসলমানেরা যে স্থানটিতে অবস্থান নিয়েছিলেন সেখানে সূর্যের তেজ সরাসরি তাদের মুখের ওপরে পড়ে। কিন্তু কাফেরদের মুখে দিনের বেলায় সূর্যের আলো পড়ে না। মুসলমানেরা যেখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবেন সেখানের মাটি একটু নরম, যা যুদ্ধেক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত নয়। অপর দিকে কাফেররা যেখানে অবস্থান নিয়েছিলো সেখানের মাটি শক্ত এবং যুদ্ধের জন্য স্থানটি ছিলো উপযুক্ত।
এহেন সঙ্কুল পরিস্থিতিতে বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে আল্লাহ সুরা আনফালের ৩৬ নং আয়াতে কাফিরদের যুদ্ধের প্রস্ততি ও প্রত্যয় উল্লেখ করে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য যুদ্ধের পরিনতির কথা জানিয়ে দিয়ে বলেন-

“নিঃসন্দেহে যেসব লোক কাফের, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধন-সম্পদ, যাতে করে বাধাদান করতে পারে আল্লাহর পথে। বস্তুতঃ এখন তারা আরো ব্যয় করবে। তারপর তাই তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হবে এবং শেষ পর্যন্ত তারা হেরে যাবে।”

 

নবী (স.) এর নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরুঃ
বদর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) পানির উৎস হিসেবে বদরের কূপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে গেলেন এবং মধ্যরাতে কূপের কাছে পৌঁছে তাঁবু ফেললেন। সাহাবারা সেখানে হাউস বানালেন এবং বাকি সব জলাশয় বন্ধ করে দিলেন।
এরপর রাসুল (সা.) সেনাবিন্যাস করেন। উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হলো। এ সময় রাসুল (সা.) হাত তুলে আল্লাহর দরবারে বললেন-

‘হে আল্লাহ, কুরাইশরা পরিপূর্ণ অহংকারের সঙ্গে তোমার বিরোধিতায় এবং তোমার রাসুলকে মিথ্যা প্রমাণ করতে এগিয়ে এসেছে। হে আল্লাহ, আজ তোমার প্রতিশ্রুত সাহায্যের বড় বেশি প্রয়োজন। আল্লাহ, তুমি আজ ওদের ছিন্নভিন্ন করে দাও।’
রাসুল (সা.) এ সময় মুসলিম বাহিনীকে কাতারবন্দি করলেন। কাতার সোজা করার পর নবী (সা.) সাহাবিদের বললেন, তাঁর পক্ষ থেকে নির্দেশ না পেয়ে কেউ যেন যুদ্ধ শুরু না করে। তিনি সাহাবিদের সামনে নিজের যুদ্ধ পরিকল্পনা তুলে ধরলেন এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিলেন। তিনি বললেন-

পৌত্তলিকরা যখন দলবদ্ধভাবে তোমাদের কাছে আসবে, তখন তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করবে। তীরের অপচয় যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখবে। তারা তোমাদের ঘিরে না ফেলা পর্যন্ত তরবারি চালাবে না। এরপর নবী (সা.) হজরত আবু বকর (রা.)- কে সঙ্গে নিয়ে অবস্থান কেন্দ্রে চলে গেলেন।
যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন ছিল আসওয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ মাখজুমি। সে ময়দানে বের হওয়ার সময় বলছিল, আমি আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা করছি যে ওদের হাউসের পানি পান করেই ছাড়ব। যদি তা না পারি, তবে সেই হাউসকে ধ্বংস বা তার জন্য জীবন দেব। অন্যদিকে সাহাবিদের মধ্য থেকে হজরত হামজা ইবনে আবদুল মোত্তালেব এগিয়ে যান এবং আসওয়াদকে হত্যা করেন। তার মৃত্যুর পর যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কুরাইশ বাহিনীর মধ্য থেকে তিনজন বিশিষ্ট যোদ্ধা বেরিয়ে এলো। তারা হলো রাবিয়ার দুই পুত্র ওতবা ও শায়বা এবং ওতবার পুত্র ওয়ালিদ। তাদের মোকাবেলায় আউফ, মুয়াউয়িজ ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এগিয়ে এলেন। কুরাইশরা জিজ্ঞাসা করল, তোমাদের পরিচয় কী? তারা বলল, আমরা মদিনার আনসার। কুরাইশরা বলল, তোমরা অভিজাত প্রতিদ্বন্দ্বী সন্দেহ নেই, কিন্তু তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। আমরা স্ববংশীয় অর্থাৎ কুরাইশদের সঙ্গে লড়াই করতে চাই। তখন রাসুল (সা.) ওবায়দা ইবনে হারেস, হামজা ও আলী (রা.)-কে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাঁরা তিনজনই নিজ নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করেন। তবে হজরত হারেস (রা.) ওতবার দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হন। এভাবেই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অমুসলিম বাহিনীর ব্যর্থতা ও হতাশার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠল। মুসলমানদের প্রবল আক্রমণে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। যুদ্ধের পরিণাম হয়ে উঠল সুস্পষ্ট। অন্যদিকে রাসুলে আকরাম (সা.) মুসলিম বাহিনীকে উদ্দীপ্ত করলেন এবং তাদের সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিলেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যের সুসংবাদও দিলেন। আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীর সাহায্যে ফেরেশতা প্রেরণ করলেন। আল্লাহর সাহায্য ও মুসলিম বাহিনীর বীরত্বের কাছে দাম্ভিক কুরাইশদের করুণ পতন হলো।

 

বদর যুদ্ধের ফলাফলঃ
অতঃপর যুদ্ধে মহান আল্লাহ’র প্রতিশ্রুত সাহায্য আসে এবং মুসলমানদের বিজয়ের মাধ্যমে বদরের যুদ্ধ সমাপ্ত হয়। এই যুদ্ধে মুসলিম পক্ষে ৬জন মুহাজির ও ৮ জন আনছার অর্থাৎ ১৪ জন শহীদ হন। অন্যদিকে কাফেরদের পক্ষের ৭০ জন নিহত ও ৭০ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বন্দী হয়। হিজরতের প্রাক্কালে মক্কায় রাসূল (সা.) কে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী আবু জাহল সহ ১৪ নেতার ১১ জনই এই যুদ্ধে নিহত হয়। বাকী তিনজন আবু সুফিয়ান, জুবায়ের বিন মুতব‘ইম ও হাকীম বিন হেযাম পরে মুসলমান হন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের হয় এবং বদর যুদ্ধের উদ্দেশ্য পূর্ণতা লাভ করে।

 

পরাজিতদের সাথে ব্যবহারঃ
বদর যুদ্ধের পর নবীজির (সা.) অবস্থান ছিল পরাজিত আত্মসমর্পণকারীদের হত্যা না করা ও কষ্ট না দেওয়া। যুদ্ধ শেষে নবীজি (সা.) প্রথম ঘোষণা করলেন: ‘তাদের হত্যা করো না।’ বদরের বন্দিদের প্রতি রাসূল (সা.) যে আদর্শ ব্যবহার দেখালেন, জগতের ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার। তাঁর আদেশে মদিনায় আনসার এবং মুহাজিররা সাধ্যানুসারে বন্দিদেরকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে আপন আপন গৃহে স্থান দিলেন এবং আত্মীয়-স্বজনের মতোই ব্যবহার তাদের সঙ্গে করেন। বন্দীদের স্বগতোক্তি ছিল—

'মদিনাবাসীদের ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হোক। তারা আমাদের উটে চড়তে দিয়ে নিজেরা পায়ে হেঁটে গেছে, নিজেরা শুষ্ক খেজুর খেয়ে আমাদের রুটি খেতে দিয়েছে'।

 

বদর যুদ্ধের গুরুত্বঃ
ফলাফল ও প্রতিক্রিয়ার দিক দিয়ে বদর যুদ্ধ ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ । প্রকৃতপক্ষে ইসলামের দাওয়াত অগ্রাহ্য করার দরুন মক্কার কাফের দের জন্যে যে খোদায়ী আযাব নির্ধারিত হয়েছিল, এ যুদ্ধ ছিল তারই প্রথম নিদর্শন। তাছাড়া ইসলাম ও কুফরের মধ্যে মূলত কার টিকে থাকবার অধিকার রয়েছে এবং ভবিষ্যতের হাওয়ার গতিই বা কোন দিকে মোড় নেবে, এ যুদ্ধ তা স্পষ্টত জানিয়ে দিল। এ কারণেই একে ইসলামের ইতিহাসে পহেলা যুদ্ধ বলা হয়।

 

বদর যুদ্ধে ঐশী সাহায্যঃ
মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম সৈন্য কতৃক এক সহস্রাধিক কাফের সৈন্যকে পরাজিত করা এবং এক প্রকার বিনা সাজ-সরঞ্জামে কয়েকগুণ বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে নির্মূল করা সত্ত্বেও তাদের কে বলে দেয়া হলোঃ তারা যেন এ ঘটনাকে নিজেদের বাহাদুরি বা কৃতিত্ব বলে মনে না করে। কারণ তাদের এ বিজয় শুধু আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ মাত্র। কেবল তারই দয়া এবং করুণার ফলে এতো বড়ো শত্রু বাহিনীকে তারা পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে। কাজেই তাদের কখনো আপন শক্তি -সামর্থের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; বরং সর্বদা আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং তারই করুণা ও অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে ময়দানে অবতরণ করার ভেতরে নিহিত রয়েছে তাদের আসল শক্তি।
যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে হযরত (সা.) এক মুঠো বালু হাতে নিয়ে ‘শাহাদাতুল ওজুহ’ (চেহারা আচ্ছন্ন হয়ে যাক) বলে কাফিরদের দিকে ছুঁড়ে মারেন। এরপরই মুসলমান সেনারা একযোগে কাফিরদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাদের কে ধরাশয়ী করে। অন্য লোক হলে এই ঘটনাকে নিজের ‘কেরামত ’ বা অলৌকিক কীর্তি বলে ইচ্ছামত গর্ব করতে পারতো এবং একে ভিত্তি করে তার অনুগামীরা ও নানারুপ কিস্‌সা-কাহিনীর সৃষ্টি করতো। কিন্তু কুরআন পাকে খোদ আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে বলে দিলেন-

‘তাদেরকে (কাফিরদেরকে) তোমরা হত্যা করো নি, বরং তাদের হত্যা করেছেন আল্লাহ।’ এমনকি তিনি হযরত (সা:) কে পর্যন্ত বলে দিলেন যে, ‘(বালু) তুমি ছুঁড়োনি, বরং ছুঁড়েছেন আল্লাহ এবং মুমিনদেরকে একটি উত্তম পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ করা হয়েছে।’(সূরা আনফাল , আয়াতঃ১৭)

এভাবে মুসলমানদেরকে বলে দেয়া হলো যে, প্রকৃত পক্ষে সমস্ত কাজের চাবিকাঠি রয়েছে আল্লাহর হাতে এবং যা কিছু ঘটে তার নির্দেশ ও ইচ্ছানুক্রমেই ঘটে থাকে। মুমিনদের কাজ হচ্ছে আল্লাহর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহ ও রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য করা এর ভেতরই নিহিত রয়েছে তাদের জন্যে সাফল্য।

 

বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের অংশগ্রহণঃ
আল্লামা ইবনে জারির (রহ.) হজরত আলী (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে হজরত জিব্রাইল (আ.) এক হাজার ফেরেশতা নিয়ে রাসুল (সা.)-এর ডান দিকে আর হজরত মিকাইল (আ.) এক হাজার ফেরেশতা নিয়ে রাসুল (সা.)-এর বাঁ দিকের বাহিনীর সঙ্গে এসে মিলিত হন। তবে আল্লামা ইবনে কাছির (রহ.) হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত ফেরেশতার বাহিনীদ্বয়ের পাঁচ শ করে মোট এক হাজার ফেরেশতা আগমনের তথ্যাটিকে সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারি শরিফে বদরের যুদ্ধে ফেরেশতা উপস্থিত হওয়ার বিষয়ে পৃথক একটি অধ্যায় রচনা করে ফেরেশতাদের আগমনের বিষয়টি সপ্রমাণ করেছেন।

 

বদর যুদ্ধের প্রভাবঃ
ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ সুদূরপ্রসারী প্রভাব সৃষ্টি হয়। যুদ্ধ জয়ের ফলে বিশ্বনেতা হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্তৃত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। ফলে মদিনার নতুন রাষ্ট্রকে অন্য আরব গোত্রগুলি মুসলিমদেরকে নতুন শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করে।
বদরের যুদ্ধের পর নতুন রাষ্ট্র মদিনার শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেকেই ইসলামের সুশীতল ছায়া তলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। মুসলিম উম্মাহর কাছে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ অনেক সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।
অন্যদিকে এ যুদ্ধে আবু জাহলসহ মক্কার অনেক প্রভাবশালী নেতৃবর্গ মৃত্যুবরণ করে। ফলে আবু সুফিয়ান কুরাইশদের নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। মক্কা বিজয়ের আগে বদর পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে কুরাইশদের নেতৃত্ব দেয় আবু সুফিয়ান।
১০ হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলিম হওয়ার পর আবু সুফিয়ান মুসলিম সাম্রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। খোলাফায়ে রাশেদার ৩০ বছর রাজত্বের পর তার ছেলে আমীর মুয়াবিয়া উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন।

 

বদরের যুদ্ধের শিক্ষাঃ
বদরের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় বিষয় হল সব কিছুর জন্য সবার উপরে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা বা তাওয়াক্কুল করা। এই যুদ্ধ প্রমান করে সংখ্যা ও যুদ্ধ সরঞ্জামের কমবেশী বিজয়ের মাপকাঠি নয়, বরং আল্লাহর উপরে দৃঢ় ঈমান ও তাওয়াক্কুল হল বিজয়ের মূল হাতিয়ার।
বদরের যুদ্ধ মুসলমানদের শিখিয়েছে জাগতিক সকল প্রস্ততির পরেও বিজয় বা সাফল্যের জন্য নির্ভর করতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহ’র ওপর। তবেই মহান আল্লাহর সাহায্য আসবে এবং বিজয়লাভ বা সফল হওয়া সম্ভব হবে। আল্লাহ তায়ালা সংখ্যায় কম হওয়া সত্ত্বেও বদর প্রান্তরে মুসলমানদের বিজয় ও সফলতা দিয়েছেন, সেই অনন্ত স্রষ্ট্রা মহাপ্রভূ আল্লাহ একইভাবে সেসব ক্ষেত্রেও মুসলমানদের সাহায্য করতে সক্ষম, যখন একমাত্র মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে সততা ও ইখলাস সহকারে তাঁর দ্বীনের বিজয়ে লক্ষ্যে মুসলমানরা এগিয়ে যাবে। এই এগিয়ে যাওয়ায় সেই অকুতোভয় মুজাহিদ বদরের সৈনিকদের কথা স্মরণ করে নিজেরাও প্রয়োজনে বদরের মতো যুদ্ধে যেতে পারি সেই শিক্ষাই আমাদের বদর দিবস থেকে নিতে হবে।

বদর যুদ্ধের পরই কাফিরদের প্রচেষ্টা থেমে যায়নি। বরং অব্যাহত রয়েছে আজ পর্যন্ত, এবং তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মহান আল্লাহ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন-

‘বস্তুতঃ তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদেরকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়’।

ইসলামে জিহাদ যে কেবল জয়ের জন্য যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধ প্রস্তুতি মাত্র নয়, রক্ত ও মৃত্যুর বিভীষিকা যে জিহাদের মূল চিত্র ও চেতনা নয়, বদরের প্রান্তরে প্রার্থনার কান্না, যুদ্ধকালে রোজা রেখে ক্ষুধার্ত থাকা আর শান্তি ও সত্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ধরে রাখার মধ্য দিয়ে বদর যুদ্ধ তার এক উজ্জ্বল মানবিক রূপ উপহার দিয়েছে।

মাহে রমজান ফিরে ফিরে আসে কিন্তু ইসলামের বিজয় আসে না। বদরের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে বাতিল শক্তির মোকাবেলায় এখন আর মুসলমানকে লড়তে দেখা যায় না। রাসূল (সা.) যুদ্ধের সার্বিক প্রস্তুতির নেয়ার পর কাতরকণ্ঠের প্রার্থনা উম্মতকে যে আধ্যাত্মিকতা শিখিয়েছে আজ তার প্রতিফল দেখি না। ইসলামের পরাজয়ে আমরা শুধু দোয়া করাকেই যথেষ্ট মনে করছি। দোয়ার সঙ্গে প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবাদ করছি না। অন্যায়ের কাছে, অসত্যের কাছে মাথা না নোয়ানোই বদরের শিক্ষা, ওহুদের শিক্ষা, কারবালার শিক্ষা। কাজী নজরুলের কবিতা দিয়েই শেষ করছি-

‘বালু ফেড়ে ওঠে রক্ত-সূর্য ফজরের শেষে দেখি / দুশমন খুনে লাল হয়ে ওঠে খালেদী আমামা একি!/ খালেদ! খালেদ! ভাঙ্গিবে না কি ও হাজার বছরী ঘুম?/ মাজার ধরিয়া ফরিয়াদ করে বিশ্বের মজলুম।’

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top