সিডনী সোমবার, ২১শে জুন ২০২১, ৬ই আষাঢ় ১৪২৮


একাই একশো মাহি : শিবব্রত গুহ


প্রকাশিত:
৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৪:২৩

আপডেট:
৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:১৯

ছবিঃ মহেন্দ্র সিং ধোনি


"মাহি " -ভারতীয় ক্রিকেটে এক সাড়াজাগানো নাম। এই নামের প্রতি আস্থা দেখিয়েছে আপামর ভারতবাসী। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, যে, মাহি কে? তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন ভারতীয়দের হার্টথ্রব বিখ্যাত সদ্য প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার ও প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। যিনি একাই একশো।

তাঁর অধিনায়কত্ব ছিল, ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের এক অন্যতম প্রধান স্বর্ণযুগ। তিনি অনেক অসম্ভবকে করেছিলেন সম্ভব। প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির হাত ধরে, ভারতীয় ক্রিকেট দল যে সাফল্যের পথে হাঁটতে শুরু করেছিল, ধোনির অধিনায়কত্বে, সেই সাফল্য ছুঁয়ে ফেলল আকাশ। ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমী দর্শকেরা ভেসে গেলেন আনন্দের জোয়ারে। জীবনে কখনো হার মানতে শেখেননি মহেন্দ্র সিং ধোনি। তাঁর দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করার মানসিকতা দাবী রাখে প্রশংসার।

মহেন্দ্র সিং ধোনির মাথা খুব ঠান্ডা। খেলার মাঠে, হাজারো প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও, তিনি কখনও হননি টেনশনের শিকার। টেনশনে আক্রান্ত হয়ে, অনেক বিখ্যাত ক্রিকেট খেলোয়াড়েরা জেতা ম্যাচ হেরে বসেছেন, শুধু টেনশনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি বলে। এক্ষেত্রে, মহেন্দ্র সিং ধোনি একদম ব্যতিক্রমী একজন ক্রিকেটার।

তিনি কখনো তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে আক্রান্ত হননি টেনশনে। তিনি অদ্ভুতভাবে, প্রবল চাপের মুখে ভেঙে না পড়ে, চঞ্চল না হয়ে, থাকতেন একদম শান্ত। খেলার মাঠে, তাঁকে দেখে, হাজারো খারাপ পরিস্থিতির মুখে পড়েও, কখনো মনে হয়নি, তিনি চাপে আছেন। এজিনিসটা ক্রিকেট বিশ্বে সবাইকে অবাক করতো। তিনি কিভাবে চাপকে নিয়ন্ত্রণ করতেন? তা নিয়ে আজো চলছে প্রবল চর্চা।

মাহির আর একটা বড় গুণ হল, তিনি খুব ভালো গেম রিড করতে পারেন। খেলার কোন পরিস্থিতিতে, কোন চাল দিলে, খেলার পটপরিবর্তন হবে? তাতে তিনি হলেন সিদ্ধহস্ত। প্রতিপক্ষ, এতে বারবার তাঁর কাছে বোকা বনে গেছে, দেশে ও বিদেশে। এরকম অনেক উদাহরণ রয়েছে।

মহেন্দ্র সিং ধোনির ব্যক্তিত্ব সত্যিই অসাধারণ। যার হয় না কোন তুলনা। তিনি একজন জন্মগত নেতা। নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যই তাঁর জন্ম হয়েছে। মহেন্দ্র সিং ধোনি যখন, খেলার মাঠে, দল পরিচালনা করতেন, তা ছিল, দেখবার মতো। তাঁর পদচারণা, খেলার মাঠে, দেখলে মনে হতো, যেন তিনি মাঠে নেমেছেন খেলায় জেতার জন্যই। তিনি, সহ - খেলোয়াড়দের খুব সুন্দর মোটিভেট করতেন।

মহেন্দ্র সিং ধোনি, সহ - খেলোয়াড়দের কাছে থেকে, তাঁদের সেরা পারফরম্যান্স সঠিক সময়ে বের করে আনতেন । তিনি হলেন ভারতের অন্যতম সেরা উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। একজন উইকেটকিপার যদি ভালো ও দক্ষ ব্যাটসম্যান হয়, তাহলে, যে দলের কত উপকার হয়! হারা ম্যাচ জেতা যায়! তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি।

তিনি হলেন ভারতীয় তথা বিশ্ব ক্রিকেটের একজন দক্ষ ফিনিশার। তাঁর ম্যাচ ফিনিশ করার অবিশ্বাস্য দক্ষতা, সবাইকে দেয় অবাক করে। ওয়ান ডে ক্রিকেট ও টি- টোয়েন্টি ক্রিকেটে, মানে, সীমায়িত ওভারের ক্রিকেটে, তাঁর মতো ফিনিশার খুব কমই আছে। তিনি যে একা হাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতকে ও আইপিএলে
চেন্নাই সুপার কিংসকে জিতিয়েছেন, কত ম্যাচে, তার শেষ নেই।

মহেন্দ্র সিং ধোনির হেলিকপ্টার শট দেখবার মতো। তিনি কিভাবে, মাঠে নেমে, স্কোরবোর্ডকে সচল রাখতে হয়? তা ভালোভাবেই জানেন। তাঁর রানিং বিটুইন দ্য উইকেটস, দেখবার মতো। এক রানকে কিভাবে ফিল্ডারের চোখে ধুলো দিয়ে, দুই রানে, পরিবর্তন করতে হয়? সেব্যাপারে তিনি একদম সিদ্ধহস্ত।

যখন স্কোরবোর্ডে রানের দরকার, তখন চার - ছয় মেরে, ঝড়ের গতিতে, তিনি রান তুলে নিতেন। তাঁর পেল্লাই ছক্কাগুলো, দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত, দর্শকদের। তারা হাততালি দিয়ে ভরিয়ে দিত তাদের প্রিয় মাহিকে। ধোনির এক মস্ত গুণ হল, যে - কোন ধরনের ক্রিকেটে, তিনি ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাট করে যান। যখন মারার দরকার, মারবেন, ধরতে হলে ধরবেন। এমনই হলেন ক্রিকেটার মাহি।

ভারত তথা, বিশ্বের সর্বকালের সেরা অধিনায়কদের, মধ্যে, একজন হলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। বলা যেতে পারে, তিনি একজন বিশ্ববন্দিত অধিনায়ক। ২০০৭ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকায়, অনুষ্ঠিত, আইসিসি বিশ্ব টুয়েন্টি ২০ বিশ্বকাপে, ভারতীয় দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তাঁর নেতৃত্বে।

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে, ভারতীয় ক্রিকেট দল, আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে, ১নং দলের মর্যাদা পায়। ২০১১ সালে, ভারতের মাটিতে, তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বে, ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ভারত ৫০ ওভারের একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপে, চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এই ম্যাচ জিততে ভারতের হয়ে বিরাট অবদান রেখেছিলেন ব্যাট হাতে, মহেন্দ্র সিং ধোনি।

তিনি যখন ওই ম্যাচে, ব্যাট হাতে, মাঠে নেমেছিলেন, তখন ভারতের ওই ম্যাচ জিততে দরকার ছিল, ওভারপ্রতি ৬ রান করে। কিন্তু, এরই মধ্যে, ভারতের প্রথম তিনজন ব্যাটসম্যান ইতিমধ্যে, গিয়েছিল, আউট হয়ে। এই পরিস্থিতিতে, মহেন্দ্র সিং ধোনি, গৌতম গম্ভীরের সাথে জুটি বাঁধেন। তাঁরা ক্রমাগত স্কোরবোর্ডকে রাখতে থাকেন সচল। একদম শেষে, মহেন্দ্র সিং ধোনি ছয় মেরে, দলের জয় নিশ্চিত করেছিলেন ও তৈরি হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস।

মাহি বরাবরই, টিমম্যান। তিনি বরাবরই টিমের স্বার্থকে দিয়েছেন গুরুত্ব। স্লগ ওভারে, কিভাবে, ম্যাচ জেতাতে, হয়? তা ধোনি খুব ভালো ভাবে জানেন। তিনি একজন বিশ্বমানের উইকেটকিপারও বটে। তাঁর উইকেটকিপিং দেখবার মতো। উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে তিনি সব অসাধারণ স্ট্যাম্পিং করেছেন, ক্যাচ ধরেছেন। যা হয়ে গেছে ইতিহাস।

মহেন্দ্র সিং ধোনি একাধিক সন্মান ও পুরষ্কার পেয়েছেন। তিনি ২০০৮ ও ২০০৯ সালে, আইসিসি একদিনের ক্রিকেটের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার পেয়েছিলেন। এছাড়া, তিনি, রাজীব গান্ধী খেলরত্ন ও পদ্মশ্রী পেয়েছেন। তিনি এমন একজন ভারতীয় অধিনায়ক, যে, তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেট দল, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ৫০ ওভারের একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপ ও আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতেছিল। যা এক অনবদ্য রেকর্ড। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলেও, তাঁর সাফল্য ঈর্ষনীয়। চেন্নাই সুপার কিংসকে তিনি এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন আইপিএলে।

মহেন্দ্র সিং ধোনির জন্ম হয় ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাঁচিতে। তাঁর বাবার নাম হল পান সিং ও মায়ের নাম হল দেবকী দেবী। মাহিদের পৈতৃক নিবাস উত্তরাখন্ড রাজ্যের আলমোড়া জেলার লামগাড়া ব্লকের লাওলি গ্রামে৷ পান সিং, যখন রাঁচির মেকন লিমিটেডে জুনিয়র ম্যানেজারের পদে চাকরী করতেন, তখনই তাঁর পরিবার উত্তরাখন্ড থেকে চলে আসে রাঁচিতে।

মাহি আগে, তাঁর প্রিয় অভিনেতা জন আব্রাহামের মতো লম্বা চুল রাখতেন। তাঁকে ক্রিকেট বিশ্বের স্টাইল আইকন বললেও কম বলা হয়। তাঁর চুলের স্টাইলে বারেবারে দেখা গেছে অভিনবত্ব। যা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে উৎসাহের সঞ্চার করেছে সর্বদা। তিনি বরাবর বাইক চালাতে ভালোবাসেন। গতি তাঁর খুব প্রিয়।
তাঁর জীবনের গতিপথ এই গতির ওপর নির্ভর করে বারংবার হয়েছে পরিবর্তিত।

সম্প্রতি তিনি অবসর গ্রহণ করেছেন ক্রিকেট থেকে। তাঁর এই ক্রিকেট থেকে অবসরগ্রহণের পরে সারা ভারত ভাসছে আবেগে। এবার ধোনি কি করবেন? তাই নিয়ে চলছে জল্পনা আর কল্পনা। কেউ বলছেন, তিনি এবার রাজনীতিতে করবেন প্রবেশ। আবার অন্য কারুর মত, তিনি ক্রিকেট কোচিং করবেন এবার থেকে। সে যাই হোক, এটা তো সত্যি, যে, ভারতীয় দলের হয়ে আর ক্রিকেট খেলতে দেখা যাবে না মাহিকে।


( তথ্য সংগৃহীত)



শিবব্রত গুহ
কলকাতা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top