সিডনী রবিবার, ৭ই আগস্ট ২০২২, ২৩শে শ্রাবণ ১৪২৯


ঈমানের পরিচয় ও মৌলিক স্তম্ভ


প্রকাশিত:
১০ মার্চ ২০২০ ১৬:১০

আপডেট:
১০ মার্চ ২০২০ ২১:২১

ফাইল ছবি

প্রভাত ফেরী: ইসলামের মূল স্তম্ভ পাঁচটি। ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব ও যাকাত। এই পাঁচ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা এবং তদানুযায়ী আমল করা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। সবার আগে ‘ঈমান’ আনতে হবে। ঈমান ঠিক না করে জীবনভর নেক আমল করলেও আখেরাতে কোনো লাভ হবে না। জিবরাঈল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে ছদ্মবেশে এসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, ঈমান কাকে বলে? জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ঈমানের হাকিকত বা স্বরূপ হলো, তুমি বদ্ধমূলভাবে বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহ তায়ালার প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, আসমানি কিতাবগুলোর প্রতি, আল্লাহর নবী-রাসুলদের প্রতি, কেয়ামত দিবসের প্রতি এবং তকদিরের ভালো-মন্দ সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হওয়ার প্রতি।’ (বোখারি : ৫০)। উল্লিখিত হাদিসটি ‘ঈমানে মুফাসসাল’ এর ভিত্তি। ঈমানে মুফাসসালে ঘোষণা করা হয়, আমি ঈমান আনলাম, ১. আল্লাহ তায়ালার প্রতি, ২. তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, ৩. তাঁর কিতাবগুলোর প্রতি, ৪. তাঁর নবী-রাসুলদের প্রতি, ৫. কেয়ামত দিবসের প্রতি, ৬. ভালো-মন্দ তকদিরের প্রতি এবং ৭. মৃত্যুর পর কেয়ামতের দিন আবার জীবিত হওয়ার প্রতি।

আলোচ্য হাদিসে ঈমানের পরিচয়ে মৌলিক ছয়টি বিষয়ের ওপর বিশ্বাস রাখার কথা বলা হয়েছে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে এ ছয় বিশ্বাসের সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হলো।

আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস

ঈমানের প্রথম এবং প্রধান স্তম্ভ হলো-‘আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রভু নেই’অন্তরে এই বিশ্বাস স্থাপন করা। এ কথা বিশ্বাস করা যে- আল্লাহ এক, অদ্বিতীয় ও অতুলনীয়। তার কোনো অংশীদার নেই, তার কোনো কিছুর অভাব নেই। তিনিই সবার অভাব পূরণকারী। তিনি কারও বাবা নন, ছেলেও নন। তার সমতুল্য কেউ নেই। একমাত্র তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা ও পালনকর্তা। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। তিনিই একমাত্র ইবাদত পাওয়ার যোগ্য। তিনি চিরঞ্জীব, তার কোনো মৃত্যু নেই। তিনি ছাড়া অন্য সবকিছুই ক্ষয়শীল ও ধ্বংসশীল, কিন্তু তার ক্ষয়ও নেই, ধ্বংসও নেই। সবকিছুর ওপরই তার ক্ষমতা চলে। কিন্তু তার ওপর কারও ক্ষমতা চলে না। এসব কেবল অন্তরে বিশ্বাস নয়; মুখেও স্বীকার করা এবং অঙ্গ-প্রতঙ্গের মাধ্যমে তদানুযায়ী কাজ করা। তবেই আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন হবে।

ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হলো -ফেরেশতাদের অস্তিত্ব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা। তারাও আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি। আল্লাহর দরবারে তাদের অনেক সম্মান ও মর্যাদা। আল্লাহ তাদের যা আদেশ করেন তারা সঙ্গে সঙ্গে তা পালন করেন। ফেরাশতারা নবী-রাসুলদের কাছে আল্লাহর বাণী পুঙ্খানুপুঙ্খানো পৌঁছে দিতেন; কোনো হেরফের করা ব্যতীত। পবিত্র কোরআন ইরশাদ হয়েছে-‘ফেরেশতারা তো আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। তারা আগ বেড়ে কথা বলতে পারে না এবং তারা তার আদেশেই কাজ করে।’ (সূরা আম্বিয়া : ২৬-২৭)।

নবী-রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস

আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অনেক নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। সেই রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাও ঈমানের মৌলিক স্তম্ভের অন্তর্ভুক্ত। দৃঢ়ভাবে এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জাতির জন্য একজনকে দূত বানিয়ে পাঠিয়েছেন। যিনি তাদের এক আল্লাহর ইবাদত করার এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর ইবাদতকে অস্বীকার করার দাওয়াত দেন। সব নবী-রাসুল সত্যবাদী, সত্যায়নকারী, পুণ্যবান, সঠিক পথের দিশারি, তাকওয়াবান ও বিশ্বস্ত। আল্লাহ তাদের যা কিছু দিয়ে পাঠিয়েছেন তারা তা পরিপূর্ণভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। কোনো অংশ গোপন বা পরিবর্তন করেননি। নিজে থেকে কোনো সংযোজন বা বিয়োজন করেননি। আল্লাহ বলেন, ‘রাসুলদের দায়িত্ব তো শুধু সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছে দেয়া।’ (সূরা নাহল : ৩৫)। আরও ঈমান রাখতে হবে সর্বশেষ রাসুল হচ্ছেন আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)। তার পরে আর কোনো নবী নেই। আল্লাহ বলেন, ‘মুহাম্মদ তোমাদের কোনো ব্যক্তির বাবা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।’ (সূরা আহজাব : ৪০)

আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস

আল্লাহ তায়ালা মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী-রাসুলদের ওপর বিভিন্ন আসমানি কিতার নাজিল করেছেন। সেই কিতাবগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাও ঈমানের মৌলিক স্তম্ভ। কিতাবগুলোর প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপনের জন্য জরুরি হলো-এ বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে পোষণ করা যে, সব আসমানি কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে। এ কিতাবের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন।  আসমানি কিতাব যেমনÑকোরআন, তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল। এগুলো আল্লাহ প্রেরিত বড় কিতাব। তা ছাড়াও নবীদের ওপর ছোট ছোট অংখ্য আসমানি কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে; যেগুলোকে বলা হয় ‘সহিফা’। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-‘বলুন, আল্লাহ যে কিতাব নাজিল করেছেন, আমি তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি।’ (সূরা শুরা : ১৫)।

কেয়ামতের প্রতি বিশ্বাস

কেয়ামত দিবস তথা পরকালের প্রতি বিশ্বাসও ঈমানের মৌলিক স্তম্ভের অন্তর্ভুক্ত। এ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় লক্ষণীয়।  ১. মানুষের পুনরুত্থানে বিশ্বাস, ২. হাশরের মাঠের হিসাব-নিকাশ ও বিচারের বিশ্বাস এবং ৩. জান্নাত-জাহান্নামের বিশ্বাস ।

পৃথিবীর সবাই এক সময় মৃত্যুবরণ করবে। তারপর আল্লাহর হুকুমে একদিন মৃত ব্যক্তিদের আবার জীবিত করা হবে। সব মানুষ আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হবে। হাশরের মাঠ কায়েম হবে। সেদিন সবার বিচার করা হবে। দুনিয়াতে মানুষ যেসব কর্ম করেছে, সেদিন তাদের কর্মের হিসাব নেবেন আল্লাহ। বিশেষ পাল্লায় মানুষের আমল ওজন করা হবে। যার বদ আমলের চেয়ে নেক আমলের পাল্লা ভারী হবে, তিনি জান্নাতি হবেন। যার নেক আমলের চেয়ে বদ আমলের পাল্লা ভারী হবে, সে জাহান্নামি হবে। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যার ডান হাতে তার আমলনামা দেয়া হবে, অচিরেই তার হিসাব-নিকাশ সহজ করা হবে। বস্তুত সে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে সন্তুষ্টচিত্তে ফিরে যাবে। কিন্তু যার আমলনামা তার পিঠের পেছনের দিক থেকে দেয়া হবে, সে অচিরেই মৃত্যুকে ডাকবে এবং সে উত্তপ্ত জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সূরা ইনশিকাক : ৭-১২)। জান্নাত হলো চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির স্থান; মুমিনদের জন্য তা তৈরি করা হয়েছে। আর জাহান্নাম চিরস্থায়ী দুঃখ-কষ্টের স্থান। আল্লাহর অবাধ্যদের জন্য তা তৈরি করা হয়েছে।

তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস

তাকদিরে বিশ্বাস করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাকদিরের সহজ অর্থ ভাগ্যলিপি। পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা সমগ্র সৃষ্টিজীবের ভাগ্যলিপি লিখে রেখেছেন। তাকদিরের প্রতি ঈমান রাখা একজন মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন-এ চেতনা লালন করা এবং তার বিধি ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট থাকার মধ্যেই শান্তি ও মঙ্গল নিহিত রয়েছে। হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,‘কোনো বান্দা ঈমানদার হতে পারে না যতক্ষণ না সে বিশ্বাস রাখে যে, তাকদির ও তাকদিরের ভালোমন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয় এবং যতক্ষণ না সে এই বিশ্বাস রাখে যে, যা তার কাছে পৌঁছার তা কখনও তাকে ত্যাগ করবে না। আর যা তাকে ত্যাগ করার তা কখনও তার কাছে পৌঁছবে না।’ (তিরমিজি : ২১৪৪)। তাই, দুনিয়াতে কল্যাণকর কিছু ঘটলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। আর অকল্যাণকর কিছু ঘটলে তওবা-ইস্তেগফার এবং ধৈর্যধারণ করতে হবে। সেই সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য পাওয়ার ইচ্ছা প্রবল করতে হবে এবং তদনুযায়ী আমল বা চেষ্টা করে যেতে হবে।

এ ছয়টি ছাড়াও ঈমানের আরও অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে।

লেখক : আমিন ইকবাল, আলেম ও প্রাবন্ধিক

 

 


বিষয়: ঈমান


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top